তত্ত্বীয়

ষষ্ঠ শ্রেণি — মাধ্যমিক - সংগীত | NCTB BOOK
480
Please, contribute by adding content to তত্ত্বীয়.
Content

সংগীতের নীতি (প্রথম অধ্যায়)

482
Please, contribute by adding content to সংগীতের নীতি.
Content

পরিভাষা (প্রথম পরিচ্ছেদ)

144

সংগীত
সাধারণত সংগীত বলতে গানকে বোঝায়। সংগীত কথাটি দিয়ে বাদ্যসংগীতকে বা বাজনাকেও বোঝানো হয়। তবে সংগীত বলতে মূলত গীত, নৃত্য ও বাদ্যকে একত্রে বোঝায়। সংগীতকে ইংরেজিতে Music বলে। গীত মানে কণ্ঠসংগীত, বাদ্য মানে বাদ্যসংগীত এবং নৃত্য মানে মুদ্রা ও অভিনয় সহযোগে অঙ্গক্রিয়া।
স্বর কী?
সংগীতে ব্যবহৃত ধ্বনির নাম স্বর। এই স্বর দুই প্রকার, তাহলো শুদ্ধস্বর ও বিকৃতস্বর। শুদ্ধ স্বর ৭টি ও বিকৃত স্বর ৫টি। উভয় মিলে মোট স্বরের সংখ্যা ১২টি। ৭টি শুদ্ধ স্বরের নাম হচ্ছে ষড়জ, ঋষভ বা রেখাব, গান্ধার, মধ্যম, পঞ্চম, ধৈবত এবং নিষাদ বা নিখাদ। সংক্ষেপে এগুলোকে বলে সা রে গা মা পা ধানি।
শুদ্ধ স্বর আবার দুই প্রকার: চলস্বর এবং অচলস্বর। সাতটি শুদ্ধ স্বর হচ্ছে-সারেগামাপাধা নি। এর মধ্যে সা এবং পা বিকৃত হয় না বলে এ দুটিকে বলে অচলস্বর। রেগামাধানি এই পাঁচটির প্রত্যেকটি বিকৃত হয় বলে এগুলোকে বলে চলম্বর।
স্বরের প্রকারভেদ
বিকৃত স্বর দুই প্রকার যেমন: কোমল ও তীব্র বা কড়ি। কোমলস্বর চারটি। তীব্র বা কড়ি স্বর একটি। এগুলো কোমল গান্ধার, কোমল ধৈবত, কোমল নিষাদ ও তীব্র মধ্যম।
তীব্রস্বর
তীব্রস্বরের সংখ্যা মাত্র একটি। সেটি হচ্ছে তীব্র মধ্যম বা কড়ি মধ্যম।
স্বরের নাম ও স্বর চিহ্ন
স্বরলিপির অনেক পদ্ধতি আছে। আমাদের দেশে আকারমাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতি সর্বাধিক প্রচলিত। স্বরচিহ্ন এবং স্বরগুলোর নামের তালিকা নিচে আকারমাত্রিক এবং ভাতখণ্ডে পদ্ধতি অনুযায়ী দেয়া হলো:

শুদ্ধস্বরের চিহ্নসমূহ

স্বরের নাম স্বরের নাম (সংক্ষিপ্ত) আকারমাত্রিক পদ্ধতিতে ভাতখণ্ডে পদ্ধতিতে

ষড়জ সা স সা

ঋষভ বা রেখাব রে র রে

গান্ধার গা গ গ

মধ্যম মা ম ম

পঞ্চম পা প প

ধৈবত ধা ধ ধ

নিষাদ বা নিখাদ নি ন নি

বিকৃতস্বরের চিহ্নসমূহ

স্বরের নাম আকারমাত্রিক পদ্ধতিতে ভাতখণ্ডে পদ্ধতিতে

কোমল ঋষভ ঋ রে

কোমল গান্ধার জ্ঞ গ

কড়ি মধ্যম হ্ম ম

কোমল ধৈবত দ ধ

কোমল নিষাদ ণ নি

সপ্তক
সাত স্বরের সমষ্টিকে সপ্তক বলা হয়। কণ্ঠসংগীতে সাধারণত তিনটি সপ্তক ব্যবহৃত হয়। এগুলো হচ্ছে- মন্দ্র সপ্তক, মধ্য সপ্তক ও তার সপ্তক। প্রচলিত কথায় এগুলোর নাম- উদারা, মুদারা ও তারা। আকারমাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতিতে উদারা সপ্তকের স্বর চিহ্নে হসন্ত এবং তার সপ্তকের স্বর চিহ্নে রেফ ব্যবহৃত হয়। ভাতখণ্ডে স্বরলিপি পদ্ধতিতে উদারা সপ্তকের স্বর চিহ্নে স্বরের নিচে বিন্দু এবং তার সপ্তকের স্বর চিহ্নে স্বরের উপরে বিন্দু ব্যবহৃত হয় এবং মুদারা সপ্তকের স্বর চিহ্নে উভয় পদ্ধতির স্বরলিপি লিখনে কোনো চিহ্ন ব্যবহৃত হয় না। তিন সপ্তকের অবস্থান নিম্নরূপ:

উদারা মুদারা তারা

আকারমাত্রিক পদ্ধতিতে সঝরজ্ঞগমহ্মপদধণন সঝরজ্ঞগমহ্মপদধণন সর্খরজ্ঞগর্মাপর্দধর্ণন

ভাতখণ্ডে পদ্ধতিতে সারেরেগ্রগমমপধধনিনি সারেরেগ্রগমমপধধনিনি সারেরেগ্রগমমপধনিনি

স্বরমালিকা
স্বরমালিকা এমন একটি অনুশীলন যা রাগে ব্যবহৃত হয়। এর স্বরসমূহ তালে আবদ্ধ করে পরিভ্রমণ করা যায়। স্বরমালিকা শাস্ত্রীয়সংগীতের প্রাথমিক বা সূচনাকালীন অনুশীলনের আবশ্যিক।

জাতি
আরোহণ এবং অবরোহণের স্বর সংখ্যার হিসাবকে জাতি বলে। জাতি প্রধানত ৩টি। সম্পূর্ণ, ষাড়ব ও ঔড়ব। সাত স্বরের রাগকে বলে সম্পূর্ণ জাতির রাগ। ছয় স্বরের রাগকে বলে ষাড়ব বা খাড়ব জাতির রাগ। পাঁচ স্বরের রাগকে বলে ঔড়ব জাতির রাগ। আরোহণ ও অবরোহণের স্বর সংখ্যাভেদে এই তিনটি থেকে নয়টি জাতি সৃষ্টি হয়। এগুলোর পরিচিতি নিম্নরূপ:

জাতির নাম আরোহণের স্বর সংখ্যা অবরোহণের স্বর সংখ্যা

সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ ৭ টি ৭টি

সম্পূর্ণ-ষাড়ব ৭ টি ৬টি

সম্পূর্ণ-ঔড়ব ৭ টি ৫ টি

ষাড়ব-সম্পূর্ণ ৬ টি ৭টি

ষাড়ব-ষাড়ব ৬ টি ৬টি

ষাড়ব-ঔড়ব ৬ টি ৫টি

ঔড়ব-সম্পূর্ণ ৫ টি ৭টি

ঔড়ব-ষাড়ব ৫ টি ৬টি

ঔড়ব-ঔড়ব ৫ টি ৫টি

আরোহ বা আরোহণ
যেকোনো স্বর থেকে উপরের স্বরে যাওয়ার জন্য প্রতিটি রাগে একটি নির্দিষ্ট গতিপথ রয়েছে একে বলে আরোহ বা আরোহণ। আরোহ দুই প্রকার। যেমন: সরল ও বক্র।
অবরোহ বা অবরোহণ
যেকোনো স্বর থেকে নিচের দিকে চলার জন্য প্রতিটি রাগে একটি নির্দিষ্ট গতিপথ রয়েছে একে বলে অবরোহ বা অবরোহণ। অবরোহ দুই প্রকার। যেমন: সরল ও বক্র।
বাদী ও সমবাদী
যে স্বরের অধিক ব্যবহারে রাগরূপ স্পষ্ট হয় তাকে বাদী স্বর বলে। রাগে যে স্বরটি বাদী স্বরের চেয়ে কম কিন্তু অন্যান্য স্বরের চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় তাকে সমবাদী স্বর বলে।
অনুবাদী স্বর
বাদী এবং সমবাদী স্বর ছাড়া অন্য যে স্বরগুলি রাগে ব্যবহৃত হয় তাদের অনুবাদী স্বর বলে।
বিবাদী স্বর
সাধারণত যে স্বর রাগে ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু কুশলী শিল্পীগণ রাগের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যে স্বর ব্যবহার করে থাকেন তাকে বিবাদী স্বর বলে।
নিম্নে ১০টি ঠাটের নাম, স্বররূপ ও জনক রাগ এর পরিচিতি দেওয়া হলো:-

ঠাটের নাম সাত স্বর জনকরাগ

বিলাবল সরগমপধন বিলাবল

খাম্বাজ সরগমপধণ খাম্বাজ

কাফী সরজ্ঞমপধণ কাফী

আশাবরী সরজ্ঞমপদণ আশাবরী

ভৈরবী সঋজ্ঞমপদণ ভৈরবী

ভৈরব সঋগমপদন ভৈরব

কল্যাণ সরগহ্মপধন ইমন

মারওয়া বা মারবা সঋগমপদন মারওয়া বা মারবা

পুরবী সঋগমপদন পুরবী

টোড়ি সঋজ্ঞহ্মপদন টোড়ি

হারমোনিয়ামের স্কেল পরিচিতি
সংগীতে ব্যবহৃত ১২টি স্বরের প্রতিটির পৃথক পৃথক নাম রয়েছে। পাশ্চাত্য সংগীতের ধারায় এদেরকে স্কেল বলা হয়। নিচে এক সপ্তকের ১২টি স্কেল চিত্রসহ নির্দেশ করা হলো

চিত্র-২: হারমোনিয়ামের বিভিন্ন পর্দা ও স্কেল পরিচিতি

Content added By

তাল ও ছন্দ প্রকরণ (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

588

তাল
সংগীতে মাত্রার ছন্দোবদ্ধ রূপকে তাল বলে। এই তাল মাত্রা, লয়, তালি, খালি, বিভাগ ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত। মাত্রা, আঘাত, অনাঘাত ও বিভাগের সমন্বয়ে সৃষ্ট ছন্দকলাকে তাল বলে। তাল দুই প্রকার- সমপদী তাল ও বিসমপদী তাল।
সমপদী তাল
যে তালের প্রতিটি বিভাগের মাত্রা সংখ্যা সমান তাকে সমপদী তাল বলে।
বিসমপদী তাল
যে তালের প্রতিটি বিভাগের মাত্রা সংখ্যা অসমান তাকে বিসমপদী তাল বলে।
তাললিপি
তালের লিখিত রূপকে তাললিপি বলে। যেমন তে, রে, কে, ধিন ইত্যাদি।
মাত্রা
তালের একককে মাত্রা বলে।
ঠেকা
প্রতিটি তালের বোল-বাণী যুক্ত একটি নির্দিষ্ট রচনা থাকে তাকে ঠেকা বলা হয়।
আঘাত
তালের কোনো কোনো মাত্রায় অতিরিক্ত ঝোঁক পড়ে এই স্থানগুলোকে আঘাত বলে। আঘাতের অন্য নাম তালি বা ভরি।
অনাঘাত
তালের কোনো কোনো মাত্রায় ঝোঁক পড়লেও তালি না দিয়ে উপরে হাত প্রদর্শিত হয়, এই স্থানগুলোকে খালি বা ফাঁক বলে।
গৃহ
এক বা একাধিক মাত্রার বিভাগকে বলে গৃহ।
সম
সাধারণত তালের প্রথম আঘাতকে বলে সম।
লয়
তালের গতিকে লয় বলে। লয় তিন প্রকার। যেমন: বিলম্বিত, মধ্য ও দ্রুত।
বিলম্বিত লয়
ধীরগতির লয়কে বলে বিলম্বিত লয়।
মধ্য লয়
মাঝারি গতির লয়কে বলে মধ্যলয়।
দ্রুত লয়
দ্রুতগতির লয়কে বলে দ্রুত লয় বা জলদ।
তাললিপি পরিচিতি
তাল লেখার পদ্ধতিকে বলে তাললিপি। এতে মাত্রা, সম, আঘাত, অনাঘাত ও বিভাগ চিহ্নগুলো নির্দেশ করে ।
ঠেকার উল্লেখ থাকে। তালযন্ত্রে বোলসমূহ বিভাগ অনুযায়ী বাজাবার ক্রিয়াকে বলা হয় ঠেকা। ঠেকার নিচ দিয়ে ১, ২, ৩ এইভাবে মাত্রা নম্বর দেওয়া হয় এবং ঠেকার ওপরে নির্দিষ্ট জায়গায় তাল চিহ্নগুলো দেওয়া হয়।
তালের বর্ণ
তবলার তালকে প্রকাশের জন্য যে বাণী ব্যবহার করা হয় তাকে বর্ণ বলে। সংগীতে যেমন সাতটি স্বরের ব্যবহার রয়েছে, তেমনি তবলায় দশটি বর্ণ রয়েছে। বর্ণ দুই প্রকার- মৌলিক বর্ণ ও যৌগিক বর্ণ। যে বর্ণ এককভাবে প্রকাশিত হয় তাকে মৌলিক বর্ণ বলে। যেমন- তা বা না, তি বা তিন, তে, টে বা রে, খুন, দি বা দিন, ক বা কৎ, গে। যে বর্ণ তবলা এবং বায়া উভয়ের সমন্বয়ে প্রকাশিত হয় তাকে যৌগিক বর্ণ বলে। যেমন-

তাল চিহ্ন পরিচিতি আকারমাত্রিক ভাতখণ্ডে

সম + X

দ্বিতীয় আঘাত ২ ২

তৃতীয় আঘাত ৩ ৩

চতুর্থ আঘাত 8 8

অনাঘাত ০ ০

বিভাগ | |

তাল: দাদরা

মাত্রা ৬

বিভাগ ২

ছন্দ ৩/৩

সম বা তালি ১ম মাত্রায়

খালি বা ফাঁক ৪র্থ মাত্রায়

পদ সমপদী

দাদরা তালের তাললিপি

মাত্রা ১২৩।৪ ৫৬।১

বোল ধাধিনা। নাতিনা। ধা

চিহ্ন X ০ X

তাল: কাহারবা

মাত্রা ৮

বিভাগ ২

ছন্দ 8/8

সম বা তাল ১ম মাত্রায়

খালি বা ফাঁক ৫ম মাত্রায়

পদ সমপদী

কাহারবা তালের তাললিপি

মাত্রা ১২৩৪।৫৬৭৮।১

বোল ধাগেতেটে। নাগেধিনা।ধা

চিহ্ন X ০ X

ত্রিতাল তালের তাললিপি

মাত্রা ১২৩৪।৫৬৭৮। ৯১০১১১২।১৩১৪১৫৬।১

বোল ধা ধিন ধিন ধা ধা ধিন ধিন ধা। না তিন তিন না। তেটে ধিন ধিন ধা । ধা

চিহ্ন X ২ ৩

Content added By

ইতিহাস (দ্বিতীয় অধ্যায়)

