Academy

ছোটোগল্পের আরম্ভ ও উপসংহার নাটকীয় হওয়া চাই। সত্য কথা বলিতে কি, কোথায় আরম্ভ করিতে হইবে এবং কোথায় সমাপ্তির রেখা টানিতে হইবে, এই শিল্পদৃষ্টি যাহার নাই, তাহার পক্ষে ছোটোগল্প লেখা লাঞ্ছনা বই কিছুই নহে।

Created: 3 months ago | Updated: 3 months ago
Updated: 3 months ago

বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন

১। যশের জন্য লিখিবেন না। তাহা হইলে যশও হইবে না, লেখাও ভালো হইবে না। লেখা ভালো হইলে যশ আপনি আসিবে।
২। টাকার জন্য লিখিবেন না। ইউরোপে এখন অনেক লোক টাকার জন্যই লেখে এবং টাকাও পায়; লেখাও ভালো হয়। কিন্তু আমাদের এখনও সে দিন হয় নাই। এখন অর্থের উদ্দেশ্যে লিখিতে গেলে, লোকরঞ্জন-প্রবৃত্তি প্রবল হইয়া পড়ে। এখন আমাদিগের দেশের সাধারণ পাঠকের রুচি ও শিক্ষা বিবেচনা করিয়া লোকরঞ্জন করিতে গেলে রচনা বিকৃত ও অনিষ্টকর হইয়া উঠে ।
৩। যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন। যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্যে লেখেন, তাঁহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে।
৪। যাহা অসত্য, ধর্মবিরুদ্ধ; পরনিন্দা বা পরপীড়ন বা স্বার্থসাধন যাহার উদ্দেশ্য, সে সকল প্রবন্ধ কখনও হিতকর হইতে পারে না, সুতরাং তাহা একেবারে পরিহার্য। সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য । অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী-ধারণ মহাপাপ ।
৫। যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না। কিছু কাল ফেলিয়া রাখিবেন। কিছু কাল পরে উহা সংশোধন করিবেন। তাহা হইলে দেখিবেন, প্রবন্ধে অনেক দোষ আছে। কাব্য নাটক উপন্যাস দুই এক বৎসর ফেলিয়া
রাখিয়া তারপর সংশোধন করিলে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে। যাঁহারা সাময়িক সাহিত্যের কার্যে ব্রতী, তাঁহাদের পক্ষে এই নিয়ম রক্ষাটি ঘটিয়া উঠে না। এজন্য সাময়িক সাহিত্য, লেখকের পক্ষে অবনতিকর।
৬। যে বিষয়ে যাহার অধিকার নাই, সে বিষয়ে তাহার হস্তক্ষেপ অকর্তব্য। এটি সোজা কথা কিন্তু সাময়িক সাহিত্যতে এ নিয়মটি রক্ষিত হয় না। ৭ । বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করিবেন না। বিদ্যা থাকিলে, তাহা আপনিই প্রকাশ পায়, চেষ্টা করিতে হয় না। বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা পাঠকের অতিশয় বিরক্তিকর এবং রচনার পরিপাট্যের বিশেষ হানিজনক। এখনকার প্রবন্ধে
ইংরাজি, সংস্কৃত, ফরাসি, জার্মান কোটেশন বড় বেশি দেখিতে পাই। যে ভাষা আপনি জানেন না, পরের গ্রন্থের
সাহায্যে সে ভাষা হইতে কদাচ উদ্ধৃত করিবেন না ।
৮। অলংকার-প্রয়োগ বা রসিকতার জন্য চেষ্টিত হইবেন না। স্থানে স্থানে অলংকার বা ব্যঙ্গের প্রয়োজন হয় বটে; লেখকের ভাণ্ডারে এ সামগ্রী থাকিলে, প্রয়োজন মতে আপনিই আসিয়া পৌঁছিবে- ভাণ্ডারে না থাকিলে মাথা কুটিলেও আসিবে না। অসময়ে বা শূন্য ভাণ্ডারে অলংকার প্রয়োগের বা রসিকতার চেষ্টার মতো কদর্য আর কিছুই নাই ৷
৯। যে স্থানে অলংকার বা ব্যঙ্গ বড় সুন্দর বলিয়া বোধ হইবে, সেই স্থানটি কাটিয়া দিবে, এটি প্রাচীন বিধি। আমি সে কথা বলি না। কিন্তু আমার পরামর্শ এই যে, সে স্থানটি বন্ধুবর্গকে পুনঃ পুনঃ পড়িয়া শুনাইবে। যদি ভালো না হইয়া থাকে, তবে দুই চারি বার পড়িলে লেখকের নিজেরই আর উহা ভালো লাগিবে না-বন্ধুবর্গের নিকট পড়িতে লজ্জা করিবে। তখন উহা কাটিয়া দিবে।
১০। সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা। যিনি সোজা কথায় আপনার মনের ভাব সহজে পাঠককে বুঝাইতে পারেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক। কেন না লেখার উদ্দেশ্য পাঠককে বুঝানো ।
১১। কাহারও অনুকরণ করিও না । অনুকরণে দোষগুলি অনুকৃত হয়, গুণগুলি হয় না। অমুক ইংরাজি বা সংস্কৃত বা বাঙ্গালা লেখক এইরূপ লিখিয়াছেন, আমিও এরূপ লিখিব, এ কথা কদাপি মনে স্থান দিও না ।
১২। যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহা লিখিও না। প্রমাণগুলি সংযুক্ত করা সকল সময়ে প্রয়োজন হয় না, কিন্তু হাতে থাকা চাই ।
১৩। বাঙ্গালা সাহিত্য, বাঙ্গালার ভরসা। এই নিয়মগুলি বাঙ্গালার লেখকদিগের দ্বারা রক্ষিত হইলে, বাঙ্গালা সাহিত্যের উন্নতি বেগে হইতে থাকিবে।

