মানুষ পাপ করে ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে গেলেও মানুষের জন্য ঈশ্বরের সীমাহীন ভালোবাসা একটুও কমে যায়নি। তিনি মানুষকে কথা দিলেন যে, তিনি একজন ত্রাণকর্তাকে পাঠাবেন। ঈশ্বরের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মারীয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ঈশ্বরের আহ্বানে মারীয়ার সাড়াদান আমাদের জীবনের জন্য অনুপ্রেরণাস্বরূপ। আমরা অন্তরের গভীরে দৃঢ় বিশ্বাস ও ভক্তিসহকারে এই অধ্যায়টি পাঠ করব এবং আমাদের জীবনে ঈশ্বরের আহ্বান উপলব্ধি করতে ও সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
মানবজাতির পতন ও ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি থেকেই শুরু হয়েছে মুক্তির পরিকল্পনা। সাপের বেশ ধরে আসা শয়তানকে ঈশ্বর বলেছিলেন: "তোমার ও নারীর বংশের মধ্যে, তোমার বংশ ও তার বংশের মধ্যে আমি এক শত্রুতা জাগিয়ে তুলব, তার বংশের মানুষ তোমার মাথায় আঘাত হানবে আর তুমি তাদের পায়ের গোড়ালিতে ছোবল মারবে।" এই প্রতিশ্রুাতির মধ্যে এক নারীর কথা ও তাঁর বংশের কথা উল্লেখ আছে।
মারীয়া ছিলেন নাজারেথের এক কুমারী কন্যা। জাতিতে তিনি ছিলেন ইহুদি। তাঁর বাবা ছিলেন যোয়াকিম এবং মা আন্না। জন্মের পূর্ব থেকেই মারীয়াকে তাঁর বাবা ও মা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলেন। আর ঈশ্বর তাঁর পুত্রের জননী হবার জন্য মারীয়াকে নিষ্পাপ অবস্থায় পৃথিবীতে এনেছিলেন।
একদিন ঈশ্বর মারীয়ার কাছে স্বর্গদূত গাব্রিয়েলকে পাঠালেন। মারীয়া ছিলেন যোসেফ নামক দাউদ বংশীয় একজনের বাগদত্তা। স্বর্গদূত তাঁর কাছে এসে বললেন: "প্রণাম মারীয়া। পরম আশিসধন্যা তুমি! প্রভু তোমার সঙ্গেই আছেন!" এই কথা শুনে মারীয়া খুব বিচলিত হলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, এমন সম্ভাষণের অর্থ কী? স্বর্গদূত তখন মারীয়াকে বললেন: "ভয় পেয় না, মারীয়া! তুমি ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করেছ। শোন, গর্ভধারণ করে তুমি একটি পুত্রের জন্ম দেবে। তাঁর নাম রাখবে যীশু। তিনি মহান হয়ে উঠবেন, পরাৎপরের পুত্র বলে পরিচিত হবেন। প্রভু ঈশ্বর তাঁকে দান করবেন তাঁর পিতৃপুরুষ দাউদের সিংহাসন। যাকোব-বংশের ওপর তিনি চিরকাল রাজত্ব করবেন; অশেষ হবে তাঁর রাজত্ব।"
মারীয়া তখন দূতকে বললেন: "তা কী করে হবে? আমি যে কুমারী?" উত্তরে দূতটি বললেন: "পবিত্র আত্মা এসে তোমার ওপর অধিষ্ঠান করবেন, পরাৎপরের শক্তিতে আচ্ছাদিত হবে তুমি। তাই এই যাঁর জন্ম হবে, সেই পবিত্রজন ঈশ্বরের পুত্র বলেই পরিচিত হবেন। আর দেখ, তোমার আত্মীয় এলিজাবেথ, সে-ও বৃদ্ধবয়সে একটি পুত্রকে গর্ভে ধারণ করেছে। লোকে যাকে কথ্যা বলে ডাকত, তাঁরই এখন ছয় মাস চলছে। কারণ ঈশ্বরের অসাধ্য কিছুই নেই।!" মারীয়া তখন বললেন: "আমি প্রভুর দাসী। আপনি যা বলছেন, আমার তাই হোক!" (লুক:১:২৬-৩৮)।
কাজ: মারীয়ার কাছে দূত-সংবাদের ঘটনাটি অভিনয় করে দেখাও। অভিনয় শেষে দূতের বন্দনা প্রার্থনাটি একসঙ্গে বলো। |
বাইবেলের এই অংশটুকু পাঠ করলে আমরা দেখতে পাই স্বর্গদূতের মধ্য দিয়ে ঈশ্বর মারীয়ার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পাঠালেন। মুক্তিদাতার মা হবার জন্য তিনি মারীয়াকে আহ্বান জানালেন। আর মারীয়া প্রথমে বিচলিত হলেও ঈশ্বরের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি পুরোপুরিভাবে ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সঁপে দিলেন। তিনি বললেন, "আমি প্রভুর দাসী! আপনি যা বলছেন, আমার তাই হোক!"
