আমলাতন্ত্রের আধুনিক আলোচনার অগ্রনায়ক হলেন জার্মান সমাজতত্ত্ববিদ ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber)
বর্তমান সময়ে আমলাতন্ত্র যেকোনো রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অঙ্গ। আমলাতন্ত্র বলতে বোঝায় সেসব কর্মকর্তাকে যারা রাষ্ট্রের তথা সরকারে বিভিন্ন পর্যায়ে নিযুক্ত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, পেশাদারি, রাজনীতি নিরপেক্ষ এবং সরকারি নীতি নির্ধারণ ওবাস্তাবয়নে নিজেদের নিয়োজিত রাখে। অধ্যাপক ফাইনারের মতে, "আমলাতন্ত্র হচ্ছে একটি স্থায়ী, বেতনভুক্ত এবং দক্ষ চাকরিজীবী শ্রেণি। অর্থাৎ আমলাতন্ত্র হচ্ছে সরকারি স্থায়ী, বেতনভুক্ত ও দক্ষ কর্মচারীদের সংগঠন যারা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিযুক্ত এবং তারা নীতিনির্ধারণ থেকে আরম্ভ করে নীতিগুলোকে বাস্তবে কার্যকরী করে।"
আলোচ্য উদ্দীপকের আলোকে আমলাতন্ত্রের যে বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়েছে তা নিচে আলোচনা করা হলো-
কর্মবিভাগ ও কর্মবিশেষীকরণ: আমলাতান্ত্রিক সংগঠন কর্মবিভাগ ও কর্মবিশেষী করণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে যেসব কর্মচারী যে অংশের কাজের জন্য মেধা ও যোগ্যতা অর্জন করে সেসব কর্মচারীর জন্য ওইসব কাজকেই বাছাই করা হবে। কাজেই এটি আমলাতন্ত্রের
একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
পদসোপান নীতি: আমলাতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পদসোপান নীতি। আমলাতন্ত্রের পদসোপান নীতি অনুসারেই বিভিন্ন পদের শ্রেণিবিন্যাস ও সংগঠন করা হয়।
পদোন্নতি: আমলাতন্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পদোন্নতি। আমলাতান্ত্রিক সংগঠনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির ব্যবস্থা রয়েছে
আনুষ্ঠানিকতা: আনুষ্ঠানিকতা আমলাতন্ত্রের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। আমলাতন্ত্রের নিয়োগ পদান্নতি কর্মবণ্টন ও কর্মসম্পাদন আনুষ্ঠানিক নিয়মের মধ্য দিয়ে সম্পাদিত হয়।
অধীনস্ততা: আমলাগণ রাজনৈতিক নির্বাহীদের অধীনে চাকরি করেন এবং সরকারি সিদ্ধান্তসমূহ দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করেন। এজন্য অধীনস্ততা আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য।
নিরপেক্ষতা: নিরপেক্ষতা আমলাতন্ত্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য। নিরপেক্ষভাবে সরকারি নীতিসমূহকে বাস্তবায়িত করাই আমলাদের প্রধান কাজ।
কারও ওপর অর্জিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালনের নিশ্চয়তাই জবাবদিহিতা। একজন আমলার ওপর আরোপিত ক্ষমতার সুষ্ঠু জবাবই হলো আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা। যার ওপর সুশাসন নির্ভর করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো আমলাদের কর্তব্যের অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ করা। আমলা হচ্ছে প্রশাসনের প্রাণ। প্রশাসন আমলাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। এজন্য প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে বিষয়টি সর্বপ্রথম প্রয়োজন তা হলো আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কেননা রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রে যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহলে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হয়ে পড়ে। এছাড়াও রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও নীতিনিধারণ রাষ্ট্র টিকে থাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এ বিষয় দুটিতেও আমলালা সম্পৃক্ত থাকে। তাই আইন প্রনয়ন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয় তাহলে প্রয়োজন হলো আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কেননা তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে তারা জনগণের কল্যাণের দিকে দৃষ্টি রেখে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। ফলে এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিশেষ সহায়ক হয়। এজন্য আমলাদের কর্মকাণ্ডের যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায় তাহলে তারা ব্যক্তি স্বার্থের পরিবর্তে সামগ্রিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে দায়িত্বের সাথে কর্মসম্পাদন করবে। এভাবেই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
