
আমরা অনেকেই কাজ করে আনন্দ পাই। কাজে সফলতা লাভের জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হওয়া এবং সৃজনশীল চিন্তাচেতনার প্রয়োগ করা। সাধারণত কায়িক ও মেধাশ্রম প্রয়োগ করে কাজ সম্পন্ন করতে হয়। কাজের মাধ্যমে আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এখন আমরা আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা, কায়িক ও মেধাশ্রমের ধারণা লাভ করতে চেষ্টা করব।
এই অধ্যায় শেষে আমরা-
- আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এবং কায়িক ও মেধাশ্রমের ধারণা দিতে পারব।
- কাজের ক্ষেত্রে আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
পড়ালেখার পাশাপাশি খালিদ তার বাবাকে মাঠে কাজ করতে সাহায্য করে। সে তার বাবাকে ডেইরি ফার্মে কাজ করতেও সাহায্য করে। তাই সে সর্বদা ব্যস্ত থাকে।
রহিম-বাড়িতে নিজের কাজ নিজে করে। সে কখনো উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে না। বড়দেরকে সম্মান করে। রহিম সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। সবাই এসব গুণের জন্য রহিমকে আদর করে।
তোমরা হয়ত তোমাদের চারপাশে এ রকম কথাবার্তা শুনে থাকবে- 'করিম সাহেব একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ।' এই আত্মমর্যাদা শব্দটি দিয়ে আসলে কী বোঝায়? শব্দ ভেঙে যদি অর্থ বের করার চেষ্টা করি, তবে দেখা যায় 'আত্ম' অর্থ 'নিজ' আর 'মর্যাদা' অর্থ 'সম্মান'। তাহলে আত্মমর্যাদা বলতে কি 'নিজেদের প্রতি সম্মান'কে বোঝায়? এসো নিচের ঘটনাগুলো থেকে বোঝার চেষ্টা করি-
ঘটনা-১: নিতু কলেজে পড়ে। তার ভালো আচরণের জন্য সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। সে বাড়ির সব কাজে মাকে সাহায্য করে। মা তাকে প্রায়ই বলেন, 'তোর আমাকে সাহায্য করতে হবে না। আমি নিজেই করব।' নিতু উত্তর দেয়, 'তোমরা সবাই আমাকে এত উৎসাহ দাও, আদর করো, পড়ালেখায় সাহায্য করো, তোমাদের সবার জন্য তো আমার কিছু করা উচিত। আমি জানি, কাজ করার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই বরং এতে সম্মান বাড়ে'। নিতুর এ আত্মমর্যাদাবোধে মা খুবই খুশি হলেন, বললেন, 'এমন আত্মমর্যাদাবান মেয়েই আমাদের দরকার।'

ঘটনা-২: আজিজ মেধাবী ছাত্র। সে খুব ছোটোবেলায় এক দুর্ঘটনায় তার বাম পা হারায়। সে এখন ক্র্যাচ ব্যবহার করে চলাফেরা করে। স্কুলে সব পরীক্ষায় আজিজ প্রথম হয়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার সে এ+ পেয়েছে। নতুন স্কুলে এসে ভর্তি হলে সবাই তার সুন্দর আচরণে মুগ্ধ হলো। তার পরীক্ষার ফলাফলও খুব ভালো। ক্লাসের সবাই একদিন টিফিনের সময় আজিজকে জিজ্ঞেস করল, ওর যে পা নেই তাতে ওর মন খারাপ হয় কিনা। সে পড়ালেখায়ই বা এত ভালো করছে কেমন করে? আজিজ ওদের বলল- আমার পা নেই তাতে কি; আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব পরিশ্রম করি। বাড়িতে সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে এবং যে কাজগুলো আমি করতে পারি না, সে কাজগুলোতে আমাকে সাহায্য করে। প্রথম দিকে আমার খুব মন খারাপ হতো, তবে এখন আমার নিজেকে অন্য সবার মতই মনে হয়।

