সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন

মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস - বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা - এসএসসি | NCTB BOOK

1.9k

মধ্যযুগে বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় হিন্দু ও মুসলমান এই দুইটি ধর্মের প্রভাব বিদ্যমান ছিল । বস্তুত এই দুই ধর্মকে কেন্দ্র করেই মধ্যযুগে বাংলার সামাজিক রীতি-নীতি গড়ে উঠেছিল ।

মুসলমান সমাজ ও সংস্কৃতি:
মধ্যযুগে বাংলায় মুসলমান শাসনকালে সুলতান ছিলেন সমাজ জীবনে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী । মুসলমান সমাজ জীবনে সুলতানকে কতকগুলো বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হতো। জুমা এবং ঈদের নামাজে খুতবা পাঠ মুসলমান শাসকের একটি বিশেষ কর্তব্য ছিল। তাঁকে মুসলমান সমাজের নেতা হিসেবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হতো । মুসলমানদের ঐক্য ও ধর্মীয় চেতনা প্রসারের জন্য শাসক নিজ নিজ রাজ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ্ ইত্যাদি নির্মাণ করতেন। মুসলমান শাসকরা জমকালো প্রাসাদে বাস করতেন। তাঁদের রাজধানীও নানারকম মনোমুগ্ধকর অট্টালিকায় সুসজ্জিত থাকত । ঐশ্বর্য ও আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও রাজদরবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের সমাবেশ । শাসকগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতির উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

মধ্যযুগে বাংলায় মুসলমান সমাজ ব্যবস্থায় উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন – এই তিনটি পৃথক শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল। সৈয়দ, -- উলেমা প্রমুখ শ্রেণি সমাজে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল । ধর্মপরায়ণ ও শিক্ষিত ব্যক্তিগণকে জনগণ যথেষ্ট শ্রদ্ধা করত। মুসলমান শাসকগণও তাঁদের বিশেষ শ্রদ্ধা করতেন। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে ভাতা এবং জমি বরাদ্দ করা হতো। উলেমাগণ ইসলামি শিক্ষায় অভিজ্ঞ হতেন । তাঁদের মধ্য থেকে কাজি, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং ধর্মবিষয়ক অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগ করা হতো । শেখগণ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে জনগণকে শিক্ষা দিতেন। মধ্যযুগে বাংলায় মুসলমান সমাজের অগ্রগতির ক্ষেত্রে তাঁদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

মধ্যযুগে বাংলার মুসলমান সমাজে একটি অভিজাত সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল । যোগ্যতা, প্রতিভা ও জ্ঞানের দ্বারা তারা নিজেদের সাধারণ মানুষের তুলনায় একটি আলাদা শ্রেণি হিসেবে গড়ে তুলেছিল । যেকোনো ব্যক্তি তার যোগ্যতা ও প্রতিভা দ্বারা রাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ পদে বসতে পারতেন। এ ক্ষেত্রে সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওজ খলজি ও সুবাদার মুর্শিদ কুলি খানের দৃষ্টান্ত উল্লেখযোগ্য । অবশ্য পরবর্তী সময়ে এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে। উত্তরাধিকার সূত্রে মর্যাদাপূর্ণ সরকারি পদ লাভের নীতি প্রচলিত হয় । এ যুগে সামরিক ও বিচার বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের নিয়ে সরকারি অভিজাত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। নিম্ন শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হয় । কৃষক, তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমিক শ্রেণি নিয়ে তৃতীয় শ্রেণি গঠিত ছিল। কৃষকদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু । কতকগুলো পেশা মুসলমানদের জন্য একচেটিয়া ছিল ।

মুসলমান সমাজে কতকগুলো সামাজিক উৎসব পালন করা হতো। এগুলো এখনও মুসলমানরা পালন করে । মুসলমানরা নবজাত শিশুর নামকরণকে কেন্দ্র করে ‘আকিকা' নামক বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করে। ‘খতনা’ মুসলমান সমাজের একটি অতি পরিচিত সামাজিক প্রথা ছিল । বিয়ে মুসলমান সমাজের একটি বিশেষ উৎসবমুখর অনুষ্ঠান । মৌলবিরা মুসলমান রীতি-নীতি অনুযায়ী বিবাহকার্য সম্পন্ন করে থাকেন। মৃতদেহ সৎকার এবং মৃতের উদ্দেশে বিভিন্ন সময়ে মুসলমানরা কতকগুলো ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি-নীতি পালন করে। তারা মৃতদেহকে কবর দেয় এবং তার আত্মার শান্তির জন্য কোরআন পাঠ করে এবং মিলাদ পড়ায় । ধর্মীয় উৎসবাদি এবং বিয়ে-শাদির মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে মৌলবিদের উপস্থিতি অপরিহার্য । মুসলমান সমাজে সুফি ও দরবেশ নামে পরিচিত পির বা ফকির সম্প্রদায়ের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি লাভের জন্য সাধারণ মানুষ তাদের দেয়া তাবিজ-কবজ ব্যবহার করত । বাংলার বিশাল সংখ্যক হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরা অনেকেই তাদের পূর্ববর্তী ধর্মের কোনো কোনো বিশ্বাস ও সংস্কার ত্যাগ করতে পারেনি। এভাবে হিন্দু সমাজের ‘গুরুবাদ’ মুসলমান সমাজে প্রবেশ করে । পিরের দরগায় সন্ধ্যায় আলো জ্বালানো এবং শিরনি প্রদান অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা ছিল ।

