Summary
মানুষের মধ্যে ভালোবাসা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সকলের মধ্যে তা দেখা যায় না। কিছু মানুষ মানবসেবার জন্য নিবেদিত থাকেন, যেমন মাদার তেরেসা।
মাদার তেরেসা ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট আলবেনিয়ার স্কপিয়েতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম ছিল অ্যাগনেস গোনজা বোজাঝিউ। ১৮ বছর বয়সে তিনি 'লরেটো সিস্টার্স' নামে খ্রিষ্টান মিশনারিতে যোগ দেন এবং ভারতের দার্জিলিংয়ে নান হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন। পরে কলকাতায় তিনি শিক্ষিকার দায়িত্বগ্রহণ করেন এবং দারিদ্র্যক্লিষ্ট শিশুদের জন্য সহায়তা করেন।
১৯৪৮ সালে তিনি 'লরেটো' ছেড়ে গরিবদের সেবায় নিবেদন করেন এবং 'মিশনারিজ অব চ্যারিটি' গঠন করেন। কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় অসহায় মানুষদের জন্য চিকিৎসাকেন্দ্র এবং আশ্রয়স্থল প্রতিষ্ঠা করেন, যেমন 'নির্মল হৃদয়', 'শিশুভবন', এবং 'প্রেমনিবাস'। এছাড়া, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে শরণার্থীদের সেবাও করেন।
মাদার তেরেসা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সেবা করেছেন। তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, কিন্তু কখনো পুরস্কারের অর্থ নিজে ব্যবহার করেননি। তিনি ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
মাদার তেরেসা মানবতা, সহানুভূতি, এবং সেবার জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সবসময় তেমন দেখা যায় না। আবার বিভিন্ন যুগে এমন মানুষও পৃথিবীতে আসেন যাঁরা মানুষের সেবাতেই প্রাণমন সব ঢেলে দেন। ভালোবাসা দিয়ে তাঁরা জয় করে নেন দুনিয়া। মাদার তেরেসা ছিলেন তেমনি একজন অসাধারণ মানবদরদি।
মাদার তেরেসা জন্মেছিলেন অনেক দূরের দেশ আলবেনিয়ার স্কপিয়েতে। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের ছাব্বিশে আগস্ট তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন বাড়িঘর তৈরির কারবারি, নাম নিকোলাস বোজাঝিউ। মায়ের নাম দ্রানাফিল বার্নাই। পারিবারিক পদবি অনুসারে কন্যার নাম রাখা হয় অ্যাগনেস গোনজা বোজাঝিউ। তিন ভাইবোনের মধ্যে অ্যাগনেস ছিলেন ছোট। বড় হয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণের সময় তাঁর নাম হলো মাদার তেরেসা।
তেরেসা যখন খুব ছোট, তখন ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা জুড়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলেছিল এই যুদ্ধ। ইতিহাসে এই যুদ্ধকে বলা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এতে তেরেসার কোমল মনে খুব আঘাত লেগেছিল। এসময়ে বাবার মৃত্যু পরিবারেও বিপর্বয় ঘটিয়েছিল। দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে বড় হচ্ছিলেন তেরেসা। অল্পবয়সে তাঁর ভেতরে ইচ্ছা জাগে মানুষের সেবা করবেন, তাদের কষ্ট লাঘব করবেন। তেরেসার বয়স যখন আঠারো, তখন তিনি 'লরেটো সিস্টার্স' নামে খ্রিষ্টান মিশনারি দলে যোগ দেন। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে এরা কাজ করতেন। দার্জিলিং-এ 'লরেটো সিস্টার্স'দের আশ্রমে তিন বছর তিনি নান হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন। বাঙালিদের মধ্যে কাজ করার জন্য বাংলা ভাষাও রপ্ত করেন। এরপর কলকাতায় সেন্ট মেরি'জ স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব পান। ১৭ বছর সেখানে কাজ করেন তিনি। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সেবার আগ্রহ জাগাতে চেষ্টা করতেন তেরেসা। সপ্তাহে একদিনের টিফিনের পয়সা বস্তির দরিদ্র শিশুদের জন্য খরচ করতে তিনি উৎসাহ দিতেন তাদের।