ঘটনা-৩: তাপস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। সে কখনও কাউকে অসম্মান করে না, মন্দ কথাও বলে না। অন্যের সাথে মতের অমিল হলেও তর্ক করে না। সে বিশ্বাস করে, অন্য কারো চিন্তাধারা ভিন্ন হতেই পারে। একদিন ওর ক্লাসের সাগর বলেছিল, আনিস স্যারের পড়ানো ওর খুব ভালো লাগে। কিন্তু অনিক বলল, আনিস স্যার খুব তাড়াতাড়ি কথা বলেন, তাই ওর বুঝতে কষ্ট হয়। এই নিয়ে দুজনের যখন তর্ক-বিতর্ক শুরু হবার উপক্রম, তখন তাপস বলল, তোমরা দুজনেই নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছ এবং এটা করার অধিকারও তোমাদের আছে। তর্ক না করে তোমরা দুজন দুজনের মতামতকে শ্রদ্ধা করতে পারো, তাই না? আমি একটি বইয়ে পড়েছি- যাঁরা নিজেদের সম্মান করে তাঁরা অন্যদেরও সম্মান করে।
উপরের ঘটনাগুলো থেকে আমরা কী শিখতে পারি?
উপরের ঘটনাগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি, একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ-
- নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে: কোন ধরনের ন্যায় কাজ করতে লজ্জাবোধ করে না।
- নিজের কোন শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নিজের ক্ষমতা ও সামর্থ্যকে সম্মান করে।
- অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে।
অনেকে মনে করেন, আত্মমর্যাদা হলো নিজের কাছে নিজের সম্মান ও মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় সম্পর্কে সচেতন থাকা। আবার কেউ মনে করেন, আত্মমর্যাদা হলো নিজের চারপাশ ও নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সে অনুযায়ী আচরণ করা। অন্যায় কাজ করতে লজ্জাবোধ করা, মানুষ হিসেবে সকল মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য আচরণ করা, ভালো ও নতুন কিছু চিন্তা করা ইত্যাদি আত্মমর্যাদাবোধের পরিচয় বহন করে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য রুচিবোধের প্রকাশও আত্মমর্যাদাবোধের পরিচয়।
দলগত কাজ চার-পাঁচজনের দল তৈরি করে তোমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আত্মমর্যাদাবিষয়ক একটি ঘটনা বর্ণনা করো। |
কাজের মাধ্যমেই অর্জিত হয় মর্যাদা। আমাদের আত্মমর্যাদার প্রকাশ ঘটে কাজের মাধ্যমেই।
নিচের ছকের কাজগুলো আত্মমর্যাদার পরিচয় বহন করে কি না, তোমার উত্তর হ্যাঁ/না আকারে লিখ।
| কাজ | হ্যাঁ/না |
| সোহেল নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করে | |
| বাবা-মা কখনও বকা দিলে ফাতেমা বকার কারণ খুঁজে নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করে | |
| মিলি স্কুলে যাওয়ার সময় কাজের মেয়ে তার ব্যাগ বহন করে | |
| রমা খুব উচ্চঃস্বরে কথা বলে না, কারণ সে মনে করে উচ্চঃস্বরে কথা বললে অন্যদের অসুবিধা হয় | |
| শিরিন নিয়মিত বাড়ির কাজ করে আনে, কারণ শিক্ষার্থী হিসেবে এটি তার দায়িত্ব | |
| সারাদিন রিকশা চালিয়ে সন্ধ্যাবেলায় বাবা বাসায় ফিরলে মাহমুদ বাবাকে খাবার পানি এগিয়ে দেয়, রিকশা মুছে দেয় | |
| মা শুভর ময়লা কাপড় ধুয়ে দেন। |
এখন চলো নিজের ভাবনাটাকে মূল্যায়ন করি। সোহেল নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করে। কারণ হিসেবে সে বলে- 'বুদ্ধিমানেরা নিজের ওপর নির্ভর করে, আর বোকারা নির্ভর করে অন্যের ওপর'। কাজেই নিজের কাজ নিজে করাটা আত্মমর্যাদার পরিচায়ক। এখন থেকে আমরা সবাই সোহেলের মতো নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করব।
মানুষ হিসেবে আমাদের লজ্জাবোধ থাকা উচিত। অন্যায় করলে আমরা লজ্জিত হই। সেজন্য ফাতেমা যদি তার কোনো আচরণের কারণে বাবা-মায়ের কাছে বকা খায়, তাহলে সে লজ্জিত হয়। সে বাবা-মায়ের চাওয়া - পাওয়াকে শ্রদ্ধা করে এবং তাদের মতামত মেনে চলে। ফাতেমার এই আচরণ আত্মমর্যাদাবোধের পরিচয় বহন করে।
আমরা যদি খুব উচ্চস্বরে কথা বলি তাতে আমাদের চারপাশের মানুষের অসুবিধা হতে পারে। একজন আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষ অন্যের অসুবিধা হয় এমন কিছু করেন না। কাজেই, রমার আস্তে কথা বলা তার আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে সচেতনতার পরিচয় বহন করে।
শিরিন তার আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন। সেই সাথে সে নিজের দায়িত্ব পালনের প্রতি এবং বিদ্যালয়ের নিয়মকানুন মেনে চলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তার মতে, 'অন্যরা সবাই যদি পারে তাহলে আমিও পারব'।
সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সচেতনতার পরিচয় বহন করে। আমরা যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকি আমাদের পোশাক যদি পরিচ্ছন্ন না হয় তা হলে আমাদের নোংরা দেখাবে। আমাদের গায়েও ঘাম ও ময়লায় দুর্গন্ধ হবে। অন্যের গায়ের দুর্গন্ধ আমাদের নাকে এলে আমাদের কি ভালো লাগে? আমাদের আশেপাশে যারা রয়েছে তাদেরও এতে খুব অসুবিধা হয়।
যাঁরা কায়িক শ্রম করেন, আমাদের উচিত তাদের সম্মান করা। রিকশা চালানো, নৌকা চালানো, ক্ষেতে কাজ করা ইত্যাদি অনেক কঠিন কাজ। তারা এ কঠিন কাজগুলো করেন বলেই আমাদের জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে। আমাদের উচিত তাদের সম্মান করা। তাঁরা যখন কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরেন, তখন তাঁদের সেবা করা। তাঁদের বিশ্রামের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া।
কাজেই আমরা সবসময় নিজের কাজ নিজে করব। তবে না শিখে বিপজ্জনক কাজ করব না। আমরা অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাব এবং সম্ভব হলে অন্যকে তার কাজে যথাসাধ্য সাহায্য করব। সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকব। কোনো কাজে ভুল হয়ে গেলে নিজেকে ছোটো মনে না করে সঠিকভাবে করার জন্য কারো কাছ থেকে শিখে নেব। এতে লজ্জাবোধ করার কিছু নেই। সব মানুষ সঠিকভাবে সব কাজ করতে পারে না। সঠিকভাবে কাজ করার জন্য কাজ শিখে নিতে হয় এবং বারবার চেষ্টা করতে হয়। তাই আমরা নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস হারাব না।
আত্মমর্যাদার গল্প
জগদীশচন্দ্র বসু লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি নিয়ে ভারতবর্ষে ফিরে এলে তাঁকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অস্থায়ী অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করা হলো। সেই সময় সাহেবরা ভাবতেন ভারতীয়রা বিজ্ঞান শিক্ষাদানের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই ঐ পদে ইংরেজরা যে বেতন পেতেন জগদীশকে দেওয়া হতো তার দুই-তৃতীয়াংশ। আবার অস্থায়ী বলে ঐ বেতনের অর্ধেকটা জগদীশচন্দ্র বসুর হাতে আসত।
ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যকার এই বৈষম্যে জগদীশচন্দ্রের আত্মসম্মানে ঘা লাগল। তিনি এর প্রতিবাদ জানালেন। তরুণ এ অধ্যাপকের কথায় কেউ কর্ণপাত করল না। শেষ পর্যন্ত তিনি স্থির করলেন যে তিনি বেতনই নেবেন না। তিনি একাধারে তিন বছর কোনো বেতন না নিয়ে অধ্যাপনা করে গেলেন। কর্তৃপক্ষ অবশেষে তাঁর ন্যায্য অধিকারের কাছে নতি স্বীকার করল। ইংরেজ অধ্যাপকের সমতুল্য বেতন নির্ধারণ করে তার পাওনা সকল টাকা পরিশোধ করল। জগদীশ চন্দ্র বসু একজন আত্মমর্যাদাবান ব্যক্তি।
দলগত কাজ তোমরা হয়ত তোমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ খুঁজে পাবে যারা জগদীশচন্দ্র বসুর মতো অত্যন্ত আত্মমর্যাদাবান। এসো এমন মানুষের কাহিনি নিয়ে আমরা পোস্টার বানাই। প্রত্যেক দল একটি করে আত্মমর্যাদার গল্প পোস্টারে লিখ। |