376
Please, contribute by adding content to ইতিহাস.
Content

সংগীতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (প্রথম পরিচ্ছেদ)

186

শাস্ত্রীয়সংগীতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
মানবসভ্যতার প্রথম যুগে ভাষার উৎপত্তির আগেই মানুষ তার ভাব, আবেগকে প্রকাশ করেছে সুরে সুরে। মানুষের কণ্ঠনিসৃত ধ্বনি সুরবিহীন ছিল না। মানবকণ্ঠের এই সুরময় প্রকাশের উৎকর্ষিত রূপই সংগীত। সেই দিক থেকে বিচার করলে সংগীতের ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। এই উপমহাদেশের সভ্যতা যেমন প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন ধারায়, বিভিন্ন কালে ও বিভিন্ন পর্যায়ে বিকশিত হয়েছে তেমনি সংগীতের ইতিহাসকেও কয়েকটি কাল-পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগভেদে উপমহাদেশীয় সংগীতকে মোট পাঁচটি কাল-পর্যায়ে ভাগ করা যায়। যেমন-

ক) প্রাক-বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০-২০০০ খ্রিস্টপূর্ব)
খ) বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্ব)
গ) বৈদিকোত্তর যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ১০০০-১২০৬ খ্রিস্টাব্দ)
ঘ) মধ্যযুগ (১২০৭-১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ)
ঙ) আধুনিক যুগ বা বর্তমান কাল (১২০৭-১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ)

প্রথম তিনটিকে একত্রে প্রাচীন যুগ বলে। নিচে প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক যুগ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো: প্রাচীন যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০-১২০৬ খ্রিস্টাব্দ)
ক) প্রাক-বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০-২০০০ খ্রিস্টপূর্ব)
মোটামুটি সিন্ধু সভ্যতার সময়কে প্রাক-বৈদিক যুগ ধরা হয়। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তুপ থেকে প্রাপ্ত সংগীতবাদ্যযন্ত্র, বীণা, মৃদঙ্গ, চামড়ার বাদ্যযন্ত্র, নৃত্যরত নারী-পুরুষ মূর্তি সে যুগের সংগীত চর্চার সাক্ষ্য বহন করে, তবে সংগীত প্রসঙ্গে কোনো লিখিত নিদর্শন পাওয়া যায়নি বলে সে সময়ের সংগীতের সঠিক রূপ কী ছিল তা নিরূপণ করা যায়নি।

খ) বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্ব)
বৈদিক যুগের গান মূলত সামগান। আর্যদের আগমনের ফলে প্রাচীনযুগে মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তুপের উপর গড়ে ওঠে বৈদিক সভ্যতা। বেদের স্ত্রোত্রগুলিকে সুর করে গাওয়া হতো যজ্ঞানুষ্ঠানে। বৈদিক সংগীতে উদাত্ত, অনুদাত্ত এবং স্বরিত এই তিনটি স্বর ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। সংগীত শাস্ত্রকারদের মতে, এই উদাত্ত, অনুদাত্ত এবং স্বরিত এই তিনটি আদি স্বর থেকেই পরবর্তীকালে সাত স্বরের উদ্ভব হয়েছে।

গ) বৈদিকোত্তর যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ১০০০-১২০৬ খ্রিস্টাব্দ)
বৈদিকোত্তর যুগে সংগীত চর্চার পাশাপাশি এর ঔপপত্তিক (শাস্ত্রীয়) বিশ্লেষণ প্রাধান্য পেতে থাকে। এই সময়েই রচিত হয় ভরতের 'নাট্যশাস্ত্র', নারদের 'সংগীত মকরন্দ', 'মতঙ্গের বৃহদ্দেশী' ইত্যাদি সংগীত গ্রন্থাদি। স্বরগ্রাম, মূর্ছনা ইত্যাদি সাংগীতিক পরিভাষাগুলি এই সময়ের শাস্ত্রীয় গ্রন্থগুলিতে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
ঘ) মধ্যযুগ (১২০৭-১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ)
মধ্যযুগে উপমহাদেশীয় সংগীত অভাবিত উন্নতি ও প্রসার লাভ করে। এই সময়ে শাস্ত্রীয়সংগীতে শৈলি ও পরম্পরাগত উৎকর্ষ সাধিত হয় এবং সংগীতে ঘরানা পদ্ধতির উন্মেষ ঘটে। মধ্যযুগের বিখ্যাত সংগীতশাস্ত্রীদের মধ্যে শার্জদেব, পার্শ্বদেব, কবি লোচন, অহোবল ও সোমনাথ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
ঙ) আধুনিক যুগ বা বর্তমান কাল (১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ-বর্তমান কাল)
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আধুনিক যুগের সূচনা হয়। আধুনিক যুগে ভারতীয় সংগীতের চরম উৎকর্ষতার জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে এবং পণ্ডিত বিষ্ণুদিগম্বর পলুস্কর।
যদিও আঠারো শতকের শেষভাগে রামনিধি গুপ্তের টপ্পা গানের মাধ্যমে আধুনিক বাংলা গানের সূচনা হয়। পরবর্তীতে কালী মির্জার টপ্পা, শঙ্কর ভট্টাচার্য্যের বাংলা ধ্রুপদ, রাজা রামমোহন রায়ের ব্রহ্মসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, দ্বিজেন্দ্রগীতি, রজনীকান্তের গান, অতুলপ্রসাদের গান এবং নজরুলসংগীত বাংলা আধুনিক গানের প্রথম পর্যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে অজয় ভট্টাচার্য, হিমাংশু দত্ত, সলিল চৌধুরী, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্ত, শচীন দেব বর্মন উল্লেখযোগ্য। শেষপর্যায়ে আবু হেনা মোস্তফা কামাল, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আবদুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদসহ সহস্র সংগীতকারের গৌরবোজ্জল ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাগানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশ এ দেশের কণ্ঠসংগীতকে ঐতিহ্যমণ্ডিত করেছে। বাংলাদেশের পরিবেশ, ইতিহাস এবং কৃষ্টি এ দেশের গানে রূপায়িত হয়েছে। এ দেশের মাটি ও আবহ এ দেশের গানকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।
বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাস প্রাচীন। তবে তার সঠিক সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। সংগীত শাস্ত্রকারদের লেখা বই থেকে একটা ধারণা পাওয়া যায় মাত্র। স্তোত্রকে অবলম্বন করেই সংগীতের যাত্রা।
বাংলাদেশে শাস্ত্রীয়সংগীতের প্রচলন ছিল প্রাচীনকাল থেকে। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির (১২৬৭-১৩১৬) রাজত্বকালে হযরত আমীর খসরু শাস্ত্রীয়সংগীতে নতুন ধারা প্রবর্তন করেন। ফলে সংগীতের বিকাশ শুরু হয়, ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, দাদরা, সাদ্রা, টপ্পা, ঠুমরি, গজল, কাওয়ালি, যুগলবন্ধ, প্রবন্ধ, রাগমালা, গুলনকশ, তারানা, চতুরঙ্গ, পট-খেয়াল, ত্রিবট, শোহেলা, জিগর, কাজরি প্রভৃতি নানান ধারায় সংগীতের বিকাশ সাধন হতে থাকে।
দশম শতাব্দী থেকে প্রবন্ধ সংগীতের সঙ্গে চর্যাপদের প্রচলন ছিল। তাই চর্যাকে বাংলাদেশের প্রাচীনতম সংগীত বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশের সেন বংশের শেষ রাজা ছিলেন লক্ষণ সেন। তাঁর সংগীতজ্ঞ সভাকবি ছিলেন জয়দেব। জয়দেব 'গীতগোবিন্দ' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এর পদগুলো গাওয়া হতো। বাংলাগানের সমৃদ্ধ ইতিহাসের বিষয় বস্তু হিসেবে রাধা-কৃষ্ণের যে লীলা বর্ণনা করা হয় তার মূল প্রেরণা এই গীত গোবিন্দ থেকে এসেছে বলে ধরা হয়। তাই সংস্কৃত ভাষায় রচিত হলেও গীত গোবিন্দ বাংলাগানের ইতিহাসে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়।
মধ্যযুগের পূর্বে বাংলাদেশে নিবদ্ধ গানের প্রচলন ছিল। যে গান তালের সঙ্গে গাওয়া হয় তার নাম নিবদ্ধ গান। এ গানে চারটি কলি থাকে। যথা: স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ।
মধ্যযুগে বাংলাদেশের সংগীতে মুসলমানদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্ ছিলেন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ শাসনকর্তা। তাঁর শাসনামলে শ্রীচৈতন্যের কীর্তন প্রচলন শুরু হয় বলে অনুমান করা হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে শাস্ত্রীয়সংগীতের প্রসার শুরু হয়। রামনিধি গুপ্ত (১৭৪১-১৮৩৯) শাস্ত্রীয়সংগীতের ওপর ভিত্তি করে বাংলায় টপ্পা গান উদ্ভাবন করেন। তাঁর টপ্পা গান 'নিধুবাবুর টপ্পা' নামে পরিচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের কণ্ঠসংগীতে নিধুবাবুর টপ্পার প্রচলন।
বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমনের সঙ্গে সংগীতের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের সূচনা হয়। এই পরিবর্তনের ধারা বাংলাদেশের সংগীতেও প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাদেশে প্রচলিত গানের সঙ্গে শাস্ত্রীয়সংগীতের চর্চা শুরু হয়। ফলে বাংলাদেশের সংগীত নতুন রূপে বিকশিত হতে শুরু করে। এ সকল সংগীতধারা ক্রমাগত বিস্তার লাভ করলেও সেই প্রাচীনকাল থেকে বাউল ও লোকধারার গান প্রচলিত ছিল। সেই বাউলধারার প্রধান প্রবর্তক লালন সাঁই (১৭৭২-১৮৯০) দেহতত্ত্ব ও অধ্যাত্মবাদ স্রোত ছিল তাঁর গানের মূল যা বাংলাগানকে অনেকখানি সমৃদ্ধ করেছে।

