বাক্য শুদ্ধিকরণঃ
বাক্যে শুদ্ধ প্রয়োগবিধির জন্য ভাষা ও ব্যাকরণ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। ব্যাকরণগত নানা ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য বাক্য অশুদ্ধ হতে পারে। এ অধ্যায়ে বাক্য কী কী কারণে এবং কীভাবে দূষিত হতে পারে, তা আলোচনা করার চেষ্টা করবো। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আমরা নিয়মের নাম দিয়েছি এবং কিছু উদাহরণ দিয়ে তা বোঝানোর চেষ্টা করেছি। উদাহরণ দেওয়ার সময় আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি বিগত বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থেকে প্রশ্ন দেওয়ার। আমরা সচরাচর যে ভুলগুলো করে থাকি সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে প্রদান করা হলো-
'জানিবার ও বুঝিবার প্রবৃত্তি মানুষের মন থেকে যেদিন চলিয়া যাবে সেদিন মানুষ আবার পশুত্ব লাভ করবে।' এ বাক্যটিতে সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণের ফলে তা গুরুচণ্ডালী দোষে দুষ্ট।
সাধু (শুদ্ধ) রূপ: জানিবার ও বুঝিবার প্রবৃত্তি মানুষের মন হইতে যেইদিন চলিয়া যাইবে সেইদিন মানুষ আবার পশুত্ব লাভ করিবে।
চলিত (শুদ্ধ) রূপ: জানবার ও বুঝবার প্রবৃত্তি মানুষের মন থেকে যেদিন চলে যাবে সেদিন মানুষ আবার পশুত্ব লাভকরবে।
বানানগত অশুদ্ধি
অশুদ্ধ: আমি 'গীতাঞ্জলী' পড়েছি। (বাক্যে ব্যবহৃত 'গীতাঞ্জলী' বানানটি ভুল)
শুদ্ধ: আমি 'গীতাঞ্জলি' পড়েছি।
পদের অপপ্রয়োগজনিত অশুদ্ধি:
অশুদ্ধ: কাল বিতরণী হবে উৎসব স্কুলে আমাদের পুরস্কার অনুষ্ঠিত। (পদের সন্নিবেশ ঠিক না হওয়ায় ভাব প্রকাশ যথাযথ হয়নি)
শুদ্ধ: কাল আমাদের স্কুলে পুরস্কার বিতরণী উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।
অশুদ্ধ | শুদ্ধ | অশুদ্ধ | শুদ্ধ |
| ইক্ষুর চারা বপন করা হইল। | ইক্ষুর চারা রোপন করা হইল। | গণিত খুব কঠিন। | গণিত খুব জটিল। |
| গোময় জ্বালানি কাষ্ঠরূপে ব্যবহার হয়। | গোময় জ্বালানিরূপে ব্যবহার হয়। | এই সভার ছাত্রগণ কর্তব্য নিরাকরণ করিবে | এই সভায় ছাত্রগণ কর্তব্য নির্ধারণ করিবে। |
| তাহার সাঙ্ঘাতিক আনন্দ হইল। | তাহার প্রচুর আনন্দ হইল। | অধ্যাপনই ছাত্রদের তপস্যা। | অধ্যয়নই ছাত্রদের তপস্যা। |
| হস্তীটি অপরিসীম স্থলাকায়। | হস্তীটি অত্যন্ত স্থলাকায়। | ছেলেটি ভয়ানক মেধাবী। | ছেলেটি অত্যন্ত মেধাবী। |
| বঙ্কিমের প্রতিভা ছিল অতি ভয়ঙ্কর। | বঙ্কিমের প্রতিভা ছিল অতি অসাধারণ। | আমরা উন্নতির পথে কুঠারাঘাত করিতেছি। | আমরা উন্নতির মূলে কুঠারাঘাত করিতেছি। |
