বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষির পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার লাভ করেছে। দেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কিছু শিল্প কারখানা, রেল ও সড়ক ব্যবস্থা প্রভৃতি রয়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশে গার্মেন্টস শিল্প বিকাশ লাভ করেছে, যা অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। শ্রমজীবী মানুষের জীবনে অসমতা না ঘুচলেও তাদের জীবনেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। অর্থনৈতিক উন্নতি ছাড়া কোনো দেশ ও জাতি টিকে থাকতে পারে না। দেশ থেকে বেকারত্ব, দারিদ্র্য দূর করতে পারলে দেশের জনগণও উন্নত জীবনযাপন করতে পারবে। এই অধ্যায়ের পাঠগুলোতে আমরা সেই বিষয়ে জানতে পারব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক জীবনধারা বর্ণনা করতে পারব;
গ্রাম ও শহরের অর্থনৈতিক কাজ বর্ণনা করতে পারব;
শহর ও গ্রামের অর্থনীতির তুলনা করতে পারব;
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রধান খাতের বর্ণনা করতে পারব;
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারব;
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করতে পারব;
বাংলাদেশের জনসংখ্যা কীভাবে সম্পদ হতে পারে তা ব্যাখ্যা করতে পারব;
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কার্যাবলি সম্পর্কে সচেতন হব এবং নিজেকে দক্ষ সম্পদে পরিণত করতে উদ্বুদ্ধ হব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
হিরন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওবায়দুল সাহেব ইউনিয়নের বেকার যুবকদের স্থানীয় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে: প্রশিক্ষণের পরামর্শ দিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি তাদের ঋণের ব্যবস্থা করে দেন। গৃহীত ঋণ নিয়ে কেউ মাছের খামার, কেউ মুরগির খামার, কেউ কুটির শিল্প, কেউবা গবাদি পশুর খামার করে।
একদিন আসিফ তার মায়ের সাথে শপিংয়ে যায়। সে'লক্ষ করে, মার্কেটে চীনের দ্রব্যে সয়লাব। আসিফ তার মাকে জিজ্ঞেস করে, মা এর কারণ কী? মা উত্তরে বলেন, চীনে শুধু জনসংখ্যা বেশি নয়, ওদের জনশক্তিও অনেক দক্ষ। ফলে চীন শিল্পে উন্নত এবং ওদের উৎপাদিত দ্রব্যের চাহিদা বিশ্ববাজারে অনেক বেশি।
কোনো সমাজ বা জনগোষ্ঠী সাধারণত যে ধরনের অর্থনৈতিক কাজ করে জীবনধারণ করে তাকেই ঐ সমাজ বা জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক জীবনধারা বলে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। জমিতে চাষ করে তারা শস্য উৎপাদন করে। তা দিয়ে নিজেদের খাদ্যের চাহিদা মেটায়। উৎপাদিত ফসলের একটা অংশ তারা বাজারে বিক্রি করে সেই অর্থে সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটায়। বাড়তি শস্য উৎপাদন করে তারা দেশবাসীর খাদ্যের জোগান দেয়। এভাবে তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। একইভাবে শহরাঞ্চলের শ্রমিক, শিল্পপতি, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক জীবনধারাও শিল্প কিংবা ব্যবসাকেন্দ্রিক।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। গ্রামের অধিকাংশ লোক কৃষিজীবী। কৃষিই তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। এমনকি যাদের নিজস্ব জমি নেই তারাও অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। অর্থাৎ দেশের কয়েক কোটি মানুষ তাদের জীবিকার জন্য সরাসরি কৃষির উপর নির্ভরশীল। সে কারণে বাংলাদেশকে কৃষিনির্ভর দেশ বলা হয়।
কৃষিকাজ ছাড়াও গ্রামের মানুষের একটা অংশ জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, ছুতার, মুদি হিসেবে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। কিছু কিছু লোক গ্রামের হাট-বাজার বা কাছাকাছি শহরে-গঞ্জে ছোটোখাটো ব্যবসা করে। এদের সবাইকে নিয়েই বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রয়েছে।
বর্তমানে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং সার, কীটনাশক ও উচ্চফলনশীল বীজের প্রয়োগ হচ্ছে। এর ফলে ফসলের উৎপাদনই শুধু বাড়েনি, গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও তা নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। সাথে তৈরি জ করেছে পরিবেশ ঝুঁকি, গ্রামের মানুষের শিক্ষা স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক জীবনযাত্রার উপর এর প্রভাব পড়েছে।

কুমার মাটির পাতিল তৈরি করছে

জেলে জাল দিয়ে মাছ ধরছে

তাঁতি কাপড় বুনছে
গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্ব -
আমাদের দেশের মোট খাদ্য চাহিদার বড়ো অংশ আসে কৃষি থেকে। আর গ্রামের মানুষই এর উৎপাদক। দেশে শিল্পের কাঁচামালের অন্যতম উৎসও হচ্ছে গ্রামীণ কৃষিখাত। অর্থাৎ দেশের শিল্প-বাণিজ্য ও জনগণের কর্মসংস্থানের বিষয়টি অনেকাংশে গ্রামীণ অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি এখনও আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের শহুরে অর্থনীতি
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ত্রিশ শতাংশ শহরাঞ্চলে বাস করে। রাজধানী ঢাকা, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম, শিল্প শহর নারায়ণগঞ্জ ও খুলনায় বাস করে বিপুল সংখ্যক মানুষ। এসব শহর ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরে বসবাসকারী মানুষ সাধারণত অফিস-আদালত ও শিল্প- কারখানায় চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, যানবাহন চালনা, নানা ধরনের দিনমজুরি ও বাসাবাড়িতে সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা ধনী তারা নগরীর অভিজাত এলাকায় বাস করে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজস্ব বা ভাড়া বাসায় থাকে। এছাড়া বিশালসংখ্যক মানুষ বস্তি এলাকায় বাস করে। বড় বড় শহরগুলোতে ভাসমান মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তারা অস্থায়ীভাবে ফুটপাত, পার্ক, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট ইত্যাদিতে রাত কাটায়। বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকেও কোনো না কোনো জীবিকা অবলম্বন করতে হয়। শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমিক, দিনমজুর, বস্তিবাসী সবাই মিলেই শহরের অর্থনৈতিক জীবনকে সচল রাখে।

শহুরে অর্থনীতির গুরুত্ব
শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে আজ বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের মানুষের জীবনধারার পার্থক্য কিছুটা কমে আসছে। বাড়ছে গ্রাম ও শহরের একে অপরের উপর নির্ভরশীলতা। লেখাপড়া, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, ইত্যাদির জন্য গ্রামের মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শহরের উপর নির্ভরশীল। নগর জীবনের বিস্তার, শিল্পায়ন ও কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে প্রতিদিন বহুলোক শহরে আসে। তাছাড়া উঠতি বড়লোকরা সবাই শহরেই থাকে ফলে মোট উৎপাদনে শহরে অর্থনীতির ভূমিকা অনেক। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে শহুরে জনগণের ভূমিকা দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
| কাজ: বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের অর্থনৈতিক কাজের গুরুত্ব চিহ্নিত কর। |
পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমাদের অর্থনীতিরও প্রধান খাতগুলো হলো কৃষি, শিল্প, ব্যবসা- বাণিজ্য ও সেবাখাত। তবে এছাড়াও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ একটা বড়ো ভূমিকা রাখে।
ক. কৃষি: প্রাচীনকাল থেকেই এদেশের অর্থনীতিতে কৃষি মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানেও এদেশের বেশিরভাগ মানুষ জীবিকার জন্য কৃষির উপর নির্ভরশীল। ধান, পাট, চা, ডাল, রবিশস্য, শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন; বনজ সম্পদ, পশুপালন ও মৎস্যচাষকে কৃষিখাতের মধ্যে ধরা হয়। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান প্রায় ২০ শতাংশ।
খ. শিল্প: কারখানায় উৎপাদিত সামগ্রী, বিদ্যুৎ, গ্যাস, খনিজসম্পদ, দালানকোঠা বা অবকাঠামো নির্মাণ এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য শিল্পসামগ্রী হলো পাট ও চামড়াজাত দ্রব্য, সুতা ও কাপড়। এছাড়া রয়েছে কাগজের কল, তৈরি পোশাক শিল্প, আসবাবপত্র তৈরির কারখানা, চিনি কল ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যশিল্প, পেট্রোল ও রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন শিল্প, ঔষধ শিল্প ইত্যাদি।
গ. ব্যবসা-বাণিজ্য: অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যও আমাদের অর্থনীতির একটি প্রধান খাত। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বলতে দেশের ভিতরে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে জিনিসপত্র কেনাবেচাকে বোঝায়। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে আমরা যেমন কিছু পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করি, তেমনি যেসব পণ্য আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপন্ন হয় তার একটি অংশ বিদেশে রপ্তানিও করি। এভাবে রপ্তানিকৃত পণ্য থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
