তৎসম শব্দের স্বরসন্ধি:
স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনের নাম স্বরসন্ধি ।
১. অ-কার কিংবা আ-কারের পর অ-কার কিংবা আ-কার থাকলে উভয়ে মিলে আ-কার হয়, আ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন—
অ + অ আ নর+ অধম = নরাধম। এরূপ-হিমাচল, প্রাণাধিক, হস্তান্তর, হিতাহিত ইত্যাদি। =
অ + আ আহিম + আলয় = হিমালয়। এরূপ - দেবালয়, রত্নাকর, = সিংহাসন ইত্যাদি। আ + অ আ যথা + অর্থ = যথার্থ। এরূপ – আশাতীত, কথামৃত, মহার্ঘ ইত্যাদি ।
=আ + আ আ বিদ্যা+ আলয় = বিদ্যালয়। এরূপ- কারাগার, মহাশয়, সদানন্দ ইত্যাদি।
২. অ-কার কিংবা আ-কারের পর ই-কার কিংবা ঈ-কার থাকলে উভয়ে মিলে এ-কার হয়; এ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন—
অ + ই = এ শুভ + ইচ্ছা = শুভেচ্ছা।
আ + ই =এ যথা + ইষ্ট = যথেষ্ট।
অ + ঈ=এ পরম + ঈশ =পরমেশ।
আ + ঈ =এ মহা + ঈশ =মহেশ ।
এরূপ –পূর্ণেন্দু, শ্রবণেন্দ্রিয়, স্বেচ্ছা, নরেশ, রমেশ, নরেন্দ্র ইত্যাদি।
৩. অ-কার কিংবা আ-কারের পর উ-কার কিংবা ঊ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ও-কার হয়; ও-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনে যুক্ত হয়। যেমন-
অ + উ সূর্য + উদয় = সূর্যোদয় ।
আ + উ = যথা + উচিত যথোচিত।
অ + ঊ =ও গৃহ + ঊর্ধ্ব = গৃহো ।
আ + ঊ = গঙ্গা + ঊর্মি = গঙ্গোর্মি।
এরূপ – নীলোৎপল, চলোর্মি, মহোৎসব, নবোঢ়া, ফলোদয়, যথোপযুক্ত, হিতোপদেশ, পরোপকার, প্রশ্নোত্তর ইত্যাদি ৷
8. অ-কার কিংবা আ-কারের পর ঋ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ‘অর’ হয় এবং তা রেফ (´ ) রূপে পরবর্তী বর্ণের সাথে লেখা হয়। যেমন—
অ + ঋ =অর্ দেব + ঋষি = দেবর্ষি ।
আ + ঋ = অর্ মহা + ঋষি = মহর্ষি
এরূপ – অধমর্ণ, উত্তমর্ণ, সপ্তর্ষি, রাজর্ষি ইত্যাদি।
৫. অ-কার কিংবা আ-কারের পর “ঋত’-শব্দ থাকলে (অ, আ+ঋ) উভয় মিলে ‘আর’ হয় এবং বানানে পূর্ববর্তী বর্ণে আ ও পরবর্তী বর্ণে রেফ লেখা হয়। যেমন—
অ + ঋ= আর শীত + ঋত = = শীতার্ত।
আ + ঋ = আর তৃষ্ণা + ঋত = তৃষ্ণার্ত।
এরূপ –ভয়ার্ত, ক্ষুধার্ত ইত্যাদি।
৬. অ-কার কিংবা আ-কারের পর এ-কার কিংবা ঐ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ঐ-কার হয়; ঐ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সাথে যুক্ত হয়। যেমন—
অ + এ = ঐ জন + এক জনৈক।
আ + এ= ঐ সদা + এব = সদৈব।
অ + ঐ=ঐ মত + ঐক্য = মতৈক্য।
আ + ঐ = ঐ মহা + ঐশ্বর্য মহৈশ্বৰ্য ৷
এরূপ— হিতৈষী, সর্বৈব, অতুলৈশ্বর্য ইত্যাদি।
৭. অ-কার কিংবা আ-কারের পর ও-কার কিংবা ঔ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ঔ-কার হয়; ঔ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সাথে যুক্ত হয়। যেমন-
বন + ওষধি বনৌষধি ৷
অ + ও =মহা + ওষধি মহৌষধি ।
আ + ও = ঔ
অ + ঔ =ঔ পরম + ঔষধ =পরমৌষধ।
আ + ঔ =ঔ মহা + ঔষধ = মহৌষধ ।
৮. ই-কার কিংবা ঈ-কারের পর ই-কার কিংবা ঈ-কার থাকলে উভয়ে মিলে দীর্ঘ ঈ-কার হয়। দীর্ঘ ঈ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সাথে যুক্ত হয়। যেমন-