এসো নিচের ছবিগুলো দেখি এবং ভাবি -

প্রথম ছবিতে রাকিবের, দ্বিতীয় ছবিতে নিতুর মধ্যে কী দেখেছ এবং তৃতীয় ছবিতে শ্রেণিতে যারা হাত তোলেনি, তাদের মধ্যে কিসের অভাব ছিল? নিতু ও রাকিবের মধ্যে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস ছিল, তাই তারা একটুও ভয় পায়নি। তৃতীয় ছবিতে কারো কারো মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল, তাই তারা হাত তোলেনি। তারা ভয় পাচ্ছিল কারণ তারা আত্মবিশ্বাসী ছিল না। তাহলে আত্মবিশ্বাস বলতে আমরা কী বুঝব?
'আত্ম' মানে তো 'নিজ'। তাহলে আত্মবিশ্বাস মানে কি নিজের ওপর বিশ্বাস? হ্যাঁ, ঠিক তাই। আত্মবিশ্বাস মানে হলো নিজের জ্ঞান, কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা সম্পর্কে বিশ্বাস ও আস্থা। যাদের নিজেদের কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা সম্পর্কে জানা আছে ও সেটার ওপর যথাযথ আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে, তারাই আত্মবিশ্বাসী।
চলো একটা গল্প শুনি-
এক দেশে ছিল এক লোক। তার নাম ছিল হাবু। সে খুব করে খেত শুধুই দুধ-সাগু। সে নিজেকে খুবই পালোয়ান মনে করত, যদিও তার গায়ে তেমন বল ছিল না। তো সে ভাবল গায়ে বল থাকলেই উড়া যায়। তাই সে শহরময় ঘোষণা করে বসল যে সে পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে উড়ে বেড়াবে। বোকা হাবুর মাথাতেই এলো না যে উড়তে হলে পাখা দরকার, আর উড়তে শেখাটাও দরকার। তো সে যথারীতি নির্দিষ্ট দিনে পাহাড়ে উঠল। সবাই তাকে নিষেধ করল। কিন্তু কে শোনে কার কথা। হাবু ভাবল- সে বিখ্যাত হয়ে যাবে দেখে সবার অনেক হিংসা হচ্ছে। তাই তারা তাকে নিষেধ করছে। নিজের বিশ্বাস মতো হাবু দিল লাফ... আর তারপর...যা হবার তাই হলো...একেবারে চিৎপটাং।
হাবুর নিজের প্রতি এই বিশ্বাস কিন্তু আত্মবিশ্বাস নয় বরং অতি বা ভুল বিশ্বাস। আত্মবিশ্বাস হল নিজের প্রকৃত ক্ষমতা জেনে, বুঝে তারপর নিজের প্রতি বিশ্বাস বা আস্থা তৈরি হওয়া।
কাজ প্রত্যেক শিক্ষার্থী নিজে কোন কোন ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, তা নিয়ে খাতায় লিখবে এবং ক্লাসে সবার সামনে উপস্থাপন করবে। |
অনেকেই মনে করেন, আত্মবিশ্বাস হলো জীবনে সফল হওয়ার মূলমন্ত্র। আত্মবিশ্বাসী না হলে জীবনে সফল হওয়া যায় না। জীবনে চলার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা আসে। কিন্তু যারা আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান, তারা সহজে হাল ছাড়ে না। লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত চলতেই থাকে তাদের প্রচেষ্টা। যত বাধাই আসুক কিছুই তাদের থামিয়ে রাখতে পারে না। যাদের আত্মবিশ্বাস নেই তারা অল্পতেই হাল ছেড়ে দেয়, মেনে নেয় পরাজয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবো। বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানিরা আমাদের বঞ্চিত করেছে। আমাদের টাকায়, আমাদের সম্পদে ওরা সম্পদ গড়েছে। তারপর আমরা যখন আমাদের ন্যায্য অধিকার চাইলাম, তখন ওরা আমাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতে লাগল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নির্বিচারে হাজার হাজার নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষ হত্যা করল। সেই জুলুম আমরা মেনে নিইনি। আমরা তার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি। আমাদের না ছিল অস্ত্রশস্ত্র, না ছিল সামরিক প্রশিক্ষণ। কিন্তু আমরা বাংলা মায়ের দামাল ছেলে-মেয়েরা দেশপ্রেম ও আত্মত্মবিশ্বাসে বলীয়ান ছিলাম। তাই আমরা শত বাধা অতিক্রম করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছি।
তোমরা কি মুসা ইব্রাহিমের নাম শুনেছ? তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে পড়ার সময় থেকেই তিনি পর্বতারোহণের কঠোর অনুশীলনে মগ্ন থাকতেন। এভারেস্টে আরোহণকালেও অক্সিজেন স্বল্পতা ও শারীরিক নানা বাধার মুখে পড়েন তিনি। বেশ কয়েকবার মৃত্যুমুখে পড়তে পড়তে বেঁচে ফেরেন। তবুও তিনি হার মানেননি, দমে যাননি, থেমে যাননি। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে তিনি ঠিকই এভারেস্ট জয় করেছেন।

