যেকোনো গবেষণা কার্য পরিচালনা বা ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রথম কাজ হলো তথ্য সংগ্রহ। পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এই তথ্য সংগ্রহ বিভিন্নভাবে করা যায়। নিচে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও প্রকারভেদ সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়া হলো-
▪️ প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি (Methods of Primary Data Collection ) : অনুসন্ধান ক্ষেত্রে উত্তরদাতার কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা তথ্যকে প্রাথমিক তথ্য বলে। গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ, সময়, জনশক্তি ও গবেষণার উদ্দেশ্য প্রভৃতির ওপর প্রাথমিক উপাত্ত/তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নির্ভর করে । প্রাথমিক তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের বিভিন্ন পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো—
১. সাক্ষাৎকার বা সরাসরি/প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত অনুসন্ধান পদ্ধতি (Interview or direct personal investigation method):
পদ্ধতিতে অনুসন্ধানকারী ব্যক্তিগতভাবে অনুসন্ধান ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। এক্ষেত্রে অনুসন্ধানকারীর সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অবশ্যই পূর্বজ্ঞান থাকতে হবে। তাই এ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করতে হলে তথ্য সংগ্রহকারীকে কিছুকাল অনুসন্ধান ক্ষেত্রে অবস্থান করতে হয় । তাকে সেখানকার লোকজনের সাথে কিছুদিন মিশতে হয়। এর ফলে তথ্য সংগ্রহকারী অনুসন্ধান সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভ করে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। কম গুরুত্বপূর্ণ বা সীমিত পরিসরে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি বেশি উপযোগী।
২. পর্যবেক্ষণ বা পরোক্ষ মৌলিক অনুসন্ধান (Observation or indirect investigation): সরাসরি উত্তরদাতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ না করে অন্য কোনো বিকল্প পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহকে পরোক্ষ মৌলিক অনুসন্ধান বলে । এই পদ্ধতি অনুযায়ী অনুসন্ধানকারী উত্তরদাতার সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না করে পর্যবেক্ষণ বা আশপাশের লোকজনের সাহায্যে তথ্য সংগ্রহ করে থাকেন।
৩. অনুসন্ধানকারী নিয়োগ করে অনুসন্ধান (Investigation through appointing investigator) : এ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনুসন্ধানকারীদেরকে তথ্য সংগ্রহের কাজে লাগানো হয়। তারা অনুসন্ধান ক্ষেত্রে গিয়ে দুটি পদ্ধতিতে তথ্য অনুসন্ধান করেন। প্রথমত, অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া প্রশ্নমালা নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, তথ্য সংগ্রহকারী সেখানে প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে কারো সাহায্য ছাড়া সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন ।
৪. স্থানীয় সংবাদদাতা নিয়োগ (Appointment of local correspondents): এ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অনুসন্ধান ক্ষেত্রে স্থানীয় ভিত্তিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সংবাদদাতা নিয়োগ অথবা সংবাদপত্রের প্রতিনিধি নিয়োগ করে। তারা সেখানে সবসময় অবস্থান করেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন।
৫. প্রশ্নমালার সাহায্যে অনুসন্ধান (Investigation through questionnaires) : প্রশ্নমালার সাহায্যে অনুসন্ধান পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত গণনাকারীদেরকে নির্ধারিত প্রশ্নমালা সহকারে অনুসন্ধান এলাকায় পাঠানো হয়। তারা অনুসন্ধান ক্ষেত্রে প্রশ্নাবলির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন।
৬. ডাকযোগে প্রশ্নমালা প্রেরণ (Sending questionnaries by Post): এ পদ্ধতিতে অনুসন্ধানকর্তা নির্বাচিত প্রশ্নমালা ডাক মারফত উত্তরদাতাদের নিকট পাঠান এবং চিঠিতে উত্তরদাতাকে ঐ প্রশ্নে সঠিক উত্তর দিতে অনুরোধ করেন। প্রশ্নমালার সাথে একটি ছোট অনুরোধপত্র এবং প্রয়োজনীয় অব্যবহৃত ডাকটিকিটও পাঠানো হয়। উত্তরদাতাগণ অনুসন্ধানকারীর অনুরোধে সাড়া দিয়ে, প্রশ্নমালায় তথ্যাবলি লিপিবদ্ধ করে প্রেরকের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়। পরে এই উত্তরের ওপর ভিত্তি করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
৭. টেলিফোন সাক্ষাৎকার (Telephonic interview): অনেক সময় জরুরিভিত্তিতে স্বল্পসময়ে অধিক তথ্য সংগ্রহের জন্য এই পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়। এতে তথ্য সংগ্রাহক টেলিফোনের মাধ্যমে উত্তরদাতার সাক্ষাৎকার নেন এবং তথ্য সংগ্রহ করেন। এক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহকারীর ব্যবহার মার্জিত ও কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
