ভাগ্য বিড়ম্বিত যুবক ইরফান। পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলের অধিপতি ছিলেন। কিন্তু নিকট আত্মীয়দের ষড়যন্ত্রের কারণে ঐ রাজ্য তার হাতছাড়া হয়ে যায়। এ অবস্থায় তিনি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পার্শ্ববর্তী রাজ্য আক্রমণ করেন। উন্নত রণনীতি ও সমরাস্ত্রের সাহায্যে প্রতিবেশীর বিশাল সৈন্যবাহিনীকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। অতঃপর ঐ রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি নতুন সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করার গৌরব অর্জন করেন।
'মোঙ্গ' শব্দ থেকে মোঙ্গল এবং মোঙ্গল থেকে মুঘল নামের উৎপত্তি ঘটেছে। তারা আদি বাসভূমি মঙ্গোলিয়া ছেড়ে মধ্য এশিয়ার পশ্চিম অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে মুঘল নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৫২৬ খ্রি. মুঘলরা ভারতের সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতবর্ষের শাসক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত এরপর থেকেই মুঘলরা একটি বৃহৎ জাতিগঠনে অবদান রাখতে শুরু করে।
উদ্দীপকের সাথে ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ ব্যবরের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পর মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবর ফারগানার সিংহাসনে উপবিষ্ট হন। সিংহাসন লাভের পর পরই তার দুই পিতৃব্য ও আত্মীয়স্বজন এবং উজবেক নেতা সাইবানি খানের রিরোধিতার মুখে পড়েন। ১৪৯৭ খ্রিষ্টাব্দে বাবর সমরখন্দ দখল করেন। কিন্তু ভাগ্যবিপর্যয়ে পতিত হয়ে তিনি সমরখন্দ হারান। ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ফারগানাও হস্তচ্যুত হয়। অর্থাৎ দাবার ছকের রাজার মতো বাবর স্থান থেকে স্থানান্তর ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কিন্তু ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফারগানা পুনরুদ্ধার করেন। ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে সমরখন্দ অধিকার করেন। পরবর্তীকালে ১৫০৩ খ্রিষ্টাব্দে আরচিয়ানের যুদ্ধে সাইবানি খানের কাছে পরাজিত হয়ে ফারগানা ও সমরখন্দ থেকে বিতাড়িত হন। এ সময় কাবুলের অভ্যন্তরীণ অরাজকতার সুযোগে ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে কাবুল অধিকার করে
বাদশাহ উপাধি নিয়ে রাজত্ব করতে থাকেন। ১৫১১ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের শাহ ইসমাইল সাফাভীর সহযোগিতায় সমরখন্দ দখল করলেও ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে তা আবারও হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপর ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি কাবুলেই রাজত্ব করেন। কিন্তু অসাধারণ সাহসী বাবর এতেই সন্তুষ্ট থাকেননি। ১৫২৬ খ্রি. তিনি পানিপথের প্রথম যুদ্ধে সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের ভাগ্য বিড়ম্বিত যুবুক ইরফান ও ভারতবর্ষে মুঘল শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বাবরই অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ।