Content added By

Related Question

View More

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য হলো সত্য ও ধর্ম।

আলোচ্য উক্তির মাধ্যমে লেখক বুঝিয়েছেন, ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা বা অন্যের অনিষ্ট সাধনের উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ চরম গর্হিত কাজ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য মানবতার মঙ্গল সাধন অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি। লেখার মাধ্যমে যদি সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা হয়, তবে তা সার্থক হয়। অন্যদিকে যে লেখায় কেবল নিজের স্বার্থ প্রাধান্য পায়, যাতে মিথ্যা প্রশ্রয় দেওয়া হয়, যে লেখা মানুষের পীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তাই সৎ মনোভাব ছাড়া লেখনী ধারণকে লেখক মহাপাপ বলে উল্লেখ করেছেন।

উদ্দীপকের কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য সাধনায় 'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধে প্রকাশিত মানবকল্যাণে আত্মনিবেদনের বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন দেখা যায়।

'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' রচনায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য রচনার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। লেখকের মতে, খ্যাতি বা অর্থলাভ সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য নয়। মানুষের কল্যাণ বা সৌন্দর্য সৃষ্টিই লেখকের মূল অভিপ্রায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। লেখকদের প্রতি তাই তাঁর নিবেদন, যে লেখায় মানুষের অনিষ্ট হয় তা পরিত্যাগ করে মানবমজাল নিশ্চিত করে এমন সাহিত্য রচনায় ব্রতী হওয়া উচিত।
উদ্দীপকে বাংলা সাহিত্যের মহান শিল্পী কাজী নজরুল ইসলামের কথা বলা হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সংকটকালে তিনি মানবমুক্তির গান নিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভূত হয়েছিলেন। মানুষের শোষণ-বঞ্চনা, ক্ষুধা-দারিদ্র্যের যন্ত্রণা তাঁর লেখনীতে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। শ্রেণি-বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নের কথাই নজরুলের সাহিত্যে মুখ্য হয়ে ওঠে। মানবহিতৈষী মনোভাব নিয়ে সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হওয়ার আহ্বান আলোচ্য প্রবন্ধেও বিদ্যমান। প্রবন্ধের লেখকের মতে, এটিই সাহিত্য রচনার আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এ বৈশিষ্ট্যই কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

সাহিত্যের মধ্য দিয়ে সত্য ও সুন্দরের চর্চা অব্যাহত রাখার বিবেচনায় উদ্দীপকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নিবেদন যথার্থভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে অবশ্য পালনীয় কিছু পরামর্শ প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য যশ বা অর্থ লাভ নয় বরং মানবকল্যাণ। লেখকগণের উচিত লোকরঞ্জন পরিত্যাগ করে সত্য প্রকাশে অসংকোচ হওয়া। বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ ও জনকল্যাণমুখী করার জন্য বঙ্কিমচন্দ্রের এ পরামর্শ অমূল্য।

আলোচ্য উদ্দীপকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখক সত্তার পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। শোষণ-বঞ্চনা, দারিদ্র্য, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা- এ সবই তিনি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। নিজের সাহিত্যে তিনি এ সমস্ত অন্ধকারের অবসান কামনা করেছেন। মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন সৌহার্দপূর্ণ সমাজ গড়াই ছিল নজরুলের লক্ষ্য। আলোচ্য প্রবন্ধের মূলসুরও তাই।
লেখক মাত্রই সত্য ও সুন্দরের পূজারি। মানবমুক্তির গভীরতম অনুভূতি লেখকের জাদুকরী শব্দমালায় আমাদের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে। সমাজের অসাম্য, অন্যায়, অরাজকতা লক্ষ করেও যে চুপ থাকে বা অন্যায়কারীদের তোষণ করে সে প্রকৃত লেখক নয়। প্রকৃত লেখক কখনোই সত্য প্রকাশে পিছপা হন না। তাঁর সত্য ভাষণেই মানবমুক্তির দুয়ার উন্মোচিত হয়। আলোচ্য উদ্দীপকে বর্ণিত কৰি কাজী নজরুলের লেখার মাঝে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বেজেছিল প্রবল বিদ্রোহের সুর। মানবকল্যাণের শাশ্বত ও সুন্দর বাণীই ছিল তাঁর লেখার মূল হাতিয়ার। এই হাতিয়ারকে জীবনপথের পাথেয় করার নিবেদনই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আলোচ্য প্রবন্ধে করেছেন। রচনায় মানবমঙ্গলকেই সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণের নিবেদন জানিয়েছেন তিনি, যার প্রতিফলন উদ্দীপকে স্পষ্টরূপেই ফুটে উঠেছে।

সাহিত্যে অলংকার বা ব্যঙ্গ যথাযথভাবে ব্যবহার করা প্রসঙ্গে লেখক আলোচ্য কথাটি বলেছেন।
'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধে লেখক নতুন লেখকদের আদর্শ লেখক হওয়ায় করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। মূলত নতুনদের যথাযথ অলংকার বা ব্যক্তা ব্যবহারের প্রতি আলোকপাত করেছেন লেখক। কেননা লেখার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নানাবিধ অলংকার। ব্যঙ্গ সেসবের মধ্যে অন্যতম। এসব অলংকার ব্যবহার যথার্থভাবে করতে না পারলে এবং তা বারবার পড়লে যদি বেখাপ্পা মনে
হয়, তখন তা কেটে দেওয়া উচিত বলে লেখক মনে করেন। প্রশ্নোক্ত বক্তব্যে সে কথাই বলা হয়েছে।

Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...