মার্গ সংগীত বাংলার প্রাচীন সংগীতের ধারা। বৈদিক ও তার পরবর্তী যুগে যে সুরের মাধ্যমে উপাসনা বা আরাধনা করা হতো, তাকে মার্গ সংগীত বলা হয়। এই গান সাধারণের জন্য নয় এবং এক ধরনের কঠিন ব্রত পালনের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম রীতি অনুসরণ করে গাওয়া হতো। অন্যদিকে দেশে দেশে অঞ্চলভেদে নানা ভাবে মানুষের হৃদয় উৎসারিত এবং ধর্মনিরপেক্ষ গানগুলোকে দেশি সংগীত বলে। এই গানের আবেদন স্বতঃস্ফূর্ত এবং সর্বসাধারণের জীবন ও রুচির প্রকাশই এতে প্রধান দিক হিসেবে বিবেচিত। দেশি সংগীত মার্গ সংগীতের সমসাময়িক হলেও তা নানা বিবর্তনের ভেতর দিয়ে নদীর স্রোতের মতো প্রবাহিত হয়ে চলেছে। লোকসংগীত দেশি সংগীতেরই একটি ধারা। দেশি সংগীতে বিদেশি সুরের মিশ্রণ সর্মথন করা হতো। যেমন মধ্যযুগে পারস্য সংগীতের মিশ্রণের মাধ্যমে হিন্দুস্থানি সংগীতের বিকাশ ঘটে।
লোক বা গ্রামীণ সংগীত বলতে পল্লী ও প্রান্তিক মানুষের জীবনের কথা, সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, শ্রম-শ্রান্তির কথা ফুটে ওঠে যে সংগীতে। এই গান মুলত মৌখিক, ভাষা আঞ্চলিক এবং প্রকৃতি নির্ভর। অথবা বলা যায় এই গান আদি তৃণমূল পর্যায়ের গান। সম্মিলক বা একক কন্ঠে গাওয়া হলেও এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে মানুষের মুখে মুখে বিবর্তনের মাধ্যমে বিকাশ ঘটে। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, সারি, বাউল, গম্ভীরা, পালাগান প্রভৃতি লোকসংগীত পর্যায়ের গান। লোকগানে একদিকে যেমন ভাব ও মরমিবাদ আছে, অন্যদিকে শ্রম-শ্রান্তি, জীবিকা নাটক নৃত্য সবকিছুরই উদ্দীপনা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংগীতের ভাণ্ডার খুবই সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের গান সুর-সম্পদ এবং সুর-বৈচিত্র্যে অতুলনীয়। বাংলাদেশের জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, গম্ভীরা, কীর্তন, কবিগান, পালাগান, চট্টক্কা ইত্যাদি বাংলাদেশের একান্ত সম্পদ। বাংলাদেশের কণ্ঠসংগীতের ভুবনকে আরো সমৃদ্ধ করে তোলেন কালজয়ী সংগীত রচয়িতাগণ। তন্মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, লালন সাঁই, হাসন রাজা উল্লেখযোগ্য।

লোকসংগীত
বাংলাদেশের কন্ঠসংগীতের ঐতিহ্যের মূলে রয়েছে এ দেশের লোকগীতি বা লোকসংগীত। লোকসংগীত বাংলাদেশের দেশজ কৃষ্টি। তাই লোকসংগীত চিরায়ত সংগীত। এই সংগীতে রয়েছে মাটির মানুষের প্রাণের ছোঁয়া। এই গানের মূল বিষযবস্তু গ্রামের মানুষের বিরহ-ব্যথা ও হাসি-কান্নার কাহিনি। গ্রাম্য জীবন, প্রকৃতি ও গ্রামের মানুষের মনের কথা নিয়ে লোকসংগীত রচিত। এ সংগীতে রয়েছে কৃষক, জেলে, মাঝি, তাঁতি, কামার ও কুমোরের মতো গ্রাম্য মানুষের মনের কথা। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ, আনন্দ-উৎসবে এ সকল গান গাওয়া হয়। লোকসংগীতে অনেক শ্রেণির গান রয়েছে। যেমন- বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, টুসু, গম্ভীরা, জারি, সারি, কবি, পালা, চটকা, ঝুমুর, গাজন, কীর্তন, পাঁচালি, পুঁথি পাঠ, মেয়েলি গীত, আলকাপ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। লোকসংগীতে পল্লি মানুষের সহজ সরল মনের প্রকাশ ঘটে। এ গানে শাস্ত্রীয়সংগীতের জটিলতা নেই। এ গানের আবেদন সহজ ও সরল। তাই এ গানের আবেদন চিরন্তন। মূলত শ্রুতি ও স্মৃতি নির্ভর করেই এ গান প্রবহমান নদীর ধারার মতো বহমান থাকে। বাংলাদেশের লোকসংগীত যুগ যুগ ধরে শুধুমাত্র দেশের সাংস্কৃতিক ধারাকেই নয়, বিদেশেও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভাঙারকেও সমৃদ্ধ করেছে।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি লোকসংগীতের ধারা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা ঃ-