বাংলাদেশের এক ছোট্ট শহরে ফেরদৌসির জন্ম। ছোটোবেলা থেকেই তার ইচ্ছা সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। তাই সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করত। সে যখন স্কুলে পড়ত, তখন স্কুলে যাবার পথে কয়েকজন বখাটে ছেলে তাকে বিরক্ত করত। ফেরদৌসি ছিল সাহসী ও আত্মমর্যাদাবান মেয়ে।

বাংলাদেশের এক ছোট্ট শহরে ফেরদৌসির জন্ম। ছোটোবেলা থেকেই তার ইচ্ছা সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। তাই সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করত। সে যখন স্কুলে পড়ত, তখন স্কুলে যাবার পথে কয়েকজন বখাটে ছেলে তাকে বিরক্ত করত। ফেরদৌসি ছিল সাহসী ও আত্মমর্যাদাবান মেয়ে।
এসো আত্মবিশ্বাসী হই
নিচের ছবিগুলো দেখে বলো তুমি কোথায় কোথায় আত্মবিশ্বাসী হতে পারো?

কাজ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রথমে দুই ভাগ হয়ে যাবে। প্রতি ভাগে ছেলে-মেয়ের অনুপাত সমান থাকবে। দুই ভাগের প্রথম ভাগ হবে সরকার পক্ষ ও দ্বিতীয় ভাগ হবে বিরোধীপক্ষ। উভয়পক্ষই শিক্ষকের সহায়তায় তাদের ২-৩ জনের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। এই প্রতিনিধি নিচের ইস্যুতে তার দলের ভূমিকা বা অবস্থান ব্যাখ্যা করবে। শিক্ষক এ ক্ষেত্রে মাননীয় স্পিকারের ভূমিকা নিতে পারেন। |
শান্তনু পত্রিকায় শিশুদের পাতা পড়ছিল। একটি শব্দ তাকে বেশ আকৃষ্ট করল। শব্দটি হলো 'সৃজনশীলতা'। শান্তনু তার মাকে প্রশ্ন করল 'আচ্ছা মা, সৃজনশীলতা কী'? মা বললেন- 'সৃজনশীলতা হলো নতুন কিছু সৃষ্টি করা। আবার কোনো কাজ নতুনরূপে নতুনভাবে করাটাও সৃজনশীলতা'। মা ঠিকই বলেছেন। নতুন কিছু তৈরি করা, যা ভালো কাজে লাগতে পারে বা কোনো কাজ নতুনভাবে করা এক ধরনের সৃজনশীলতা।
যেমন: মেঝেতে আলপনা আঁকা, কবিতা বা গল্প লেখা, ছবি আঁকা, পোকার আক্রমণ থেকে ধান ক্ষেত রক্ষার জন্য নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন, কোন প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করা ইত্যাদি।
সৃজনশীলতা আমাদের সবার ভেতরেই থাকে। একেকজনের ভেতর থাকে একেক রূপে, একেকজন একেক বিষয়ে সৃজনশীল হয়ে থাকেন। আমাদের ভেতরের লুকানো সৃজনশীলতা আমরা নানা রকম কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করি।
সাদিয়া স্বপ্ন দেখে সে বড়ো হয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে। এখন থেকেই সে তার আশেপাশের নানারকম বাতিল বা ফেলে দেওয়া জিনিস-পত্র দিয়ে প্রয়োজনীয় অনেক কিছু বানায়। সে তার বাতিল কলমগুলো গলিয়ে পেপারওয়েট বানিয়েছে, পুরানো গ্লাস আর রঙিন কাগজ কেটে কলমদানি বানিয়েছে। শিক্ষক তার এসব বানানোর কথা শুনে বললেন- আমাদের সাদিয়া একজন সৃজনশীল মেয়ে।

এজাজ এবং তার কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করল যে তারা তাদের শ্রেণিকক্ষকে সুন্দর করে সাজাবে। তাই এজাজ ও তার বন্ধুরা মিলে বেশকিছু রঙিন কাগজ সংগ্রহ করল। তারপর তারা সেসব কাগজ কেটে বিভিন্ন রকম সুন্দর সুন্দর ফুল-পাতা-পাখি বানিয়েছে। সেসব ফুল-পাতা-পাখি দিয়ে তারা সুন্দর করে তাদের শ্রেণিকক্ষ সাজিয়েছে। খবর শুনে প্রধান শিক্ষক দেখতে এলেন। তিনি সবার এই সৃজনশীল উদ্যোগ ও কাজের খুব প্রশংসা করলেন। সবাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন- শুধু শ্রেণিকক্ষ নয় বরং সবাই আমরা আমাদের নিজেদের ঘর, পড়ার টেবিল কীভাবে সাজিয়ে রাখি ইত্যাদিও সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে।
তোমরা কি কখনো ভেবেছ, আমরা কীভাবে নতুন নতুন জিনিস বানাই, কীভাবে এসব নিত্যনতুন জিনিস বানাবার বুদ্ধি পাই? আসলে আমরা সচেতন এবং অবচেতন উভয় অবস্থায় আমাদের চারপাশের নানা বস্তু, বিষয় ও ঘটনা নিয়ে ভাবি। ভাবনার ভেতরেই নতুন বুদ্ধি চলে আসে।