নাজারেথের কুমারী কন্যা মারীয়া অতি সাধারণভাবেই জীবনযাপন করছিলেন। আর দশটি সাধারণ মেয়ের মতোই মারীয়া যোসেফকে নিয়ে ঘর করার স্বপ্ন দেখছিলেন। কারণ যোসেফের সাথে তাঁর বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়েছিল। মারীয়া ও যোসেফের মধ্যে বাগ্দান হয়েছিল। আর ঠিক সেই সময় দূতের এই সংবাদ তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল। তারপর অবিবাহিত অবস্থায় সন্তান গর্ভে ধারণ করার বিষয়টিও যে অসম্ভব তা নিয়েও মারীয়া গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে পুরোপুরিভাবে ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিলেন। কারণ ঈশ্বরের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আস্থা ও বিশ্বাস। তিনি ছিলেন অতি পবিত্র, ধার্মিক ও ঈশ্বরভক্ত নারী। ঈশ্বরের যে-কোনো ইচ্ছা পালনে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও উন্মুক্ত। নিজেকে তিনি ঈশ্বরের দাসী বলেছেন। স্বর্গদূত যখন তাঁকে বললেন যে ঈশ্বরের কাছে সবই সম্ভব, তখন মারীয়া তাঁর জীবনে ঈশ্বরের যে-কোনো ঘটনাই ঘটতে দিতে রাজি হলেন। এতে তাঁর কী হবে, সমাজের লোকেরা কী ভাববে বা বলবে এ ধরনের কোনো বিষয়ে তিনি চিন্তা করেননি। তাঁর পুরো জীবন দিয়ে তিনি শুধু ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন করবেন এটাই ছিল তাঁর একান্ত ইচ্ছা।
কাজ: তোমার জীবনে তুমি কীভাবে ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন কর তা দলের সাথে সহভাগিতা করো। |
খ্রীষ্টের সঙ্গে মারীয়ার সম্পর্ক কোনোক্রমেই বিচ্ছিন্ন করা যায় না। কারণ মারীয়া প্রকৃত অর্থেই ঈশ্বর ও মুক্তিদাতার মা। আমরাও তাঁকে এভাবে স্বীকৃতি দেই ও সম্মান করি। যে কারণে খ্রীষ্ট ও মারীয়ার সম্পর্ক বিছিন্ন করা যায় না, ঠিক সেই কারণেই খ্রীষ্টমন্ডলীর সঙ্গে মারীয়ার বন্ধনও বিচ্ছিন্ন করা যায় না। মানবজাতির পরিত্রাণকাজে পুত্রের সঙ্গে মাতার একাত্মতা ছিল। এই একাত্মতা কুমারীর গর্ভে যীশুর আগমন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে।
১। অনুগৃহীতা: প্রভুর আগমনবার্তা ঘোষণার সময় মহাদূত গাব্রিয়েল তাঁকে 'অনুগৃহীতা' বলে সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন। এই বিশেষ সময় মারীয়া যেন তাঁর বিশ্বাসের গুণে ঈশ্বরের আহ্বানে সাড়া দিতে পারেন তার জন্য 'অনুগ্রহে পূর্ণ' হওয়া খুব দরকার ছিল। মারীয়া আশিসধন্যা হয়েছেন ও তাঁর পবিত্রতা এসেছে সম্পূর্ণরূপে খ্রীষ্টের কাছ থেকে। "খ্রীষ্টের পুণ্য ফলে তিনি এক মহত্তর উপায়ে পরিত্রাণ লাভ করেছেন ।
২। বাধ্যতা: স্বর্গদূত মারীয়াকে বলেছিলেন যে পবিত্র আত্মার শক্তিতে তিনি একটি পুত্রের জন্ম দেবেন। বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে অসম্ভব মনে হলেও মারীয়া বিশ্বাসপূর্ণ বাধ্যতা সহকারে তাতে সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চিত জানতেন যে "ঈশ্বরের অসাধ্য কিছুই নেই।" বাধ্যতা ও নম্রতার কারণেই তিনি বলতে পেরেছিলেন যে, "আমি প্রভুর দাসী; আপনি যা