পাপ (চতুর্থ অধ্যায়)

সপ্তম শ্রেণি (মাধ্যমিক ২০২৫) - খ্রীষ্টধর্ম শিক্ষা - | NCTB BOOK
27
27

স্বজ্ঞানে মানুষ পাপ করতে পারে আবার অনেক পাপ করা থেকে সে বিরতও থাকতে পারে। তাই মানুষকে প্রথমেই পাপ করা বা না-করার একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যারা নিজেদের গৃহীত এই সিদ্ধান্তে অটল থাকে তারা পবিত্রতার পথে অনেক দূর অগ্রসর হতে পারে। যারা সিদ্ধান্ত নিয়ে তা পালন করে না, তাদের মধ্যে অবহেলার ভাবই বেশি। আর যারা পাপ করা থেকে বিরত থাকার কোনো সিদ্ধান্তই নেয় না, তাদের মধ্যে পাপের চেতনার অভাব। এখানে আমরা পাপ কী, পাপের প্রকারভেদ এবং পাপ থেকে মুক্তিলাভের উপায় নিয়ে আলোচনা করব। এর মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে পাপবোধ সম্পর্কে নতুন চেতনা জেগে উঠবে।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • পাপের অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • পাপের প্রকারভেদ বর্ণনা করতে পারব।
  • সপ্তরিপু সর্ম্পকে ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • সপ্তরিপু দমনের মাধ্যমে ধূমপান ও সকল প্রকার মাদকদ্রব্য সেবনের হাত থেকে দূরে থাকার উপায় বর্ণনা করতে পারব।
  • পাপের ফল বর্ণনা করতে পারব।
  • পাপ থেকে মুক্তিলাভের জন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও উপায় বর্ণনা করতে পারব।
  • পাপ কাজ থেকে দূরে থাকব ও সৎ জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ হব।
Content added By

পাপ (পাঠ ১)

15
15

যে কাজ, কথা, চিন্তা বা অবহেলার দ্বারা আমরা ঈশ্বর ও মানুষের ভালোবাসার বিরোধিতা করি অথবা ভালোবাসার সম্পর্ক থেকে দূরে চলে যাই, তা-ই পাপ। পাপ হলো বুদ্ধিশক্তি, সত্য ও শুদ্ধ বিবেকের বিরুদ্ধে অপরাধ। পাপের মধ্য দিয়ে আমরা নিজের মধ্যে অথবা অন্য কোনো সৃষ্ট বিষয়ে অতিরিক্ত আসক্ত হই। এই কারণে আমরা ঈশ্বর ও মানুষকে প্রকৃতভাবে ভালোবাসতে ব্যর্থ হই। পাপের কারণে আমরা ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে যাই। পাপ মানুষের সুন্দর ও সুকোমল স্বভাবকে ধ্বংস করে। মানুষের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের সংহতি বা সমন্বয়কে নষ্ট করে ফেলে। এখন আমরা বলতে পারি, পাপ হলো চিরকালীন বা শাশ্বত বিধানের বিপরীতধর্মী চিন্তা, ইচ্ছা, কথা ও কাজ। আদিপাপের মতো আমাদের অন্য সকল পাপগুলো হচ্ছে অবাধ্যতা ও ঈশ্বরের বিরোধিতা করা। পাপ হলো ঈশ্বরকে উপেক্ষা করে নিজেকে ভালোবাসা বা নিজেকে প্রাধান্য দেওয়া।

কাজ: একটু সময় নাও, নীরব হও ও চিন্তা কর, ধ্যান কর- তুমি কোন প্রকার পাপ করো।
পাপের প্রকারভেদ

