পৃথিবীর সপ্তাশ্চার্যগুলোর মধ্যে চীনের প্রাচীর বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রাচীনকালে মঙ্গোলিয়ার যাযাবর দস্যুরা চীনের বিভিন্ন অংশে আক্রমণ করতো এবং লুটতরাজ চালাতো। ফলে দস্যুদের হাত থেকে চীনকে রক্ষা করার জন্য সম্রাট কিং সি হুয়াং এ প্রাচীর নির্মাণ করেন। পাশাপাশি সীমান্তের দুর্গগুলো সংস্কার করে দক্ষ সামরিক নেতাদের সেখানে নিয়োগ করেন। এভাবে সম্রাট সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চীনকে বৈদেশিক শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেন।
আলাউদ্দিন খলজির শাসনামলে দিল্লি সালতানাতে প্রায় সাত বার মোঙ্গল আক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। তাই মোঙ্গলদের প্রতিহতকরণে তিনি কতিপয় কার্যকর মোঙ্গলনীতি গ্রহণ করেন। আলাউদ্দিন খলজি মোঙ্গলদের মোকাবিলায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সাথে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মোঙ্গলদের আক্রমণ পথে তিনি পুরাতন কেল্লা সংস্কার ও নতুন কেল্লা স্থাপন করে সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন। তিনি উন্নতমানের অস্ত্রের জন্য কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব বিশ্বস্তদের ওপর ন্যস্ত করেন। এছাড়া তিনি মোজঙ্গলদেরকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত সৈন্য সংগ্রহ করেন। এভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে তিনি মোঙ্গল আক্রমণ মোকাবিলায় সাফল্য লাভকরেন। তার রাজত্বকালে মোঙ্গলরা আর ভারত আক্রমণে সাহস করেনি।
উদ্দীপকে শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের সঙ্গে দিল্লির সালতানাতের মহিলা শাসক সুলতান রাজিয়ার সাদৃশ্য রয়েছে।
পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা চিরকালই অবহেলিত হয়ে আসছে। এই অবহেলার মাঝেও নারীরা স্বীয় যোগ্যতাবলে সমাজের উন্নয়নে অংশীদার হয়েছে। নানা বাধার সম্মুখীন হয়েও তারা সফল হয়েছে; সকল সমালোচনার উচিত জবাব দিয়েছে। উদ্দীপকের শ্রীমাভো বন্দরনায়েক এবং সুলতান রাজিয়া এমনই দুজন নারী ব্যক্তিত্ব। শ্রীমাভো বন্দরনায়েক ছিলেন আধুনিক বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বিভিন্ন দেশের কিছু অভিজাত শ্রেণির সমালোচনার মুখোমুখি হন। তারা নারী বলে শ্রীমাভো বন্দরনায়েককে শাসনকার্যে অনুপযোগী ও অদক্ষ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু নিজ মেধা, তেজস্বিতা আর কর্মদক্ষতার গুণে শ্রীমাভো সকল বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি প্রতিহত করে দেশের উন্নতি সাধন করেন। সুলতান রাজিয়াও একইভাবে ১২৩৬ থেকে ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লির সিংহাসনে বসে সুলতানি শাসন পরিচালনা করেন। তার ৪ বছরের রাজত্বকাল মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ প্রতিহত করেন। তিনি উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম মহিলা শাসনকর্তা। তার সাহসিকতা, দক্ষতা ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব তুর্কি জাতির সাহসিকতা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে। তার উদার রাজনৈতিক চিন্তাধারা বস্তুত মুসলিম শাসনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। সুতরাং দেখা যায় উদ্দীপকের শ্রীমাভো বন্দরনায়েক এবং সুলতান রাজিয়া শাসন পরিচালনার দিক দিয়ে একে অন্যের প্রতিরূপ।
ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে সুলতান রাজিয়া ছিলেন দিল্লির সিংহাসনে আরোহণকারী প্রথম ও একমাত্র মহিলা।
সালতানাতের এক সংকটকালে সুলতান রাজিয়া সিংহাসনে আরোহণ করেন। ঐতিহাসিক মিনহাজ-উস-সিরাজের হিসেব মতে, তিনি ৩ বছর ৬ মাস ৬ দিন রাজত্ব করেন। তিনি ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং অসাধারণ প্রতিভাশালী একজন নারী। প্রচলিত মুদ্রায় তিনি নিজেকে উমদাদ-উল-নিসওয়ান (নারীদের মধ্যে বিশিষ্ট) বলে উল্লেখ করেন। মিনহাজ-উস-সিরাজ তাকে মহান নৃপতি, বিচক্ষণ, ন্যায়পরায়ণ ও মহানুভব বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি একজন সার্বভৌম নৃপতির প্রয়োজনীয় গুণাবলি ও - যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এ. বি. এম. হবিবুল্লাহর মতে, সাহসিকতা ও অদম্য দৃঢ়তাই (Courage and unflincing determination) ছিল রাজিয়ার আদর্শ। চারিত্রিক দৃঢ়তায় সুলতান রাজিয়া নিজেকে পুরুষ অপেক্ষা যোগ্যতর প্রমাণ করেন। ব্যক্তিগত দৃঢ়তা ও যোগ্যতাই তার ক্ষমতা ও অস্তিত্বের চাবিকাঠি ছিল। সুলতান রাজিয়া প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিগত শক্তি-সামর্থ্য প্রমাণের লক্ষ্যেই মহিলা পোশাক পরিত্যাগ করেন, অশ্বারোহণে জনসমক্ষে বের হন এবং প্রকাশ্যে দরবার পরিচালনা করেন। অধ্যাপক কে. এ. নিজামী যথার্থই বলেছেন, "অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে, তিনি ছিলেন ইলতুৎমিশের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যোগ্যতম।" পরিশেষে বলা যায় যে, সুলতান রাজিয়া ছিলেন অপরিসীম কৃতিত্বের অধিকারী।
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন এবং মোজাল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের গৃহীত নিষ্ঠুর ও কঠোর পদক্ষেপই 'রক্তপাত ও কঠোর নীতি' (Blood and Iron policy) নামে পরিচিত। সিংহাসনে আরোহণ করেই বলবন নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল আমির-ওমরাহ ও অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান ঔদ্ধত্য, দ্বন্দ্ব-কলহ ও ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ, দিল্লির সন্নিকটস্থ মেওয়াটি দস্যুদের উপদ্রব, উপর্যুপরি মোঙ্গল আক্রমণ প্রভৃতি। এসব সমস্যা সাম্রাজ্যের ভিতকে হুমকির সম্মুখীন করে তোলে। তাই নিজের ক্ষমতা সুসংহত করে সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি গুপ্তচর প্রথা চালু, বিচার ব্যবস্থার পুনর্গঠন, মোঙ্গল নীতি প্রভৃতি বিষয়ে কঠোর ও নিষ্ঠুর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এগুলোই বলবনের 'রক্তপাত ও কঠোর নীতি' হিসেবে স্বীকৃত।