Summary
বর্তমানে আধুনিক যুগে কোনো রাষ্ট্র এককভাবে চলতে পারে না, ফলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এই সহযোগিতার জন্য গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সংস্থা, যার মধ্যে জাতিসংঘ অন্যতম। জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বে শান্তি স্থাপন করা এবং বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে এর সদস্যপদ লাভ করে।
এছাড়া, রয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা যেমন- সার্ক, আসিয়ান, ইইউ, যেগুলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থে যৌথভাবে কাজ করে। পঞ্চম শ্রেণিতে জাতিসংঘের বিভিন্ন শাখা এবং এসংক্রান্ত উন্নয়নমূলক সংস্থা সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা জানে। এই অধ্যায়ে আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব, অঞ্চলভুক্ত দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র, প্রসিদ্ধ আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার গঠন ও কার্যক্রম বর্ণনা করবো এবং পারস্পরিক সম্পর্কিত মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হব।
বর্তমানে আধুনিকযুগে কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে তাদের প্রয়োজন সম্পন্ন করতে পারে না। এ প্রয়োজনীয়তা থেকেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। গড়ে তুলেছে বিভিন্ন সহযোগিতা সংস্থা। এদের মধ্যে অন্যতম হলো জাতিসংঘ। বিশ্বে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে জাতিসংঘ গঠন করা হয়। বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করেছে। তাছাড়া রয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। যেমন- সার্ক, আসিয়ান, ইইউ প্রভৃতি। এসব সংস্থা তাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করে। আমরা পঞ্চম শ্রেণিতে জাতিসংঘের বিভিন্ন শাখা, জাতিসংঘের উন্নয়নমূলক সংস্থা ও সার্ক সম্পর্কে জেনেছি। এ অধ্যায়ের পাঠগুলোতে আমরা বিভিন্ন আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সম্পর্কে জানব।

এ অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা-
- আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব;
- একই অঞ্চলভুক্ত বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র উল্লেখ করতে পারব;
- বিশ্বের উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার গঠন এবং কার্যক্রম বর্ণনা করতে পারব;
- পারস্পরিক সম্প্রীতি, সহযোগিতা, সৌহার্দ, ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
'ক' সংস্থাটি শিল্পোন্নত শীর্ষ সাত দেশের জোট। বিভিন্ন সমস্যা দূর করে অভিশাপমুক্ত পৃথিবী গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
মুরাদ আলী তাড়াইল গ্রামে একটি সংস্থা গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ সংস্থাটির মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা হলেও এর কর্মক্ষেত্র সমাজ, শিক্ষা, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে বিস্তার লাভ করছে।
আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহ একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমস্যা ও প্রয়োজন বিভিন্ন রকম। কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই এককভাবে তার সকল প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। অথচ এ সমস্ত প্রয়োজন ও সমস্যার সমাধান না হলে কোনো রাষ্ট্রের জনগণেরই কল্যাণ ও উন্নয়ন সম্ভব হয় না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো যদি পরস্পরকে সহযোগিতা করে তাহলে অনেক সমস্যার সহজ সমাধান হয়। তাই একই অঞ্চলে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলো পরস্পর সহযোগিতা করে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গড়ে উঠে। তারা যৌথ উদ্যোগে এসব অঞ্চলের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাধাসমূহ দূর করার জন্য কাজ করে। ফলে সকল পক্ষের উন্নয়ন সাধন হয়।
আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র
আঞ্চলিক সহযোগিতার অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে ক্ষেত্রসমূহ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রসমূহ হচ্ছে- শিল্প-বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি, তথ্য- প্রযুক্তি, কৃষি, পর্যটন, ক্রীড়া, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ, পরিবহন ও যোগাযোগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বিনিময়, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, জলবায়ু ও পরিবেশ উন্নয়ন ইত্যাদি।

| কাজ: আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর তালিকা প্রস্তুত কর। |
অবস্থানগত সুবিধার ভিত্তিতে পৃথিবীতে অনেক আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গড়ে উঠেছে। আমরা এ পাঠে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে জানব।
সার্ক (SAARC)
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মিলে গঠন করেছে সার্ক। সংস্থাটির পুরো নাম-South Asian Association for Regional Cooperation (SAARC)।