পাপের প্রকার অসংখ্য। আমরা অনেকভাবে বিভিন্নরকম পাপ করে থাকি। গালাতীয়দের কাছে পত্রে সাধু পল বলেছেন: আমাদের মধ্যে একটি নিম্নতর স্বভাব অর্থাৎ দেহ বা আবেগের বশে চলার স্বভাব রয়েছে। এই নিম্নতর স্বভাবটি পবিত্র আত্মার বিরোধিতা করে। আর এই নিম্নতর স্বভাবের বশে চললেই আমরা পাপ করি। এভাবে যে পাপগুলো করে থাকি সেগুলো হলো: ব্যভিচার, অশুচিতা, উচ্ছৃঙ্খলতা, পৌত্তলিকতা, তন্ত্রমন্ত্রসাধন, শত্রুতা, বিবাদ, ঈর্ষা, ক্রোধ, রেষারেষি, মনোমালিন্য, দলাদলি, হিংসা, মাতলামি, বেসামাল ভোজ-উৎসব, আরও এই ধরনের সব কাজ। যারা এই ধরনের কাজ করে তাদের সম্পর্কে এই সতর্কবাণীও দেওয়া আছে যে, তারা কখনো ঐশরাজ্যে প্রবেশ করতে পারবে না।

নানা দৃষ্টিকোণ থেকে পাপের শ্রেণিবিভাগ করা যায়। যেমন: পাপের প্রতি মনোভাবের দিক থেকে এক অর্থে পাপের শ্রেণিবিভাগ করা যায়, পরিবেশ-পরিস্থিতির দৃষ্টিকোণ থেকেও করা যায়। আবার ঈশ্বর, প্রতিবেশী বা নিজের বিরুদ্ধে পাপ, আত্মিক ও দৈহিক কলুষতা, আবার চিন্তা, কথা, কাজ বা অবহেলাজনিত পাপ- এসব দৃষ্টিকোণ থেকেও পাপের শ্রেণিবিভাগ করা যায়। প্রথমে দেখা যাক পাপের গুরুত্বের দিকটা। পাপের গুরুত্ব অনুসারে পাপকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা: মারাত্মক পাপ ও লঘু পাপ। নিচে এই দুইরকম পাপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

মারাত্মক পাপ ও লঘু পাপ

মারাত্মক পাপ হলো ঈশ্বরের বিধান গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করা। এই পাপের ফলে মানুষের অন্তরের ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যায়। নিম্নতর স্বভাবের প্রতি আসক্ত হয়ে জীবনের পরম ও চরম লক্ষ্য ঈশ্বরের কাছ থেকে সে অনেক দূরে সরে যায়। ঈশ্বর, যিনি পরম সুখ, তাঁর কাছ থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জীবনের প্রাণশক্তি ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যায়। মারাত্মক পাপের ফলে মানুষ আত্মার দিক থেকে মরে যায়। যেমন: মানুষ খুন করা, ঈশ্বরনিন্দা করা ইত্যাদি।

অন্যদিকে লঘু পাপ হলো কম গুরুতর বিষয়ে নৈতিক বিধানের নির্দেশিত নীতি অমান্য করা। অর্থাৎ সামান্য বিষয়ে মানুষ যখন ঈশ্বরের অবাধ্য হয় তখন আমরা তাকে বলি লঘু পাপ। অনেক সময় মানুষ এই কাজগুলো করে পূর্ণ জ্ঞান অথবা সম্পূর্ণ সম্মতি ছাড়া। এখানে মানুষের অন্তরের ভালোবাসা সামান্য পরিমাণে ব্যাহত হতে পারে। তবে লঘু পাপের কারণে ভালোবাসা দুর্বল হয়। যেমন: মিথ্যা কথা বলা, মাত্রাতিরিক্ত হাসি-তামাশা করা, অত্যাধিক কথা বলা ইত্যাদি। এখানে মারাত্মক পাপ ও লঘু পাপের তুলনামূলক আলোচনা করা হলো:

মারাত্মক পাপ ও লঘু পাপ

মারাত্মক পাপলঘু পাপ
১। গুরুতর বিষয়ে ঈশ্বরের বিধান অমান্য করা।১। সামান্য বা ছোটো বিষয়ে ঈশ্বরের বিধান অমান্য করা।
২। ভালোবাসা নিঃশেষ হয়ে গেলে এবং ঐশ করুণা বঞ্চিত হলে মানুষ মারাত্মক পাপ করে।২। লঘু পাপে ভালোবাসা দুর্বল হয়ে যায়। তবে পবিত্রকারী কৃপা, ঈশ্বরের সাথে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা তথা শাশ্বত সুখ থেকে মানুষ পুরোপুরি বঞ্চিত হয় না।
৩। বিদ্বেষ সহকারে, সুচিন্তিতভাবে মন্দকে বেছে নেওয়া মারাত্মক পাপের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।৩। অজ্ঞতা বা পুরোপুরি না- বুঝে আজ্ঞা লঙ্ঘন করা লঘু পাপের বৈশিষ্ট্য।
৪। ব্যক্তি, স্থান বা সময়ের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যেমন: একজন অপরিচিত লোকের প্রতি সহিংস হবার চেয়ে নিজের জন্মদাতা পিতামাতার প্রতি সহিংস হওয়া নিশ্চয়ই অধিকতর মারাত্মক বিষয়।৪। লঘু পাপের বেলায়ও বিষয়টি প্রযোজ্য তবে কিছুটা শিথিলতা আছে।

পাপ বিষয়ে গভীরভাবে জানতে হলে কয়েকটি বিষয় আমাদের মনে রাখা আবশ্যক। বিষয়গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

১। ঈশ্বরের ক্ষমা, পরিত্রাণ ও ঐশ কৃপায় সর্বদা বিশ্বাস করা। কারণ তিনি অসীমরূপে ক্ষমাশীল। তিনি সবসময় অপেক্ষা করেন কখন আমরা তাঁর কাছে ফিরে আসব। পাপ থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য ঈশ্বর তাঁর একমাত্র পুত্র যীশুকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
২। কখনো নিরাশ না-হওয়া। ঈশ্বরের ওপর সবসময় আস্থা ও আশা রাখা।
৩। পাপ সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
৪। পাপের পথ পরিহার করার ইচ্ছা থাকা।
৫। সঠিক বিবেক গড়ে তোলা ও বিবেকের নির্দেশমতো পথ চলা।
৬। নিজের স্বাধীন ইচ্ছার সঠিক ব্যবহার করা।
৭। ঈশ্বর পাপকে ঘৃণা করেন তবে পাপীকে নয়- একথা সবসময় মনে রাখা।

কাজ: পাঁচটি মারাত্মক পাপ ও পাঁচটি লঘু পাপের নাম লেখ।
Content added By

ঈশ্বরের দশ আজ্ঞার বিরুদ্ধে পাপ (পাঠ ২)

20
20

ঈশ্বর আমাদের দশটি বিশেষ আজ্ঞা দিয়েছেন যেন আমরা এই পৃথিবীতে তাঁর পথে চলতে পারি ও পবিত্র জীবন যাপন করতে পারি। পূর্বে আমরা আজ্ঞাগুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছি। পবিত্র জীবন যাপন করার ও পাপ থেকে বিরত থেকে সুপথে চলার জন্য এই আজ্ঞাগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এগুলো পালনে ব্যর্থ হলে আমরা পাপ করে থাকি। অর্থাৎ আজ্ঞাগুলোর মধ্যে যে নিষেধাজ্ঞাগুলো রয়েছে তার মধ্যে পাপ সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া আছে। দশ আজ্ঞার বিরুদ্ধে আমরা যেভাবে পাপ করে থাকি সেগুলো হলো:
১। ঈশ্বর ব্যতীত অন্য দেবতার পূজা করে বা অন্য কিছুতে আসক্ত হওয়া।
২। ঈশ্বরের পবিত্র নামের অবমাননা করে। অকারণে ঈশ্বরের নাম নিয়ে।
৩। বিশ্রামবার পালন না-করে ও প্রভুর প্রশংসা না- করে।
৪। পিতামাতা ও গুরুজনকে সম্মান না-করে।
৫। নরহত্যা করে।
৬। ব্যভিচার করে বা অবৈধ সম্পর্ক রেখে।
৭। চুরি করে।
৮। মিথ্যা কথা বলে বা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে।
৯। অন্যের জিনিসে লোভ করে।
১০। অন্যের স্বামী বা স্ত্রীতে লোভ করে।

