বিশ্বের সকল স্বাধীন রাষ্ট্রই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। প্রতিটি দেশের সরকারের দায়িত্ব হলো দেশকে সুন্দর ও সঠিকভাবে পরিচালনার মাধ্যমে দেশ ও জনগণের কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন সাধন করা। এজন্য বিভিন্ন দেশের সরকার বিভিন্নমুখী কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করে। কিন্তু এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা কোনো সরকারের পক্ষে এককভাবে করা সম্ভব হয় না। প্রয়োজন হয় অন্য কোনো দেশ বা সংস্থার সহযোগিতা। এ প্রয়োজনীয়তা থেকেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণার উদ্ভব হয়েছে। গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সহযোগিতা সংস্থা। এদের মধ্যে অন্যতম হলো জাতিসংঘ। এ অধ্যায়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
১. আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব;
২. জাতিসংঘের গঠন বর্ণনা করতে পারব;
৩. জাতিসংঘ গঠনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে পারব;
৪. জাতিসংঘের মৌলিক নীতিসমূহ বর্ণনা করতে পারব;
৫. জাতিসংঘের বিভিন্ন শাখার উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম বর্ণনা করতে পারব;
৬. বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা বর্ণনা করতে পারব;
৭. বিশ্ব শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের ভূমিকা বর্ণনা করতে পারব।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণা
বিশ্বের প্রত্যেক রাষ্ট্রই তাদের নিজেদের কল্যাণে বা স্বার্থে বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন করে। বৈদেশিক নীতির মূলে রয়েছে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমে নিজ দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। দেশগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সাতটি মহাদেশে ছড়িয়ে আছে। দেশগুলো স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেও অনেক দেশই সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল নয়। এছাড়া দেশগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা। এ সমস্যাগুলো দূর করতে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় অন্য দেশ ও সংস্থার সহযোগিতা। যেমন- আমাদের বাংলাদেশে জ্বালানি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের সরকারের পক্ষে এককভাবে এ সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। ফলে এ সমস্যাগুলো দূরীকরণে বাংলাদেশকে অন্যান্য দেশ বা সংস্থার সহযোগিতা নিতে হয়। আবার মধ্যপ্রাচ্যসহ আফ্রিকার অনেক দেশে রয়েছে জাতিগত সংঘাত, যুদ্ধ ও অস্থিরতা। ফলে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনী জাতিসংঘের মাধ্যমে সেখানে শান্তি রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এভাবেই বিশ্বের দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সুন্দরভাবে টিকে আছে।
উপরের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে বিশ্বের দেশগুলো স্বাধীন হলেও তাদের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা ও বন্ধুত্বের মনোভাব। কেবল একই অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেই নয়, বিশ্বের দূরদূরান্তে অবস্থিত দেশগুলোর মধ্যেও এ ধরনের সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে। সহযোগিতার এ গুরুত্ব থেকে তাই পৃথিবীতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা, যেমন-জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথ ইত্যাদি। এসব আন্তর্জাতিক সংস্থা বিভিন্ন দেশকে সহযোগিতা দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব : বর্তমান যুগ পরস্পর নির্ভরশীলতার যুগ। আর পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এ যুগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। একটি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ, আবহাওয়া, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে এ ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। অনেক সময় একটি দেশ সরাসরি বা দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে অন্য দেশকে সাহায্য করে। আবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমেও সহযোগিতা করে থাকে। মূলত নিজস্ব প্রচেষ্টার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বের দেশগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে। আবার এমন অনেক সমস্যা আছে যেগুলোর সাথে এক বা একাধিক দেশের স্বার্থ জড়িত। ফলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব হয় না। এ জন্য বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
নিচে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো। এগুলো পাঠের মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবে।
উদাহরণ-১: বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে নিরক্ষর জনসংখ্যা অনেক। শিক্ষা হচ্ছে যে কোনো দেশের সব ধরনের উন্নয়নের চাবিকাঠি। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে দেশগুলোর নিজেদের পক্ষে দেশের সকলকে শিক্ষিত করা সম্ভব নয়। ফলে ইউনিসেফ, ইউনেস্কোসহ বিশ্বের আরও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সাহায্য দিচ্ছে। জাতিসংঘ 'সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা'র আলোকে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশগুলোকে নিরক্ষরতামুক্ত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল।
এ লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশকে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছিল। 'সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা' ২০১৫ সালে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর 'টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা'র যাত্রা ২০১৬ হতে শুরু হয়।
উক্ত লক্ষ্য মাত্রায় শিক্ষার সম্প্রসারণ ও মান উন্নয়নে জাতিসংঘের অঙ্গীকার রয়েছে।
উদাহরণটি থেকে সহজেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। এ ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের অনেক বড়ো বড়ো সমস্যার সমাধান সম্ভব।
কাজ: আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বের উপর একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন লিখ। |
জাতিসংঘ গঠনের পটভূমি
আমরা জানি বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মাত্র ২৫ বছরের ব্যবধানে পৃথিবীতে দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথমটি হয় ১৯১৪ সালে এবং দ্বিতীয়টি শুরু হয় ১৯৩৯ সালে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এসব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। এ যুদ্ধ ছিল মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় বিরাট বাধা। সেজন্য যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী চলেছে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা। তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯২০ সালে গঠিত হয়েছিল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা লীগ অব নেশনস। কিন্তু বিভিন্ন দেশের স্বার্থপরতার কারণে এ সংস্থাটি স্থায়িত্ব লাভকরেনি। ফলে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীকে গ্রাস করে। এ যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জাপান আণবিক বোমার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। মারা যায় লাখ লাখ মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা দেখে বিশ্ববাসী শংকিত ও হতবাক হয়ে যায়। তাদের মনে দানা বাঁধে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। এছাড়া তারা অনুভব করে মানব কল্যাণের জন্য যুদ্ধকে পরিহার করতে হবে।
দেশগুলোকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসতে হবে। ফলে ১৯৪১ সাল থেকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হাতে নেয়। তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর উদ্যোগে এবং বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের সাথে দীর্ঘদিন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ১৯৪৫ সালের ২৪-এ অক্টোবর তারিখে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় অন্য কোনো যুদ্ধের ধ্বংসলীলা থেকে মুক্তির জন্য জাতিসংঘের জন্ম হয়।
জাতিসংঘ গঠন
জাতিসংঘ মোট ছয়টি সংস্থা বা শাখা নিয়ে গঠিত।
শাখাগুলো নিম্নরূপ:
ক) সাধারণ পরিষদ
খ) সচিবালয়
গ) অছি পরিষদ
ঘ) আন্তর্জাতিক আদালত
ঙ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ
চ) নিরাপত্তা পরিষদ
শুরুতে জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫১। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৯৩। জাতিসংঘের মহাসচিব হচ্ছে এর প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। নরওয়ের অধিবাসী ট্রিগভেলি ছিলেন জাতিসংঘের প্রথম মহাসচিব। বর্তমান (জানু-২০১৭ হতে) মহাসচিবের নাম অ্যান্টনিও গুতেরেস (Antonio Guterres)। তিনি পর্তুগালের অধিবাসী। জাতিসংঘের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে অবস্থিত। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে।
জাতিসংঘের নিজস্ব পতাকা আছে। পতাকাটি হালকা নীল রঙের। মাঝখানে সাদার ভিতরে বিশ্বের বৃত্তাকার মানচিত্র রয়েছে। এর দুইপাশ দুটি জলপাই পাতার ঝাড় দিয়ে বেষ্টিত।
জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি। এগুলো হলো: আরবি, চাইনিজ, ইংরেজি, ফরাসি, রাশিয়ান ও স্পেনিশ। জাতিসংঘের যেকোনো সভায় এই ছয়টি ভাষার যেকোনো একটি ব্যবহার করা হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাকি ভাষাগুলোতে অনুবাদ হয়ে যায়। তবে ইংরেজি ভাষার উপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়ে থাকে।
কাজ: জাতিসংঘের গঠন সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত রচনা তৈরি কর। |
জাতিসংঘ গঠনের উদ্দেশ্য
বিশ্বশান্তি ও সহযোগিতার মহান লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপ-
জাতিসংঘের মৌলিক নীতি
জাতিসংঘের সাতটি মৌলিক নীতি আছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো এগুলো মেনে চলার শর্তে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে থাকে। এ মূলনীতিগুলো-
জাতিসংঘ মানবতার কল্যাণ ও সদস্য রাষ্ট্রসমূহের উন্নয়নের লক্ষ্যে বহুমুখী কাজ করে থাকে। নিম্নে জাতিসংঘের কয়েকটি কাজ উল্লেখ করা হলো:
দলীয় কাজ: পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন রিপোর্টের ভিত্তিতে জাতিসংঘের উদ্দেশ্য ও মূলনীতি বাস্তবায়নের দুটি করে উদাহরণ উল্লেখ করে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন তৈরি কর। |
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের উপর দাঁড়িয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি থেকেই জন্ম নিয়েছিল জাতিসংঘ। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার একটি প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জাতিসংঘ সফলতা অর্জন করেছে। আবার কোথাও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তা সত্ত্বেও এর অবদান উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের সবচেয়ে বড়ো অবদান হলো এটি প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বে আজ পর্যন্ত কোনো বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই। এটি প্রতিষ্ঠার পূর্বে মাত্র ২৫ বছরের ব্যবধানে দুটি বিশ্ব যুদ্ধ পৃথিবীকে গ্রাস করেছিল। জাতিসংঘের একটি অন্যতম সংস্থা 'নিরাপত্তা পরিষদ'।
বিশ্বশান্তি রক্ষার প্রধান দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনে নিরাপত্তা পরিষদকে যে কোনো সম্মিলিত ব্যবস্থা গ্রহণে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। ফলে বিশ্বের কোথাও কোথাও আন্তর্জাতিক শান্তিবিরোধী কোনো কাজ সংঘটিত হলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালায়। এভাবে জাতিসংঘ বিশ্ব শান্তি রক্ষায় ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশ্বের অনেক দেশেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা অর্জন, এর একটি অন্যতম উদাহরণ।
এছাড়া বিভিন্ন দেশে এবং অঞ্চলে বিরাজমান আর্থ-সামাজিক সমস্যা, মানবাধিকার লংঘন ইত্যাদিও বিশ্ব শান্তি নষ্ট করে। তাই জাতিসংঘ বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বিভিন্ন দেশের যুদ্ধ, সংঘাত নিরসনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। নিচে সংক্ষেপে জাতিসংঘের এ জাতীয় উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
কাজ: বর্তমানে জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে কী ভূমিকা পালন করছে? |
বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর একটি অন্যতম সদস্য দেশ। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সদস্যপদ লাভ করার পর থেকেই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশ সর্বপ্রথম ১৯৮৮ সালে শান্তিরক্ষা বাহিনীতে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য প্রেরণ করে।
২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী (সশস্ত্রবাহিনী) এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্য মিলে ৪০টি দেশে ৫০টি মিশনে কাজ করছে। এ পর্যন্ত যে সমস্ত দেশে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা বাহিনী কাজ করছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি দেশের নাম উল্লেখ করা হলো: কংগো, হাইতি, আইভোরি কোস্ট, পূর্বতিমুর, ইরাক, কুয়েত, নামিবিয়া, সুদান, সিয়েরালিয়ন, পশ্চিম সাহারা, মোজাম্বিক, রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া, উগান্ডা, জর্জিয়া, সিরিয়া, লাইবেরিয়া আফগানিস্তান প্রভৃতি।
২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে মোট ১,৫৭,০৫০ জন সদস্য পাঠিয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রথম স্থান দখল করে আছে। বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা বিশ্ব শান্তিরক্ষী বাহিনীতে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। এ সুনাম অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে নতুনভাবে পরিচিত করছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে অংশগ্রহণ ও সুনাম অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশকে অবশ্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে অংশ গ্রহণ করে ১২৪ জন সদস্য বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও শান্তিরক্ষার যুদ্ধে নিহত হয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশিরা সর্বোচ্চ কৃতিত্ব প্রদর্শন করছে। বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর কেবল পুরুষ সদস্যই নয়, মহিলা সদস্যও দক্ষতা এবং সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করছে ও বিদেশের মাটিতে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে।
আসলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর অবস্থান উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। এ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে শান্তিরক্ষা বাহিনীতে কমান্ডার হিসেবে ও ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ভূমিকার আরেকটি স্বীকৃতি, যা বিশ্বে দেশের মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ দেশকে অর্থনৈতিকভাবেও সমৃদ্ধ করছে।
কাজ: বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের অবদান ও আত্মত্যাগ উদাহরণের সাহায্যে তুলে ধরো। এক্ষেত্রে পত্র-পত্রিকার সাহায্যে এটা করা যেতে পারে। |
১. সব ধরনের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি নিচের কোনটি?
ক. পরিশ্রম
খ. সম্পদ
গ. শিক্ষা
ঘ. স্বাস্থ্য
২. শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ-
i. বাংলাদেশের ব্যাপক পরিচিতি দিয়েছে
ii. বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে
iii. বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ খুলে দিয়েছে
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. i ও iii
ঘ. i, ii ও iii
৩. বিশ্ব শান্তি রক্ষার প্রধান দায়িত্ব জাতিসংঘের কোন পরিষদের?
ক. সাধারণ পরিষদের
খ. আন্তর্জাতিক আদালতের
গ. অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের
ঘ. নিরাপত্তা পরিষদের
8. নিচের কোনটি জাতিসংঘের কাজ নয়?
ক. শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
খ. আগ্রাসী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া
গ. নির্বাচনে সহায়তা করা
ঘ. আন্তর্জাতিক আদালতের বিরোধ নিষ্পত্তি করা
সৃজনশীল প্রশ্ন
১. ২০১২ সালে 'ক' উপজেলার সকল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান একত্রিত হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানকে পরিষদের সভাপতি করে প্রত্যেকটি ইউনিয়নের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য কিছু নীতিমালা করে তা মেনে চলার অঙ্গীকার করেন। প্রতিটি ইউনিয়নের বিরোধ মীমাংসা, উন্নয়ন এবং এলাকার মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ শুরু করে। এতে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এলাকার মানুষ নিরাপদ জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়। দুটি ইউনিয়নের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে 'ক' উপজেলা চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে তা সমাধান হয়। 'ক' উপজেলার সাফল্যে অন্যান্য উপজেলাও এ ধরনের নীতিমালা গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
ক. কত সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে?
খ. 'জাতিসংঘে সকল সদস্য রাষ্ট্র সমান মর্যাদা ও সমান সার্বভৌমত্বের অধিকারী হবে'- জাতিসংঘের এ মৌলিক নীতিটির ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকের দুই ইউনিয়নের বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াটি জাতিসংঘের কোন নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ? তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. 'ক' উপজেলার শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা জাতিসংঘের বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টার অনুরূপ'-মতামত দাও।
২. নিচের চিত্রটি লক্ষ কর এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও।
সিয়েরালিয়ন জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন ডাক্তার চিকিৎসা দিচ্ছেন
ক. জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিবের নাম কী?
খ. 'আঞ্চলিক সংস্থাসমূহের সহযোগিতা গ্রহণ করা-জাতিসংঘের একটি কাজ'-ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকের চিত্রে কর্মরত বাহিনী বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তায় কী ভূমিকা পালন করছে-ব্যাখ্যা কর।
ঘ. চিত্রে প্রদর্শিত বাহিনীর ভূমিকার কারণেই বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম ও মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে-তুমি কী এ বক্তব্যের সাথে একমত? মতামত দাও।
Read more