শব্দগঠনের জন্য কতকগুলো ভাষিক উপাদান রয়েছে। এগুলোকে বলে প্রত্যয়, বিভক্তি, উপসর্গ ও সমাস। নিচে এগুলো আলোচনা করা হলো।
১) প্রত্যয়: প্রত্যয় বলতে সেইসব ভাষিক উপাদানকে বোঝায়, যেগুলো স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হয় না। এগুলো শব্দের পরে বসে। প্রত্যয় দু ধরনের- কৃৎ প্রত্যয় ও তদ্ধিত প্রত্যয়। কৃৎ প্রত্যয় বসে ক্রিয়ামূলের শেষে। যেমন- খেল্ + আ = খেলা; পড়ু উয়া পড়ুয়া। তদ্ধিত প্রত্যয় বসে শব্দের পরে। যেমন- সমাজ ইক সামাজিক; বাঙালই বাঙালি। প্রত্যয়ের সাহায্যে গঠিত কিছু শব্দের নমুনা নিচে দেওয়া হলো:
ক্রিয়ামূল / শব্দমূল + প্রত্যয় = গঠিত শব্দ
ফল+ অন = ফলন '- হাত+আ = হাতা
দুল্+অনা = দোলনা - ঢাকা+আই = ঢাকাই
কাঁদ্+অন = কাঁদন - প্যাঁচ-আনো = প্যাঁচানো
খেল্+অনা = খেলনা - পাগল+আমি = পাগলামি
ফুট্+অন্ত = ফুটন্ত - শাঁখা+আরি = শাঁখারি
বল্+আ = বলা - দাঁত+আল = দাঁতাল
বাঁধ+আই = বাঁধাই - আকাশ+ই = আকাশি
জান্+আন = জানান - ইচ্ছা+উক = ইচ্ছুক
মিশ্+উক = মিশুক - জমি+দার = জমিদার
নাচ্+উনি = নাচুনি - হাত+উড়ে = হাতুড়ে
২) বিভক্তি: প্রত্যয়ের মতো বিভক্তিরও স্বাধীন ব্যবহার নেই। এগুলো ক্রিয়ামূল বা শব্দমূলের পরে বসে। ক্রিয়ামূলের পরে যে-বিভক্তি বসে তাকে বলে ক্রিয়া-বিভক্তি। যেমন- খেল্ + ই = খেলি; পড়ু + ইল = পড়িল>পড়ল; দেখ্ + ইব = দেখিব দেখব। শব্দমূলের পরে যে-বিভক্তি বসে তা-ই শব্দ বিভক্তি। যেমন- বাড়ি + তে = বাড়িতে; মামা + র = মামার; ছাত্র + দের = ছাত্রদের।
৩) উপসর্গ: প্রত্যয় বা বিভক্তির মতো উপসর্গ বলতেও কিছু ভাষিক উপদানকে বোঝায়। কিন্তু প্রত্যয় ও বিভক্তি বসে শব্দের শেষে; উপসর্গ বসে শব্দের আগে। যেমন- 'হার' একটি শব্দ, এর পূর্বে প্র-, বি-, উপ- উপসর্গ যোগ করলে হয় প্রহার (< প্র + হার), বিহার (< বি+ হার), উপহার (< উপ + হার)। বোঝাই যাচ্ছে যে, উপসর্গের সাহায্যে নতুন শব্দ বা ভিন্ন অর্থবহ শব্দ তৈরি হয়। কিন্তু বিভক্তির সাহায্যে তা কখনো হয় না, মূল শব্দটি কেবল সম্প্রসারিত হয়। প্রত্যয়যোগে নতুন শব্দ কখনো হয় আবার কখনো হয় না। মনে রাখতে হবে, নতুন শব্দ তখনই তৈরি হয় যখন আগের শব্দটি থেকে গঠিত শব্দটির অর্থ, আকার বা রূপ ও শ্রেণির পরিবর্তন ঘটে। যেমন- বাড়ি তে = বাড়িতে শব্দে আয়তন 'বাড়ি' থেকে বেড়েছে, অর্থ বদলায়নি। কিন্তু 'পড়'-এর পর -উয়া প্রত্যয় যোগ করে 'পড়ুয়া' গঠন করলে দেখা যাচ্ছে যে, 'পড়'-এর অর্থ যা, 'পড়ুয়া'-র অর্থ তা থেকে ভিন্ন। 'পড়' (তুই বই পড়) হলো ক্রিয়া কিন্তু 'পড়ুয়া' বিশেষ্য। 'পড়ুয়া' নতুন শব্দ।
৪) সমাস: দুই বা তার চেয়ে বেশি শব্দ একসঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি শব্দ তৈরির প্রক্রিয়াকে সমাস বলে। যেমন- কালের অভাব = আকাল; খেয়া পারাপারের ঘাট = খেয়াঘাট; নদী মাতা যার = নদীমাতৃক ইত্যাদি।