উদ্দীপকে সম্রাট বাবরের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সম্রাট বাবর কেবল নির্ভীক সৈনিক, দক্ষ সেনাধ্যক্ষ, সুদক্ষ অস্ত্র পরিচালক, প্রশংসনীয় ঘোড়সওয়ারই ছিলেন না; বরং আলেকজান্ডারের মতো দেশ জয়ের নেশায় বিভোর থাকতেন। পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, খানুয়ার যুদ্ধ এবং গোগরার যুদ্ধে তার সাফল্য তাকে ভারতীয় সমর ইতিহাসে উচ্চাসনে- অধিষ্ঠিত করেছে। বাবর মাত্র ১১ বছর বয়স থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হন। বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে তিনি প্রথমে কাবুলে এবং পরে ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। শুধু প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হননি, তার ভিত্তি সুদৃঢ় করে একে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করেন।
বাবরের চার বছরের শাসনামলে যুদ্ধবিগ্রহ কেটে যায়। এ অবস্থায় নবপ্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় কোনো প্রকার পরিবর্তন ও সংস্কার সাধন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তথাপি তিনি নিজেকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হ্রাস করেন। প্রাদেশিক শাসনকার্য পরিচালনার জন্য প্রত্যেক প্রদেশে একজন ওয়ালি (প্রাদেশিক কর্মকর্তা), একজন দিওয়ান (রাজস্ব কর্মকর্তা), শিকদার (সামরিক কর্মকর্তা) এবং কোতওয়াল (নগরকর্তা) ছিল। তিনি প্রশাসনিক কাজে তুর্কি, আফগান ও হিন্দুদের সমান সুযোগ দিতেন। সমগ্র সাম্রাজ্যে ১৫ মাইল অন্তর তিনি ডাক চৌকির ব্যবস্থা করেন। প্রজারঞ্জক বাবর দিল্লি ও আগ্রায় ২০টি উদ্যান, বহু পাকা নর্দমা, সেতু, অট্টালিকা নির্মাণ করেন। পরিশেষে বলতে পারি, সম্রাট বাবর শুধুমাত্র একজন বিজেতা হিসেবেই প্রশংসার দাবিদার নন, বরং একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও তিনি কৃতিত্বের দাবিদার। তাই সার্বিকভাবে বাবরের শাসনকাল কৃতিত্বপূর্ণ একথা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।
ফিরোজশাহ তুঘলক দিওয়ান-ই-বন্দেগান গঠন করেন কারণ, তিনি ছিলেন ক্রীতদাসদের প্রতি অনুরক্ত। তাই তিনি সিংহাসনে আরোহনের পর একটি বিরাট ক্রীতদাস বিভাগ গড়ে তোলেন। তার আমলে ক্রীতদাসের সংখ্যা ছিল ১,৮০,০০০, যার মধ্যে ৪০,০০০ ক্রীতদাস সুলতানের প্রাসাদে অবস্থান করত। সুলতান তাদের বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ-সুবিধার জন্যই 'দিওয়ান-ই-বন্দেগান' গঠন করেন।
উদ্দীপকের মুহিবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ যে সম্রাট ভারতবর্ষে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। উদ্দীপকের জনাব মুহিব উত্তরাধিকারসূত্রে ছোট্ট একটি শিল্প কারখানার মালিক হন। কিন্তু আর্থিক সংকট ও শ্রমিক বিদ্রোহের কারণে অল্প কিছুদিনের মধ্যে কারখানাটি হাতছাড়া হয়ে গেলে উদ্যমি মুহিব শূন্য অবস্থা থেকে আবার শুরু করেন। স্বীয় মেধা ও পরিশ্রম দ্বারা অনেকগুলো শিল্পকারখানা গড়ে দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতিতে পরিণত হন। তদ্রুপ, ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর ছিলেন ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কষ্টসহিষ্ণু, আত্মবিশ্বাসী ও সমরকুশলী। তিনি বাল্যকাল হতে একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছিলেন। পূর্বপুরুষদের বাসভূমি মধ্য এশিয়ার সুবিধা করতে না পেরে তিনি ভারতবর্ষের দিকে নজর দেন। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান, ঐশ্বর্য ও ধনসম্পদ, রাজনৈতিক অনৈক্য, সামরিক দুর্বলতা, ভারতীয় সুলতান • ইব্রাহিম লোদী বিরোধীদের তৎপরতা 'বাবরকে দিল্লি আক্রমণে প্রলুব্ধ করে। লাহোরের শাসনকর্তা দৌলত খান লোদীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সম্রাট বাবর ভারত দখল করেন। এভাবে উদ্দীপকের মুহিবের মতো তিনি স্বীয় প্রতিভা ও যোগ্যতাবলে শূন্য থেকে প্রথম শ্রেণির শাসক তথা সম্রাট পদে অধিষ্ঠিত হন।