দারিদ্র্য দূরীকরণে ফাদার ইয়াং-এর ভূমিকা (পাঠ ৪)

সপ্তম শ্রেণি (মাধ্যমিক) - খ্রীষ্টধর্ম শিক্ষা - ফাদার চার্লস যোসেফ ইয়াং | NCTB BOOK
117

ফাদার ইয়াং এদেশের মাটি ও মানুষকে ভীষণ ভালোবেসে ফেললেন। এদেশের দরিদ্র মানুষের কান্না ফাদার ইয়াং-এর হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। কারণ দরিদ্র ও কষ্টভোগী মানুষের মাঝেই তিনি খ্রীষ্টকে দেখতেন। মানুষের সেবার মধ্য দিয়েই খ্রীষ্টকে সেবা করার ব্রত নিয়েছিলেন তিনি। তাই মানুষকে কীভাবে দরিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা যায় তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকলেন। তবে তিনি খুবই নীতিবান মানুষ ছিলেন। তাঁর গভীর বিশ্বাস ছিল যে, ভিক্ষা দিয়ে মানুষের দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। মানুষকে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সাহায্য করার মধ্য দিয়েই তাদের প্রকৃত সাহায্য করা হয়। তাই তিনি এদেশের মানুষের দারিদ্রতা দূর করার জন্য বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

(ক) ধর্মপল্লি পর্যায়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রচেষ্টা: ফাদার চার্লস যোসেফ ইয়াং বর্তমান ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বাঐবাদা (মরিয়মনগর), বিড়ইডাকুনী, বারমারী, রাণীখং ইত্যাদি অঞ্চলে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি সেখানে মানুষকে সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ঐসব অঞ্চলের দরিদ্র জনগণের জন্য ধানব্যাংক পরিচালনা করেছেন। ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দে ঐসব অঞ্চলের অসহায় মানুষদের ওপর হয়রানি, নির্যাতন ও লুটপাট চালানো হয়েছিল। তিনি সেগুলোর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। অসীম সাহস ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তিনি দরিদ্র মানুষকে নিজ নিজ বাসস্থানে শান্তিতে বসবাস করতে সহযোগিতা করেছেন। তিনি তাদের অভাব মোকাবেলা করার জন্য কৃষিজীবী মানুষকে ফসলের বীজ, গৃহপালিত পশু ও আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন। এভাবে তিনি অভাবী মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন।

(খ) কারিতাস প্রতিষ্ঠা: বর্তমান কারিতাস বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠার বহু পূর্বে ফাদার ইয়াং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কারিতাস শুরু করেছিলেন। এই কারিতাস ছিল রোমের আন্তর্জাতিক কারিতাসের অধীনে। ফাদার ইয়াং পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ধর্মপল্লিতে কারিতাসের যাত্রা বিস্তৃত করছিলেন। এ-সময়ের কারিতাস ধর্মপল্লি পর্যায়ে সীমিত আকারে মাত্র গুটিকয়েক প্রকল্প পরিচালনা করত। রোম থেকে কিছু আর্থিক মঞ্জুরি দেওয়া হতো। রোমের আর্থিক সাহায্যের আশায় না থেকে ধর্মপল্লির স্থানীয় জনগণকেও আর্থিক সহযোগিতা প্রদানে অনুপ্রাণিত করা হতো। এই তহবিলের অর্থ প্রধানত ব্যবহার করা হতো কষ্টকর বা দুর্যোগমূলক পরিস্থিতি ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে।

(গ) কোর প্রতিষ্ঠায় ফাদার ইয়াং-এর অবদান: ১৯৭০ খ্রীষ্টব্দের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ঘটেছিল এক প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাস। এর ফলে অগণিত মানুষ মারা গিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ স্বজনহারা, গৃহহারা ও ফসলহারা হয়েছিল। বহু বছর পর এই সময় ফাদার ইয়াং ছুটি কাটাতে নিজ দেশে গিয়েছিলেন।

এক মাস ছুটি কাটাতে না কাটাতেই বিশপ গাঙ্গুলি তাঁকে এক জরুরি তারবার্তা পাঠিয়ে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের সংবাদ দিলেন ও অতি সত্বর ফিরে এসে ত্রাণকার্যে যোগ দিতে বললেন। তিনি অনতিবিলম্বে ফিরে আসেন। এসেই অসহায় মানুষের সাহায্যে নিবেদিত হয়ে পড়েন। চট্টগ্রাম ধর্মপ্রদেশের বিশপ যোয়াকিম রোজারিও, সিএসসি ও ফাদার বেঞ্জামিন লাবে, সিএসসি-র সাথে একাত্ম হয়ে তিনি 'কোর' নামক ত্রাণ ও পুনর্বাসন সংস্থা স্থাপন করেন ও ত্রাণকাজ শুরু করেন। এই ক্ষতির রেশ শেষ না-হতেই ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ মানুষের কল্যাণে ও পূর্ণগঠন কাজে ফাদার ইয়াং কোরের পরিচালক ও অন্য কর্মীদের সাথে এক হয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এই কোর পরে কারিতাস বাংলাদেশ নাম নিয়ে অদ্যাবধি বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে দীনদরিদ্র মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।

(ঘ) এনএফপি প্রতিষ্ঠায় ফাদার ইয়ং: কর্মপাগল বিচক্ষণ পরিকল্পনাকারী ফাদার ইয়াং বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানে নিবেদিত হয়ে কাজ করেছেন। তিনি প্রাকৃতিক পরিবার পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে জনসংখ্যাকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। পুরো কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে ফাদার ইয়াংকে সহযোগিতা করেছেন সিস্টার ইমেল্ডা এসএমআরএ। ১৯৮৩ খ্রীষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে এনএফপির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে কারিতাস এটি বাংলাদেশ-এর একটি প্রকল্প। কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড ন্যাচারাল 'ফ্যামিলি প্ল্যানিং' দেশের মানুষের উপকারে কাজ করছে। পরিকল্পিত পরিবার গঠন করে মানুষ তার দরিদ্রতা দূর করবে-স্বর্গীয় ফাদার ইয়াং এই স্বপ্নই দেখেছিলেন।

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...