রাষ্ট্রের উন্নতি নাগরিকের যোগ্যতা ও দক্ষতার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। সুনাগরিক দেশের জন্য হবে সম্পদ। আর তা না হলে দেশের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। দেশের প্রগতি ও ব্যর্থতা উভয়ই নির্ভর করে নাগরিকের সততা, দক্ষতা এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের উপর। এজন্য নাগরিকদের হতে হবে সুনাগরিক। বর্তমান অধ্যায়ে সুনাগরিকের প্রয়োজনীয় গুণাবলি, এর প্রতিবন্ধকতা, গুরুত্ব ইত্যাদি দিক সম্পর্কে আমরা জানব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
সুনাগরিকের গুণাবলি বর্ণনা করতে পারব;
বাংলাদেশে সুনাগরিক হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো বর্ণনা করতে পারব এবং প্রতিবন্ধকতাগুলো দূরীকরণের উপায় ব্যাখ্যা করতে পারব;
বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সুনাগরিকের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব;
নাগরিকের অধিকার অর্জন ও দায়িত্ব পালন সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব।
সাম্প্রদায়িকতা সুনাগরিকত্ব অর্জনের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে।
সাম্প্রদায়িকতার কারণে দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক সময় বিভেদ ও অশান্তি বিরাজ করে। এতে পারস্পরিক সম্প্রীতি নষ্ট হয় এবং সমাজে সংকীর্ণ ও বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতার উদ্ভব হয়। এর চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে বিভিন্ন ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা ও হানাহানি সংঘটিত হয়। এ জন্যই সুনাগরিক হওয়ার পথে অন্যতম অন্তরায় হিসেবে সাম্প্রদায়িকতাকে চিহ্নিত করা হয়।
উদ্দীপকের রিকশাওয়ালার মাঝে সুনাগরিকের 'আত্মসংযম' গুণটি প্রকাশ পেয়েছে।
আত্মসংযম হচ্ছে নাগরিকের এমন গুণ, যা তাকে বিভিন্ন অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে। এ গুণ ব্যক্তিকে দেশ এবং সমাজের স্বার্থে কাজ করতে ও নিয়ম মেনে চলতে অনুপ্রাণিত করে। আত্মসংযমী নাগরিক রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন মেনে চলে, অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করে, দেশের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের চেয়ে বড়ো করে দেখে এবং অন্যায় কাজ ও দলীয় স্বার্থপরতা থেকে বিরত থাকে, মোট কথা একজন সুনাগরিক তার আত্মসংযমের কারণেই সব ধরনের খারাপ কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়।
উদ্দীপকের দুই বান্ধবীর কথোপকথন থেকে জানা যায়, একজন রিকশাওয়ালা তার রিকশায় ওঠা জনৈক যাত্রীর এক লক্ষ টাকার একটি ব্যাগ পেয়েও নেননি, বরং ঠিকানা খুঁজে টাকাটা যাত্রীকে ফেরত দিয়েছেন। এখানে রিকশাওয়ালার মধ্যে আত্মসংযম কাজ করায় তিনি টাকা আত্মসাৎ করেননি। এ গুণের কারণেই তিনি অনৈতিক কাজ থেকে দূরে থেকেছেন এবং নিজেকে সুনাগরিক হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
আমার মতে সুনাগরিক হতে হলে রিকশাওয়ালার উক্ত গুণ তথা 'আত্মসংযম' যথেষ্ট নয়।
সুনাগরিকের তিনটি মৌলিক গুণ থাকা জরুরি। যথা- বুদ্ধি, আত্মসংযম এবং বিবেক। একজন ব্যক্তিকে সুনাগরিক হতে হলে এই তিনটি গুণেরই অধিকারী হতে হবে। কেননা একজন আত্মসংযমী ব্যক্তির পাশাপাশি বুদ্ধিমান ও বিবেকবোধসম্পন্ন নাগরিকও যেকোনো রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ।
একজন আত্মসংযমী নাগরিক যেমন অসৎ কাজ থেকে বিরত থেকে দেশ এবং জাতির উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করেন, ঠিক তেমনি বুদ্ধিমান ব্যক্তি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। অন্যদিকে বিবেকবান নাগরিক রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকার ভোগের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি যথাযথভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন এবং ন্যায়ের পক্ষে থাকেন। উদ্দীপকের রিকশাওয়ালা একজন আত্মসংযমী নাগরিক। এ কারণেই তিনি অন্যের টাকা আত্মসাৎ করেননি। তবে তার মধ্যে নাগরিকের মৌলিক গুণাবলির কেবল একটি গুণ লক্ষ করা যায়।
সামগ্রিক আলোচনার পরিয়মাপ্তিতে বলা যায়, সুনাগরিক হতে হলে আত্মসংযমী হওয়ার পাশাপাশি বুদ্ধিমান ও বিবেকবান হওয়া জরুরি।
সুনাগরিক হওয়ার ক্ষেত্রে নির্লিপ্ততা অন্যতম বাধা হিসেবে কাজ করে।
কাজের প্রতি নাগরিকদের উদাসীনতাকে নির্লিপ্ততা বলে। বিভিন্ন কারণে নাগরিকদের মধ্যে নির্লিপ্ততা তৈরি হয়। যেমন-নিরক্ষরতা, উপযুক্ত শিক্ষার অভাব, অলসতা, দারিদ্র্য ও কাজে অনীহা। এর কারণে নাগরিক রাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করতে চায় না। এমনকি নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্যও পালন করে না।