অশুদ্ধ | শুদ্ধ | অশুদ্ধ | শুদ্ধ |
| আমি অপমান হয়েছি। | আমি অপমানিত হয়েছি। | এ কথা প্রমাণ হয়েছে। | এ কথা প্রমাণিত হয়েছে। |
| আমি তোমার আগমন-সংবাদে সন্তোষ হইয়াছি। | আমি তোমার আগমন-সংবাদে সম্ভ্রষ্ট হইয়াছি। | রহীন সঙ্কট অবস্থায় পড়িয়াছে। | রহীন সঙ্কটজনক অবস্থায় পড়িয়াছে। |
| সে আরোগ্য হয়েছে। | সে আরোগ্য লাভ করেছে। | তিনি এখন মৌনী আছেন। | তিনি এখন মৌন আছেন। |
| দেবী অন্তর্ধান হইবেন। | দেবী অন্তর্হিত হইবেন। | গৌরব লোপ হইয়াছে। | গৌরব লোপ পাইয়াছে। |
| আমার কথাই প্রমাণ হলো। | আমার কথাই প্রমাণিত হলো। | তাহার জীবন সংশয়পূর্ণ। | তাহার জীবন সংশয়াপন্ন। |
অশুদ্ধ | শুদ্ধ | অশুদ্ধ | শুদ্ধ |
| ইহার আবশ্যক নাই। | ইহার আবশ্যকতা নাই। | ইদানীং অবকাশ নাই। | আমি সাক্ষ্য দিয়েছি। |
| ইদানিং সাবকাশ নাই। | ইদানীং অবকাশ নাই। | তদ্দৃষ্টে লিখিত হইল। | তদ্দর্শনে লিখিত হইল। |
বচনঘটিত শুদ্ধিকরণ: একই সাথে দুবার বহুবচন বাচক প্রত্যয় বা শব্দ ব্যবহৃত হয় না। একটি বাক্যে একাধিকবার বহুবচনবাচক প্রত্যয় বা শব্দ ব্যবহারে 'বাহুল্য-দোষ' ঘটে। যেমন-
অশুদ্ধ | শুদ্ধ | অশুদ্ধ | শুদ্ধ |
| সকল শিক্ষকগণ আজ উপস্থিত | সকল শিক্ষক আজ উপস্থিত। | সদাসর্বদা তোমার উপস্থিত প্রার্থনীয় | সর্বদা তোমার উপস্থিতি প্রার্থনীয় |
| প্রত্যেক শিক্ষকগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন | প্রত্যেক শিক্ষক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। | সর্ব বিষয়ে বাহুল্যতা বর্জন করা উচিত | সর্ব বিষয়ে বাহুল্য বর্জন করা উচিত। |
| সকল আলেমগণ আজ উপস্থিত। | সকল আলেম আজ উপস্থিত।/আলেমগণ আজ উপস্থিত। | সকল মানুষেরাই মরণশীল। | মানুষ মরণশীল। |
| সব ছাত্ররা আজ উপস্থিত। | সব ছাত্র আজ উপস্থিত। / ছাত্ররা আজ উপস্থিত। | সমুদয় পক্ষীরাই নীড় বাঁধে। | সমুদয় পক্ষীই নীড় বাঁধে। |
| নীরোগ লোকরা যথার্থ সুখী। | নীরোগ লোক যথার্থ সুখী। | সকল সভ্যগণ এখানে উপস্থিত ছিলেন। | সকল সভ্য এখানে উপস্থিত ছিলেন / সভ্যগণ এখানে উপস্থিত ছিলেন |
| চোরটি সব মালসুদ্ধ ধরা পড়েছে। | চোরটি মালসুদ্ধ ধরা পড়েছে। |
লিঙ্গঘটিত শুদ্ধিকরণ: সাধারণত পুংলিঙ্গ থেকে স্ত্রীলিঙ্গে অথবা স্ত্রীলিঙ্গ থেকে পুংলিঙ্গে রূপান্তরকালে কিছু প্রত্যয়, অতিরিক্ত শব্দ বা শব্দাংশ যুক্ত করতে হয়; যা না হলে ব্যাকরণজনিত ভুল দেখা দেয়। বিধেয় বিশেষণ অর্থাৎ বিশেষ্যের পরবর্তী বিশেষণে স্ত্রীবাচক হয়না। যেমন-
অশুদ্ধ | শুদ্ধ | অশুদ্ধ | শুদ্ধ |
