নটরডেম কলেজের ছাত্র রণদীপ সমাজবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে মধ্যযুগের তিউনিসে জন্মগ্রহণ করা একজন মুসলিম দার্শনিকের তত্ত্ব পড়ে আকৃষ্ট হয়। সমাজের উত্থান-পতন সম্পর্কে সে এই দার্শনিকের তত্ত্বকেই সঠিক এবং অভ্রান্ত মনে করত। একদিন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সিফাত তাকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক হিসেবে বিখ্যাত জনৈক জার্মান দার্শনিকের সমাজের বিকাশ সম্পর্কিত তত্ত্ব বুঝিয়ে দেয়। তত্ত্বটি জানার পর রণদীপ সমাজ ও সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করে।
সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সমাজের বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।
(অনুধাবন)
সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সমাজের বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।
(অনুধাবন)
Earn by adding a description for the above question! 🏆✨
Provide correct answer/description to Question, help learners, and get rewarded for your contributions! 💡💰'
জার্মান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের সমাজ বিশ্লেষণের পদ্ধতি হলো আদর্শ নমুনা।
ওয়েবারের মতে, কোনো সামাজিক প্রপঞ্চ কিংবা ঐতিহাসিক সত্তাকে জানতে বা বিশ্লেষণ করতে হলে তার আদর্শ নমুনা তৈরি করতে হবে। আর এ নমুনা তৈরির জন্য বিজ্ঞানীকে অন্তর্দৃষ্টির আশ্রয় নিতে হবে। বিশেষ করে একটি প্রপঞ্চের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও যৌক্তিকতাকে আদর্শ ধরে নিয়ে অন্য প্রপঞ্চকে তার সাথে মিল বা অমিলের ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। ম্যাক্স ওয়েবারের 'আদর্শ নমুনা' সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতির প্রবর্তন। তিনি আমলাতন্ত্রকে 'আদর্শ নমুনা' তত্ত্বের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেছেন।
জাউদ্দীপকে উল্লিখিত মানুষের শ্রমবিভাজন ও আত্মহত্যাতত্ত্ব ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের।
উনিশ শতকের অন্যতম সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম তার 'The Division of Labour in Society' গ্রন্থে আধুনিক শিল্পসমাজে শ্রমবিভাজনের অস্বাভাবিক রূপ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি এর দু'টি প্রধান অস্বাভাবিক রূপকে চিহ্নিত করেন। এগুলো হলো, নৈরাজ্যমূলক এবং বাধ্যতামূলক শ্রমবিভাজন। নৈরাজ্যমূলক শ্রমবিভাজনটি শ্রমের চরম বিশেষীকরণের ফল। এক্ষেত্রে ব্যক্তি তার বিশেষীকৃত কর্মক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বাধ্যতামূলক শ্রমবিভাজন হলো এমন একটি অবস্থা, যাতে ব্যক্তি তার পছন্দ অনুযায়ী বৃত্তি নির্বাচনের সুযোগ পায় না। ফলে বাধ্যতামূলকভাবে তাকে যেকোনো একটি বৃত্তি গ্রহণ করতে হয়। ডুর্খেইম বলেন, ব্যক্তির যোগ্যতাকে অস্বীকার করে এভাবে তার ওপর শ্রম চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক সংঘাতের মূল কারণ।
এমিল ডুর্খেইম তার 'The Suicide' গ্রন্থে আত্মহত্যা সম্পর্কে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, আত্মহত্যা হলো ব্যক্তিগত ঘটনা কিন্তু আত্মহত্যার হার সামাজিক ঘটনা। কারণ আত্মহত্যা ঘটনাবলির পরিসংখ্যান গ্রহণ এবং এর পরিমাণও নিরূপণ করা যায়। ফলে এটি কেবল আত্মহত্যা হিসেবেই বিবেচ্য থাকে না, বরং তা সামাজিক ঘটনায় পরিণত হয়। ডুর্খেইম আত্মহত্যাকে তিনভাগে ভাগ করেছেন। যথা- আত্মকেন্দ্রিক, পরার্থমূলক এবং নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা।
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায় যে, উদ্দীপকে উনিশ শতকের অন্যতম পথিকৃৎ সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম প্রদত্ত শ্রমবিভাজন ও আত্মহত্যাতত্ত্বের উল্লেখ রয়েছে।
লাউদ্দীপকে উল্লিখিত মুসলিম মনীষী হচ্ছেন ইবনে খালদুন।
খালদুন ১৩৩২ খ্রিষ্টাব্দে তিউনিসের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অর্থাৎ জন্মসাল অনুযায়ী তিনি চৌদ্দ শতকের মনীষী। এছাড়া ইবনে খালদুনই সর্বপ্রথম মানুষ সম্পর্কে একটি বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব এবং সামাজিক বা গোষ্ঠী সংহতিকে ব্যাখ্যা করেন, যেমনটা উদ্দীপকে বলা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে আমি ইবনে খালদুনকে পথিকৃৎ দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে মূল্যায়ন করব।
