ভাব সম্প্রসারণ করুনঃ (যে-কোনো ১টি)
অনেকের ধারণা, জীবনের দুঃখভোগ কেবল পাপের ফল। তবে এই ধারণা সব সময় সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, দুঃখই সুখের জন্মদাতা। যদি পৃথিবীতে দুঃখ না থাকত, তাহলে সুখের কোনো মূল্য থাকত না। মানুষ দুঃখের তাপে পুড়েই আত্মশুদ্ধি লাভ করে এবং প্রকৃত মানুষের রূপ ধারণ করে। ইতিহাসের মহান মনীষীদের জীবনেও দুঃখের গহ্বর পেরিয়ে সাফল্যের গল্প রচিত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, দুঃখের পরেই সুখ আসে—এটাই প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম। দুঃখ ও সংগ্রাম ছাড়া জীবনে প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। মানুষ যখন দুঃখের মধ্য দিয়েও এগিয়ে চলে, তখন তার অন্তরে সত্যিকারের আনন্দের সূচনা হয়। দুঃখ মানুষের জীবনের এক বড় পরীক্ষা; এটি মানুষকে সাহসী করে, সংকটে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়। দুঃখের স্পর্শে মানুষ তার আত্মিক শক্তিকে বিকশিত করে এবং সত্যিকারের মানব হয়ে ওঠে। মনীষীরা দুঃখের তুলনা করেছেন পরশপাথরের সাথে, যার ছোঁয়ায় লোহা যেমন সোনা হয়ে ওঠে, তেমনি দুঃখ মানুষের অন্তরের সকল গ্লানি দূর করে তাকে মহিমান্বিত করে।
জীবনের প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে লুকিয়ে থাকে অগণিত দুঃখ-কষ্টের ইতিহাস। দুঃখ থেকেই জন্ম নেয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। দুঃখের প্রচণ্ড দহন শেষে যে সুখ আসে, তা নিঃসন্দেহে গভীর এবং অনুপম। মানুষের মনুষ্যত্ব ও বিবেক দুঃখের মধ্য দিয়েই পরিণত হয়। পৃথিবীর যাবতীয় মূল্যবান সম্পদ অর্জিত হয়েছে দুঃখ, কষ্ট ও শ্রমের বিনিময়ে। বাংলা প্রবাদেও বলা হয়—"কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মেলে না"। তাই ত্যাগ, তিতিক্ষা ও অধ্যবসায় ছাড়া জীবনের স্বর্ণশিখরে পৌঁছানো অসম্ভব।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “দুঃখই জগতে সকল পদার্থের মূল।” মাতৃস্নেহ, পুণ্যকর্ম, বীরত্ব—সবকিছুর মূলেও রয়েছে দুঃখের ছোঁয়া। মানুষ যখন সাহসের সাথে দুঃখ মোকাবিলা করে, তখনই তার প্রকৃত শক্তির পরিচয় ঘটে। অনেকেই দুঃখে ভেঙে পড়ে, জীবনে পরাজিত হয়; কিন্তু যাঁরা বলিষ্ঠ মনোবলে দুঃখকে জয় করে, তারাই প্রকৃত বিজয়ী।
বিশ্বের মহান ব্যক্তিত্বদের জীবনী দেখলে দেখা যায়, দুঃখ-দারিদ্র্য তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। নজরুল ইসলাম ছিলেন দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি, কিন্তু তাঁর সেই দুঃখই তাঁকে মহিমান্বিত করেছিল। নজরুল গর্বভরে বলেছেন—“হে দারিদ্র্য! তুমি মােরে করেছ মহান।” ঠিক তেমনি, হযরত মুহম্মদ (সা.), যিশু খ্রিস্ট, গৌতম বুদ্ধ—সকলেই জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে দুঃখের আগুনে পোড়ে নিজেদের মহানত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।
দুঃখ মানুষের আত্মা থেকে জড়তা সরিয়ে দেয় এবং তাকে নির্মল করে। দুঃখের ভেতর দিয়েই জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য অর্জিত হয়। তাই বলা যায়, পৃথিবীতে যেকোনো মূল্যবান অর্জনের পূর্বশর্ত হলো দুঃখের গভীর অভিজ্ঞতা।
লোভী মানুষ সুখের জন্য ব্যাকুল হলেও, মহৎ আত্মারা সুখ-দুঃখ উভয়কেই জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে মেনে নেয়। এ কারণে অনেক মহাপুরুষ আজীবন দুঃখক্লিষ্ট জীবন বেছে নিয়েছিলেন, নিজেদের পূর্ণতা অর্জনের জন্য।
'ভাব-সম্প্রসারণ' কথাটির অর্থ কবিতা বা গদ্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে ব্যাখ্যা করা, বিস্তারিত করে লেখা, বিশ্লেষণ করা। আবৃতকে উন্মোচন, সংকেতকে নির্ণীত করে তুলনীয় দৃষ্টান্ত ও প্রবাদ-প্রবচনের সাহায্যে সহজ ভাষায় ভাবের বিন্দুকে বিস্তার করার নাম ভাব-সম্প্রসারণ।
ক. প্রদত্ত চরণ বা গদ্যাংশটি একাধিকবার মনোযোগ সহকারে পড়ে অন্তর্নিহিত ভাবটি কী, তা সঠিকভাবে বুঝতে হবে। মূল ছত্রটি হুবহু ব্যবহার করা উচিত নয়।
খ. অন্তর্নিহিত মূলভাবটি কোনো উপমা, রূপক-প্রতীকের আড়ালে প্রচ্ছন্ন থাকে, তবে ভাব-সম্প্রসারণের সময় প্রয়োজনে অতিরিক্ত অনুচ্ছেদ-যোগে ব্যাখ্যা করলে ভালো হয়।
গ. সহজ ভাষার, সংক্ষেপে ভাবসত্যটি উপস্থাপন করা উচিত। প্রয়োজনে যুক্তি উপস্থাপন করে তাৎপর্যটি উদ্ধার করতে হবে।
ঘ. মূল ভাব-বীজকে বিশদ করার সময় সহায়ক দৃষ্টান্ত, প্রাসঙ্গিক তথ্য বা উদ্ধৃতি ব্যবহার করা চলে।
ঙ. ভাব-সম্প্রসারণ করার সময় মনে রাখতে হবে যে, যেন বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বারবার একই কথা লেখা ভাব-সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে দূষণীয়।
চ. ভাব-সম্প্রসারণকে প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত করা যায়। যথা: প্রথম অংশে ভাবের অর্থ, দ্বিতীয় অংশে ভাবের ব্যাখ্যা, তৃতীয় অংশে ভাবের তাৎপর্য।
ছ. ভাব-সম্প্রসারণ করার সময়ে প্রদত্ত অংশের রচয়িতার নাম উল্লেখ করাতে হয় না।
জ. প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?