তাই আমরা যদি সৃজনশীল হতে চাই, তবে আমাদের নানা বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে, মনের ভেতর থেকে নতুন, সুন্দর এবং প্রয়োজনীয় কোনো কিছু করতে চাইতে হবে।
এসো নিচের কয়েকটি ঘটনা পড়ি:
![]() ঘটনা-১ | ![]() ঘটনা-২ | ![]() ঘটনা-৩ |
এখন বলতো দেখি, আমরা কোন কোন কাজের ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে পারি?

| কাজ আমরা প্রত্যেকে কী ধরনের সৃজনশীল কাজ করতে পারি তার একটি তালিকা (কাজের বর্ণনাসহ) তৈরি করি। অন্তত দুটি কাজ বর্ণনাসহ উপস্থাপন করি। |
এরই মধ্যে আমরা সৃজনশীলতা সম্পর্কে জেনেছি। এই পাঠে আমরা জানব কয়েকজন সৃজনশীল মানুষের গল্প। যদিও প্রতিটি মানুষই কম-বেশি সৃজনশীল, তবুও কিছু কিছু মানুষ রয়েছেন, যাদের সৃজনশীলতা পৃথিবী বিখ্যাত। তেমন কয়েকজন মানুষের গল্প আমরা এই পাঠে জানব।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গল্প বা কবিতা লেখাও এক ধরনের সৃজনশীলতা। রবীন্দ্রনাথ আমাদের নোবেল বিজয়ী কবি। তিনি মানুষের জীবন, মন আর প্রকৃতি নিয়ে গল্প-কবিতা-নাটক-উপন্যাস ও অসংখ্য গান লিখেছেন। গানে সুরও দিয়েছেন। তিনি ছবিও আঁকতেন। তাঁর সে লেখায়, কথার বুননে, শব্দ চয়নে, বাক্যের গাঁথুনিতে সবার উপরে জীবন ও দর্শন নিয়ে ভাবনা-চিন্তার প্রকাশে আমরা তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় পাই।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

রং আর তুলিতে যার সৃজনশীলতা হয়ে উঠেছিল বাস্তব, তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন আমরা সবাই দেখি, আমরা সবাই সেই জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই যাই; তবু আমাদের দেখা জয়নুল আবেদিনের মতো হয় না। সবার পক্ষে সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে যা আঁকতে চায় তা যথার্থভাবে আঁকা সম্ভব হয় না। সম্ভব হয় তাদের পক্ষে যারা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মত সৃজনশীল।
টমাস আলভা এডিসন
খুব ছোটোবেলায় এডিসনকে স্কুলে খুব করে বকা খেতে হয়েছিল পড়া না পারার কারণে। কিন্তু এই এডিসনই সবার বিচারে শতাব্দীর অন্যতম সৃজনশীল মানুষ। হাজারের বেশি আবিষ্কারের রেকর্ড রয়েছে তার। এই যে আমরা বিদ্যুৎ বাতির আলোয় রাতের অন্ধকারেও চারপাশ উজ্জ্বল দেখি, সেটা এই এডিসনের আবিষ্কার। আজকালকার বহুল ব্যবহৃত ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র যেমন ক্যাসেট প্লেয়ার কিংবা সিডি প্লেয়ার আবিষ্কার হওয়ার পূর্বে মানুষ যে গ্রামোফোনে গান শুনত, সেই গ্রামোফোনও এডিসনের আবিষ্কার। এ ছাড়া তিনি টেলিগ্রাফও আবিষ্কার করেন।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি
১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ইতালির কালজয়ী চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ফ্লোরেন্সের অদূরবর্তী ভিঞ্চি নগরের একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম লিওনার্দো দি সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি। খুব অল্প বয়সে তাঁর শিল্প-মেধার বিকাশ ঘটে। তাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে মোনালিসা, দ্য লাস্ট সাপার, ম্যাডোনা অন্যতম। অবশ্য বহুমুখী প্রতিভাধর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অন্যান্য পরিচয়ও রয়েছে। তিনি একাধারে ভাস্কর, স্থপতি, সংগীতজ্ঞ, সমরযন্ত্রশিল্পী এবং বিংশ শতাব্দীর বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের স্রষ্টা। আমরা যে আকাশে হেলিকপ্টার উড়তে দেখি, আকাশে পাখির ওড়া দেখে তাঁর নকশা তিনিই প্রথম করেছিলেন। লিওনার্দো একধরনের প্লাস্টিক ও ক্যামেরা তৈরি করেছিলেন। কন্টাক্ট লেন্স এবং স্টিম ইঞ্জিন নিয়ে লিখে গেছেন, আকাশ কেন নীল তা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এই সব করতে পেরেছিলেন তাঁর চমৎকার সৃজনশীলতার গুণে। তাঁর জীবন হল সৃজনশীলতার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। লিওনার্দো সবসময় আচ্ছন্ন ছিলেন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে এবং সেই সাথে পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণের মাধ্যমে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে চাইতেন।