বলেছেন, আমার প্রতি তা-ই ঘটুক।" এই সম্মতিদানের মধ্য দিয়েই তিনি ঈশ্বরপুত্রের মা হয়েছিলেন। মানুষের পরিত্রাণের জন্য ঐশ ইচ্ছাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছেন। নিজ পুত্রের নিকট এবং তাঁর কাজে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করেছেন। হবার অবাধ্যতার ফলে মানুষ পাপে কলুষিত হয়েছিল। কিন্তু মারীয়ার বিশ্বাস ও বাধ্যতার কারণে মানুষ পাপমুক্ত হয়েছে। হবার অবাধ্যতায় পৃথিবীতে এসেছিল মৃত্যু। কিন্তু মারীয়ার বাধ্যতায় পৃথিবীতে এসেছে জীবন। তিনি হয়ে উঠেছেন জীবিতদের মাতা। স্বয়ং যীশুর সাথে যুক্ত থেকেই তিনি বাধ্যতার এই ঐশগুণ লাভ করেছেন।
৩। মারীয়া যীশুকে জগতে এনেছেন: যীশুর জন্য মারীয়া পুরো জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন। মারীয়া যীশুকে গর্ভে ধারণ করলেন ও পৃথিবীর জন্য একজন ত্রাণকর্তাকে উপহার দিলেন। ছোট্ট যীশুকে তিনি বড়ো করে তুললেন, শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে সুবুদ্ধি দান করলেন। মারীয়ার জীবনের সব আনন্দ-বেদনা যীশুকে ঘিরেই। যীশুর জন্য মারীয়া সাতটি শোক পেয়েছিলেন। এই সাতটি শোক ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মারীয়া যীশুর জন্য অনেক কষ্ট পেয়েছেন। তবে এই দুঃখ-শোকের মধ্য দিয়ে মারীয়ার মাতৃত্বের রূপটি আরও সুন্দর ও অর্থপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মা হিসেবেই মারীয়া সবসময় মণ্ডলীর জন্য প্রার্থনা করেন। এভাবে খ্রীষ্ট ও তাঁর মন্ডলীর সাথে মারীয়ার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
৪। মারীয়ার ঐশ মাতৃত্ব: পবিত্র বাইবেলে মারীয়াকে 'যীশুর মাতা' বলে অভিহিত করা হয়েছে। পবিত্র আত্মার অনুপ্রেরণায় এলিজাবেথ তাঁর পুত্রের জন্মের আগেই মারীয়াকে 'আমার প্রভুর মা' বলে সম্বোধন করেছেন। মারীয়ার এই ঐশ মাতৃত্বকে মণ্ডলীও স্বীকার করে নিয়েছে: মারীয়া ঈশ্বরজননী। তিনি পরমেশ্বরের পুত্র, যিনি মানুষ হয়েছেন এবং যিনি নিজেই ঈশ্বর- তাঁর জননী হয়েছেন মারীয়া। মা ও পুত্রের চিরকালীন ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বন্ধনে যীশু ও মারীয়া আবদ্ধ।
৫। ক্রুশের তলায় মারীয়া: মারীয়ার সাথে খ্রীষ্ট ও মণ্ডলীর একাত্মতা সবচেয়ে গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে যীশুর যন্ত্রণাভোগের সময়। যীশু শত্রুদের হাতে সমর্পিত হলেন।
তাঁর বিচার হলো এবং তাঁকে ক্রুশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। এতে মারীয়া ভীষণভাবে আঘাত পেলেন। যীশুর কাঁধে অতি ভারী ক্রুশ চাপিয়ে দেওয়া হলো। তিনি ক্রুশ কাঁধে চললেন কালভেরির পথে। মারীয়াও তাঁর সাথে চললেন। পথে তাঁর প্রিয় পুত্রের সাথে দেখা হলো। যীশু কালভেরিতে পৌঁছলে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হলো। মৃত্যুর পূর্বে যীশু তিন ঘণ্টা ক্রুশীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। এই যন্ত্রণাকালে প্রায় সব শিষ্যেরা ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু যীশুর মা মারীয়া সাহস করে ক্রুশের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন। মা হিসেবে সন্তানের এই মৃত্যুযন্ত্রণাকালে তাঁর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ী।