৮. ই-মেইল পদ্ধতি (E-mail method): ই-মেইল (E-mail)-এর অর্থ হলো ইলেকট্রনিক মেইল (Electrionic mail)। কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের তথ্যাবলি আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াকে ই-মেইল বলা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের সর্বাধুনিক পদ্ধতি হচ্ছে ই-মেইল পদ্ধতি। ই-মেইলে তথ্য আদান-প্রদানের সাথে সাথে যেকোনো ধরনের ছবি, গ্রাফিক্স প্রভৃতি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো যায়। এ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি ই-মেইল ঠিকানায় (E-mail Address) পূর্ব থেকেই নির্ধারিত প্রশ্ন সংবলিত একটি প্রশ্নমালা (Questionnaires) পাঠান এবং ই-মেইল ঠিকানাটি জনসাধারণকে পত্রিকার মাধ্যমে জানিয়ে দেন। এর ফলে উত্তরদাতাগণ স্বল্প সময়ে প্রশ্নের উত্তর প্রেরণ করতে পারেন। এক্ষেত্রে তথ্যের উত্তর প্রদানকারীর ই-মেইল বা কম্পিউটারে জ্ঞান থাকা জরুরি।
▪️ মাধ্যমিক তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি (Methods of Secondary Data Collection) : অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংগৃহীত ও প্রক্রিয়াজাতকৃত তথ্যকে মাধ্যমিক তথ্য বলে। মাধ্যমিক তথ্য সরাসরি উত্তরদাতাদের নিকট হতে সংগ্রহ করা হয় না। তাই মাধ্যমিক তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ অপেক্ষা অনেক সহজ। প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের বিভিন্ন পদ্ধতির মতো কোনো পদ্ধতিতে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয় না। ফলে মাধ্যমিক তথ্য সংগ্রহ করতে হলে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় না। এক্ষেত্রে মাধ্যমিক তথ্যের উৎসসমূহ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মাধ্যমিক তথ্যের উৎসসমূহ নিচের দুই ধরনের হতে পারে-
(ক) প্রকাশিত উৎস (Published sources) : প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের পর এই তথ্য বিভিন্ন পত্রপত্রিকা বা অন্য কোনো মাধ্যমের সাহায্যে কখনো কখনো প্রকাশ করা হয়। কোনো গবেষক তার প্রয়োজনীয় তথ্য এরূপ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে সংগ্রহ করে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন। প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করে এরূপ প্রতিষ্ঠানসমূহ হলো-
১. আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান (International organization): বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন- জাতিসংঘ (UN), আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (IMF), বিশ্বব্যাংক (WB), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), UNICEF, UNESCO প্রভৃতি সংস্থা নির্দিষ্ট সময় পর পর অর্থনৈতিক ও পরিসংখ্যানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
২. সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান (Government and semi- government organization): দেশের বিভিন্ন সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান বার্ষিক বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ পে-কমিশন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
৩. বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান (Commercial organization): ব্যবসায় ও অর্থ সম্পর্কিত বিভিন্ন সাময়িকী বা জার্নাল থেকে শিল্প-বাণিজ্য সংক্রান্ত তথ্য জানা যায়। এসব তথ্যের প্রকাশক হলো— চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, স্টক এক্সচেঞ্জ, বণিক সমিতি প্রভৃতি ।
৪. গবেষণা প্রতিষ্ঠান (Research institute): বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সময় উপযোগী বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করে। বাংলাদেশে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান হলো— বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (Bangladesh Institute of Development Studies-BIDS), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউট (Bangladesh Agricultural Research Institute-BARI) প্রভৃতি ।
৫. সংবাদপত্র ও সাময়িকী (Newspapers and periodicals) : অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করে থাকে। আবার, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠান পত্র-পত্রিকায়। ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে থাকে। বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার জরিপের ফলাফলসহ বিভিন্ন বিষয়ের গবেষণা এতে স্থান পায়। তাই সংবাদপত্র ও সাময়িকী মাধ্যমিক তথ্যের উল্লেখযোগ্য উৎস এবং দলিল হিসেবে কাজ করে। এসব সংবাদপত্র ও সাময়িকীর মধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র যেমন- Times News, The Economist প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
৬. বিভিন্ন কমিশন ও কমিটি (Various commissions and committees): সরকার কর্তৃক গঠিত বিভিন্ন কমিশন ও কমিটি যেমন – বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি, শিক্ষা কমিশন প্রভৃতির রিপোর্ট মাধ্যমিক তথ্যের অন্যতম উৎস।
(খ) অপ্রকাশিত উৎস (Unpublished sources): প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের পর অনেক সময় এটি কোনো প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে প্রকাশ করা হয় না। কোনো গবেষক ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। এই অপ্রকাশিত তথ্যের উৎস সাধারণত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। এ উৎস একেবারে কম নেই। সরকারি ও বেসরকারি অফিসে সংরক্ষিত রেকর্ডসমূহকে অপ্রকাশিত উৎস বলা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, তথ্য সংগ্রহ যেকোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি কাজ। আর এজন্য বিভিন্ন উৎস প্রচলিত রয়েছে। এজন্য উপরিউক্ত উৎস ও পদ্ধতিগুলোই সচরাচর ব্যবহার করা হয়ে থাকে ।