ভাটিয়ালি
'ভাটি' শব্দ থেকে ভাটিয়ালি কথাটি এসেছে। ভাটিয়ালি গানে সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার প্রকাশ ঘটে। ভাটির টানে মাঝি নৌকা ছেড়ে মনের খুশিতে ভাটিয়ালি গান গায়। এ গানের সুরে একটা উদাস ভাব আছে। এ গানের সুর টানা। কোনো বাঁধা তাল নেই। একক গান হিসেবে ভাটিয়ালি প্রচলিত। বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে (ময়মনসিংহ, সিলেট, ফরিদপুর ইত্যাদি) ভাটিয়ালি গান খুব জনপ্রিয়।
ভাওয়াইয়া
ভাওয়াইয়া উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় লোকসংগীত। এই গান মূলত ভাব প্রধান। গানের কথা ও সুর করুণ। 'ভাব' শব্দ থেকে 'ভাওয়াইয়া' গানের উৎপত্তি। তবে অনেকের মতে 'ভাওয়া' শব্দ থেকে 'ভাওয়াইয়া' কথাটি এসেছে। কাশ, নলখাগড়ার বিস্তীর্ণ চরকে 'ভাওয়া' বলা হয়। 'ভাওয়াইয়া' গান বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রচলিত।
বাউল
বাউল আধ্যাত্মিক গান। এ গান সাধকদের গান। এই সাধকরা 'বাউল' নামে পরিচিত। বাউলদের সাধনা অতি প্রাচীন। বাউলদের সাধনা সহজ পথের সন্ধান। গানের ভেতর দিয়ে তারা সেই পথের সন্ধান করে। বাউল গানের সঙ্গে একতারা ও ডুগডুগি বাজানো হয়। বাউল গানের আবেদন অন্তর্ভেদী। লালন সাঁই বাউল গানের অন্যতম পুরোধা।
মারফতি
লোকসংগীতের আধ্যাত্মিক ধারার একটি অন্যতম গান মারফতি। স্রষ্টাকে প্রেমের মাধ্যমে অর্জনই এই গানের মূল লক্ষ্য।
মুর্শিদি
মুর্শিদ মানে গুরু। এই মুর্শিদি বা গুরুর প্রতি ভক্তি নিবেদন বিষয়ক গানই হলো মুর্শিদি গান। বাংলাদেশের • মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও কেরাণীগঞ্জ অঞ্চলে এই গানের প্রচলন বেশি।

Content added By

সংগীতগুণীদের জীবনী (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

318

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের অন্যতম রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (৭ মে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ) কোলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগে থেকেই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি কোলকাতার সাহিত্য, সংগীত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিখ্যাত ছিল। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখনকার সমাজের কুসংস্কার দূর করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ঊনিশ শতকের উল্লেখযোগ্য সমাজ সংস্কারক। ঠাকুর পরিবার ছিল যেমনি বিশাল তেমনি নানা প্রতিভাবানের সমাবেশে উজ্জ্বল। রবীন্দ্রনাথের বড়ো ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন দার্শনিক ও কবি, সেজো ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন বৃটিশ-ভারতের প্রথম বাঙালি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। অন্যান্য ভাই বোনদের মধ্যে হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বর্ণকুমারী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একাধারে সংগীতজ্ঞ ও নাট্যকার। গানের ব্যাপারে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে রবীন্দ্রনাথ অনেক ঋণী।
বালক বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথ কবিতা লেখা শুরু করেন। ছোটোবেলা থেকে বিভিন্ন বিষয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি গানও শিখেছেন। ছোটোবেলাতেই নিজের তৈরি গান শুনিয়ে বাবার কাছ থেকে পুরস্কারও পেয়েছিলেন। তিনি প্রথমে পড়েছেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে, পরে নর্মাল স্কুলে। স্কুলের একঘেয়ে নিয়মের বন্দিদশা থেকে তিনি মুক্তি চাইতেন। অথচ অন্যদিকে আবার বারান্দার রেলিংগুলোকে ছাত্র বানিয়ে কড়া শাসন করতেন। এ ছিল বালক রবীন্দ্রনাথের আপন খেয়ালের খেলা। আবার বন্ধ ঘরের জানালা দিয়ে উদাস দুপুরের রূপ দেখতেন। জমিদার বাড়ি হলে কি হবে প্রাচুর্য বা জৌলুসের মধ্যে তিনি বড়ো হননি।
'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে কবি হিসেবে সাহিত্যে বিশ্বের সেরা নোবেল পুরস্কার পান এবং সেই সুবাদে বাংলা সাহিত্য বিশ্বের দরবারে পরিচিতি পায়।