কাজ: তুমি কীভাবে দশ আজ্ঞার বিরুদ্ধে পাপ না- করে চলতে পার তা চিন্তা করে লিখ।

পাপ-প্রবণতা

পাপ থেকে পাপের জন্ম হয় বা পাপ-প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বারবার একই পাপকাজ রিপুর জন্ম দেয়। সাতটি বিশেষ পাপ স্বভাবকে বলা হয় সপ্তরিপু। সপ্তরিপুর নামগুলো হলো: অহংকার, লোভ, ঈর্ষা, ক্রোধ, কামুকতা, পেটুকতা ও আলস্য। এগুলো পাপের প্রধান কারণ বা এগুলো অন্যান্য আরও পাপ বা কুপ্রবৃত্তির জন্ম দেয়। নিচে এই সাতটি রিপু বা পাপ-প্রবণতার ব্যাখ্যা করা হলো:

১। অহংকার: নিজেকে অন্যের চেয়ে বড়ো ভাবা বা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা; নিজেকে বা আমিত্বকে প্রাধান্য দেওয়া।
অহংকারের কারণে মানুষ ঈশ্বর ও মানুষকে সম্মান করা থেকে বিরত থাকে। আমরা জানি, স্বর্গদূতদের পতন হয়েছিল কারণ তাঁরা নিজেদেরকে বড় মনে করেছিল আর ঈশ্বরের বিরোধিতা করেছিল। আমাদের আদি পিতামাতাও ঈশ্বরের সমান হতে চেয়েছিলেন বলে তাঁরা অবাধ্য হয়েছিলেন ও পাপ করেছিলেন। বর্তমানকালেও আমরা দেখি এমন অনেক মানুষ আছে যাদের অনেক ধনসম্পদ বা টাকাপয়সা আছে বলে তারা অন্যদের খুব হেয় মনে করে। অনেকে তাদের অনেক বুদ্ধি বা বিশেষ গুণ আছে বলেও তারা নিজেদের খুব বড় মনে করে, আর খুব অহংকারী হয়ে ওঠে। এভাবে আমরাও অনেক সময় অহংকার করে পাপ করি।

২। লোভ: যা আমার নয় বা পাবার সম্ভাবনাও নেই তা নিজের করে পাবার বাসনা বা আকাঙ্ক্ষা। লোভের বশবর্তী হয়েও মানুষ পাপ করে থাকে। যে জিনিস আমার নিজের নয় তা আমি নিজের করে পেতে চাইলে আমি লোভ করে পাপ করি। যেমন, ক্লাসে এক বন্ধু অনেক সুন্দর একটি কলম স্কুলে নিয়ে এলো, সেটি দেখে আমি হয়তো মনে মনে বলছি, এই কলমটি আমার চাই। এভাবে অন্যের জিনিসের প্রতি আমরা লোভকরে পাপ করি।

৩। ঈর্ষা: অন্যের ভালো বা সুখ সহ্য করতে না- পারা বা তার জন্য মনে মনে কষ্ট পাওয়া। ঈর্ষা হলো অন্যের ভালো সহ্য করতে না পারা বা অন্যের ভালোর জন্য মন খারাপ করা। অনেকবার আমাদের এরকম হয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্লাসে যে মেয়েটি বা ছেলেটি প্রথম হয় বা শিক্ষক হয়ত বা কোনো এক শিক্ষার্থীর প্রতি একটু বেশি মনোযোগদেন। আমি তা সহ্য করতে পারি না। মনে মনে আমার খুব রাগ হয়। তার বিরুদ্ধে নানারকম কথাও বলি। ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে আমরা একে অন্যের ক্ষতি করতে পারি। ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে ফরিসিরা যীশুকে ক্রুশ দিয়ে মেরেছিল।

