দুটির মূলে রয়েছে জন্ম বা বংশ। আধুনিককালে জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। জাতি হচ্ছে জাতীয়তাবাদী চেতনারই ফসল। জাতীয়তার বেশকিছু উপাদান রয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক ঐক্যই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক উন্মেষের ফলে।
জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য কী কী? ব্যাখ্যা কর।
(প্রয়োগ)
জাতি বলতে বোঝায় এমন এক রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন জনসমাজ যারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিবাসী। অপরদিকে, কোনো জনসমাজের। মধ্যে যখন রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চার হয় তখন তাকে জাতীয়তা বলে। জাতি ও জাতীয়তার মূল পার্থক্য হলো রাজনৈতিক চেতনা। এছাড়াও জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে নিম্নলিখিত পার্থক্য লক্ষ করা যায়।
জাতীয়তা গঠনে ভাষা, সাহিত্য, ঐতিহ্য, ইতিহাস ধর্ম প্রভৃতির মিল থাকতে হয়। অপরদিকে, জাতি গঠনের মূল হচ্ছে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ জনসমাজ ও স্বাধীনতা।
জাতীয়তা মূলত এক ধরনের মানসিক ধারণা। আর জাতি হচ্ছে একটি সক্রিয় ধারণা।
জাতীয়তা হচ্ছে জাতি গঠনের প্রাথমিক পর্যায় আর জাতি হচ্ছে জাতি গঠন প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ ও সর্বশেষ পর্যায়।
জাতীয়তার জন্য রাজনৈতিক সংগঠন আবশ্যক নয় কিন্তু জাতি গঠনের জন্য রাজনৈতিক সংগঠন অপরিহার্য।
জাতীয়তা খুব বেশি সুসংহত ও স্বাধীন নয়, কিন্তু জাতি অনেকাংশে সুসংহত স্বাধীন ও সার্বভৌম।
জাতীয়তা গঠনে ভাবগত উপাদান হচ্ছে প্রধান আর জাতি রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত জনসমষ্টি।
জাতীয়তা অধিকতর কম স্থায়ী কিন্তু জাতি অধিকতর স্থায়ী একটি জনসমষ্টি।
জাতীয়তাবাদ একটি মহান আদর্শ, যা মূলত এক প্রকার মানসিক অনুভূতি। বিভিন্ন উপাদান থেকে এর উৎপত্তি। কিন্তু এ জাতীয়তাবাদ যদি এমন হয় যে, তা অন্য জাতিকে ঘৃণা করতে শেখায়, নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায় এবং অন্যকে নিজের অধীন রাখার মতো হীনমানসিকতাকে জাগিয়ে তোলে, তবে তা হবে উগ্র জাতীয়তাবাদ। এটি একটি বিবৃত মানসিকতা যা ব্যক্তিকে অন্ধ দেশপ্রেমে প্রলুব্ধ করে। জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনী এরূপ জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিল, যার ফলাফল প্রলয়ঙ্করী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি ঐতিহাসিক বিষয়। এর বিকাশ ঘটেছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করে, যা প্রধান শিক্ষক উদ্দীপকে উল্লেখ করেছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশের পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক মাইলফলক। বাঙালি দামাল ছেলেরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক ইতিহাস রচনা করে। এ ভিত্তিতেই রচিত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশ। ৫২'র ভাষা আন্দোলন ছিল স্বাধিকার আদায়ের প্রথম ধাপ। এ আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ৫৪'র নির্বাচন, ৬২'র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬'র ছয় দফা, ৬৯'র গণঅভুত্থান, ৭০'র নির্বাচন এবং ৭১'র স্বাধীনতা অর্জিত হয়। এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে। বাঙালি জাতি এক ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিজয় অর্জনে এটি আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
জাতীয়তা একটি বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রত্যয়। এটি গড়ে ওঠার পেছনে অনেকগুলো factor কাজ করে থাকে। উদ্দীপকে প্রধান অতিথি যে কথাটি বলেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা শুধু ভাষাগত মিল একটি জাতীয়তা নির্মাণের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশের ভাষা ইংরেজি হলেও তারা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা জাতি। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের লোকজনের ভাষা এক হওয়া সত্ত্বেও এরা আলাদা দুটি জাতি। আবার ভারত বহু ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীর দেশ হলেও তাদের জাতীয়তা এক। এভাবে ভাষাগত সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য একরূপ জাতীয়তা সৃষ্টি বা আলাদা করতে ভূমিকা পালন নাও করতে পারে। জাতীয়তা নির্মাণের পথ অত্যন্ত জটিল ধারায় আবর্তিত হয়।
জাতীয়তা নির্ধারণের অন্যান্য যেসব উপাদান রয়েছে তার মধ্যে প্রধান হলো একই ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, সাহিত্য, ভৌগোলিক ঐক্য, মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য, রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক অভিন্ন উদ্দেশ্য ইত্যাদি। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির লোক জড়ো হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন বসবাস করছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য তাদেরকে একই সূত্রের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে এবং শক্তিশালী জাতীয়তা নির্মাণে সহায়তা করেছে। তাদের সবার জাতীয়তা নির্ধারিত হয়েছে মার্কিনী। এরূপ কালের পরিক্রমায় দীর্ঘ পরিসরে মানুষের জীবনধারার প্রেক্ষিতে একটি জাতীয়তা গড়ে উঠেছে। অনুরূপভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের মধ্যেও ইতিহাসের বিবর্তন ধারায় গড়ে উঠেছে জাতীয় চেতনা। এ চেতনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে জাতীয়তাবোধ। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এরূপ লক্ষ করা যায়। Activate
জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ জনসমষ্টির রাষ্ট্রগুলোকে জাতি-রাষ্ট্র বলা হয়। জাতীয়তার উপাদানগুলোর মাধ্যমে সংগঠিত ও স্বাধীন হয়ে এরূপ রাষ্ট্র গঠিত হয়। জাতিরাষ্ট্র ধারণার প্রবক্তা ম্যাকিয়েভেলি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি জাতি-রাষ্ট্র।