বাংলার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা মাদার তেরেসাকে খুব বিচলিত করছিল। মানুষের সেবায় আরও কাজ করার জন্য মনে খুব তাগিদ অনুভব করছিলেন। অবশেষে ১৯৪৮ সালে লরেটো থেকে বিদায় নিয়ে তিনি শুরু করলেন একেবারে গরিবদের সেবার কাজ। গাউন ছেড়ে পরলেন শাড়ি-বাঙালি নারীর পোশাক। সেই থেকে তিনটির বেশি শাড়ি তার কখনো ছিল না। একটি পরার, একটি ধোয়ার, আরেকটি হঠাৎ দরকার কিংবা কোনো উপলক্ষের জন্য রেখে দেওয়া। তাঁর হাতে টাকা-পয়সাও বিশেষ ছিল না। তবে মনে ছিল গরিব-দুখি মানুষের জন্য ভালোবাসা আর প্রবল এক আত্মবিশ্বাস।
কলকাতার এক অতি নোংরা বস্তিতে তিনি প্রথম স্কুল খুললেন। বেঞ্চ-টেবিল কিছু নেই, মাটিতে দাগ কেটে শিশুদের শেখাতে লাগলেন বর্ণমালা। অসুস্থদের সেবার জন্য খুললেন চিকিৎসাকেন্দ্র। ধীরে ধীরে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন অনেক মানুষ। মাদার তেরেসার কাজের পরিধি ক্রমাগত বেড়ে চলল। তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন আরও অনেক নান। তাদের নিয়ে তিনি গড়লেন মানবসেবার সংঘ- 'মিশনারিজ অব চ্যারিটি'।
সবচেয়ে যারা গরিব, সবচেয়ে করুণ যাদের জীবন, তাদের সেবা করার ব্রত ছিল মাদার তেরেসার। মৃত্যুমুখী অসহায় মানুষের সেবার জন্য তিনি ১৯৫২ সালে কলকাতার কালিঘাটে 'নির্মল হৃদয়' নামে এক ভবন প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতায় ফুটপাতে সহায়-সম্বলহীন বহু মানুষের বাস। অসুখে ধুঁকে ধুঁকে তাঁদের অনেকের প্রায় মৃত্যুদশা। মরণাপন্ন এইসব মানুষকে বুকে তুলে নেন মাদার তেরেসা। নির্মল হৃদয়ে এনে মমতাময়ী মা কিংবা বোনের মতো তাদের সেবাযত্ন করেন।
রাস্তা থেকে তুলে আনা অনাথ শিশুদের আশ্রয় দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'শিশুভবন'। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য স্থাপন করেন 'নবজীবন আবাস'।
মাদার তেরেসার আরেকটি বড় কাজ কুষ্ঠরোগীদের আবাসন-'প্রেমনিবাস' প্রতিষ্ঠা। ভারতের টিটাগড়ে তিনি প্রথম এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এর আরো অনেক শাখা গড়ে তোলা হয়। কুষ্ঠরোগীদের শরীরে দুর্গন্ধময় দগদগে ঘা হয় বলে সমাজের অনেকে রোগীকে পরিত্যাগ করে। অসুখটা ছোঁয়াচে ভেবে রোগীর কাছ থেকে সবাই দূরে থাকে। ফলে কুষ্ঠরোগীদের জীবন হয়ে ওঠে খুব কষ্টের। মাদার তেরেসা নিজের হাতে কুষ্ঠরোগীদের সেবা করতেন। তাঁদের ঘা ধুইয়ে স্নান করিয়ে দিতেন। তাঁর সেবাকর্ম অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করত।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে প্রায় এক কোটি লোক ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের অত্যাচারে তারা দেশ ত্যাগ করেছিল। শরণার্থী শিবিরে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ রাখা খুব সহজ কাজ ছিল না। সেই সময়ে শিবিরের দুর্গত মানুষের সেবার কাজ করেন মাদার তেরেসা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশে শুরু করেন তাঁর 'মিশনারিজ অব চ্যারিটি'-র সেবাকাজ। ঢাকার ইসলামপুরে প্রথম শাখা গড়ে তোলা হয়। এরপর খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, সিলেট আর কুলাউড়াতে 'নির্মল হৃদয়' ও 'শিশুভবন' প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯১ সালের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ের পর একাশি বছর বয়সী মাদার তেরেসা বাংলাদেশে ছুটে আসেন। তিনি চেয়েছিলেন নিজহাতে দুর্গত মানুষের ত্রাণের কাজ করবেন। ভালোবাসা দিয়ে মানুষের জীবনকে শান্তিময় করার জন্য কাজ করে গেছেন মাদার তেরেসা। সেবাকাজে মানুষকেই সবচেয়ে বড় করে দেখেছিলেন তিনি। ধর্মের ফারাক, দেশের ভিন্নতা, জাতির পার্থক্য তিনি কখনো বিবেচনায় নেন নি। তাই সব দেশের সব ধর্মের মানুষের ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন। সেবাকাজের জন্য বহু সম্মাননা তিনি লাভ করেছেন, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো নোবেল পুরস্কার। সে পুরস্কার শান্তির কাজের জন্য। জীবনে কোনো পুরস্কারের অর্থই নিজের জন্য ব্যয় করেন নি মাদার তেরেসা, নোবেল পুরস্কারের অর্থও দান করেছেন দুঃখীজনের জন্য। সেই সাথে আরেকটি কাজ করেছিলেন। নোবেল পুরস্কার প্রদান উপলক্ষে সুইডেনের নোবেল কমিটি এক ভোজসভার আয়োজন করে। মাদার তেরেসা অনুরোধ করেছিলেন ভোজসভা বাতিল করে সেই অর্থ ক্ষুধার্ত মানুষদের দেওয়ার জন্যে। এই সংবাদ জানতে পেরে সুইডেন ও অন্যান্য দেশের মানুষ এগিয়ে আসেন। এঁদের মধ্যে স্কুলের অনেক ছাত্রছাত্রীও ছিল। তারা মাদার তেরেসাকে যে সাহায্য করেছিলেন সেটা ছিল নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্যের অর্ধেক।
১৯৯৭ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় এই সেবাব্রতীর মৃত্যু হয়।
সারা জীবন মাদার তেরেসা মানুষের সেবা করেছেন, সেই সাথে মানুষের সেবায় এগিয়ে আসতে অন্যদের অনুপ্রাণিত করেছেন। নীলপাড় সাদা শাড়িপরা ছোটখাটো এই মানুষটিকে তাই দুনিয়ার সবাই এক ডাকে চেনে। মানুষের মনে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মানবদরদি - মানুষের জন্য যার দরদ বা সমবেদনা আছে।
সন্ন্যাসব্রত - সংসারজীবন ত্যাগ করে তপস্যা ও সংযমের সাধনা।
মিশনারি - ধর্মপ্রচারক।
নান - গির্জা বাসিনী। সন্ন্যাসিনী। Nun.
অনাথ - মা-বাবা এবং অভিভাবক নেই যে-সব শিশুর। এতিম।
প্রশিক্ষণ - হাতে-কলমে বিশেষ শিক্ষা।
রপ্ত - আয়ত্ত। অভ্যাসের সাহায্যে শিখে নেয়া।
গাউন - মহিলাদের বিশেষ ধরনের পোশাক।
মিশনারিজ অব চ্যারিটি - পরের উপকারের উদ্দেশ্যে স্থাপিত প্রতিষ্ঠান, মানবসেবা সংঘ।
সেবাব্রতী - মানুষের সেবা করাই যার ব্রত।
ব্রত - সৎকাজ করার জন্যে কঠিন সাধনা ও ত্যাগ।
আবাসন - বসবাসের ব্যবস্থা।
পাকিস্তানিদের দোসর - ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী; রাজাকার, আলবদর ইত্যাদি বাহিনীর সদস্যবৃন্দ।
সম্মাননা - সম্মান দেখানো। সম্মানের স্বীকৃতি প্রদান।
নারী ও নারীর কর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলা, গরিব ও দুঃখী মানুষের সেবার প্রতি আগ্রহী করে তোলা।
মাদার তেরেসা একজন অসাধারণ মানবসেবী। তাঁর জন্মস্থান সুদূর আলবেনিয়া হলেও তিনি অবিভক্ত ভারতের বাংলা অঞ্চলের মানুষের দুঃখ দুর্দশায় বিচলিত হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি গরিব ও অসুস্থ মানুষের জন্য তৈরি করেন স্কুল ও চিকিৎসা কেন্দ্র। সমাজে অবহেলিত ও পরিত্যক্ত কুষ্ঠ রোগীদের তিনি নিজের হাতে সেবা করতেন, স্নান করাতেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া দুর্গত মানুষের সেবা করেন মাদার তেরেসা। পরে স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়ও খোলা হয় তাঁর মানবসেবা প্রতিষ্ঠান। দেশ, ধর্ম, জাতির পার্থক্য না করে সেবাকাজে মানুষকেই বড় করে দেখেছিলেন তিনি। এ জন্য সব দেশের এবং সব ধর্মের মানুষের কাছেই তিনি পেয়েছেন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান। নোবেল পুরস্কার তাঁর তেমনই একটি অর্জন।
সন্জীদা খাতুন ১৯৩৩ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর সন্জীদা খাতুন প্রধানত প্রবন্ধকার এবং গবেষক। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী হিসেবে তাঁর খ্যাতি আছে। সন্জীদা খাতুন সাহিত্য ও গবেষণাকর্মের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছেন। সংস্কৃতিক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য অর্জন করেছেন বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে 'সত্যেন্দ্র-কাব্য পরিচয়', 'রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ', 'ধ্বনি থেকে কবিতা', 'অতীত দিনের স্মৃতি' উল্লেখযোগ্য।
১. মানবসেবায় অবদান রেখেছেন এমন পাঁচজন ব্যক্তির কর্মজগৎ নিয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা কর।
২. তোমার পরিচিত যে-সব মানুষ ছোটখাটো দান ও সেবার মধ্যদিয়ে মানুষের কল্যাণ সাধন করতে চেষ্টা করছেন তাদের সম্পর্কে লেখ।
Read more