এভাবে মারীয়া তাঁর বিশ্বাসের তীর্থযাত্রায় এগিয়ে গিয়েছেন। ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত পুত্রের সাথে বিশ্বস্ততায় অটল ছিলেন। ঐশ পরিকল্পনা অনুসারে তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রের চরম যন্ত্রণার সময় পাশে ছিলেন। তিনি তাঁর মাতৃহৃদয়ে পুত্রের যাতনার এ গভীরতা অনুভব করেছেন। মুক্তির কাজে এগিয়ে যেতে ভালোবাসাপূর্ণ সম্মতি দিয়েছেন। যীশুও মৃত্যুর পূর্বে তাঁর মাকে প্রিয় শিষ্যের মা হিসেবে দান করেছিলেন। ক্রুশের তলায় মারীয়ার মাতৃত্বের এক অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে। ক্রুশের তলায় মারীয়ার মাতৃত্বের তিনটি বিশেষ দিক আমরা লক্ষ করি। সেগুলো হলো: সাধারণ নারী ও মানুষ হিসেবে তাঁর মানবিক মাতৃত্ব, ঈশ্বরপুত্রের জননী হিসেবে তাঁর ঐশ মাতৃত্ব এবং বিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাঁর আধ্যাত্মিক মাতৃত্ব। আমরা উপলব্ধি করতে পারি, মারীয়ার মাতৃত্বের এক চরম প্রকাশ এই ক্রুশের তলায় দাঁড়িয়ে থাকার সময়। যীশু নিজেও মারীয়ার কাছ থেকে শক্তি ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন এই চরম যন্ত্রণা ভোগ করার জন্য।
যোহনের কাছে নিজের মাকে তুলে দিয়ে মারীয়াকে তিনি বিশ্বের সকল মানুষ ও মানবজাতির মা করে দিয়েছেন। আর যোহনকে মারীয়ার পুত্র হিসেবে দান করে সমগ্র মানবজাতিকে দিয়েছেন সন্তানের অধিকার। যীশুর মৃত্যুর পূর্বে ক্রুশের তলায় মা মারীয়ার উপস্থিতিতে মানবজাতির ইতিহাসের এই অসাধারণ ঘটনাটি ঘটেছিল। আজ পর্যন্ত মারীয়া আমাদের সবার দুঃখবেদনার সময় একইভাবে আমাদের পাশে দাঁড়ান। আমাদের আশা দেন, শক্তি ও সাহস জোগান জীবনের পথে এগিয়ে যাবার জন্য। কঠিন কাজ সম্পন্ন করার ও সকল বাঁধা অতিক্রম করার জন্য উৎসাহিত করেন।
কাজ: তোমার জীবনের একটি ঘটনা সহভাগিতা কর, যখন তুমি মা মারীয়ার অনুপ্রেরণাদায়ী উপস্থিতি অনুভব করেছ। |
৬। প্রার্থনার মাধ্যমে মারীয়া খ্রীষ্ট ও মন্ডলীর সাথে সংযুক্ত: মারীয়া তাঁর পুত্রের স্বর্গারোহণের পর প্রেরিতশিষ্যদের
সাথে ছিলেন। তিনি তাঁদের সাথে একাত্ম হয়ে প্রার্থনায় রত ছিলেন। এভাবে তিনি খ্রীষ্টমণ্ডলীর ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করেছেন। সকলের সাথে প্রার্থনায় রত থেকে তিনি পবিত্র আত্মার অবতরণের অপেক্ষায় ছিলেন। পবিত্র আত্মার প্রভাবেই মারীয়া গর্ভবতী হয়েছিলেন এবং সব সময় মারীয়াকে ঘিরে ছিলেন।