৪। ক্রোধ: কোনো বিষয়ে রেগে যাওয়া। ক্রোধ বা রাগ হলো কোনো বিষয়ে নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারা। শুধু তাই নয়, রেগে গিয়ে ক্ষতিকর কিছু করে ফেলা। আমরা বলতে শুনি রেগে গেলে মানুষ বন্য পশুর মতো হিংস্র হয়ে যায়।

নিজেরাও লক্ষ করি, রেগে গিয়ে আমরা পরিবেশ নষ্ট করি, খারাপ কথা বলে ফেলি, জিনিসপত্র ভেঙে ফেলি, অন্যকে আঘাত করি। কখনো কখনো রেগে গিয়ে এক মানুষ অন্য মানুষকে মেরেও ফেলে। কিন্তু রাগ করে ক্ষতিকর কিছু করে তার পরে মানুষ নিজের অপরাধ বুঝতে পারে ও অনুতপ্ত হয়।

৫। কামুকতা: ঈশ্বর আমাদের যৌনবাসনা দিয়েছেন গঠনমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য। যখন এই বাসনার অপব্যবহার করি তখন এটি পাপ। অনিয়ন্ত্রিত যৌনবাসনাকে বলা হয় কামুকতা। মানুষকে ভোগের জন্য কামনা, বিরক্ত করা, কটূক্তি করা, লালসার দৃষ্টিতে তাকানো, কুনভাবে তাকানো ইত্যাদি হলো কামুকতার কিছু উদাহরণ। আজকাল আমরা প্রায়ই দেখি ও শুনে থাকি কত রকম যৌন অনাচার ঘটছে। শিশু, যুবতী-কেউ নিরাপত্তা পাচ্ছে না। যৌনপ্রবৃত্তি মানুষকে পশুতে পরিণত করে। যারা সংযমী নয় তারা নানাভাবে পাপ করে থাকে।

৬। পেটুকতা: খাবারের প্রতি অতিরিক্ত লোভ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেতে চাওয়া ও খাওয়া, বার বার খেতে চাওয়া বা দুইচোখে যা দেখে তাই খেতে চাওয়া ও খাওয়া। বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খাদ্য দরকার। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার খাওয়া পাপ। পেটুকতার কারণে মানুষের নানারকম অসুখবিসুখও হতে পারে।

৭। আলস্য: আধ্যাত্মিক চর্চা ও কাজের প্রতি অনীহা। আধ্যাত্মিক অনুশীলনে অবহেলা করা এবং কাজ না-করে শরীর বাঁচিয়ে চলা। অকর্মণ্য অবস্থায় সময় নষ্ট করা। ঈশ্বর আমাদের দেহ, মন ও আত্মা দিয়েছেন। আমরা যেন আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও কায়িক পরিশ্রম করে সুন্দর জীবন যাপন করতে পারি। কিন্তু কিছু মানুষ পরিশ্রম করতে প্রস্তুত নয়। তারা খুব অলস ও আরামপ্রিয়। অলসতা করেও আমরা পাপ করি।

Content added By

সপ্তরিপু দমন (পাঠ ৩)

21
21

সপ্তরিপু যেহেতু পাপ বৃদ্ধির সহায়ক তাই আমাদের শিখতে হবে কীভাবে আমরা এই রিপুগুলোকে বশ করতে পারি।
১। নম্রতার অনুশীলন, নিজের মতো করে অন্য সকলকেও গুরুত্ব দেওয়া ও সম্মান করা;
২। লোভ না-করে নিজের যা বা যতটুকু আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা;
৩। অন্যের ভালোতে খুশি হওয়া ও আনন্দ করা, প্রশংসা করা ও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়া;
৪। উগ্র স্বভাব পরিহার করে সবকিছুতে ও সব অবস্থায় কোমল ও মৃদু আচরণ করা;
৫। সং্যমগুণের অনুশীলন করা;
৬। পরিমিত আহার গ্রহণের অভ্যাস করা;
৭। সকল বিষয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করা এবং অবহেলা না করা।