| মেয়েটি পাগলি হয়ে গেছে | মেয়েটি পাগল হয়ে গেছে | আজকালকার মেয়েরা যেমন মুখরা, তেমনি বিদ্বান। | আজকালকার মেয়েরা যেমন মুখরা, তেমনি বিদুষী। |
| রহিমা পাগলি হয়ে গেছে। | রহিমা পাগল হয়ে গেছে। | রাজা পাপিষ্ঠ রানীকে শাস্তি দিলেন। | রাজা পাপিষ্ঠা রানীকে শাস্তি দিলেন |
| রাজা পাপিষ্ঠা রানীকে শাস্তি দিলেন | আসমা ভয়ে অস্থির। | সে এমন রূপসী যেন অপ্সরা। | সে এমন রূপবতী যেন অপ্সরা। |
অন্বয়ঘটিত শুদ্ধিকরণ: বাগভঙ্গি এবং প্রমিত ভাষা ব্যাকরণের সাথে সাথে সব সময় চলে না। অর্থের দিকে এবং বক্তার আবেগের মাত্রার দিকে সচেতন থাকলে এসব অশুদ্ধি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। যেমন-
অশুদ্ধ | শুদ্ধ |
| অদ্য সভায় মহতী অধিবেশন হইবে। | অদ্য মহতী সভার অধিবেশন হইবে। |
| সহসা আগুন লাগায় ও খেলা পণ্ড হইল। | সহসা আগুন লাগিল ও খেলা পণ্ড হইল। |
| এই স্কুলে যে-কয়জন শিক্ষক আছেন, তাঁহার মধ্যে জলিলই শ্রেষ্ঠ। | এই স্কুলে যে-কয়জন শিক্ষক আছেন, তাঁহাদের মধ্যে জলিল সাহেবই শ্রেষ্ঠ। |
অশুদ্ধ | শুদ্ধ |
| শুধুমাত্র গায়ের জোরে কাজ হয় না। | শুধু গায়ের জোরে কাজ হয় না। |
| তাহার বৈমাত্রেয় সহোদর অসুস্থ। | তাহার বৈমাত্রেয় ভ্রাতা / ভাই অসুস্থ। |
| তাহার হৃদি কমলে জ্ঞানের বীজ উপ্ত হইল। | তাহার হৃদয় ক্ষেত্রে জ্ঞানের বীজ উপ্ত হইল। |
| তাহার অন্তর অজ্ঞান-সমুদ্রে আচ্ছন্ন। | তাহার অন্তর অজ্ঞান-সমুদ্রে নিমজ্জিত অথবা অজ্ঞান-তমসাচ্ছন্ন। |
| কথাটা তিনি কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করিলেন। | কথাটা শুনিয়া তিনি কপটাশ্রু বিসর্জন করিলেন / কথাটা শুনিয়া তিনি মায়া-কান্না জুড়িয়া দিলেন। |
| ছেলেটি বংশের মাথায় চুনকালি দিল। | ছেলেটি বংশের মুখে চুনকালি দিল। |
| কথাটা আমার স্মৃতিপটে জাগরূক আছে | কথাটা আমার স্মৃতিপটে অঙ্কিত আছে। |
| গঙ্গায় তরঙ্গের ঢেউ প্রবাহিত হইতেছে। | গঙ্গায় তরঙ্গের হিল্লোল খেলিতেছে। |
কি ও কী সমস্যা: প্রশ্নবোধক বাক্যে কি এবং বিস্ময়সূচক বাক্যে কী হবে। কোনো প্রশ্নের উত্তর শুধু হাঁ বা না দিয়ে হলে 'কি' বসবে এবং প্রশ্নের উত্তর যদি ব্যাখ্যাকারে দিতে হয় তাহলে 'কী' বসবে। যেমন-
অশুদ্ধ | শুদ্ধ | অশুদ্ধ | শুদ্ধ |
| তুমি কী আজ যাবে? | তুমি কি আজ যাবে? | কি ভয়ানক বিপদ! | কী ভয়ানক বিপদ! |
| তুমি কী ঢাকা যাবে? | তুমি কি ঢাকা যাবে? | কারক কত প্রকার ও কি কি? | কারক কত প্রকার ও কী কী? |
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?