রবীন্দ্রনাথ শুধু লেখেননি, সমাজসেবামূলক অনেক কাজ করেছেন। আমাদের দেশের কৃষকদের সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশের শাহজাদপুরে কৃষিব্যাংক এবং পশ্চিমবঙ্গে বোলপুরের শ্রীনিকেতনে পল্লি সংগঠন স্থাপন করেন। তাঁর মহত্তম কীর্তি শান্তিনিকেতন। প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশে সেখানে একেবারে শিশুশ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ রয়েছে। নাচ-গান, ছবি আঁকা, কাপড় রাঙানো, তাঁত বোনা, সেলাই করা সব রকম কলা চর্চার ব্যবস্থা আছে লেখাপড়ার পাশাপাশি। এছাড়া, কুটির শিল্প, সমবায় এসবের জন্যও তিনি বহু কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে মনে করতেন গানই তাঁর সেরা সৃষ্টি। তিনি দুই হাজারেরও বেশি গান লিখেছেন। এগুলো পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ এ রকম কয়েকটি পর্বে ভাগ করেছেন নিজেই। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' তাঁরই রচনা।
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীত ভুবনে এক অসাধারণ কবি, গীতিকার ও সুরস্রষ্টা। কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ সালের ১১জ্যৈষ্ঠ বুধবার (১৮৯৯ সালের ২৪ মে) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতার নাম জাহেদা খাতুন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে কাজী নজরুল ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া। নয় বছর বয়সে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। ফলে আর্থিক সংগতির অভাবে তার বিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়। জীবিকা নির্বাহের জন্য সামান্য চাকরি থেকে শুরু করে যুদ্ধ ক্ষেত্রে সৈনিক হিসেবেও তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ১৯১০ সালে মসজিদে ইমামতি করেন ও স্থানীয় পীরের মাজারে খাদেম ছিলেন। ১৯১১-১২ সালে শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে প্রথম ভর্তি হন ও কিছুকালের মধ্যেই স্কুল ত্যাগ করে মাথরুন নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউটশনে ভর্তি হন। এরপর ১৯১৪ সালে তিনি ময়মনসিংহের দরিরামপুর হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন ও পরবর্তীতে ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সালে পুনরায় শিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। পরিশেষে ১৯১৭ সালে ৪৯নং বাঙালি পল্টনে সৈনিকরূপে যোগদান করেন।
কৈশোরে লেটোর গান রচনা, বিদ্যালয়ে শিক্ষকের বিদায় সম্বর্ধনা উপলক্ষে কবিতা রচনা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে তার স্বাভাবিক কবিত্বশক্তির স্ফুরণ লক্ষ করা যায়। পরবর্তীকালে ১৯১৯ সালে তাঁর সৈনিক জীবনের মধ্যভাগ থেকে তিনি সাহিত্য-সাধনায় ব্রতী হন। এই সময়ে তাঁর "বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী" নামে রচনা মাসিক 'সওগাত' ও 'মুক্তি' নামে কবিতা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। সৈনিক জীবন থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি পুরোপুরিভাবে কাব্য রচনায় ব্যাপৃত হন। বাংলা কাব্য সাহিত্যে 'বিদ্রোহী' নামে এক অমর কবিতা রচনা ও পরাধীনতা, সামাজিক অনাচার, অবিচার, কুসংস্কার এর বিরুদ্ধে তাঁর নিরলস, দুঃসাহসী ও আপোষহীন সংগ্রাম তাঁকে 'বিদ্রোহী' কবি নামে জাতির কাছে পরিচিত করেছিল।
দেশ তখন ইংরেজ শাসনাধীন ছিল। পরাধীনতার বিরুদ্ধে অনলবর্ষী রচনার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ রাজ তার বেশ কয়েকটি পুস্তক বাজেয়াপ্ত করেন। তাঁকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয় ও একাধিকবার কারাগার বরণ করতে হয়।
সমাজের সাধারণ শ্রেণির মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সদা জাগ্রত ছিল, তাঁর জীবনের বিভিন্ন সময়ে পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর পরিচয় রেখেছেন। কী কবিতায়, কী গানে, তিনি তাঁর সময়ের প্রচলিত ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক দিগন্ত উন্মোচন করেন ও অত্যন্ত বলিষ্ঠ একটি ভাবধারার প্রবর্তন করেন।

কবিতার ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু ছাড়াও বিভিন্ন অপ্রচলিত ও নিত্য নতুন ছন্দের অনায়াস ব্যবহারে তিনি সবাইকে চমৎকৃত করেছেন। নজরুল তাঁর কবিতায় ও গানে আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষার বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন।
তাঁর রচিত গান সম্পূর্ণ নতুন এবং বিচিত্র ধরনের। সংগ্রামী তার গানে উদ্বুদ্ধ হত, ভক্ত তাঁর গানের ভক্তিরসে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হতো। সমাজের সকল স্তরে সব মানুষের দুঃখ সুখের সঙ্গী তাঁর গান। তিনি আবৃত্তিকার ও অভিনেতা হিসেবেও পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। ছায়াছবি ও নাটকের কাহিনিকার এবং সংগীত পরিচালকের ভূমিকাতেও তার কৃতিত্ব অসামান্য।
নজরুল ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত এইচ এম ভি গ্রামোফোন কোম্পানির গীতিকার ও প্রশিক্ষক (Trainer) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অন্যান্য রেকর্ড কোম্পানি ছাড়াও ১৯৩২ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোলকাতা বেতারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এই সময়ে তিনি 'হারামণি' ও 'নবরাগমালিকা' শিরোনামে সংগীত বিষয়ক তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রচার করেছেন। ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খান, ওস্তাদ কাদের বখশ, ওস্তাদ মঞ্জু সাহেব, ওস্তাদ মস্তান গামা প্রমুখ প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞদের কাছ থেকে তিনি শাস্ত্রীয়সংগীতের তালিম গ্রহণ করেছিলেন।

নজরুল স্বয়ং বেশ কয়েকটি রাগের সৃষ্টি করেছেন যেমন: নির্ঝরিণী, সন্ধ্যামালতী, বেণুকা, শংকরী, বনকুন্তলা, যোগিনী, উদাসী ভৈরব, মীনাক্ষী, শিব-সরস্বতী, অরুণ-ভৈরব, রূপমঞ্জুরী, রুদ্র ভৈরব, অরুণ-রঞ্জনী, আশা- ভৈরবী, দেবযানী, শিবানী-ভৈরবী, দোলনচাঁপা ইত্যাদি।
এছাড়া তিনি কয়েকটি নতুন তাল সৃষ্টি করেন। যেমন- প্রিয়া, নব-নন্দন, মণিমালা, মঞ্জুভাষিণী, মন্দাকিনী, স্বাগতা, মধুমতি, রুচিরা, দীপকমালা, ছন্দবৃষ্টিপ্রপাত, মত্তময়ূর ইত্যাদি।
এছাড়া বাংলা গজলের প্রচলন তিনিই সার্থকভাবে করতে পেরেছিলেন। বাংলাসংগীতে মার্চ-সংগীত বা কুচকাওয়াজের গানের তিনিই প্রথম উপস্থাপক। প্রায় ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ ধরনের গানের স্রষ্টা কাজী নজরুল। যেমন- গণসংগীত, শ্রমিকের গান, কৃষকের গান, ধীবরের গান, ছাদ পেটার গান, লেটো গান, ছাত্রদলের গান, কুচকাওয়াজের গান, নদীর মাঝির গান ইত্যাদি। এসব ছাড়াও পল্লিসংগীত, বাংলা ভাষায় সাঁওতালিদের ঝুমুর গান, আরবি, ফারসি ও অন্যান্য বিদেশি শব্দ ও সুরের মিশ্রণে গজল গান, বিভিন্ন প্রচলিত অপ্রচলিত রাগাশ্রয়ী গান, নিজ সৃষ্ট অন্তত বিশটি রাগের উপর রচিত গান, প্রকৃতির গান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান, কীর্তন, শ্যামা সংগীত, ভজন, হামদ, নাত, মর্সিয়া ইত্যাদি ভক্তিমূলক গান, মুসলিম জাগরণী গান, বৃন্দ গান, বাউল গান, শিশুতোষ গান, হোরী, নারীদের ওপর রচিত গান, কাব্যসংগীত (আধুনিক), দেশাত্মবোধক গান, রাগ প্রধান, ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের গান রচনা করে তিনি বাংলার সংগীত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর স্মৃতি শক্তি ও বাকশক্তি হারান। বাংলাদেশ সরকার এর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ কবিকে ১৯৭২ সালে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, নাগরিকত্ব প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক 'ডি-লিট' উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলা ১৩৮৩ সালের ১২ ভাদ্র ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
বাংলাগানের পঞ্চভাস্করদের (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলাম) মধ্যে অন্যতম দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্ম গ্রহণ করেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবার যেমন বাংলা সাহিত্য-সংগীত চর্চার ক্ষেত্রে কোলকাতায় উল্লেখযোগ্য নাম তেমনি কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে রায় পরিবার। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কয়েক পুরুষ পূর্ব থেকেই সাহিত্য সংগীত চর্চায় ব্রতী ছিল কৃষ্ণনগরের রায় পরিবার। শোনা যায় কৃষ্ণনগরের রাজা মহারাজ কৃষ্ণ চন্দ্র রায়ের সাহিত্য সভার সভাসদ ছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পূর্বপুরুষ। তাঁর পিতা দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্র রায় ছিলেন তৎকালীন সময়ের প্রসিদ্ধ খেয়াল গায়ক। বড়ো ভাইদের মধ্যে জ্ঞানেন্দ্রলাল রায় ছিলেন স্বনামখ্যাত সাহিত্যিক এবং বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক। রাজেন্দ্রলাল রায় ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে সুপণ্ডিত। রাজেন্দ্রলাল রায় এবং জ্ঞানেন্দ্রলাল রায় মিলে নবপ্রভা নামের একটি পত্রিকা সম্পাদন করতেন।
ছেলেবেলায় পারিবারিক পরিবেশে সংগীতে প্রাথমিক শিক্ষা পান দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। তিনি ১৮৭৮ সালে এন্ট্রান্স এবং ১৮৮০ সালে এফএ পাশ করে হুগলী কলেজে ভর্তি হন। ১৮৮২ সালে হুগলী কলেজ থেকে বিএ এবং ১৮৮৪ সালে কোলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাশ করেন। একই বছর দ্বিজেন্দ্রলাল রায় কৃষিবিদ্যা বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিলেত যান। বিলেত বাসকালে দ্বিজেন্দ্রলাল পাশ্চাত্যসংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরেই তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মুঙ্গেরে যোগদান করেন। প্রখ্যাত টপখেয়াল গায়ক সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার তখন মুঙ্গেরে বাস করছেন। টপ্পা বিশেষ অলংকারধর্ম এক ধরনের সংগীত শৈলী। টপ্পার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অলংকার সহযোগে গীত খেয়াল গানকে টপ-খেয়াল বলা হয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সুরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছে টপখেয়ালের তালিম গ্রহণ করেন।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর ওজস্বী, ব্যঞ্জণাধর্মী সুর, টপ্পার অলংকার, জমজমা (পাশাপাশি দুটি স্বরের আন্দোলনধর্মী অলংকার) এবং পাশ্চাত্য সুরধর্মী চলন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ই বাংলা গানে প্রথম শাস্ত্রীয়সংগীত এবং পাশ্চাত্য সংগীতের যথার্থ মেলবন্ধন (Fusion) ঘটিয়ে নতুন মাত্রা দান করেন। সেই সময় এই বিশেষ ধরনের সুরকে DL Roy এর সুর বলা হতো।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় দেশাত্ববোধক, প্রেমসংগীত, ভক্তিগীতি এবং নাট্যসংগীত ইত্যাদি বিচিত্র ধারার গান রচনা করেন। তাঁর সময়ে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। হাসির গানের জন্য তিনি তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, ইংরেজ শাসন, এবং ইংরেজ তোষামোদী বাঙালি সমাজ নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ ছিল এই গানের প্রধান বিষয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ১৯১৩ সালের ১৭ মে মৃত্যুবরণ করেন।