আর এর সুস্পষ্ট ছাপ রয়ে গেছে তার লেখালেখিতেও। খেয়ালী রাজকুমারের মতো এলোমোলো ভাবে নোটবুকের পৃষ্ঠায় ভিঞ্চি তার চিন্তাভাবনা লিখে রেখে গেছেন। আলোক বিজ্ঞানের উপর কোনো লেখার পাশেই হয়ত আঁকা হয়েছে কোনো মুখের স্কেচ, বা কোনো নির্দিষ্ট রং কিভাবে তৈরি করা যাবে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা বা কোনো নির্দিষ্ট রোগ থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যাবে তার উপায়।
| দলগত কাজ সৃজনশীল আরো কয়েকজন মানুষের একটি তালিকা (কাজের বর্ণনাসহ) তৈরি করে উপস্থাপন কর। |
কায়িক শ্রম বলতে আমরা আসলে শারীরিক পরিশ্রমকে বুঝি। প্রায় সব ধরনের শারীরিক পরিশ্রম কায়িক শ্রমের অন্তর্ভুক্ত। হাঁটা- চলা যেমন এক ধরনের কায়িক শ্রম, তেমনি খেলাধুলা করাও এক ধরনের কায়িক শ্রম। এ ছাড়াও অনেক পেশাজীবী আছেন, যারা নিয়মিত কায়িক শ্রম দিয়ে জীবিকা অর্জন করে থাকেন। যেমন- রিকশাচালক; তিনি সারা দিন রিকশা চালান। রিকশা চালাতে তার অনেক শারীরিক পরিশ্রম হয়। রিকশা চালাতে তার যে শারীরিক পরিশ্রম হয়, তাই কায়িক শ্রম। রিকশাচালক ছাড়াও রয়েছেন কৃষক, শ্রমিকসহ নানা পেশার মানুষ, যারা নানা রকম কায়িক শ্রমের সাথে যুক্ত।

তবে শুধু ভারী ভারী কাজ করাই যে কায়িক শ্রম তা কিন্তু নয়, আসলে যেকোনো ধরনের পরিশ্রমই কায়িক শ্রম। এই যেমন- বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করা; কিন্তু এ ক্ষেত্রে শ্রমের পরিমাণ এতটাই কম যে, আমরা তা বিবেচনার মধ্যেই আনি না। আমরা বাড়িতেও অনেক কাজ করি। থালা বাসন ধোয়া, কাপড় ধোয়া, ঘর- দোর পরিষ্কার করা ইত্যাদি। এসব কাজও কায়িক শ্রমের উদাহরণ।
যাঁরা বিখ্যাত হয়েছেন, তাঁরা সবাই কায়িক শ্রমকে অনেক মূল্যায়ন করেন। প্রত্যেক ধর্মেও কায়িক শ্রমের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কায়িক শ্রম আমাদের নানা রকম শারীরিক সমস্যা থেকে দূরে রাখে। আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে।
| কাজ তুমি তোমার পাশে বসা সহপাঠীর সাথে আলাপ করে বের করো যে তোমরা সারাদিন কী কী কায়িক শ্রমের কাজ করো। |
সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়। সাফল্য এমনিতে আসে না। সততার সাথে মেধা আর পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই কেবল সাফল্য অর্জন করা যায়। আজ আমরা এমনি একজন মানুষের গল্প শুনব, যিনি তার জীবনে সততা আর কায়িক শ্রমের যথাযথ সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
কঠোর পরিশ্রম করে অনাথ রতন এখন অল্প-স্বল্প সহায় সম্পত্তির অধিকারী। পত্রিকা বিলির মধ্য দিয়ে তার দিন শুরু হলেও রাতে ঘুমাতে যেতে হয় খামারের গরু দেখাশোনা করে। এভাবেই কঠোর পরিশ্রম করে ধাপে ধাপে উপরে উঠে এসেছেন রতন। হকার রতন পরিশ্রম করে আরও বড় হতে চান। ছয় বছর বয়সে বাবা অনাথ চন্দ্র সরকার মারা গেলে মা সন্ধ্যারানী রতনকে নিয়ে আশ্রয় নেন জোনাইডাঙ্গা গ্রামের রুপু মজুমদারের বাড়িতে। এর পর সন্ধ্যারানী ছেলেমেয়েকে বাঁচাতে মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নেন। তাতেও যখন চলে না, তখন রতনকে স্থানীয় পত্রিকার দোকানে খাওয়া-দাওয়া চুক্তিতে কাজ নিয়ে দেন।
১৯৮৯ সালে অন্যের দোকানে পত্রিকা বিলি করতে করতে রতনের ইচ্ছা হয়, তিনি নিজেই পত্রিকা বিক্রি করবেন। ১৯৯২ সালে রতন চাকরি ছেড়ে দিয়ে দৈনিক চাঁদনীবাজার পত্রিকা এনে উলিপুর বাজারে বিক্রি করা শুরু করেন। এখান থেকে তার পথচলা শুরু, পরিচয় হয় সাংবাদিকসহ নানা পেশার মানুষের সঙ্গে। ১৯৯৫- ৯৬ সালে তিনি প্রথমে একটি পত্রিকার এজেন্সি পান। এরপর একে একে বেশ কয়েকটি পত্রিকার এজেন্সি পান।
বিনয়ী ও সদালাপী রতন সরকার হয়ে ওঠেন উলিপুরে সবার প্রিয় 'আমাদের রতন'। পত্রিকা দ্রুত এলাকায় পৌঁছানোর জন্য কিনেছেন একটি মোটরসাইকেল। তাতে করে প্রতিদিন ভোরে গিয়ে কুড়িগ্রাম থেকে পত্রিকা এনে ৮ হকারকে পত্রিকা দিয়ে নিজে সাইকেলে পত্রিকা নিয়ে ছুটে চলেন পাঠকের বাড়ি বাড়ি। দুপুর থেকে মুরগির খামারে কাজ করে বিকেলে আবার পত্রিকার টাকা তুলে হিসাব করে রাত ১০টায় বাড়ি ফেরার পর মুরগি ও গরুর খামার দেখাশোনা। এভাবে কর্মের মধ্য দিয়ে তার দিন কাটে।
প্রতিদিন তিনি গড়ে ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। এভাবেই দুঃখভরা জীবনকে সুখের নীড় করে তুলেছেন বলে জানান রতন। রতন জানান, নিজে তেমন একটা লেখাপড়া করতে পারেননি বলে তার ভীষণ কষ্ট। আর এ কষ্টকে জয় করবেন বলে স্ত্রী সুমিত্রা রানী সরকারকে এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করান। ৫ ও ৩ বছরের মেয়ে রাত্রী ও রীতি সরকারকে অনেক লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা রয়েছে বলে জানান।
তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও ভালো ও বড়ো কিছু করার। আর সেই লক্ষ্য নিয়ে গরুর খামার করেছেন। এ খামারে কোনো কর্মচারী না রেখে তারা নিজেরাই রুটিন মাফিক সব কাজ করেন। খামারে ৩টি গাভি থেকে প্রতিদিন ৩০-৩৫ লিটার দুধ আসে। আর্থিক সংকট তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রধান অন্তরায় বলে জানান। তবে এ অন্তরায়কেও তিনি জয় করবেন বলে দৃঢ়তা প্রকাশ করেন। (সূত্র: ইন্টারনেট)
এসো আজ আমরা সবাই মিলে কায়িক শ্রমের অনুশীলন করব। আজ আমরা আমাদের শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করব এবং সুন্দর করে সাজাব।
দলগত কাজ কাজ ১: শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার দল-১ বেঞ্চ, চেয়ার ও টেবিল পরিষ্কার করবে
কাজ ২: শ্রেণিকক্ষ সজ্জা সবাই মিলে শ্রেণিকক্ষ নতুন করে সাজাতে হবে
|
শ্রম কিন্তু শুধু শারীরিক হয় তা নয়, মেধাগত পরিশ্রমও আমরা নিয়মিত করে থাকি। যেমন ধর-
তোমার কোনো বন্ধু তোমাকে একটি ধাঁধা জিজ্ঞেস করল। তুমি বেশ চিন্তাভাবনা করে ধাঁধাটির উত্তর দেবে। এই যে ধাঁধাটির উত্তর দেওয়ার জন্য তুমি চিন্তা করেছ, সেটি কিন্তু এক ধরনের মানসিক পরিশ্রম। ধাঁধাটির উত্তর দেবার জন্য তুমি তোমার মেধা খাটিয়েছ; অর্থাৎ তুমি মেধাশ্রম দিয়েছ।