অভিজাত মুসলমানরা ছিল ভোজনবিলাসী। তাদের খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন মাছ-মাংসের সঙ্গে আচারের নামও পাওয়া যায় । এসব খাবারের পাশাপাশি কাবাব, রেজালা, কোর্মা আর ঘিয়ে রান্না করা যাবতীয় মুখরোচক খাবার জায়গা করে নেয় । ভাত, মাছ, শাক-সবজি বাঙালি মুসলমানদের প্রতিদিনের খাদ্য ছিল। খাদ্য হিসেবে রুটির ব্যবহারের কথাও জানা যায় । খিচুড়ি তখনকার সমাজে একটি প্রিয় খাদ্য ছিল । অভিজাত মুসলমানরা পায়জামা ও গোল গলাবন্ধসহ জামা পরত। তাদের মাথায় থাকত পাগড়ি, পায়ে থাকত রেশম ও সোনার সুতার কাজ করা চামড়ার জুতা । তারা তাদের আঙ্গুলে অনেক মণি-মুক্তা বসানো আংটি ব্যবহার করত । মোল্লা ও মৌলবিরাও পায়জামা, জামা এবং টুপি ব্যবহার করত। গরিব বা নিম্ন শ্রেণির মুসলমানরা লুঙ্গি ও টুপি পরত। অভিজাত মহিলারা কামিজ ও সালোয়ার ব্যবহার করত । তারা প্রসাধনী ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল না । তারা বাহু ও কব্জিতে সোনার অলঙ্কার এবং আঙ্গুলে সোনার আংটি পরত ।

এ যুগের প্রথম দিকে চারিত্রিক গুণাবলি ও সততার জন্য মুসলমানরা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল । পরবর্তী সময়ে তারা ধর্মীয় আচরণের ক্ষেত্রে কঠোর ও নৈতিক মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে মুসলমান সমাজে দুর্নীতি ও অনৈসলামিক কার্যাবলির অনুপ্রবেশ ঘটে। সামাজিক জীবনে মুসলমানদের নৈতিক অধঃপতন শাসন ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করেছিল । বাংলার নবাবি শাসনের অবসানের পেছনে শাসকবর্গের নৈতিক অবনতি যথেষ্ট দায়ী ছিল।

 

হিন্দু সমাজ ও সংস্কৃতি:
মধ্যযুগে বাংলার মুসলমানদের প্রভাব, রীতিনীতি ও ভাবধারা হিন্দু সমাজে অনুপ্রবেশ করেছিল । তথাপি হিন্দু সমাজের মূল নীতিগুলো এবং সাধারণ সমাজ ব্যবস্থায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ যুগেও হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রচলিত ছিল । বিভিন্ন পেশাকে ভিত্তি করেই এ প্রথার সৃষ্টি। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র সমাজে এ চারটি উল্লেখযোগ্য বর্ণ ছিল । এ চার বর্ণের মানুষের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা ছিল না। বর্ণপ্রথা কঠোরভাবে পালিত হতো । ফলে এক বর্ণের সঙ্গে অন্য বর্ণের বিয়ে বা আদান-প্রদান নিষিদ্ধ ছিল । ধর্মকর্মের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের একক কর্তৃত্ব ছিল।

মধ্যযুগের বাংলায় জন্ম, বিয়ে ও মৃত্যু উপলক্ষে হিন্দুরা বিভিন্ন সামাজিক রীতি-নীতি পালন করতো । তখনকার যুগের প্রচলিত অনুষ্ঠানগুলো বর্তমানকালেও রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে লক্ষ্য করা যায়। সন্তান জন্মের পর তাকে গঙ্গাজল দিয়ে ধৌত করা হতো । ষষ্ঠ দিনে ষষ্ঠী পূজার আয়োজন করা হতো। ব্রাহ্মণ শিশুর কোষ্ঠী গণনা করতেন । এক মাস পর বালক উত্থান পর্ব পালন করা হতো। ছয় মাসের সময় করা হতো অন্নপ্রাশনের ব্যবস্থা । অধিকাংশ হিন্দু রমণী নিয়মিত উপবাস ও একাদশী পালন করতো।

হিন্দু সমাজে বিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক অনুষ্ঠান। বাংলায় হিন্দু সমাজে একান্নবর্তী পরিবারই ছিল অধিক । পিতার মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ পুত্রই সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করত। স্বামীভক্তি হিন্দু সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল।