৭। মারীয়ার কুমারীত্ব: মা মারীয়া ঈশ্বরপুত্রের জননী। কিন্তু খ্রীষ্টমণ্ডলী প্রথম থেকেই একথা স্বীকার করেছে যে যীশু একমাত্র পবিত্র আত্মার শক্তিতেই কুমারী মারীয়ার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন। পবিত্র বাইবেলের বিবরণ অনুযায়ী কুমারীর গর্ভে যীশুর জন্ম এক ঐশ্বরিক কাজ। এ বিষয়টি মানুষের পক্ষে পুরোপুরি বুঝে ওঠা কঠিন। স্বপ্নে দূত যোসেফকে দেখা দিয়ে বলেছিলেন যে, "মারীয়ার গর্ভে যা জন্মেছে তা পবিত্র আত্মার প্রভাবেই হয়েছে।" তাছাড়াও খ্রীষ্টমণ্ডলী মারীয়ার কুমারীত্বের ঐশ প্রতিশ্রুতির পূর্ণতা দেখতে পেয়েছে। এ সম্পর্কে প্রবক্তা ইসাইয়ার গ্রন্থে লেখা ছিল: "দেখ, যুবতীটি গর্ভবতী হয়ে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করবে।" মারীয়ার ঈশ্বরপুত্রকে জন্মদান একটি রহস্যাবৃত সত্য। তাই মণ্ডলীর উপাসনায় মারীয়াকে সগর্বে 'চিরকুমারী' বলে ঘোষণা করা হয়।
৮। ঐশ পরিকল্পনায় মারীয়ার কুমারী মাতৃত্ব: ঈশ্বর তাঁর মুক্তি পরিকল্পনায় চেয়েছিলেন যে তাঁর পুত্র এক কুমারীর গর্ভে জন্ম নেবেন। সমগ্র মানবজাতির পক্ষে মারীয়া সেই মুক্তিদায়ী কাজকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর কুমারীত্ব হলো তাঁর বিশ্বাসের চিহ্ন। তাঁর বিশ্বাসই তাঁকে তাঁর ত্রাণকর্তার জননী হতে সাহায্য করেছে। "খ্রীষ্টের রক্তমাংসের দেহকে গর্ভে ধারণ করার জন্য মারীয়া ধন্যা ঠিকই, কিন্তু তিনি আরও অধিক ধন্যা, কেননা তিনি বিশ্বাসে খ্রীষ্টকে আলিঙ্গন করেছেন।" মারীয়া তাঁর মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছেন খ্রীষ্টমন্ডলীর প্রতীক। খ্রীষ্টের সাথে তাঁর সম্পর্ক হয়ে উঠেছে আরও দৃঢ়।
কাজ: যীশুর সাথে মারীয়ার সম্পর্ক তুমি ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে দেখ সেই অনুভূতি ছোটো দলে সহভাগিতা করো। |
মারীয়া খ্রীষ্টের মাতা এবং তিনি খ্রীষ্টমন্ডলীরও মাতা। খ্রীষ্ট ও পবিত্র আত্মার রহস্যে কুমারী মারীয়ার ভূমিকার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। মন্ডলীর রহস্যেও কুমারী মারীয়ার ভূমিকাটি বিবেচনা করা হয়। মারীয়া ঈশ্বর জননী, মুক্তিদাতার জননী। তাই যীশুর সাথে জড়িত সবকিছুর সাথে তিনিও জড়িত। যীশু মণ্ডলী স্থাপন করেছেন, তিনি মণ্ডলীর মস্তক। মারীয়া যীশুর মা, তাই তিনি মণ্ডলীরও মা। মণ্ডলীর জন্মদানে মারীয়ারও ভূমিকা আছে। বিশেষভাবে মণ্ডলীর জন্মদিন, পঞ্চাশত্তমী পর্বের দিনে যখন পবিত্র আত্মা নেমে এসেছিলেন তখন মা মারীয়া শিষ্যদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। আজ পর্যন্ত মারীয়া মন্ডলীর মাতা হিসেবে সর্বদা মণ্ডলীতে উপস্থিত আছেন।
১। ধন্যা কুমারী মারীয়ার প্রতি ভক্তি: খ্রীষ্টমণ্ডলীতে মা মারীয়ার প্রতি ভক্তি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। খ্রীষ্টমণ্ডলীর আদি থেকেই তিনি ঈশ্বরজননী বলেই সম্মানিত হয়ে আসছেন। মণ্ডলীর উপাসনায় মা মারীয়ার বিশেষ স্থান আছে। মারীয়ার পর্বগুলো পালন, রোজারী মালা প্রার্থনার প্রতি ভক্তি- এগুলো মা মারীয়ার প্রতি ভক্তির নিদর্শনস্বরূপ। মণ্ডলীর ভক্তজনেরাও তাদের বিপদে-আপদে বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে মায়ের কাছে প্রার্থনা করে থাকে। শুধু তাই নয় পৃথিবীর অনেক গির্জাঘর ও গ্রটো মা মারীয়ার নামে ও উদ্দেশ্যে নির্মিত ও নিবেদিত। মা মারীয়ার স্মরণে অনেক তীর্থস্থানও রয়েছে। যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তজন মায়ের প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা নিবেদন করতে যায়। মায়ের প্রতি বিশ্বাসের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অনেক আশ্চর্য কাজ সাধিত হয়েছে ও হচ্ছে। জপমালা প্রার্থনা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রার্থনা।
