গ্রামের হতদরিদ্র জাহানারার এক সন্তানকে নিয়েই জগৎ-সংসার। হঠাৎ তার সংসারে একদিন ভাঙন দেখা দেয়। তাঁর সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসার কোনো উপায় না থাকায় দরবেশের কাছে যান পানিপড়া আনতে। দরবেশ তাঁর সব ঘটনা শুনে তাঁকে বলেন, সে চাইলে তাঁর প্রাণের বিনিময়ে সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে পারে। জাহানারা হাসিমুখে প্রাণ ত্যাগ করে সন্তানের প্রাণ বাঁচান। আর সেই থেকে জাহানারা মাতৃস্নেহের কারণে অমর হয়ে আছেন।
"সন্তানের প্রতি ভালোবাসা সম্রাট বাবরকে ও জাহানারাকে অমর করে রেখেছে।"- মন্তব্যটি যথার্থ।
এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। আজ যে আছে কাল সে থাকবে কি না কেউ জানে না। মৃত্যুতে মানুষের সব কর্মের অবসান হয়। তবে কর্ম মানুষকে জন্ম-জন্মান্তরে অমর করে রাখতে পারে।
উদ্দীপকের দরিদ্র মা জাহানারা, যিনি সন্তানকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তাঁর সন্তানস্নেহের কাছে মৃত্যুও পরাজয় স্বীকার করেছে। সন্তানের প্রতি ভালোবাসায় তাঁকে আজ গৌরবের শীর্ষ স্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কারণ অসুস্থ সন্তানকে সুস্থ করতে তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। 'জীবন বিনিময়" কবিতায়ও পিতৃস্নেহে উজ্জ্বল বাবরের পরিচয় পাওয়া যায়, যিনি সন্তানকে ভালোবেসে তাঁর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। বাদশা বাবর আজ পিতৃস্নেহের কারণে সারা জগতে পরিচিত।
ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে মানুষ তার কর্মের দ্বারা নিজেকে অমর করে নিতে পারে। মৃত্যু মানুষের শরীরকে বিনাশ করতে পারলেও তার কর্মকে বিনাশ করতে পারে না। মানুষ তার কর্ম দ্বারা যুগ যুগ ধরে সবার মাঝে অমর হয়ে থাকে। উদ্দীপকের জাহানারা ও বাদশা বাবর সন্তানের জন্য প্রাণ দিয়ে আজ অমর হয়ে আছেন তাঁদের কর্ম দ্বারা। তাই বলা যায় যে, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
বাদশা বাবর কাঁদিয়া ফিরিছে, নিদ নাহি চোখে তাঁর-
পুত্র তাঁহার হুমায়ুন বুঝি বাঁচে না এবার আর!
চারিধারে তার ঘনায়ে আসিছে মরণ-অন্ধকার ।
রাজ্যের যত বিজ্ঞ হেকিম কবিরাজ দরবেশ
এসেছে সবাই, দিতেছে বসিয়া ব্যবস্থা সবিশেষ,
সেবাযত্নের বিধিবিধানের ত্রুটি নাহি এক লেশ ।
তবু তাঁর সেই দুরন্ত রোগ হটিতেছে নাক হায়,
যত দিন যায়, দুর্ভোগ তার ততই বাড়িয়া যায়-
জীবন-প্রদীপ নিভিয়া আসিছে অস্তরবির প্রায় ৷
শুধাল বাবর ব্যগ্রকণ্ঠে ভিষকবৃন্দে ডাকি,
“বল বল আজি সত্যি করিয়া, দিও নাকো মোরে ফাঁকি,
এই রোগ হতে বাদশাজাদার মুক্তি মিলিবে নাকি?'
নতমস্তকে রহিল সবাই, কহিল না কোন কথা,
মুখর হইয়া উঠিল তাঁদের সে নিষ্ঠুর নীরবতা
শেলসম আসি বাবরের বুকে বিঁধিল কিসের ব্যথা!
হেনকালে এক দরবেশ উঠি কহিলেন- ‘সুলতান,
সবচেয়ে তব শ্রেষ্ঠ যে-ধন দিতে যদি পার দান,
খুশি হয়ে তবে বাঁচাবে আল্লা বাদশাজাদার প্রাণ ।’
শুনিয়া সে কথা কহিল বাবর শঙ্কা নাহিক মানি -
‘তাই যদি হয়, প্রস্তুত আমি দিতে সেই কোরবানি,
সবচেয়ে মোর শ্রেষ্ঠ যে ধন জানি তাহা আমি জানি ।’
এতেক বলিয়া আসন পাতিয়া নিরিবিলি গৃহতল
গভীর ধেয়ানে বসিল বাবর শান্ত অচঞ্চল,
প্রার্থনারত হাতদুটি তাঁর, নয়নে অশ্রু জল।
কহিল কাঁদিয়া- ‘হে দয়াল খোদা, হে রহিম রহমান,
মোর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আমারি আপন প্ৰাণ,
তাই নিয়ে প্রভু পুত্রের প্রাণ কর মোরে প্রতিদান ।
স্তব্ধ-নীরব গৃহতল, মুখে নাহি কারো বাণী
গভীর রজনী, সুপ্তি-মগন নিখিল বিশ্বরাণী,
আকাশে বাতাসে ধ্বনিতেছে যেন গোপন কি কানাকানি ।
সহসা বাবর ফুকারি উঠিল - ‘নাহি ভয় নাহি ভয়,
প্রার্থনা মোর কবুল করেছে আল্লাহ যে দয়াময়,
পুত্র আমার বাঁচিয়া উঠিবে - মরিবে না নিশ্চয় ।
ঘুরিতে লাগিল পুলকে বাবর পুত্রের চারিপাশ
নিরাশ হৃদয় সে যেন আশার দৃপ্ত জয়োল্লাস,
তিমির রাতের তোরণে তোরণে উষার পূর্বাভাস ।
সেইদিন হতে রোগ-লক্ষণ দেখাদিল বাবরের,
হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করিল শয্যা সে মরণের,
নতুন জীবনে হুমায়ুন ধীরে বাঁচিয়া উঠিল ফের।
মরিল বাবর - না, না ভুল কথা, মৃত্যু কে তারে কয়?
মরিয়া বাবর অমর হয়েছে, নাহি তার কোন ক্ষয়,
পিতৃস্নেহের কাছে হইয়াছে মরণের পরাজয়!
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?