ই + ই =ঈ অতি + ইত = অতীত
ই + ঈ =ঈ পরি + ঈক্ষা = পরীক্ষা ৷
ঈ + ই= ঈ সতী + ইন্দ্ৰ = সতীন্দ্র ।
ঈ + ঈ =ঈ সতী + ঈশ = সতীশ ৷
এরূপ— গিরীন্দ্র, ক্ষিতীশ, মহীন্দ্র, শ্রীশ, পৃথ্বীশ, অতীব, প্রতীক্ষা, প্রতীত, রবীন্দ্র, দিল্লীশ্বর ইত্যাদি।
৯. ই-কার কিংবা ঈ-কারের পর ই ও ঈ ভিন্ন অন্য স্বর থাকলে ই বা ঈ স্থানে ‘য’ বা য(j) ফলা হয়। য-ফলা লেখার সময় পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সাথে লেখা হয়। যেমন—
ই + অ = য্ + অ অতি + অন্ত = অত্যন্ত।
ই + আ = ষ্ + আ ইতি + আদি = ইত্যাদি ।
ই + উ = ব্ + উ অতি + উক্তি অত্যুক্তি।
ই + ঊ = য্ + ঊ প্ৰতি + ঊষ = প্রত্যূষ।
ঈ+ আ = য্ + আ মসী + আধার = মস্যাধার।
ই + এ= ব্ + এ প্রতি + এক =প্রত্যেক ।
ঈ + অ = য্ + অ নদী + অম্বু = নদ্যম্বু।
এরূপ-প্রত্যহ, অত্যধিক, গত্যন্তর, প্রত্যাশা, প্রত্যাবর্তন, আদ্যন্ত, যদ্যপি, অভ্যুত্থান, অত্যাশ্চর্য, প্রত্যুপকার ইত্যাদি।
১০. উ-কার কিংবা ঊ-কারের পর উ-কার কিংবা ঊ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ঊ-কার হয়; ঊ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জন ধ্বনির সাথে যুক্ত হয়। যেমন—
উ + উ = ঊ মরু + উদ্যান = মরূদ্যান ।
উ + ঊ= উ = বহু + ঊর্ধ্ব = বহূর্ধ্ব।
উ + উ= উ বধূ + উৎসব = বধূৎসব।
উ+ উ=উ ভূ + ঊর্ধ্ব = ভূর্ধ্ব।
১১. উ-কার কিংবা উ-কারের পর উ-কার ও ঊ-কার ভিন্ন অন্য স্বর থাকলে উ বা ঊ স্থানে ব-ফলা হয় এবং লেখার সময় ব-ফলা পূর্ববর্তী বর্ণের সাথে লেখা হয়। যেমন-
উ + অ = ব + অ সু + অল্প = স্বল্প ।
উ + আ = ব + আ সু + আগত = স্বাগত ।
উ + ই = ব + ই অনু + ইত = অন্বিত ।
উ + ঈ = ব + ঈ তনু + ঈ=তন্বী ৷
উ + এ = ব + এ অনু + এষণ = অন্বেষণ ।
এরূপ- পশ্বধম, পশ্বাচার, অন্বয়, মন্বন্তর ইত্যাদি।
১২. ঋ-কারের পর ঋ ভিন্ন অন্য স্বর থাকলে ‘ঋ’ স্থানে ‘র’ হয় এবং তা র-ফলা রূপে পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন - - পিতৃ + আলয় = পিত্রালয়, পিতৃ + আদেশ = পিত্রাদেশ ।
১৩. এ, ঐ, ও, ঔ-কারের পর এ, ঐ স্থানে যথাক্রমে অয়, আয় এবং ও, ঔ স্থানে যথাক্রমে অব্ ও আব্
হয়। যেমন-
এ + অ = অয়্ + অ নে + অন = নয়ন। শে + অন = শয়ন ।
ঐ + অ = আহ্ + অ নৈ + অক = নায়ক। গৈ + অক গায়ক।
ও + অ = অব্ + অ পো + অন = পবন। লো + অন = লবণ।
ঔ + অ = আব্ + অ পৌ + অক=পাবক ।
ও + আ = অব্ + আ গো + আদি = গবাদি ।
ও + এ = অব্ + এ গো + এষণা = গবেষণা।
ও + ই = অব্ + ই পো + ইত্ৰ = পবিত্ৰ ৷
ঔ + ই = আব্ + ই নৌ + ইক = নাবিক ।
ঔ + উ = আব্ + উ ভৌ + উক = ভাবুক ।
১৪. কতগুলো সন্ধি কোনো নিয়ম অনুসারে হয় না, এগুলোকে নিপাতনে সিদ্ধ বলে। যথা – কুল + অটা - = কুলটা (কুলাটা নয়), গো + অক্ষ = গবাক্ষ (গবক্ষ নয়), প্র + ঊঢ় = প্রৌঢ় (প্রোঢ় নয়), অন্য + অন্য = অন্যান্য, মার্ত + অণ্ড = মার্তণ্ড, শুদ্ধ + ওদন = শুদ্ধোদন।
আরও দেখুন...