ঈশ্বরগুপ্তকে বলা হয় যুগসন্ধিক্ষণের কবি। একদিকে মধ্যযুগের শেষ, অপরদিকে আধুনিক যুগের শুরু; ঠিক এমনই সময় বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ প্রতিভার জন্ম ও বিকাশ। তাঁর প্রতিভা সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, 'এত বড়ো প্রতিভা ইয়ার্কিতেই ফুরাইলো'। ঈশ্বরগুপ্তের একটি বিখ্যাত পত্তি ছিল এমন; 'কতরূপ স্নেহ করি/স্বদেশের কুকুর ধরি/ বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।'
স্বদেশ এবং স্বজনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিভীষণ প্রকৃতপক্ষে বিদেশি ঠাকুর তথা পরের মতোই গর্হিত কাজ করেছেন।
'বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ' কবিতায় রাম-রাবণের যুদ্ধে বিভীষণ শত্রু রামের পক্ষ অবলম্বন করেন। তিনি ভ্রাতুষ্পুত্র মেঘনাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে শত্রু লক্ষ্মণের হাতে তুলে দেন। বিভীষণ তাঁর দেশ, জাতি, গোত্র সবকিছু ভুলে গিয়ে রামের আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেই পথ দেখিয়ে লক্ষ্মণকে লঙ্কাতে নিয়ে আসেন মেঘনাদকে হত্যা করার জন্য। তার এই ভূমিকা বিরূপ পরজনের মতোই।
উদ্দীপকে বিদেশের ঠাকুরের চেয়ে স্বদেশের কুকুরকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কবি মনে করেন, নিজ দেশের মানুষ গুণহীন হলেও বিদেশের গুণবান ব্যক্তির চেয়ে শ্রেয়তর। উদ্দীপকের কবির কাছে তাই স্বদেশের কুকুরও একান্ত আপন কেননা, তা স্বদেশের। পক্ষান্তরে, 'বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ' কবিতায় বিভীষণ ধর্মরক্ষার অজুহাতে স্বগোত্রের কথা ভুলে শত্রুর পক্ষাবলম্বনের মতো গর্হিত কাজ করেন।
'বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ' কবিতায় বিভীষণ যদিও ধর্ম রক্ষার্থে রামের পক্ষ নিয়েছেন বলে মত দিয়েছেন, কিন্তু যুক্তিবাদী ও স্বদেশপ্রেমে উজ্জীবিত মেঘনাদ তা মানেনি। কেননা, রাম যতই ধার্মিক হোন, তিনি দেশের নন, বিদেশের। মেঘনাদের মতে, দেশ অপেক্ষা কোনোকিছুই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। তাছাড়া স্বজনদের ত্যাগ করে শত্রুপক্ষ অবলম্বন করা মূলত দেশদ্রোহিতারই শামিল। তা সত্ত্বেও জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব ত্যাগ করে বিভীষণ নিজ মাতৃভূমির সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। রামের পক্ষ অবলম্বন করে তিনি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিদেশের ঠাকুর তথা পরের ন্যায় আচরণ করলেন এবং নিজ মাতৃভূমিকেই বিপদাপন্ন করে তুললেন। তাই এ কথা বলা যায়, উদ্দীপকের ঠাকুর চরিত্রের মাঝে 'বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ' কবিতার বিভীষণ চরিত্রের প্রতিফলন ঘটেছে।
“এতক্ষণে”- অরিন্দম কহিলা বিষাদে-
“জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল
রক্ষঃপুরে! হায়, তাত, উচিত কি তব
এ কাজ, নিকষা সতী তোমার জননী,
সহোদর রক্ষঃশ্রেষ্ঠ? শূলিশম্ভুনিভ
কুম্ভকর্ণ? ভ্রাতৃপুত্র বাসববিজয়ী!
নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?
কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরু জন তুমি
পিতৃতুল্য। ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।”
উত্তরিলা বিভীষণ, “বৃথা এ সাধনা,
ধীমান্! রাঘবদাস আমি; কী প্রকারে
তাঁহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে
অনুরোধ?” উত্তরিলা কাতরে রাবণি;-
“হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে!
রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে
আনিলে এ কথা, তাত, কহ তা দাসেরে !
স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে;
পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি
ধূলায়? হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে
কে তুমি? জনম তব কোন মহাকুলে?
কে বা সে অধম রাম? স্বচ্ছ সরোবরে
করে কেলি রাজহংস পঙ্কজ-কাননে;
যায় কি সে কভু, প্ৰভু, পঙ্কিল সলিলে,
শৈবালদলের ধাম? মৃগেন্দ্র কেশরী,
কবে, হে বীরকেশরী, সম্ভাষে শৃগালে
মিত্রভাবে? অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,
অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে ।
ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষ্মণ; নহিলে
অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?
কহ, মহারথী, এ কি মহারথীপ্রথা ?
নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে
এ কথা! ছাড়হ পথ; আসিব ফিরিয়া
এখনি! দেখিব আজি, কোন্ দেববলে,
বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি!
দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ,
রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের! কী দেখি
ডরিবে এ দাস হেন দুর্বল মানবে?
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রগভে পশিল
দম্ভী; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে ।
তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে
বনবাসী! হে বিধাতঃ, নন্দন-কাননে
ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্ৰফুল্ল কমলে
কীটবাস? কহ তাত, সহিব কেমনে
হেন অপমান আমি,— ভ্রাতৃ-পুত্র তব?
তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে?”
মহামন্ত্র-বলে যথা নম্রশিরঃ ফণী,
মলিনবদন লাজে, উত্তরিলা রথী
রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে;
“নহি দোষী আমি, বৎস; বৃথা ভর্ৎস মোরে
তুমি! নিজ কর্ম-দোষে, হায়, মজাইলা
এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি!
বিরত সতত পাপে দেবকুল; এবে
পাপপূর্ণ লঙ্কাপুরী; প্রলয়ে যেমতি
বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কালসলিলে !
রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী
তেঁই আমি । পরদোষে কে চাহে মজিতে?”
রুষিলা বাসবত্রাস। গম্ভীরে যেমতি
নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্ৰ কোপি,
কহিলা বীরেন্দ্র বলী,—“ধর্মপথগামী,
হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে
তুমি; – কোন্ ধর্ম মতে, কহ দাসে, শুনি,
জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি,—এ সকলে দিলা
জলাঞ্জলি? শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি
পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি
নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা!
এ শিক্ষা, হে রক্ষোবর, কোথায় শিখিলে?
কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা! হেন সহবাসে,
হে পিতৃব্য, বর্বরতা কেন না শিখিবে ?
গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি।”
[নির্বাচিত অংশ]
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?