রজনীকান্ত সেন
বাংলাগানের ধারায় কান্তকবি বলে খ্যাত রজনীকান্ত সেন ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে সিরাজগঞ্জ জেলার ভাঙাবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলার সহজ সুমধুর লোকসুর ও রামপ্রসাদী সুর রজনীকান্তের গানের সুরবৈশিষ্ট্য আর বাণীর ভাবের ক্ষেত্রে তা প্রধানত ভঙ্গিবাদী। স্রষ্টার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সুমধুর ভক্তিগীতি রচয়িতা হিসেবে তিনি বাংলাসংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী আসন লাভ করেন। পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ছিলেন সরকারি আইন কর্মকর্তা।
মুন্সেফ এবং সাব জজ হিসেবে তিনি ঢাকা, বরিশাল, পাবনা, মেদিনীপুর, কাটোয়া বিভিন্ন জেলায় চাকরি করেছেন। রজনীকান্ত সেনের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জেলা শহরে।
রজনীকান্তের সংগীত সমগ্রকে প্রধান তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ভঙ্গিরসাত্বক, হাস্যরসাত্বক ও স্বদেশি সংগীত। আইন ব্যবসায়ী (উকিল) রজনীকান্ত সেন রাজশাহীতে থাকার সময় পরিচিতি হন সেখানে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাথে। দ্বিজেন্দ্রলালের হাসির গানে অনুপ্রাণিত হয়ে রজনীকান্ত বেশকিছু হাসির গান রচনা করেন। তবে উল্লেখ্য সদা বিনয়ী এবং আত্মসমর্পিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী রজনীকান্তের হাসির গান দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানের মতো তীব্র ব্যাঙ্গাত্মক নয় বরং হাস্য ও রম্য প্রধান।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র বাংলার সাহিত্য, সংগীত-সাংস্কৃতিক অঙ্গন উত্তাল হয়ে ওঠে। রজনীকান্ত সেন রচনা করেন তাঁর কালজয়ী গান। 'মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়, মাথায় তুলে নে-রে ভাই' এই গান তাঁকে রাতারাতি চূড়ান্ত খ্যাতি এনে দেয়। রজনীকান্ত সেন ১৯১০ সালে গলায় কর্কট (ক্যান্সার) রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

অতুলপ্রসাদ সেন
আধুনিক বাংলাগানের সমৃদ্ধিতে যে ক'জন বাঙালি গীতিকার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম অতুলপ্রসাদ সেন। বাংলাগানে তিনি যোগ করেন ঠুমরি এবং পারস্যের গজল অঙ্গের সুর। অতুলপ্রসাদ সেন ১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা রামপ্রসাদ সেন পেশায় ডাক্তার হলেও তিনি সংগীতানুরাগী ছিলেন। ছেলেবেলায় পিতার মৃত্যু হলে অতুলপ্রসাদ সেন মাতামহ বাহাদুর কালী নারায়ণ গুপ্তের আশ্রয়ে লালিত হন। মাতামহ কালী নারায়ণ গুপ্ত নিজে ছিলেন সংগীতানুরাগী সৌখিন গায়ক ও ভক্তিগীতি রচয়িতা। এমনি সংগীতময় পরিবেশে অতুলপ্রসাদ সেনের ছেলেবেলা কাটে। ১৮৯০ সালে এন্ট্রান্স পাশ করে অতুলপ্রসাদ কোলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন সমাপ্ত না করেই একই বছর অতুলপ্রসাদ সেন ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেত যান। বিলেত থেকে ফিরে তিনি প্রথম কোলকাতা এবং পরে লক্ষ্ণৌতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। বন্ধুবৎসল অতুলপ্রসাদ সেন খুব অল্প দিনেই লক্ষ্ণৌতে লোকপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। লক্ষ্ণৌতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গলী ক্লাব, সম্পাদনা করেন 'উত্তরা' পত্রিকা।
অতুলপ্রসাদ বাংলাগানে আনেন লক্ষ্ণৌ এর ঠুমরি গানের চাল ও পারস্য গজলের ধরণ, মেলবন্ধন করেন শাস্ত্রীয়সংগীতের খেয়াল, ঠুমরি আর বাংলার লোকসংগীতের। বাণী ও কাব্যভাবের দিক থেকে তাঁর গানকে মানবপ্রেম, প্রকৃতি, ভক্তি, স্বদেশ এই চার ভাগে ভাগ করা যায়। তাঁর প্রেমের গানে প্রধানত প্রকাশ পেয়েছে বিরহের দুঃখবোধ, না পাওয়ার বেদনা। প্রকৃতির গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রকৃতি, নিসর্গের রূপবর্ণন। ভক্তিগীতিতে অতুলপ্রসাদ পিতা রামপ্রসাদ সেন ও মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তের মতো সমর্পিত ঈশ্বর ভক্তির অনুগামী। অতুলপ্রসাদের স্বদেশি গান সমকালীন অন্যান্য কবিদের মতো বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উৎসারিত। তবে এই গান কালের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তির সংগ্রামে। অতুলপ্রসাদ সেন ১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।