Related Question
View AllBureaucracy' শব্দের প্রতিশব্দ 'আমলাতন্ত্র'।
আমলাতন্ত্রের এক বড় ত্রুটি হলো লালফিতায় দৌরাত্ম্য। কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বের নজিরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে অতি আনুষ্ঠানিকতা পালনকে লালফিতার দৌরাত্ম্য বলা হয়। পদসোপান ভিত্তিতে কাগজপত্রের অনুমোদন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, যা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। এর ফলে প্রশাসনিক কাজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়।
আমলাতন্ত্র একটি পেশাদার, দক্ষ ও নিরপেক্ষ বাহিনী। তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে তারা এই পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে থাকেন। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের মমতাজ আলীর কার্যক্রমেও এরূপ দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দেখা যায়। মমতাজ আলী তার কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করেন এবং সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন অনুসারে তার কাজ করেন। এটি আমলাতন্ত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মমতাজ আলী সাহেব তার। দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে তিনি তার কর্মকাণ্ডে যে সক্ষমতা প্রদর্শন। করেছেন, তা আমলাতন্ত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমলাতন্ত্রের পদের ধারাক্রম কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। এখানে আমলাতন্ত্রের কার্যপ্রণালি এবং প্রক্রিয়া দেখা যায়।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আমলাদেরকে বহুবিধ কার্যাবলি সম্পাদন করতে হয়। উন্নয়মূলক কাজেও মমতাজ আলীদের মতো আমলারা মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। অনেক সময় তাদের ভূমিকা দেশের উন্নয়নের ধারক ও বাহকের ন্যায়। আবার ক্ষেত্রবিশেষে এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়।
আমলারা রাষ্ট্রের জনগুরুত্বপূর্ণ সব কাজের তদারকিতে নিয়োজিত থাকেন। প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণ, নীতির বাস্তবায়ন তথা কাজ সম্পন্ন করা, সরকারি সম্পদের হেফাজত করা, বিচারসংশ্লিষ্ট কাজ ইত্যাদি আমলাদের রুটিনওয়ার্ক। সরকারের যাবতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিকল্পনা করা, সম্ভাব্যতা যাচাই করা, সমীক্ষা করা, বাজেট প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদনের সুপারিশ করা, কাজ বাস্তবায়ন করা, তদারকি করা ইত্যাদি আমলাদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সূচনা ও বাস্তবায়ন করার মূল দায়িত্ব এ আমলাদের ওপরই ন্যস্ত থাকে।
আমলাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতা যত বেশি হবে, এসব ক্ষেত্রে সফলতা তত দ্রুত আসবে। কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়নের অগ্রভাগে থাকেন এ আমলারা। এছাড়া সামাজিক পরিবর্তন, অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ইত্যাদি অবস্থাগত ক্ষেত্রেও আমলাদের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। তবে আমলাতন্ত্রের অতি আনুষ্ঠানিকতা, লালফিতার দৌরাত্ম্য স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অদক্ষতা, অবহেলা এবং অ-পেশাদারি আচরণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু এটি আমলাতন্ত্রের নীতির পরিপন্থী। আমলাতন্ত্রে কখনো এরূপ প্রত্যাশা করা হয় না। কিন্তু জনাব আলী সাহেবের মতো দক্ষ, সৎ ও কর্মনিষ্ঠ আমলারাই দেশের উন্নয়নের ধারক ও বাহক, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
অধ্যাপক অগ আমলাতন্ত্রকে পেশাদার দক্ষ বাহিনী বলে অভিহিত করেন।
কোনো সংগঠন পরিচালনার জন্য স্থায়ী বেতনভুক্ত দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে আমলা বলা হয়। আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র বলতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী বেতনভুক্ত কর্মীবাহিনীকে বোঝায়। আমলারা সুশৃঙ্খলভাবে পরস্পর পদের ক্রম অনুযায়ী সংযুক্ত এবং রাজনীতি নিরপেক্ষ থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ম্যাক্স ওয়েবারকে আমলাতন্ত্রের জনক বলা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!