পৃথিবীর আবর্তনের ফলে সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি। আহ্নিক গতির জন্য পৃথিবী নিজ অক্ষের উপর সর্বদা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরছে। পৃথিবীর এ আবর্তনের জন্য সমুদ্রের উপরিভাগের তরল পানি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত 'ক' স্রোত দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতকে নির্দেশ করে। বেঙ্গুয়েলা স্রোত যখন নিরক্ষরেখার দক্ষিণ দিক দিয়ে সোজা পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয় তখন তাকে দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত বলে। দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ুর প্রভাবে এ স্রোতের গতিবেগ বৃদ্ধি পায়। মহাসাগরের সবচেয়ে উষ্ণতম অঞ্চলের উপর দিকে প্রবাহিত হয় বলে এটি একটি উষ্ণ স্রোত। এ স্রোতটি আটলান্টিক মহাসাগর অতিক্রম করে দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূলে এসে সেন্টরকে অন্তরীপে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং দুটি শাখায় বিভক্ত হয়। প্রথম ও প্রধান শাখাটি দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূল দিয়ে ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রবেশ করে এবং পরে মেক্সিকো উপসাগরে পৌছে উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতে পরিণত হয়। দ্বিতীয় শাখাটি দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূল' দিয়ে প্রবাহিত হয়।
উদ্দীপকে শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের কথা বলা হয়েছে। যার দুটি স্রোত বিপরীত ধর্মী। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। উত্তর মহাসাগর হতে আগত সুমেরু শীতল স্রোত দুটি গ্রীনল্যান্ডের পূর্ব ও পশ্চিম পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে ল্যাব্রাডর উপদ্বীপের নিকট মিলিত হয়। এ মিলিত স্রোত শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত নামে পরিচিত। এ শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে নিউফাউন্ডল্যান্ডের নিকট দুটি শাখায় বিভক্ত হয়। এর একটি শাখা উপসাগরীয় স্রোতের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে এবং অপর শাখাটি উপসাগরীয় স্রোতের পশ্চিম পাশ দিয়ে উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূল বেয়ে দক্ষিণ দিকে চলে যায়। উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের নীল পানি উত্তর-পূর্ব দিকে এবং তার পাশ দিয়ে শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের সবুজ পানি দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। এ দুটি বিপরীত স্রোত পরস্পর বিপরীত দিকে প্রবাহিত হওয়ার সম্ভব তাদের স্রোতের সীমারেখা সুস্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। এ দুটি স্রোতের মধ্যবর্তী সীমারেখাকে হিমপ্রাচীর বলে l
উত্তর মহাসাগর হতে ল্যাব্রাডর স্রোতের সাথে অনেক হিমশৈল ভেসে আসে। উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের সংস্পর্শে ঐ সব হিমশৈল গলে যায়। এর ফলে হিমশৈলের সাথে বাহিত কাদা, বালি প্রভৃতি সমুদ্রতলে সঞ্চিত হয়ে বৃহৎ মগ্নচড়ার সৃষ্টি করে। নিউফাউল্যান্ডের নিকটবর্তী গ্র্যান্ড ব্রাঙ্ক এরূপে সৃষ্টি হয়েছে। উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের ওপর দিকে প্রবাহিত বায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র হয়। অন্যদিকে ল্যাব্রাডর স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু শুষ্ক ও শীতল হয়। এ বিপরীতধর্মী দুই বায়ুর সংমিশ্রণে এ অঞ্চলে প্রায়ই কুয়াশা ও ঝড়-তুফান লেগে থাকে।
চন্দ্রের আকর্ষণে পানি ফুলে ওঠাকে মুখ্য জোয়ার বলে। চন্দ্র এক স্থানে স্থির থাকে না। তা পৃথিবীর চারদিকে সর্বদা ঘুরছে। আবর্তনকালে পৃথিবীর যে অংশ চন্দ্রের নিকবর্তী হয়, সেখানে চন্দ্রের আকর্ষণ সর্বাপেক্ষা বেশি হয়। এ আকর্ষণে চারদিক হতে পানি এসে চন্দ্রের দিকে ফুলে ওঠে এবং জোয়ার হয়। এরূপে সৃষ্ট জোয়ারকে মুখ্য জোয়ার বা প্রত্যক্ষ জোয়ার বলা হয়।
সময়ের পরিবর্তনে পানি স্তরের উঠনামার কারণ হলো জোয়ারভাটা। মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী মহাকাশে বিভিন্ন গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র প্রভৃতি প্রতিটি জ্যোতিষ্ক পরস্পরকে আকর্ষণ করে। তাই এর প্রভাবে সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। কিন্তু পৃথিবীর উপর সূর্য অপেক্ষা চাঁদের আকর্ষণ বল বেশি হয়। কারণ সূর্যের ভর অপেক্ষা চাঁদের ভর অনেক কম হলেও চাঁদ সূর্য অপেক্ষা পৃথিবীর অনেক নিকটে অবস্থিত। তাই সমুদ্রের পানি তরল বলে চাঁদের আকর্ষণেই প্রধানত সমুদ্রের জল ফুলে ওঠে ও জোয়ার হয়। এরপর তা ৬ ঘণ্টা ১৩ মিনিট স্থির থেকে দ্রুতগতিতে নেমে যায় যা ভাটা নামে পরিচিত। উদ্দীপকে উল্লিখিত মহাসাগরের পানিও একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিবর্তনে পানি ভরের উঠানামা করে যা জোয়ারভাটার সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায়। সুতরাং উদ্দীপকের ঘটনাটির কারণ হলো জোয়ারভাটা।