ঘ. সেবাখাত: যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে সেবাখাত একটি বড়ো ভূমিকা পালন করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, পরিবহন বা যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাংক-বিমা, জনপ্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এগুলো হলো সেবাখাতের উদাহরণ। সরকারি ও বেসরকারি উভয় উদ্যোগেই এই খাতটি পরিচালিত হয়। যে দেশ যত উন্নত এবং জনগণের কল্যাণকে যত বেশি গুরুত্ব দেয়, সেখানে এই সেবাখাতটি ততই শক্তিশালী।
ঙ. প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ বিরাট ভূমিকা রাখে। তবে তাদের জন্য সরকারী সুযোগ-সুবিধা ততটা না থাকলেও তারা দেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। আধুনিক রাষ্ট্রে কৃষি, শিল্প, ব্যবসা ও সেবা এই খাতগুলোর কোনোটির গুরুত্ব অ অন্যটির চেয়ে চেয়ে কম নয়। কৃষিখাত দেশের মানুষের খাদ্য-চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি শিল্পের জন্য কাঁচামাল সরবরাহ করে। শিল্পখাত খাদ্য, বস্ত্র, ঔষধ, আবাসন প্রভৃতির চাহিদা মেটানো ছাড়াও নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। ব্যবসা খাত অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য-সামগ্রীকে সহজলভ্য করার পাশাপাশি বিদেশ থেকে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে। সেবাখাত দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নতির জন্য কাজ করে।
| কাজ ১: বাংলাদেশের সেবাখাতের একটি তালিকা তৈরি কর। কাজ - ২: দলে ভাগ হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের গুরুত্ব তুলে ধর। |
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। স্বাধীনতার পর অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট উন্নতি করেছি। কিন্তু পথিবীর অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেরও উন্নয়নের পথে কতগুলো বাধা বা সমস্যা রয়েছে। যেমন- সুশাসন ও গণতন্ত্রের অভাব, দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও শিক্ষার অভাব। অন্যদিকে উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের চমৎকার সম্ভাবনাও আছে। যার মধ্যে প্রধান হলো আমাদের বিরাট জনশক্তি ও উর্বর ভূমি। আমাদের সমস্যাগুলোকে ঠিকভাবে চিনে তা সমাধান করতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের সম্ভাবনাগুলোকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। আমরা অনেক ভাগ্যবান যে আমাদের মাটি, পানি ও বিরাট জনশক্তি উন্নয়নের পথে একটি বড়ো সহায়। আমাদের দেশের মানুষ পরিশ্রমী। আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকেরা বিদেশের মাটিতে তার প্রমাণ দিচ্ছে। গার্মেন্টস বা পোশাক-শিল্পে বাংলাদেশ যে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে তাও উন্নয়নের পথে আমাদের উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে তুলে ধরছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ
ক. জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা
জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে তার জন্য দরকার শিক্ষা ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। বিশাল জনসংখ্যার দেশ আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের শিক্ষার হার কম। শিক্ষায় সরকারের বরাদ্দও অপ্রতুল। শিক্ষার অভাবে আমাদের দেশের অনেক মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম। দেশের মানুষকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে আমরা তাদের জীবনমান বৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নয়নের ব্যাপারে আগ্রহী ও সচেতন করে তুলতে পারি। সেই সঙ্গে উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের বিরাট জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে পারি।
খ. কৃষির উন্নতি
গ্রামপ্রধান বাংলাদেশে কৃষি এখনও উন্নয়নের প্রধান খাত। আধুনিক যন্ত্রপাতি, বীজ, সার ও কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার, প্রাকৃতিক কৃষি এবং সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের দ্বারা আমরা আমাদের কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ আরও বাড়াতে পারি। এতে আমাদের গ্রামের মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে, পরিবেশ দূষণ কমবে ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