২। মারীয়া: খ্রীষ্টমণ্ডলীর অন্তিমকালের প্রতিকৃতি: ধন্যা কুমারী নিষ্কলঙ্কা। তাঁর সাথে মন্ডলী সংযুক্ত রয়েছে বলে মণ্ডলীও পবিত্রতা অর্জন করেছে। এখানে কোনো খুঁত নেই। তথাপি এই মন্ডলীর বিশ্বাসীগণ তাদের ব্যক্তিগত জীবনের পাপ জয় করা ও পবিত্রতা অর্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই তারা তাদের দৃষ্টি মারীয়ার প্রতি নিবদ্ধ রেখে সকল প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ মারীয়ার মধ্যে খ্রীষ্টমন্ডলী ইতোমধ্যেই সর্বপবিত্র।
৩। মারীয়া হলেন খ্রীষ্টমন্ডলীর বাস্তব রূপ : মারীয়া হচ্ছেন কুমারী। তাঁর কুমারীত্ব হচ্ছে তাঁর বিশ্বাসের চিহ্ন। এই বিশ্বাসের মধ্যে সন্দেহের কোনো স্থানই নেই। এই বিশ্বাস ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে তাঁর অখণ্ড আত্মদানের প্রতীক। তাঁর বিশ্বাসই তাঁকে ত্রাণকর্তার জননী হতে সক্ষম করেছে। সাধু আগস্টিন বলেন, "খ্রীষ্টের রক্তমাংসের দেহকে গর্ভে ধারণ করার জন্য মারীয়া ঠিকই ধন্যা, কিন্তু তিনি আরও অধিক ধন্যা, কেননা তিনি বিশ্বাসে খ্রীষ্টকে আলিঙ্গন করেছেন।" মারীয়া একই সময়ে কুমারী ও মা হয়ে, খ্রীষ্টমণ্ডলীর প্রতীক হয়েছেন। খ্রীষ্টমণ্ডলী সত্যিকারে বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঐশবাণীকে গ্রহণ করে প্রকৃত মা হয়ে ওঠে। বাণীপ্রচার ও দীক্ষাস্নান প্রদানের মধ্য দিয়ে তিনি সন্তানদের জন্ম দেন। এই সন্তানগণ পবিত্র আত্মার শক্তিতে এবং পরমেশ্বর হতে এক নতুন এবং অবিনশ্বর জীবনে জন্মলাভ করে। তিনি নিজেই সেই কুমারী, যিনি তাঁর বরের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পরিপূর্ণ ও বিশুদ্ধ বিশ্বাসে রক্ষা করেন।
কাজ: তুমি কীভাবে মা মারীয়ার প্রতি ভক্তি নিবেদন করে থাক, তা দলে সহভাগিতা করো। |
গান করি
আমার এ প্রাণ পরম প্রভুর মহিমা গায়।
হৃদয় ভরে মোর ত্রাণকর্তার প্রেরণায়।।
এই দীনা দাসীকে ধন্যা করিলে, অসীম আনন্দ হৃদয়ে দিলে।।
গর্বিতকে তিনি করেন লজ্জানত, শক্তিমান সম্রাট হয় পরাজিত।
দীনগণ হয় সমাজে মহান, যুগে যুগে প্রভু ন্যায়বান।।
শূন্যস্থান পূরণ করো।
১. মা মারীয়ার স্মরণে অনেক _____ ও রয়েছে।
২. মারীয়া খ্রীষ্টের _____ এবং তিনি খ্রীষ্টমণ্ডলীর মাতা।
৩. _______ মারীয়ার কাছে যীশুর জন্মের সংবাদ প্রদান করেন।
বাম পাশের বাক্যাংশের সাথে ডান পাশের বাক্যাংশের মিল করো।
বাম পাশ | ডান পাশ |
১. মারীয়ার মা-বাবা ২. ঈশ্বরের প্রতি তাঁর ৩. গাব্রিয়েল মারীয়াকে ৪. ঈশ্বরের ইচ্ছা পালনে মারীয়া ছিলেন ৫. মারীয়ার ঈশ্বরপুত্রকে জন্মদান |
|
১. কে মারীয়ার কাছে যীশুর জন্মের সংবাদ দিয়েছিলেন?