কাজ: সপ্তরিপুর মধ্যে কোন্ তিনটি রিপুর বশবর্তী হয়ে তুমি বেশি পাপ করো? আর পাপ না- করার শক্তি চেয়ে ঈশ্বরের কাছে একটি প্রার্থনা লিখ।

পাপের ফল

আমরা সবাই ভালো, সুন্দর ও সুখী জীবনযাপন করতে চাই। সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে চাই। পৃথিবী সুন্দর হোক, সব জায়গায় শান্তি বিরাজ করুক, কোথাও কোনো যুদ্ধ-বিবাদ না ঘটুক- এটাই আমাদের সবার কামনা। কিন্তু প্রতিদিন আমরা নানাভাবে কষ্ট পাই, আমরা একে অন্যকে কষ্ট দিয়ে থাকি। নিজেদের পাপ স্বভাবের যে ফল তা আমরা চারিদিকে দেখতে পাই। অর্থাৎ আমাদের পাপের ফল আমরা ভোগ করে থাকি। পাপের ফলে আমাদের মধ্যে দেখা যায়:

১। অশান্তি ও অমিল
২। দুঃখ ও যন্ত্রণা
৩। নানারকম অসুস্থতা
৪। বিবাদ ও বিচ্ছেদ
৫। যুদ্ধ ও মারামারি
৬। অন্যায় ও অন্যায্যতা
৭। ঈশ্বর ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট
৮। নিঃসঙ্গতা
৯। হতাশা ও নিরাশা
১০। মৃত্যু

কাজ: পাপের ফলে তোমার ব্যক্তিগত জীবনে কী হয় তা দলে সহভাগিতা করো এবং একটি পোস্টার তৈরি করো।
Content added By

পাপ থেকে মুক্তিলাভের উপায় (পাঠ ৪)

19
19

আদি পিতামাতার মধ্য দিয়ে মানুষের ইতিহাসে পাপ প্রবেশ করার সাথে সাথে দয়ালু পিতা ঈশ্বর মানুষকে পাপ থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর একমাত্র পুত্র যীশুকে এ জগতে পাঠিয়ে তিনি মানবজাতির পরিত্রাণ সাধন করবেন-এই প্রতিশ্রুতি তিনি মানবজাতিকে দিয়েছিলেন। ঈশ্বর আমাদের দিয়েছেন স্বাধীন ইচ্ছা। তিনি শুধু চান আমরা পাপ থেকে মন ফেরাই এবং মুক্তিলাভ করি। তিনি আমাদের জন্য সমস্ত ব্যবস্থা করেছেন। আমাদের পাপ যত বড়ো বা যত বেশিই হোক- না কেন, তার চেয়ে ঈশ্বরের দয়ার পরিমাণ আরও অনেক বেশি। এই কথাটি আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে। পাপী মানুষ হলেও আমরা যেন কোনো অবস্থাতেই নিরাশ হয়ে না-যাই।

পবিত্র মঙ্গলসমাচারের মধ্যে আমরা দেখতে পাই পাপী মানুষের প্রতি যীশু খ্রীষ্টের দয়ার প্রকাশ। যোসেফের নিকট স্বর্গদূত বলেছিলেন: "তুমি তাঁর নাম রাখবে যীশু, কারণ তিনিই নিজ জনগণকে তাদের পাপ থেকে মুক্ত করবেন।" মুক্তির সংস্কার খ্রিষ্টপ্রসাদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য: "আমার রক্ত, নবসন্ধির রক্ত, যা অনেকের জন্য পাপমোচনের উদ্দেশ্যে পাতিত।" আমাদের কোনোরূপ সাহায্য ছাড়া তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন কিন্তু আমাদের সহযোগিতা ছাড়া তিনি আমাদের পরিত্রাণ সাধন করেন না। কিন্তু মুক্তিলাভের অনেক উপায় তিনি দিয়েছেন। নিচে কিছু উপায় তুলে ধরা হলো:
১। বিবেকের সততা ও মুক্তিলাভের আশায় পাপ সম্পর্কে সচেতন হওয়া;
২। নিজেকে পাপী বলে স্বীকার করা;
৩। নম্রভাবে নিজের পাপ স্বীকার করা;
৪। পাপের জন্য অনুতাপ করা;
৫। পুনরায় পাপ না-করার প্রতিজ্ঞা করা;
৬। ঈশ্বরের দয়া ও কৃপায় বিশ্বাস রাখা;
৭। ক্ষমা করা ও ক্ষমা দানের মনোভাব পোষণ করা;
৯। মন পরিবর্তন করা ও স্বাধীন ইচ্ছার সঠিক ব্যবহার করা;
১০। পবিত্র আত্মাকে গ্রহণ করা ও তাঁর প্রেরণা মতো চলা;
১১। নিয়মিত প্রার্থনা ও পবিত্র বাইবেল পাঠ করা;
১২। ঈশ্বর ও প্রতিবেশীদের সাথে সঠিক সম্পর্ক বজায় রাখা।

কাজ: দুইদলে মিলে নিচের সামসংগীতটি প্রার্থনা করো।

ওগো ঈশ্বর, কে থাকতে পারবে বল, তোমার আবাসে?
কে-ই বা বাস করবে তোমার পবিত্র পর্বতে?
অনিন্দ্য যার আচরণ,
ন্যায়ধর্ম যে পালন করে,
অন্তর থেকে যে সত্যভাষী
যার রসনা করে না পরনিন্দা,
ভাইয়ের যে করে না অপকার,
প্রতিবেশীর যে রটায় না দুর্নাম,
ভ্রষ্টকে যে অবজ্ঞার চোখে দেখে,
ঈশ্বর ভক্তজনকে সম্মানই করে,
ক্ষতি হলেও আপন শপথের যে করে না অন্যথা,
ঋণ দিয়ে যে নেয় না কোনো সুদ,
নির্দোষের ক্ষতি করতে যে নেয় না কোনো ঘুষ,
এমনই যার আচরণ, সে তো কোনো কিছুতেই টলবে না কখনো

কাজ: কীভাবে পাপ থেকে মুক্তিলাভ করা যায় প্রথমে তা দলে আলোচনা কর। তারপর ব্যক্তিগতভাবে নীরব ধ্যান কর, নিজে নিজে সংকল্প নাও- তুমি কীভাবে পাপের পথ ত্যাগ করবে।
Content added By

অনুশীলনী

22
22

শূন্যস্থান পূরণ করো।

১. পাপ থেকে পাপের _____ হয়।

২. বেঁচে থাকার জন্য আমাদের ______ দরকার।
৩. ঈর্ষা হলো অন্যের _____ সহ্য করতে না পারা।
8. রাগ করে ক্ষতিকর কিছু করে তার পরে মানুষ নিজের ______ বুঝতে পারে।
৫. লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষ _________ করে থাকে।

বাম পাশের বাক্যাংশের সাথে ডান পাশের বাক্যাংশের মিল করো।

বাম পাশডান পাশ

১. পাপ মানুষের সুন্দর ও সুকোমল স্বভাবকে

২. ছোট বিষয়ে ঈশ্বরের বিধান অমান্য করাই

৩. ঈশ্বর পাপকে ঘৃণা করেন

৪. দশ আজ্ঞার পাপ হলো

৫. ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে আমরা

  • লঘু পাপ
  • পাপীকে নয়
  • চুরি করা
  • ধ্বংস করে
  • অনুতপ্ত হয়
  • একে অন্যের ক্ষতি করি
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১. পাপের গুরুত্ব অনুসারে পাপকে কয়ভাগে ভাগ করা যায়?
ক. দুই ভাগে
খ. তিন ভাগে
গ. চার ভাগে
ঘ. পাঁচ ভাগে

২. ক্রোধকে দমন করা যায়
i. ক্ষমা করে
ii. ধৈর্যশীল হয়ে
iv. প্রার্থনা ও বাইবেল পাঠ করে
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii

নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ে ৩ ও ৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও।
রাহুল ঘুম থেকে দেরি করে ওঠে তাই সময়মতো কোনো কাজই করতে পারে না। একদিন সন্ধ্যায় পারিবারিক প্রার্থনার সময় বাবা রাহুলকে বিভিন্ন পাপ কাজ সম্পর্কে বোঝালেন এবং বললেন, এগুলো করলে আমাদের পাপ হয়। আরও বললেন, 'তোমার এই খারাপ অভ্যাস বদলাতে হবে।'
৩. রাতুল কী ধরনের পাপ করেছে?
ক. লোভ
খ. ঈর্ষা
গ. অহংকার
ঘ. আলস্য

৪. রাহুল কীভাবে এ ধরনের পাপ-প্রবণতা পরিহার করতে পারে?
ক. নম্রতার অনুশীলন করে
খ. উগ্র স্বভাব পরিহার করে
গ. যথাসাধ্য চেষ্টা করে
ঘ. সংযমগুলোর অনুশীলন করে

সৃজনশীল প্রশ্ন

১. জয়ন্ত প্রায়ই তার বাবার পকেট থেকে টাকা নেয়। বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটায়। তার কথাবার্তা ও চালচলনে অনেক পরিবর্তন দেখে তার বাবা একদিন ছেলেকে ডেকে টাকার কথা জিজ্ঞাসা করলেন। কিন্তু জয়ন্ত তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করল। এভাবে সে দিনের পর দিন বন্ধুদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করতে লাগল। ধীরে ধীরে সে আরও বড়ো ধরনের অপরাধের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলল।
ক. ঈশ্বরের বিধান অমান্য করা কী ধরনের পাপ?
খ. সাতটি রিপু বা পাপ-প্রবণতা বলতে কী বুঝ?
গ. জয়ন্ত কী ধরনের কাজ করেছে ব্যাখ্যা করো।
ঘ. জয়ন্তের কাজের ফলাফল কী হতে পারে বলে তুমি মনে কর? পাঠ্যপুস্তকের আলোকে মতামত দাও।

২. (লেয়া, ছোয়া ও সুমন একই এলাকায় থাকে এবং একই শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। সকালবেলায় একসঙ্গে তিন জনের দেখা।)
লেয়া : ছোয়া কেমন আছ?
ছোয়া : তোমার মতো খারাপ নেই। ভালোই আছি।
লেয়া : স্কুলে যাবে না আজ? চলো একসঙ্গে যাই।
ছোয়া : তোমার মতো হেঁটে যাব নাকি? আমি গাড়িতে যাব।
সুমন : তুমি লেয়ার সঙ্গে এভাবে কথা বলছ কেন? টাকার গরম দেখাচ্ছ? ঈশ্বর তোমাকে শাস্তি দিবে।
ছোয়া : টাকার গরম দেখাব না! টাকাই সব! ঈশ্বর আমার কিছু করতে পারবে না।

ক. পাপ কী?
খ. লঘু পাপ বলতে কী বোঝায়?
গ. ছোয়া কী ধরনের পাপ করেছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ছোয়া কীভাবে উক্ত পাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে? মতামত দাও।

সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন

১. কারা স্বর্গরাজ্যে বা ঐশরাজ্যে প্রবেশ করতে পারবে না?
২. মারাত্মক পাপ কাকে বলে?
৩. সপ্তরিপুর নামগুলো লেখ?

বর্ণনামূলক প্রশ্ন

১. পাপ থেকে মুক্তি লাভের উপায়গুলো লেখ।
২. পাপের ফল কী হতে পারে? বর্ণনা করো।
৩. কীভাবে সপ্তরিপু দমন করা যায়?

Content added By
টপ রেটেড অ্যাপ

স্যাট অ্যাকাডেমী অ্যাপ

আমাদের অল-ইন-ওয়ান মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সীমাহীন শেখার সুযোগ উপভোগ করুন।

ভিডিও
লাইভ ক্লাস
এক্সাম
ডাউনলোড করুন
Promotion