ইবনে খালদুন বিশ্বের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে 'কিতাবুল ইবার' নামে যে গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন তার ভূমিকা 'আল-মুকাদ্দিমা' নামে পরিচিত। এ গ্রন্থটিতে তিনি তার সমসাময়িককালের ইতিহাসবেত্তাদের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ত্রুটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ইবনে খালদুন বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু রাজনৈতিক ঘটনার নিছক বর্ণনা ইতিহাসের বিষয়বস্তু হতে পারে না। তাই তিনি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। এজন্য ইবনে খালদুন একটি নতুন বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। এ নতুন বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু ও পদ্ধতি হবে সুনির্দিষ্ট, যা সত্যিকারের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনায় সাহায্য করবে। ইবনে খালদুন তার এ নতুন বিজ্ঞানের নাম দেন 'আল-উমরান' বা সংস্কৃতির বিজ্ঞান। এ বিজ্ঞান সব ধরনের মানব প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তি, প্রকৃতি ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করবে। ইবনে খালদুন প্রদত্ত 'আল-উমরান'কে সমাজবিজ্ঞান বলা যেতে পারে। কারণ মানবসমাজই এ বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু। এছাড়া 'আল আসাবিয়া' ইবনে খালদুনের সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাধারার কেন্দ্রীয় প্রত্যয়। 'আসাবিয়া' প্রত্যয়টির অর্থ হলো সামাজিক বা গোত্র সংহতি। ইবনে খালদুনের মতে, সমাজের ভিত্তি হচ্ছে গোত্র সংহতি। সমাজ সম্পর্কে তার এ চিন্তাধারা পরবর্তীকালে পৃথক শাস্ত্র হিসেবে সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছিল। এ কারণেই মহান এই মুসলিম মনীষীকে সমাজবিজ্ঞানের 'আদি জনক' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পরিশেষে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞানের মূলভিত্তি রচনায় ইবনে খালদুনের অবদান অপরিসীম।
উদ্দীপকে মুসলিম দার্শনিক ইবনে খালদুনের কথা বলা হয়েছে।
মুসলিম ঐতিহাসিক, সমাজ দার্শনিক ইবনে খালদুনের জন্ম তিউনিসে। সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশে তাকে পথিকৃৎ দার্শনিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। কারণ সমাজবিজ্ঞানের ধারণা তার সময় অস্পষ্ট ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মানুষের সমাজ ও তার সভ্যতা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অর্জিত উন্নতিকে এক অবিচ্ছিন্ন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে 'Umran' ধারণাটি ব্যবহার করেন। 'Umaranayat' শব্দের অর্থ 'সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনা', যা পরবর্তীকালে সমাজবিজ্ঞানীরা 'সমাজবিজ্ঞান' হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইবনে খালদুন রচিত বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ 'কিতাব-আল-ইবার' এর ভূমিকা 'আল-মুকাদ্দিমা'তে সমাজ, সভ্যতা ও ইতিহাসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। তিনি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও যুক্তির আলোকে ইতিহাস রচনা করতে চেয়েছিলেন যা পরে এক ধরনের সামাজিক দর্শনে পরিণত হয়। সমাজ সম্পর্কে ইবনে খালদুনের এসব চিন্তাধারা পরবর্তীকালে পৃথক শাস্ত্র হিসেবে সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছিল।
উদ্দীপকের ছাত্র রণদীপ সমাজবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে মধ্যযুগের তিউনিসে জন্মগ্রহণ করা একজন মুসলিম দার্শনিকের তত্ত্ব পড়ে আকৃষ্ট হয়। সমাজের উত্থান-পতন সম্পর্কে সে এই দার্শনিকের তত্ত্বকেই সঠিক ও অভ্রান্ত বলে মনে করত। উপরের আলোচনায় স্পষ্ট যে রণদীপ যে মুসলিম দার্শনিকের তত্ত্ব পাঠ করেছিল তিনি হচ্ছেন দার্শনিক ইবনে খালদুন। সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশে তার ভূমিকা অপরিসীম।