বাংলায় বলা যায়-দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সার্ক গঠিত হয়। বাংলাদেশ ছাড়া সার্কের অন্য সদস্য দেশগুলো হলো- ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটান ও আফগানিস্তান। এছাড়া বর্তমানে মিয়ানমার পর্যবেক্ষক হিসাবে এ সংস্থার সাথে যুক্ত হয়েছে। সংস্থাটির মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা হলেও এর কর্মক্ষেত্র সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ, প্রযুক্তিসহ উন্নয়নের সর্বক্ষেত্রেই বিস্তৃত। সার্কের সদর দপ্তর নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে অবস্থিত।
সার্ক গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
- সার্কভুক্ত দেশগুলোর জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা।
- দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য।
- কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করা।
- সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তোলা।
- উক্ত অঞ্চলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্যে কাজ করা।
- সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিরাজমান বিরোধ ও সমস্যা দূর করে পারস্পরিক সমঝোতা সৃষ্টি করা।
আসিয়ান (ASEAN)
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দশটি দেশ নিয়ে ১৯৬৭ সালের ৮ই আগস্ট গঠিত হয় আসিয়ান। সংস্থাটির পুরো নাম-Association of South-East Asian Nations (ASEAN)। বাংলায় বলা হয়-দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতিসমূহের সংস্থা। এর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে- ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, লাওস, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর। আসিয়ানের সদর দপ্তর ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায়।
আসিয়ান গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
- সম্মিলিত উদ্যোগে অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করা।
- উক্ত অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
- সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে সৌহার্দ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ করা।
- পেশাগত ও কারিগরি ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ব্যবস্থা করা।
- সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করা ইত্যাদি।
| কাজ - ১: এশিয়ার মানচিত্রে আসিয়ান ও সার্কভুক্ত দেশগুলো দেখাও। কাজ-২: সার্ক কোন কোন কাজগুলো করতে পারে তার একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ-৩: আসিয়ান কোন কোন কাজগুলো করতে পারে তার একটি তালিকা প্রস্তুত কর। |
পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো সহযোগিতার লক্ষ্যে প্রথমে গঠন করেছিল কমন মার্কেট। তারপর এর আওতা বেড়ে হয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU)। ইউরোপের প্রায় সব দেশই এর সদস্য। ইইউ তার নিজস্ব মুদ্রাও চালু করেছে, যার নাম 'ইউরো'। ইউরোপের সব দেশেই তাদের দেশীয় মুদ্রার পাশাপাশি এই ইউরোও চলে। সদস্য দেশগুলোর নাগরিকেরা আজ অবাধে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত, বসবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদর দপ্তর বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস্-এ অবস্থিত।
এছাড়া 'জি-৭' নামে আন্তঃসরকারি সহযোগিতা সংস্থা রয়েছে। এটি শিল্পোন্নত শীর্ষ সাত দেশের একটি জোট। সাত সদস্যের এই সংস্থায় আছে-যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান, কানাডা ও ইতালি। এই গ্রুপ কেবল নিজেদের মধ্যে সহযোগিতাই করে না, আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়েও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। তাছাড়া পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যু এবং দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অশিক্ষা ও অস্বাস্থ্যের অভিশাপমুক্ত পৃথিবী গড়ার বিষয়ে তাদের করণীয় নিয়েও আলোচনা ও নিজস্ব কর্মকৌশল নির্ধারণ করে জি-৭।
আফ্রিকার দেশগুলো মিলে গড়ে তুলেছে ওএইউ বা Organization of African Unity (OAU); আরব দেশগুলোর সংগঠন আরবলীগ; মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি বা Organization of Islamic Cooperation (OIC)। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে ওআইসি'র সদস্যপদ লাভ করে। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোকে নিয়ে গড়ে উঠেছে কমনওয়েলথ; আবার কোনো সামরিক জোটের সদস্য নয় এমন দেশগুলো নিয়ে গড়ে উঠেছে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা Non-Aligned Movement (NAM)। বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
এছাড়া দুটি দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা চুক্তি সম্পন্ন হয়। বর্তমানে এ ধরনের চুক্তি বেড়েই চলেছে। কারণ সহযোগিতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হলো এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা চুক্তি।
| কাজ: আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ কীভাবে উপকৃত হয় তা দলে আলোচনা করে উপস্থাপন কর। |
Read more