তেজস্ক্রিয়তা কি?




  • 1 Answer(s)

    ইউরেনিয়াম ধাতুর নিউক্লিয়াস থেকে স্বতঃস্ফূর্ত-ভাবে অবিরত যে বিশেষ ছেদন শক্তি সম্পন্ন রশ্মি নির্গত হয় তা প্রথম আবিষ্কার করেন ১৮৯৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরী বেকরেল । পরবর্তীতে দেখা গেছে যে, অস্থিত আইসোটোপগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন ধরনের রশ্নি বিকিরণ করে নিজের নিউক্লিয়াসে পরিবর্তন এনে অন্য মৌলের স্থিত আইসোটোপে পরিণত হয়। এই আচরণ বা ধর্মকে তেজস্ক্রিয়তা বলা হয়। এই ধরনের আইসোটোপগুলোকে বলা হয় তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ। ইউরানিয়াম-২৩৬, স্ট্রনসিয়াম-৯০, আয়োডিন-১৩০, প্লোটোনিয়াম-২৩৯ উল্খেখযোগ্য তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ। তেজষ্ক্রিয়তা পরমাণুর নিউক্লিয় ঘটনা, তাই একে বাইরের কোন সাধারণ ভৌত প্রক্রিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

    আমরা জানি, প্রত্যেক পদার্থ পরমাণু নামক অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত। সব মৌলের পরমাণুতে থাকে ইলেকট্টন, প্রোটন এবং নিউট্রন – এই তিনটি মূল কণিকা। নিউট্রন ও প্রোটন পরমাণুর কেন্দ্র নিউক্লিয়াসে অবস্থান করে। ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের বাইরে অবস্থান করে। পরমাণু সামগ্রিকভাবে কোনরূপ চার্জযুক্ত থাকে না। নিউট্রন চার্জবিহীন, পরমাণুতে নেগেটিভ ইলেকট্রন ও পজিটিভ প্রোটনের সংখ্যা সমান । একই মৌলের পরমাণুর কয়েক প্রকারের ভর হতে পারে (ভর = প্রোটন ও নিউট্রনের সর্বমোট সংখ্যা)। যে সব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু ভর সংখ্যা ভিন্ন হয়, সে সব পরমাণুকে পরস্পরের আইসোটোপ বলা হয়। অর্থাৎ নিউট্রনের সংখ্যার তারতম্যের জন্যই আইসোটপের সৃষ্টি।

    উপরের চিত্রে কার্বনের তিনটি পরমাণু – প্রোটনের সংখ্যা একই, পার্থক্য শুধু নিউট্রনের, যথাক্রমে ৬, ৭ ও ৮। সুতরাং এগুলো কার্বনের আইসোটোপ। পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশের বেশিরভাগ কার্বনই কার্বন-১২। একই মৌলের সব আইসোটপের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম একই , তবে আচারব্যবহারে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন কার্বন -১৪ অস্থিত ও তেজস্ক্রিয়। আইসোটোপগুলো প্রাকৃতিক হতে পারে বা কৃত্রিমভাবেও প্রস্তুত করা যায়।
    আরো সহজ করে বলা যায়, তেজস্ক্রিয়তা (Radioactivity) হচ্ছে স্থিতিহীন পরমাণু (unstable atoms) থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্গত শক্তি। এই শক্তি ভরযুক্ত পার্টিকেল রশ্মি বা ভরবিহীন বিদ্যুৎচৌম্বকীয় রশ্মি উভয় ধরণের হয়। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ রশ্মি প্রধানত তিন ধরনের: আলফা বিটা ও গামা রশ্মি।

     

    আলফা (α) কণাগুলো দু’টি নিউট্রন ও দু’টি প্রোটনের সমন্বয়ে গঠিত। তুলনামূলকভাবে এটি ভারী ও ধনাত্মক চার্জযুক্ত বিকিরণ। গঠনানুসারে একে হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস বলা যেতে পারে। আলফা বিকিরণ বায়ুর মধ্যে ২-৩ সেন্টিমিটারের বেশি যেতে পারে না। এমনকি সামান্য কাগজের বাধাও আলফা অতিক্রম করতে পারে না। তাই দুরত্বের দিক দিয়ে এটি মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে আলফা বিকরিত হচ্চে এমন কোন বস্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মারাত্মক ক্ষতি (যা অন্যান্য রশ্মি অপেক্ষা প্রায় ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি) হওয়ার সম্ভাবণা থাকে।

    বিটা (β) কণাগুলো খুবই হালকা যার ওজন প্রায় নেই বললেও চলে। চারিত্রিক বৈশিষ্টের দিক দিয়ে এগুলো ইলেকট্রনের মত। এরা প্রকৃতপক্ষে তীব্র গতিসম্পন্ন ইলেকট্রোন। বিটা কণাগুলো ঋণাত্মক চার্জযুক্ত এবং এদের ছেদন করার ক্ষমতা আলফা কণা থেকে ১০০০ গুণ বেশি। এরা বায়ুর মধ্যে কয়েক ফুট পর্যন্ত যেতে পারে এবং মানুষের ত্বকের বহিরাবরণ ভেদ করতে পারে। অতি মাত্রায় বিটা রশ্নির প্রভাবে চর্মরোগ জাতীয় সমস্যা দেখা দিতে পারে, এমনকি স্কীন ক্যান্সারও হতে পারে।
    গামা (γ) রশ্নি কোন কণিকা নয়, এটি সাধারণ আলোকের ন্যায় তড়িৎ-চৌম্বক (electro-magnetic) তরঙ্গ। তাই এদের গতিবেগ সেকেন্ডে প্রায় ৩০০০০০ কিলোমিটার (১৮৬০০০ মাইল)। এদের ছেদন ক্ষমতা খুবই বেশি। এরা রঞ্জন রশ্মির ন্যায় বিভিন্ন পদার্থের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে পারে। একমাত্র লিড বা কংক্রিটের তৈরি প্রশস্ত দেওয়াল দিয়েই গামা রশ্নিকে আটকে রাখা সম্ভব। এরা জীবন্ত কোষের ক্ষতি সাধন করে। তেজস্ক্রিয়তার ফলে বিস্তীর্ন এলাকায় জীব ও উদ্ভিদ জগতের উপর সুদুরপ্রসারী যে ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তারজন্য প্রধানতঃ এই গামা রশ্মিই দায়ী। তাছাড়া যে কোন পদার্থ গামা রশ্মি গ্রহণ করার পর অস্বাভাবিক কিছু কণা বিকিরন করে যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
    মহাজাগতিক, গামা, রঞ্জন, অতিবেগুনি, দৃশ্যমান ও অবলোহিত রশ্মি এবং মাইক্রো, রেডিও ও টেলিভিশন তরঙ্গ প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বিকিরনের তরঙ্গ। সবগুলো মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। এদের মূল পার্থক্য হচ্ছে তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য ও স্পন্দন সংখ্যায়। দৃশ্যমান আলো হল বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ রশ্মির সামান্য অংশ মাত্র। সমগ্র বিকিরণ শক্তির অধিকাংশই অদৃশ্য

    Gold Answered on 04/06/2018.
    Add Comment



  • Your Answer

    By posting your answer, you agree to the privacy policy and terms of service.