একজন রোগী ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার তার সব কথা শুনে তাকে ঔষধ দিলেন। একটু ভাবোতো দেখি- ডাক্তার তাকে কীভাবে ঔষধ দিলেন? ডাক্তার রোগীর কথা শুনে প্রথমে রোগের লক্ষণগুলো চিহ্নিত করেছেন এবং লক্ষণগুলো দেখে রোগ নির্ণয় করেছেন। তারপর রোগের জন্য নির্দিষ্ট ঔষধ দিয়েছেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ডাক্তার কিন্তু কোনো শারীরিক পরিশ্রম করেননি, তিনি খাটিয়েছেন তার মেধা। তাই ডাক্তারের এই পরিশ্রম হলো এক ধরনের মেধাশ্রম।

তুমি প্রতিদিন তোমার পাঠ শেখো। এসব পাঠ বুঝে শিখতে গিয়ে তোমাকে তোমার মেধা খাটাতে হয়। কাজেই প্রতিদিনের
পড়া শেখা, মনের মধ্যে ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে তা কাজে লাগানো মেধাশ্রমের উদাহরণ।
উপরের উদাহরণ থেকে আমরা কী বুঝতে পারি? যে সকল কাজ আমরা মেধা ব্যবহার করে সম্পাদন করি, সে সকল কাজকে মেধাশ্রম বলা যায়। অর্থাৎ যখন আমরা আমাদের চিন্তা, ভাবনা, জ্ঞান ইত্যাদি ব্যবহার করে কোনো কাজ করে থাকি, সেটাই হলো আমাদের মেধাশ্রম। মেধাশ্রম হলো মানসিক শ্রম। আমরা যখন কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করি, কোনো সমস্যা দেখা দিলে সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজি, সেগুলো সবই এক ধরনের মেধাশ্রম।
আমরা প্রতিদিন নানা রকম কাজ করি। সেসব কাজের মধ্যে যেমন মেধাশ্রম থাকে, তেমনি থাকে কায়িক শ্রম। মেধাশ্রমের পাশাপাশি কায়িক শ্রম দিতে না পারলে হয়ত অনেক কাজই সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হতো না। আমরা প্রতিদিন যেসব কাজ করে থাকি কিংবা যেসব কাজ করতে দেখে থাকি, সেসব কাজের মধ্যে কোনগুলো মেধাশ্রম আর কোনগুলো নয়, তা কি আমরা বলতে পারব? এসো একটু চেষ্টা করে দেখি।
নিচের যেগুলিতে মেধাশ্রমের পরিমাণ বেশি, সেগুলির পাশে টিক চিহ্ন (✓) দাও এবং বন্ধুদের সাথে আলোচনা করো যে ঐ কাজগুলো কেন মেধাশ্রমের উদাহরণ-
| কাজের নাম | টিক চিহ্ন (√) |
| দর্জির কাপড় সেলাই | |
| লেখকের বই লেখা | |
| শ্রেণিতে বসে মুক্তচিন্তার সাহায্যে কোন বিষয়ে অনুচ্ছেদ লেখা | |
| ডাকপিয়নের চিঠি বিলি করা | |
| ডাক্তারের রোগ নির্ণয় করা | |
| শ্রেণিতে শিক্ষকের গাণিতিক সমস্যা বুঝিয়ে দেওয়া | |
| থালা-বাসন পরিষ্কার করা |
একবার ভেবে দেখতো- মানুষ এবং মেশিনের কাজের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? মানুষ তার কাজ করার সময় নানারকম চিন্তা ভাবনা করে; মেশিন কিন্তু তা করে না। মেশিন শুধু কাজ করে যায়। মানুষ চিন্তা করতে পারে, ভাবতে পারে আর তার সে ভাবনাচিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতেও পারে। পাখির আকাশে ওড়া দেখে মানুষের মনে আকাশে ওড়ার ইচ্ছা তৈরি হয়েছে। তাই মানুষ তার মেধা খাটিয়ে মেধাশ্রম ও কায়িক শ্রম দিয়ে তৈরি করেছে উড়োজাহাজ।