Content added By

বাদ্যযন্ত্র পরিচিতি (তৃতীয় পরিচ্ছেদ)

662

গান এবং নাচের জন্য ছন্দ, মাত্রা ও তাল প্রদর্শন করতে বাদ্যের ভূমিকা অপরিহার্য। প্রকৃতির যে উপাদানগুলো বিশেষভাবে ধ্বনি ও সুর উৎপাদন করতে পারে তাকে বাদ্য বলে। সুর উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক উপাদানের বৈশিষ্ট্য অনুসারে বাদ্যকে প্রধানত চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তাহলো ততবাদ্য, আনদ্ধবাদ্য, শুষিরবাদ্য ও ঘনবাদ্য।
ততবাদ্য (Chordophones) তার জাতীয় বাদ্য। তার বা সুতা টান করে বেঁধে তাতে টোকা বা ঘষা অথবা আঘাত করে বাজানো হয়। একতারা, বেহালা, দোতারা, সারিন্দা, সেতার, গিটার এই শ্রেণির বাদ্য।
আনদ্ধ বা অবনদ্ধ বাদ্য (Membranophones) মূলত চামড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। বিভিন্ন প্রাণীর চামড়া কোনো গোলাকার কাঠ কিংবা ধাতব পাত্রে টানটান করে বেঁধে সেখানে লাঠি, হাত কিংবা আঙুলের টোকা বা আঘাত করে বাজানো হয়। ঢোল, তবলা, ডমরু, মৃদঙ্গ, মাদল, ডক্ষ, দামামা এই শ্রেণিভুক্ত।
শুষির বাদ্য (Aerophones) বলতে বাতাসবাহিত বাদ্য বোঝায়, যা মুখে ফুঁ দিয়ে বা বাতাসে চাপ সৃষ্টি করে শব্দ করা হয়। যেমন বাঁশি, হারমোনিয়াম, শঙ্খ, সানাই ইত্যাদি।
ঘনবাদ্য (Ediophones) বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যেমন লোহা, কাঁসা, কাঠ, পাথর, লাউয়ের খোল, বেল বা নারিকেলের মালা, বাঁশ, নল, পাতা, মাটি, পিতল ইত্যাদি দিয়ে বানানো হয়। মন্দিরা, জাইলোফোন, জুড়ি, খঞ্জনি এই গোত্রের।
যে সকল বাদ্য এককভাবে বাজানো যায়, তাঁকে স্বয়ংসিদ্ধ বাদ্য বলে, যেমন পিয়ানো, সেতার, সরোদ প্রভৃতি। আবার যে বাদ্য কেবল গান বা অন্য বাদ্যের সঙ্গে আনুগত্য রেখে সঙ্গত করা হয় তাকে অনুগতসিদ্ধ বাদ্য বলে, যেমন তানপুরা, মৃদঙ্গ প্রভৃতি; কণ্ঠসংগীতের সঙ্গেও এগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
সামাজিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন পূজা, বিবাহ, মুহররমের শোভাযাত্রা, লাঠিখেলা, কুস্তির আখড়ায় ঢোল ঢাক বাজানোর রীতি আছে। পাহাড়পুর-ময়নামতীর পোড়ামাটির চিত্রে কাঁসর, করতাল, ঢাক, বীণা, মৃদঙ্গ, বাঁশি, মৃৎভান্ড প্রভৃতি বাদ্যের খোদাই করা নকশা দেখা যায়। কোনো জাতির জন্য তাদের নিজ বাদ্য পরিচয়ের গুরুত্ব অশেষ।

একতারা
একতারা তত গোত্রীয় লোকজ বাদ্যযন্ত্র। একতারা তৈরি করতে একটি লাউয়ের খোল, একটি বাঁশের দণ্ড, কাঠের বয়লা ও একটি তার প্রয়োজন। বাদ্যযন্ত্রটির নির্মাণ পদ্ধতি সহজ। গোলাকৃতির লাউয়ের খোলের উপরিভাগ বৃত্তাকারে কাটা হয়। একটি সরু তিন ফুট লম্বা বাঁশের দণ্ডের এক প্রান্তের গিটকে অটুট রেখে এবং বাঁশের মধ্যাংশ চিরে সেটিকে লম্বা চিমটা আকারে লাউয়ের খোলের উভয় দিকে তার বা সুতা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। লাউয়ের খোলের তলা কেটে চামড়ার ছাউনি দেওয়া হয় এবং এই ছাউনির ভিতর দিয়ে লোহার তার ঢুকিয়ে তারের অন্য প্রান্ত বাঁশের মাথায় কানের সাথে যুক্ত করা হয়। ডান হাতের তর্জনী বা মধ্যমা আঙ্গুলে মিজরাব লাগিয়ে একতারা বাজাতে হয়। বাউল গানের সঙ্গে একতারা যন্ত্র বেশি ব্যবহৃত হয় ।

১। লাউয়ের খোল
২। বাঁশের দণ্ড
৩। কাঠের বয়লা
৪। পিতল বা লোহার তার
৫। চামড়ার ছাউনি

দোতারা
দোতারা তত জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। দোতারা কাঠের তৈরি। প্রায় আড়াই ফুট লম্বা ও আধা ফুট চওড়া এক খণ্ড কাঠ খুদে দোতারা তৈরি করা হয়।

১। কান বা বয়লা
২। তারগহন
৩। তার
৪। চামড়ার ছাউনি
৫। খোল
৬। সোয়ারি বা ব্রিজ
৭। লেংগুট বা টেলপিস

কাঠের খোদানো বুকে একটি ইস্পাতের পটরী আবদ্ধ থাকে। কাষ্ঠখণ্ডের বুকের নিচের গোলাকার অংশকে খোল বলে। খোলের ওপর একটি চামড়ার ছাউনি লাগানো হয়। খোলের শেষ প্রান্তে একটি লেংগুট আটকানো হয়। ছাউনির ওপর সোয়ারি থাকে। তারগহনের ওপরের দিকে চারটি কাঠের বয়লা লাগানো থাকে। এই চারটি বয়লা থেকে চারটি তার সোয়ারি হয়ে লেংগুটের সাথে আটকানো থাকে। বর্তমানে একটি পঞ্চম তারও দোতারায় ব্যবহৃত হয়। দোতারা জওয়া দিয়ে বাজানো হয়। বাঁ হাতে পটরির ওপর তার চেপে ডান হাতে জওয়া দিয়ে আঘাত করে দোতারা বাজানোর নিয়ম। ভাওয়াইয়া গানে দোতারা একটি অপরিহার্য বাদ্যযন্ত্র। সেই কারণে ভাওয়াইয়া গানকে দোতারার গানও বলা হয়।

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...