ক. ঈশ্বর
খ. স্বর্গদূত
গ. পবিত্র আত্মা
ঘ. মহাদূত মিখায়েল
২. ঈশ্বর কেন মারীয়াকে বেছে নিয়েছিলেন?
ক. মারীয়ার নম্রতার জন্য
খ. মারীয়ার প্রার্থনাশীলতার জন্য
গ. মারীয়ার পবিত্রতার জন্য
ঘ. মারীয়ার সরলতার জন্য
নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ে ৩ ও ৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও।
ফ্লোরা খুব ধার্মিক ও নীতিবান। তার একমাত্র সন্তানটি মানসিক প্রতিবন্ধী। সর্বদা ফ্লোরা তার সন্তানটির যত্ন নিতেন ও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন। এক সময় তাঁর এই প্রতিবন্ধী সন্তানটি একজন প্রথম সারির চিত্রকর হয়। দেশ-বিদেশে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে।
৩। ফ্লোরার মধ্যে কুমারী মারীয়ার যে গুণটি প্রকাশ পায় তা হলো ঈশ্বরের প্রতি-
ক. নির্ভরশীলতা
খ. গভীর বিশ্বাস
গ. ভালোবাসা
ঘ. ভক্তি
৪. ফ্লোরার এই চারিত্রিক গুণ মানুষকে দিতে পারে
i. ভালোবাসা
ii. পৃথিবীতে শান্তি
iii. পাপ থেকে মুক্তি
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. iii
গ. ii
ঘ. i, ii ও iii
১. শান্তা সপ্তম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। সে ধার্মিক, সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ। ইস্টার উপলক্ষ্যে বিদ্যালয়ের পাশের মাঠে অনুষ্ঠান হয়, এতে দায়িত্ব পড়ে শান্তার। অনুষ্ঠানের দিনে কিছু বখাটে ছেলে অনুষ্ঠানটিকে স্থগিত করার জন্য গোলযোগ করে। অনেক অংশগ্রহণকারী পালিয়ে যায়। শান্তা কিন্তু প্রধান শিক্ষকের নির্দেশের কথা চিন্তা করে অনুষ্ঠানটির পর্ব চালিয়ে যায়। এ সময় তার পাশে থেকে বাংলা শিক্ষক তাকে সহযোগিতা করেন, সাহস দেন। এই সময় শান্তার কুমারী মারীয়ার কথা মনে পড়ে।
ক. কুমারী মারীয়ার জীবন যাপন কেমন ছিল?
খ. আমরা কুমারী মারীয়ার প্রতি কীভাবে ভক্তি প্রদর্শন করতে পারি?
গ. শান্তার চরিত্রে কুমারী মারীয়ার কোন গুণটি পরিলক্ষিত হয়েছে তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. বাংলা শিক্ষকের ভূমিকার কারণে শান্তার এই সময়ে মারীয়ার কথা মনে হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করো।
১. মারীয়া জাতিতে কী ছিলেন?
২. কুমারী কন্যা মারীয়া কেমন জীবনযাপন করেছিলেন?
৩. ক্রুশের তলায় মারীয়ার কী লক্ষ্য করি?
১. বাধ্যতা মারীয়ার বিশেষ গুণ-আলোচনা কর।
২. 'মারীয়া আমাদের আশা দেন, শক্তি দেন'- বিশ্লেষণ করো।
৩. 'খ্রীষ্টমন্ডলীর অন্তিমকালের প্রতিকৃতি'-আলোচনা করো।
Read more