মানুষ তার মেধাশ্রম দিয়েই এত রকম জিনিসপত্র তৈরি করেছে, ফলে জীবন আরামদায়ক হয়েছে। আমরা যদি মেধাশ্রম না দিতাম তাহলে হয়ত মানবসভ্যতা এভাবে দিনে দিনে উন্নত হতে পারত না। কীভাবে ঘর বানাতে হয় তা হয়ত আমাদের আজও অজানাই থেকে যেত; আমরা হয়ত আজও পাহাড়ের গুহায় বাস করতাম। আবিষ্কারকগণ মেধাশ্রম না দিলে আমরা বিদ্যুৎ বাতিও পেতাম না: পেতাম না মোবাইল টেলিফোন, টেলিভিশন এমনকি বাইসাইকেল। মেধাশ্রম না দিলে আমরা এমনকি চাকার ব্যবহারও শিখতে পারতাম না। আসলে মেধাশ্রম ছাড়া জীবন অচল। তবে মাথায় রাখতে হবে, মেধাশ্রম যেন মানব বিধ্বংসী কাজে ব্যবহার না করা হয়; যেমন- মারণাস্ত্র তৈরি।
| কাজ তুমি প্রতিদিন কী কী করো তার একটি তালিকা তৈরি করে তালিকার কোনগুলি মেধাশ্রম তা চিহ্নিত করো প্রয়োজনে শ্রেণি শিক্ষকের সহায়তা নাও। *একটি শ্রেণি কার্যক্রম বরাদ্দ করতে হবে। |
প্রতিদিন আমরা গল্প পড়ি। আজ আমরা গল্প লিখব। চাইলে কেউ ছড়া বা কবিতাও লিখতে পারি। আবার কেউ যদি চাই ছবিও আঁকতে পারি। তবে যে যাই করি না কেন, করার আগে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের অনুমতি নিতে হবে।
দলগত কাজ
নিম্নের ধারণাটি নিয়ে গল্প/কবিতা/ছড়া লিখতে বা ছবি আঁকতে হবে।
বোলপুর গ্রামে হঠাৎ করে গাছ কাটার হিড়িক পড়ে গেল। সবার কী হলো কে জানে- যে যেভাবে পারে, গাছ কাটে। এভাবে কাটতে কাটতে মাঠ-ঘাট-গ্রাম থেকে গাছ প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেল। গাছ শুধু প্রকৃতির সম্পদই নয়, গাছ প্রকৃতির অংশ। গাছ না থাকলে প্রকৃতিও ঠিকঠাক থাকে না। বোলপুর গ্রামে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেলো..........
(এরপর থেকে তোমরা লেখ বা ছবি আঁক, পড়ে উপস্থাপন করো।)
- গল্প/কবিতা/ছড়া লেখা বা ছবি আঁকার জন্য চারটি শ্রেণি কার্যক্রম বরাদ্দ করতে হবে।
|
১. মর্যাদা অর্থ কী?
ক. বিশ্বাস
খ. সম্মান
গ. দায়িত্ব
ঘ. সচেতনতা
২. আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য-
i. অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করা
ii. নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা
iii. অন্যের কথায় কান দেওয়া
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i
খ. i ও ii
গ. i ও iii
ঘ. i, ii ও iii
নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ে ৩ ও ৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও।
আসমা মায়ের সাথে তাদের ফুল গাছে নিয়মিত পানি দেয় ও যত্ন করে। খামারে কাজ করে। ফলে তাকে সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়।
৩. উদ্দীপকে কোন চিত্রটি ফুটে উঠেছে?
ক. আত্মবিশ্বাস
খ. সৃজনশীলতা
গ. কায়িক শ্রম
ঘ. মেধাশ্রম
৪. এ ধরনের কাজের ফলে আসমা-
i. প্রফুল্ল থাকবে
ii. আত্মসম্মান বৃদ্ধি পাবে
iii. শারীরিক সমস্যায় পড়বে না
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i
খ. i ও ii
গ. i ও iii
ঘ. i, ii ও iii
সৃজনশীল প্রশ্ন:
রহিম মিয়া ডিগ্রি পরীক্ষার পর চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে চাকরি না পেয়ে বন্ধুদের সাথে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিন পর তাদের ব্যবসায় লোকসান হয়। তার বন্ধুরা মন খারাপ করে বসে থাকলেও রহিম মিয়া দমে যায়নি। ছাত্র অবস্থা থেকেই তার হাতের লেখা সুন্দর ছিল। তাই সে বিভিন্ন ডিজাইনে আকর্ষণীয় সাইনবোর্ড লেখা শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই নিজের বাড়ির সাথে ছোটো একটি ঘর তৈরি করে সাইনবোর্ড লেখার দোকান খুলে বেশ ভালো রোজগার শুরু করলেন।
ক. আত্মমর্যাদার অর্থ কী?
খ. আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ বলতে কী বুঝায়?
গ. রহিম মিয়ার কাজটি কী ধরনের ব্যাখ্যা করো।
ঘ. রহিম মিয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি মূল্যায়ন করো।
Read more