গ. প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার
গ্যাস, তেল প্রভৃতি যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ এখনও অব্যবহৃত রয়েছে সেগুলো মধ্যে পরিবেশের কথা মাথায় রেখে বিকল্পভাবে সম্পদ ব্যবহার করতে হবে। কয়লা উত্তোলন করে বায়ু ও সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প না টেকসই উন্নয়নের কথা ভাবতে হবে যা আগামীর জন্য দরকারী।
ঘ. শিল্পের প্রসার
গার্মেন্টস, ঔষধ, সিমেন্ট, সিরামিকসহ দেশের সম্ভাবনাময় শিল্পখাতকে সম্প্রসারণ করতে হবে। যাতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য আমরা আরও অধিক পরিমাণে বিদেশে রপ্তানি করতে পারি। তাতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ বাড়বে ও অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
ঙ. অবকাঠামো নির্মাণ
সড়ক, সেতু, রেলপথ এবং পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি বা সম্প্রসারণ করতে হবে। তা না হলে শিল্প বা কৃষি, বাণিজ্য বা সেবা কোনো ক্ষেত্রেই একটি দেশ উন্নতি করতে পারে না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের শর্ত হিসেবে এই অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টিকে তাই আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। তবে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা মাথায় বেখে অবকাঠামো নির্মাণের পন্থা বের করতে বিজ্ঞানের নতুন উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে হবে।
চ. পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন
যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দরকার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার হবে সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। যারা পরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন ও যারা তা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবেন তাদের সবাইকে এ ব্যাপারে দেশের স্বার্থ ও প্রকৃতির সুরক্ষার কথাকেই সবার উপরে স্থান দিতে হবে।
| কাজ: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত কর। |
মানবসম্পদ
অদক্ষ মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজের কোনো কাজে আসে না। অন্যদিকে দক্ষ মানুষ যেমন ব্যক্তিগতভাবে সফল হয়, তেমনি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকেও গতিশীল করতে পারে। দক্ষ মানুষ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়। পক্ষান্তরে অদক্ষ মানুষ গণ্য হয় রাষ্ট্রের বোঝা হিসেবে। দক্ষ মানুষকেই মানবসম্পদ বলা হয়। যেমন- বিশ্বব্যাংকের তথ্য (২০২৩) মতে চীন দেশে ১৪১ কোটি ৭ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ বাস করে। যাদের প্রত্যেকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে চীনের প্রতিটি মানুষ জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছে। চীনারা দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ায় চীনের অর্থনীতি দ্রুত উন্নতি লাভ করছে।
জনসমষ্টিকে মানবসম্পদে পরিণত করার উপায়
মানুষকে মানবসম্পদে পরিণত করার উপায়গুলো নিম্নে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:
ক. মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান,
খ. উন্নত স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান,
গ. ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি,
ঘ. উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকাশে সহায়তা,
ঙ. প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন ও প্রয়োগে সহায়তাদান,
চ. পেশাগত প্রশিক্ষণ দান ও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা প্রদান,
ছ. উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে প্রশিক্ষণ প্রদান,
জ. উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে মূলধন খাটানোর কৌশল শিক্ষাদান।
রাষ্ট্র যদি তার জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করার দর্শন গ্রহণ করাতে পারে তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা করা সম্ভব। ফলে দেশের শতভাগ মানুষ দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে। আর শতভাগ দক্ষ জনশক্তি নিয়ে কোনো দেশ দরিদ্র থাকতে পারে না। সেই দেশের উন্নতি অবশ্যম্ভাবী।
Read more