এ সময়ে বাংলার হিন্দু সমাজে নারীদের তেমন কোনো অধিকার ছিল না। স্বামী স্ত্রীকে তার সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করত। কন্যা মাতা-পিতার ওপর, স্ত্রী স্বামীর ওপর, বিধবারা সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পত্তির ওপর স্ত্রীদের কোনো অধিকার ছিল না। সমাজে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল । তবে বাংলায় সর্বত্র এ প্রথা বাধ্যতামূলক ছিল না । তথাপি এ যুগে অনেক নারী নিজ যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিজেদের স্বাধীন সত্তাকে বিকশিত করতে সমর্থ হয়েছিল । সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এ যুগের নারীদের কৃতিত্ব কম ছিল না । বিত্তশালী পরিবারে নিয়মিত শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা হতো । বীণা, তানপুরা ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রে এ যুগের নারীরা পারদর্শী ছিল ।

পোশাক ও অলঙ্কার হিসেবে মেয়েরা পাট ও তুলার কাপড়, আংটি, হার, নাকপাশা, দুল, সোনার ব্রেসলেট, সোনার শাঁখা, কানবালা, নথ, অনন্ত, বাজু প্রভৃতি ব্যবহার করতো। বিত্তবান নারীরা অলঙ্কার ব্যবহার করতো। এ সকল অলঙ্কার সোনা, রুপা, হাতির দাঁত দ্বারা নির্মিত হতো এবং মণিমাণিক্য খচিত থাকতো । বিবাহিত স্ত্রীলোকেরা প্রসাধনী হিসেবে সিঁদুর, কাজল, চন্দন মিশ্রিত কস্তুরী প্রভৃতি ব্যবহার করতো। অনেকে পায়ে নূপুর পরতো। কেবল বিশেষ অনুষ্ঠানে এ সকল অলঙ্কার ও প্রসাধনী ব্যবহার করা হতো। সাধারণ মেয়েরা নিজেদের গৃহে সাধারণ বেশভূষায় সজ্জিত থাকতো। শাড়ি তাদের নিত্যদিনের পোশাক ছিল। পুরুষদের সাধারণ পোশাক ছিল ধুতি । অভিজাত এবং শিক্ষিত ব্যক্তিরা চাদর ও পাগড়ি ব্যবহার করতো। ধনী ব্যক্তিরা বিশেষত ব্যবসায়ীরা গলায় হার, কানে দুল এবং আঙ্গুলে আংটি পরতো।

মধ্যযুগের বাংলার হিন্দু সমাজের খাদ্যের সঙ্গে বর্তমান হিন্দু সমাজের খাদ্যের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই । ভাত ছিল প্রধান খাদ্য। এছাড়া খাদ্য তালিকায় ছিল মাছ, মাংস, শাক-সবজি, দুধ, দধি, ঘৃত, ক্ষীর ইত্যাদি। চাল থেকে প্রস্তুত নানা প্রকার পিঠাও জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার ছিল। বাঙালি ব্রাহ্মণরা আমিষ খেত । তখন সকল প্রকার মাছ পাওয়া যেত । পূর্ববঙ্গে ইলিশ ও শুঁটকি মাছ খুব প্রিয় খাবার ছিল । তরকারির মধ্যে বেগুন, লাউ, কুমড়া, ঝিঙ্গা, কাঁকরোল, কচু উৎপন্ন হতো। ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, কলা, তাল, পেঁপে, নারকেল, ইক্ষু পাওয়া যেত। উল্লেখ্য, তখনকার সময়ে হিন্দু-মুসলমানদের খাদ্য তালিকার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। তবে গরুর মাংস খাওয়া হিন্দুদের নিকট চরম অধর্ম হিসেবে বিবেচিত হতো ।

হিন্দু সমাজে কৌলীন্য প্রথা প্রচলিত ছিল । ফলে সমাজে নানা অনাচার অনুপ্রবেশ করেছিল । ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থদের মধ্যে এ প্রথার ব্যাপক প্রচলন ছিল । কৌলীন্য প্রথার ফলে সমাজে বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত হয় । মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু ও মুসলমান সমাজ জীবনে কতকগুলো সামাজিক বিশ্বাস জন্মলাভ করেছিল । জ্যোতিষী পাঁজি-পুঁথি ঘেঁটে শুভক্ষণ নির্ধারণ করত। এ সময় জনগণ ইন্দ্রজাল এবং জাদুবিদ্যায় বিশ্বাস করতো।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে
সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়
প্রাচীন রীতি-নীতি বিদ্যমান ছিল
জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়
উদ্দীপকটি পড়ে ১২ ও ১৩ নং প্রশ্নের উত্তর দাও :

বর্তমানে রাজাপুর গ্রামের রতন চন্দ্র দুর্গাপূজাসহ তার ধর্মের সকল দেব-দেবীর পূজা করেন। এ অপরদিকে আব্দুর রহিম সাহেবও নিজ ধর্মের সকল উৎসব পালন করেন। কেউ কারও ধর্মীয় উৎসব পালনে বাধা দেয় না। ফলে সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধন দৃঢ় হয়।

Promotion

Are you sure to start over?

Loading...