আকাইদ' আরবি শব্দ। এটি বহুবচন। এর অর্থ হলো বিশ্বাসমালা। এর একবচন হলো 'আকিদাহ' (الْعَقِيْدَةُ), যার অর্থ বিশ্বাস। ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের প্রতি বিশ্বাসকেই 'আকাইদ' বলা হয়। যেমন: আল্লাহ, নবি-রাসুল, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, আখিরাত, তকদির, পুনরুত্থান ইত্যাদির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
আকাইদের ধারণা বর্ণনা করতে পারব।
তাওহিদের (একত্ববাদ) ধারণা, তাৎপর্য ও তাওহিদে বিশ্বাসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
অর্থসহ কালিমা তায়্যিবা ও কালিমা শাহাদাত শুদ্ধ উচ্চারণে পড়তে, বলতে ও ব্যাখ্যা করতে পারব।
ইমান মুজমাল (ইমানের সংক্ষিপ্ত পরিচয়) অর্থসহ শুদ্ধ উচ্চারণে পড়তে, বলতে ও ব্যাখ্যা করতে পারব।
আল্লাহর কতিপয় গুণবাচক নামের অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারব।
রিসালাতের ধারণা ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব।
আখিরাতের ধারণা, বিশ্বাসের গুরুত্ব ও পর্যায়সমূহ ব্যাখ্যা করতে পারব।
নৈতিকতা উন্নয়নে 'আকাইদ'-এর গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে পারব।
রিসালাত বলতে নবি রাসুলগণ যে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেসব দায়িত্বকে বোঝায়। রিসালাত শব্দের অর্থ বার্তা, খবর, চিঠি, সংবাদবহন প্রভৃতি। আল্লাহ তায়ালা নবি-রাসুলগণকে অনেক দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন। যেমন, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, সত্য দীন প্রচার করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলা ইত্যাদি। নবি রাসুলগণের এসব দায়িত্বকেই রিসালাত বলা হয়।
মামার নিকট মেজবাহর প্রশ্নটি আকাইদের তাওহিদ বিষয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও রিযিকদাতা। তিনি ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। তিনিই হলেন একমাত্র ইলাহ। আল্লাহর প্রতি এরূপ বিশ্বাসকে তাওহিদ বলে।
মেজবাই তার মামার সাথে সুন্দরবন বেড়াতে যায়। সুন্দরবনের গাছগাছালি ও সমুদ্রতীরের মনোরম দৃশ্যাবলি তাকে মুগ্ধ করে। সে অবাক হয়ে তার মামার কাছে জানতে চায়- এসব কিছুর স্রষ্টা কে? জবাবে মামা তাকে বলেন, এসবকিছুর স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা। কারণ সুন্দরবনের গাছগাছালি কোনো মানুষ রোপণ করেনি। সাগর সৃষ্টি করাও মানুষের কাজ নয়। এগুলো প্রকৃতিরও সৃষ্টি নয়। বরং এসব কিছু আল্লাহ তায়ালা মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি যখন কোনোকিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন তিনি বলেন, 'কুন' (হয়ে যাও) তাৎক্ষণিকভাবে হয়ে যায়। আর এগুলো লালন পালনও তিনি করেন। যদি এসব কিছু সৃষ্টি ও লালন-পালনে একাধিক স্রষ্টা থাকত তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ রাজত্ব নিয়ে পৃথক হয়ে যেত। অথবা রাজত্ব পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। এ থেকে বোঝা যায়, স্রষ্টা একজন যা – তাওহিদকে প্রকাশ করে।
সুতরাং বলা যায়, মেজবাহর প্রশ্নটি আকাইদের তাওহিদ বিষয়ের বিষয়ের সাথে সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মেজবাহর প্রশ্নের জবাবে তার মামা বলেছিল, এ পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র এবং গাছগাছালি, জলপ্রপাত, সমুদ্রের জলরাশি সবই একজনের সৃষ্টি। মেজবাহর মামার এ উত্তরটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত।
বস্তুত আল্লাহ তায়ালাই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্তা। মহাজগতের নিয়ম-শৃঙ্খলা তাঁরই দান। আর পশুপাখি, গাছপালাসহ সবকিছুর-নিয়ন্ত্রকও তিনি। তিনিই সবকিছু করেন। বরং তিনি যা ইচ্ছা করেন তা-ই হয়। এসব কিছুতে যদি একের বেশি নিয়ন্তা থাকত, তবে নানারকম বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন-
অর্থ : 'যদি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে, আল্লাহ ব্যতীত বহু ইলাহ থাকত, তবে উভয়েই ধ্বংস হয়ে যেত।' (সূরা আল-আম্বিয়া: ২২)
একটু চিন্তা করলেই আমরা বিষয়টি বুঝতে পারব। যেমন মহাজগতের সৃষ্টিকর্তা ও বিধানদাতা যদি একাধিক হতেন, তাহলে মহাজগৎ এত সুশৃঙ্খলভাবে চলত না। একজন স্রষ্টা চাইতেন সূর্য পূর্বদিকে উঠুক। আরেকজন চাইতেন পশ্চিম দিকে। আবার অন্যজন দক্ষিণ বা উত্তর দিকে সূর্যকে উদিত করতে চাইতেন। ফলে এক চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিত।
এমনিভাবে আম গাছে আম না হয়ে কোনো কোনো সময় কাঁঠাল, জাম ইত্যাদিও হতে পারত। এতে আমরা বেশ অসুবিধায় পড়তাম। বস্তুত একাধিক স্রষ্টা বা নিয়ন্ত্রক থাকলে বিশ্বজগতের সুন্দর সুশৃঙ্খল অবস্থা বিনষ্ট হয়ে যেত। আল-কুরআনের অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন-
অর্থ : 'আর তাঁর (আল্লাহর) সাথে কোনো ইলাহ নেই। যদি তা থাকত, তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করত।' (সূরা আল-মুমিনুন : ৯১)
উল্লিখিত আলোচনা হতে এটাই প্রমাণিত হয়, সব কিছুর স্রষ্টা ও নিয়ন্তা হলেন মহান আল্লাহ তায়ালা। এজন্য মেজবাহর মামার উত্তরটি সঠিক ও যৌক্তিক।
নৈতিকতা বলতে সুনীতির অনুশীলন করাকে বোঝায়, অর্থাৎ কথা ও কাজে উত্তম রীতিনীতির অনুশীলন করা, মার্জিত ও বিনয়ী হওয়া, উত্তম চরিত্রবান হওয়া ইত্যাদি। এর পাশাপাশি অন্যায় কাজ, অশ্লীল ও অশালীন কাজ, পাপাচার প্রভৃতি অসৎ চরিত্র পরিত্যাগ করাও নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত।