Nature of Sociology
সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি নির্ণয় করতে হলে অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে এর সম্পর্ক নির্ণয়ের পাশাপাশি শাস্ত্রটির অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর ওপরও নজর দিতে হবে। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী টি. বি. বটোমোর (T. B. Bottomore) বলেন, "সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত বিতর্ক এর প্রকৃতি নিয়ে। একদল সমাজতাত্ত্বিক একে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অনুরূপ মনে করেন। অন্য একদলের মতে, এটি একটি স্বতন্ত্র বিষয়, ইতিহাস কিংবা দর্শনের সাথেই যার বেশি মিল।"৮ সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি সম্পর্কে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট বার্স্টেড (Robert Bierstedt) তার 'The Social Order' গ্রন্থে কতকগুলো প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। এগুলো হচ্ছে-
১. সমাজবিজ্ঞান সামাজিক বিজ্ঞান, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নয়।
২. সমাজবিজ্ঞান বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান, আদর্শ বিজ্ঞান নয়।
৩. সমাজবিজ্ঞান তাত্ত্বিক বিজ্ঞান, ব্যবহারিক বিজ্ঞান নয়।
৪. সমাজবিজ্ঞান তুলনামূলকভাবে বিমূর্ত বিজ্ঞান, সুনির্দিষ্ট ঘটনা নয়।
৫. সমাজবিজ্ঞান সাধারণ বিজ্ঞান, বিশেষ কোনো বিজ্ঞান নয়।"
বস্তুত সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি এর বিভিন্ন সংজ্ঞা বিশ্লেষণের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া। পাওয়া যায়। বিভিন্ন সংজ্ঞা পর্যালোচনা করে
সমাজবিজ্ঞানের যে প্রকৃতি নির্ণয় করা যায় তা নিচে উল্লেখ করা হলো-হলো-
সামাজিক সম্পর্কের বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ (Scientific study of social relationship): মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে সমাজ গড়ে ওঠে। এজন্য সমাজবিজ্ঞান সামাজিক মানুষের আচার-আচরণ, আদর্শ-মূল্যবোধ, কার্যাবলি, রীতিনীতি কীভাবে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এবং কীভাবে এর গতিশীলতা বজায় থাকে তা নিয়ে অধ্যয়ন করতে গিয়ে গোটা সমাজের মধ্যেই এর অনুসন্ধান করে।
সমাজ সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ পাঠ (Complete study of society): সামাজিক বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য বিষয় (রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজকল্যাণ, নৃবিজ্ঞান ইত্যাদি) সমাজের এক একটি বিশেষ দিক নিয়ে আলোচনা করে। এসব সামাজিক বিজ্ঞানের কোনোটিই সমাজ সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ অধ্যয়নের দাবি করতে পারে না। পক্ষান্তরে গোটা সমাজই সমাজবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয় বা ক্ষেত্র। তাই বলা যায়, সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে সমাজ সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ পাঠ।
সমাজকাঠামোর অধ্যয়ন (Study of social structure): সমাজকাঠামো সমাজবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় প্রত্যয়। আর সমাজকাঠামোর মূল ভিত্তি হচ্ছে সামাজিক সম্পর্ক। বস্তুত মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোর দ্বারাই সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রথা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে সমাজবিজ্ঞান আলোচনা করে। এ কারণে বলা হয় যে, সমাজবিজ্ঞান হলো সমাজকাঠামো সম্পর্কিত বিশেষ অধ্যয়ন।
সমাজকাঠামোর অধ্যয়ন (Study of social structure): সমাজকাঠামো সমাজবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় প্রত্যয়। আর সমাজকাঠামোর মূল ভিত্তি হচ্ছে সামাজিক সম্পর্ক। বস্তুত মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোর দ্বারাই সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রথা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে সমাজবিজ্ঞান আলোচনা করে। এ কারণে বলা হয় যে, সমাজবিজ্ঞান হলো সমাজকাঠামো সম্পর্কিত বিশেষ অধ্যয়ন।
সমাজের বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ (Scientific study of society): সমাজবিজ্ঞান মানবসমাজের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বন করে, যার প্রেক্ষিতে তার ব্যাখ্যা হয় তথ্যনির্ভর ও যুক্তিভিত্তিক। সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতির ফলে মানব আচরণে ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে যে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে তারও সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা সমাজবিজ্ঞান প্রদান করে। কার্যত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাজবিজ্ঞান ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করে।
প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নয় (Not natural science): সমাজবিজ্ঞান সামাজিক বিজ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত। এটি ভৌত বা প্রাকৃতিক, বিজ্ঞানের (রসায়নবিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান ইত্যাদি) মতো নয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয়বস্তুকে যেভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করে, সমাজবিজ্ঞান সেভাবে করতে পারে না। তবে সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন সূত্রকে প্রয়োগ করে। ফলে এর বিষয়বস্তু বাস্তবসম্মত ও তথ্যনির্ভর হয়।
তাত্ত্বিক বিজ্ঞান (Theoretical science): সমাজবিজ্ঞান পুর প্রকৌশল, স্থাপত্যবিদ্যা বা কম্পিউটার বিজ্ঞানের মতো ব্যবহারিক শাস্ত্র নয়। একে পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র বা গণিতশাস্ত্রের মতো একটি তাত্ত্বিক বিজ্ঞান হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা গবেষণার দ্বারা নিত্যনতুন তত্ত্ব আবিষ্কারের সাথে সাথে পুরোনো তত্ত্বের সম্প্রসারণ বা পরিমার্জনের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটান, যেখানে ব্যবহারিক বিষয়ের চেয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটানোই থাকে মূল লক্ষ্য।
সর্বজনীন সমাজ পাঠ (Studying universal society): বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে সমাজবিজ্ঞানে যে শৃঙ্খলিত জ্ঞান, সাধারণ সূত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়, সেগুলো ভবিষ্যতে অনুরূপ অবস্থায় নির্দ্বিধায় প্রয়োগ করা যায়। এ জন্য একে সর্বজনীন সমাজ পাঠ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, গ্রামীণ জীবনে ক্ষমতা কাঠামো, মর্যাদা ও শ্রেণিসম্পর্ক, অপরাধ, দুর্নীতি, পরিবার-পরিকল্পনা, আত্মহত্যা ইত্যাদি সম্পর্কে সামাজিক সিদ্ধান্তগুলো মোটামুটিভাবে উন্নয়নশীল বা অনুন্নত সব দেশের গ্রামের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য।
বিশ্লেষণধর্মী বিজ্ঞান (Analytical science): সমাজবিজ্ঞান কেবল সমাজের ঘটনাবলির আলোচনাই করে না বরং ওই ঘটনাসমূহের কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টাও চালায়। এক্ষেত্রে যৌক্তিক বিচার-বিশ্লেষণের সহায়তা নেয়া হয়। তাই বলা হয়, সমাজবিজ্ঞান একটি বিশ্লেষণধর্মী বিজ্ঞান।
বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান (Objective science): বস্তুনিষ্ঠতা সমাজবিজ্ঞানীর জন্য একটি অবশ্য পালনীয় বিধি হিসেবে গণ্য করা হয়। সমাজবিজ্ঞান বিভিন্ন সামাজিক ঘটনাবলির কার্যকরণ সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে নির্মোহভাবে যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেওয়ার চেষ্টা করে। এ প্রসঙ্গে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী কিউবার (J. F. Cuber) বলেন, “বস্তুনিষ্ঠতার পথে যেহেতু মূল্যবোধ একটা বাধা হিসেবে স্বীকৃত, সেহেতু কার্যক্ষেত্রে তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টাটিকে আদর্শিকভাবে মেনে নেয়া উচিত, যদিও বাস্তবে তা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। ”
মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বিজ্ঞান (Value free Science): সমাজবিজ্ঞান তার বৈজ্ঞানিক চরিত্র বজায় রাখতে গিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞান অন্যতম সামাজিক সমস্যা নিরক্ষরতার কারণ উদঘাটন করে, কিন্তু এ সমস্যার জন্য কে দায়ী সে সম্পর্কে মতামত দেয় না। এ কারণে সমাজবিজ্ঞানকে মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করা হয়।
সামাজিক স্থিতিশীলতা ও গতিশীলতার বিজ্ঞান (Social statics and dynamics): সমাজবিজ্ঞান একই সাথে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও গতিশীলতার বিজ্ঞান। ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ-এর মতে, সমাজের স্থিতিশীলতা বর্ণনা মানে পরিবার, ধর্ম, শিক্ষা, বিবাহ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি স্থায়ী প্রতিষ্ঠানসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক আলোচনা। অন্যদিকে সামাজিক গতিশীলতা বিশ্লেষণ মানে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে কালের পরিক্রমায় উন্নত ও পরিবর্তিত হচ্ছে তার আলোচনা। শাস্ত্র হিসেবে সমাজবিজ্ঞান এ দুটো পারস্পরিক বিপরীত বিষয় নিয়েই আলোচনা করে।
বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক শাস্ত্র (Realistic and rational discipline): শাস্ত্র হিসেবে সমাজবিজ্ঞান বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। এমন কোনো আলোচ্য বিষয় পাওয়া যাবে না যেখানে সমাজবিজ্ঞান বাস্তবতা বিবর্জিত বিশ্লেষণ করেছে। এ জন্যই দেখা যায়, বিভিন্ন দার্শনিক (প্লেটো, টমাস ম্যুর, ম্যাকিয়াভেলি প্রমুখ) 'ইউটোপিয়া' বা কাল্পনিক আদর্শ সমাজের যেসব ধারণা প্রদান করেছেন তা সমাজবিজ্ঞান গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেনি।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সামাজিক বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে সমাজবিজ্ঞান একটি ভিন্ন তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বৈজ্ঞানিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত, যা শাস্ত্রটির প্রকৃতির মধ্যেই সুস্পষ্ট।
সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশ-ড. মো. আবদুল মালেক সরকার-স্যারে লেখা বই
Read more