জামিরা কলেজের একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ভূগোল বিষয়ের ছাত্রছাত্রীরা দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে শিক্ষা সফরে গেল। সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও চিরসবুজ বনভূমি দেখে তারা অভিভূত হলো। ভূগোল বিষয়ের শিক্ষক বললেন এটি বাংলাদেশের একটি বিশেষ ধরনের বনভূমি। এই বনভূমির কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা আমাদের স্রোতজ এলাকার বনভূমি থেকে আলাদা।
' অঞ্চলে বিশেষ ধরনের যে বনভূমি সৃষ্টি হয়েছে, তা হলো সুন্দরবন বা স্রোতজ বনভূমি।
সুন্দরবন সৃষ্টির প্রধান কারণ লবণাক্ততা। বালি ও কাদার বিভিন্ন স্তরে গঠিত নদী বাহিত উর্বর পলল মৃত্তিকা, সমুদ্রের জোয়ার ভাটা ও লোনাপানি, পরিমিত উত্তাপ, প্রচুর বৃষ্টিপাত, বিরল জনবসতি প্রভৃতির প্রভাবে এ বনভূমি গড়ে উঠেছে। সুন্দরবনের উত্তরাংশ মৃদু লবণাক্ত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং এই অঞ্চল মিঠাপানি ও লবণাক্ত পানির মিলিত স্থান পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিবছর নদীবাহিত পলি এসে জমা হয় বলে এখানে লবণাক্ততা কম। এ এলাকার প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরী। সমুদ্র তীর ও নদীর মোহনা নিয়ে মধ্যম লবণাক্ত অঞ্চল গঠিত। এখানকার পানির লবণাক্ততা পরিমিত তবে বর্ষাকালে লবণাক্ততা কিছুটা কমে যায়। এ এলাকার প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরী ও গেওয়া। সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা নিয়ে অধিক লবণাক্ত অঞ্চল গঠিত। সারাবছর চরম লবণাক্ত অবস্থা বিরাজমান থাকায় এটি অন্য দুটি অঞ্চলের ন্যায় উদ্ভিদ সমৃদ্ধ নয়। এ এলাকায় যেসব উদ্ভিদ জন্মায় তাদের মধ্যে গেওয়া, বাইন, গরান ইত্যাদি অন্যতম। এভাবে লবণাক্ততার তারতম্যের কারণে সুন্দরবনের বনভূমি সৃষ্টি হয়েছে।
'উদ্দীপকে 'ক' ও 'খ' চিহ্নিত অঞ্চলের বনভূমিন্বয় হলো যথাক্রমে কান্তীয় চিরহরিৎ ও পতনশীল পত্রমুক্ত বৃক্ষের বনভূমি এবং স্রোতজ বনভূমি। নিচে এ দুই ধরনের বনভূমিতে উদ্ভিদের বৈসাদৃশ্য তুলে ধরা হলো। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিকের পাহাড়িয়া এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলব্যাপী ক্রান্তীয় চিরহরিৎ ও পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি অবস্থিত। চিরহরিৎ বৃক্ষের মধ্যে চাপালিশ, তেলসুর, ময়না প্রভৃতি প্রধান। পতনশীল পত্রযুক্ত (বা পর্ণমোচী) বৃক্ষের মধ্যে গর্জন, জারুল, শিমুল, গামার, কড়ই, সেগুন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এ বনভূমির বৃক্ষসমূহ অর্থনৈতিকভাবেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কাগজ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল এ বন থেকে পাওয়া যায়, গর্জন ও জাবুল রেলওয়ের স্লিপার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এ বন থেকে সংগ্রহীত বেত দিয়ে চেয়ার টেবিল, শীতল পাটি, চাটাই মাদুর প্রভৃতি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে সমুদ্র উপকূলের লবণাক্ত ও জোয়ার ভাটাপূর্ণ জৈবনিকভাবে শুষ্ক নিবাসের উদ্ভিজ্জকে গরান বা স্রোতজ বনভূমি বলা হয়। এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্রোতজ বৃক্ষের বনভূমি। এ অঞ্চল উদ্ভিদকুলে সমৃদ্ধ এবং সুন্দরি, গরান ও ভেন্না প্রধান বৃক্ষ। তাছাড়া গেওয়া, ধুন্দল, পসুর, কেওড়া, ওড়া, আমুর ও গোলপাতা প্রভৃতি বৃক্ষও প্রচুর জন্মে। সমুদ্র তীরের অতি নিকটে এ বনে গেওয়া, সুন্দরি এবং গরান বৃক্ষসহ বিভিন্ন গাছ জন্মে। পেন্সিল তৈরিতে ধূন্দন ব্যবহৃত হয়। গোলপাতা ঘরের চালের ছাউনির কাজে ব্যবহৃত হয়, সুন্দরী বৃক্ষ বৈদ্যুতিক খুটি গৃহ নির্মাণ, নৌকা নির্মাণ প্রভৃতি কাজে ব্যবহৃত হয়। গেওয়া কাঠ নিউজপিন্ট কাগজ ও দিয়াশলাই তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের 'ক' ও 'খ' চিহ্নিত বনভূমির মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য রয়েছে।
কোনো স্থানের উদ্ভিদ, প্রাণী এবং এদের জড় পরিবেশ নিজেদের মধ্যে এবং পরস্পরের মধ্যে ক্রিয়া-বিক্রিয়া করে অবস্থান করার কারণে এদের গঠন ও কার্যের বিভিন্ন পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে। এভাবে কোনো স্থানে জীব ও এদের জড় পরিবেশ নিজেদের মধ্যে এবং পরস্পরের মধ্যে ক্রিয়া-বিক্রিয়ার গতিময় পদ্ধতিই হলো ইকোসিস্টেম বা পরিবেশতন্ত্র।