বাংলাদেশে শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে একজন শিক্ষাবিদ তার আলোচনায় বলেন, একজন ইংরেজ শাসক উপমহাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারসাধন করে আমাদের পথনির্দেশ করে দিয়েছেন। তার সংস্কারের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা মহাপরিচালক নিয়োগের মতো বড় বড় কাজ হয়।
ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্ধারিত তারিখে সূর্যাস্তের আগে সরকারি রাজস্ব পরিশোধে ব্যর্থ হলে ভূমি নিলামে তুলে বকেয়া আদায়ের যে কঠোর আইন ছিল, তাকে সূর্যাস্ত আইন বলে। ১৭৯৩ সালে সূর্যান্ত আইন প্রণয়ন করা হয়। এ আইন অনুযায়ী জমিদারদের নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করতে হতো। যেসব জমিদার ঐ সময়ের মধ্যে রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হতেন, তাদের জমিদারি নিলামে তোলা হতো। সূর্যান্ত আইনের কবলে পড়ে বাংলার অসংখ্য জমিদার, বিশেষ করে মুসলমান ভূস্বামীরা তাদের জমিদারি হারান
উদ্দীপকে বর্ণিত আইনে ব্রিটিশ ভারতের নিয়ামক আইন বা রেগুলেটিং অ্যাক্ট-এর প্রতিফলন ঘটেছে। দ্বৈতশাসনের কারণে সৃষ্ট জটিলতা ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের ফলে বাংলায় ব্যাপক মানবীয় বিপর্যয় ঘটে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়। তারা কোম্পানিকে দেউলিয়াত্বের পর্যায়ে নিয়ে যায়। এরপর ১৭৭২ সালে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ওয়ারেন হেস্টিংসকে বাংলার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তার দায়িত্ব ছিল এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো। ১৭৭৩ সালে তিনি 'নিয়ামক আইন' প্রণয়ন করেন, যা কোম্পানিকে ভারতের শাসক হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়। মূলত এ আইনটি ছিল কোম্পানির ভারতীয় সাম্রাজ্য সম্পর্কে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও কোম্পানি কর্তৃপক্ষের মধ্যকার একটি আপোস রক্ষামূলক ব্যবস্থা। উদ্দীপকে দেখা যায়, কোম্পানি পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠার সময় কিছু আইন প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিটির ব্যাপক বিস্তৃতির ফলে বেশ কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং আইনের কয়েকটি ধারা অকার্যকর প্রমাণিত হয়। এ প্রেক্ষিতে কোম্পানির ব্যবস্থাপককে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। নতুন আইনটি কোম্পানির ব্যবসা বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে বর্ণিত আইনে ব্রিটিশ ভারতের নিয়ামক আইনেরই প্রতিফলন ঘটেছে
উক্ত আইন অর্থাৎ নিয়ামক আইনের ত্রুটি বিশ্লেষণসহ আমার মতামত নিম্নরূপ- প্রথমত, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এ আইনের মাধ্যমে কোম্পানির ভারতীয় সাম্রাজ্যের ওপর সার্বস্ট্রেীম ক্ষমতা স্থাপন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। কেননা, এ আইনে সার্বভৌমত্ব কার্যকর করার জন্য কোনো এজেন্সি গঠনের প্রস্তাব করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত, এ আইনের দ্বারা মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির ওপর কলকাতা প্রেসিডেন্সির কর্তৃত্ব স্থাপন করা হয়। কিন্তু কর্তৃত্বের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট না থাকায় পরবর্তীতে বহু জটিলতার সৃষ্টি হয়। তৃতীয়ত, গভর্নর জেনারেল ও তার পরিষদের কর্তৃত্বের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট না হওয়ার সুযোগে মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সি স্বাধীনভাবে চলতে চেষ্টা করে। এর ফলে বাংলা প্রেসিডেন্সির সাথে মতবিরোধ দেখা দেয়। চতুর্থত, গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কাউন্সিলের সদস্যবর্গ এবং সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতির নিয়ন্ত্রণ ছিল। এতে শাসনকার্যে অনেক অসুবিধার সৃষ্টি হয়। পঞ্চমত, ভারতে ব্রিটিশ নাগরিকদের ওপর সুপ্রিমকোর্টের এখতিয়ার স্থাপন করা হলেও এ আইনে ব্রিটিশ নাগরিকদের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট না 'হওয়ায় কোর্টের সাথে কাউন্সিলের সদস্যদের নানা বিষয়ে মতানৈক্য দেখা যায়। ষষ্ঠত, সেসময় সুপ্রিমকোর্ট ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করতো। অপরদিকে, গভর্নর জেনারেল ও তার কাউন্সিল ভারতীয় আইন দ্বারা সদর দেউয়ানি আদালত ও সদর নিজামত আদালতগুলোতে বিচারকার্য চালাতো। ফলে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, নিয়ামক আইনের উদ্দেশ্য মহৎ ছিল, কিন্তু এ আইনের সৃষ্ট ব্যবস্থা ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনে যেসব গভর্নর জেনারেল অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, লর্ড ওয়েলেসলি তাদের অন্যতম। তিনি নতুন ইংরেজ কর্মচারীদের শিক্ষার জন্য কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে একটি কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব করেন। কিন্তু বোর্ড অব ডাইরেক্টরস তার এ পরিকল্পনা অনুমোদন না করায় পরে তা ভারতীয় ভাষা শিক্ষার কলেজে পরিণত হয়।