অমর কথাশিল্পী নামে পরিচিত - 

Updated: 5 months ago
  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

  • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

  • কাজী নজরুল ইসলাম

  • কাজী মোতাহার হোসেন

756
উত্তরঃ

অমর কথাশিল্পী নামে পরিচিত - শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়

অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা সাহিত্যে বহু অমর চরিত্রের স্রষ্টা

বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী বলা হয় তাকে। ছোটবেলায় একবার মাথায় একটা ফোঁড়া হওয়ায় সব চুল ফেলে দেয়া হয়। সেই থেকে সবাই তাকে ডাকতো ‘ন্যাড়া’ বলে। নামটি শুনে কিছু মনে পড়লো কি? নিশ্চয়ই ‘বিলাসী’ গল্পের কথা। পাঠ্যবইয়ের বদৌলতে প্রায় সবাই - ই পড়েছেন হয়তো। মৃত্যুঞ্জয়ের সকল গল্পের ঝুলি নিয়ে পাঠকদের কাছে যে গল্প বলেছিলো, সে কথকের নামও কিন্তু ছিল ‘ন্যাড়া’। এই দুজন ব্যক্তিই এক। আজ আমরা বলছি বিলাসী গল্পের কথক শরৎচন্দ্রের কথা। পুরো নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যিনি ব্যক্তিজীবনেও সাপুড়েদের মতো পটু ছিলেন বিষধর সাপ ধরার ক্ষেত্রে।

গল্প - উপন্যাস - প্রবন্ধ সব জায়গায়ই পাঠককূলে সমাদৃত এক সাহিত্যিক। রোম্যান্টিক ট্র্যাজেডি কিংবা সমাজ সংস্কার, আবহমান বাংলার আত্মকথা কিংবা স্যুট - ব্যুট পরা কোনো বিলেতফেরত নায়ক, আত্মত্যাগে নিজেকে বিলীন করে দেয়া নায়িকা কিংবা প্রতিবাদে মাথাচাড়া দেয়া কোনো অরক্ষণীয়া। শরৎচন্দ্র এদের সবাইকেই খুব গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন আমাদের কাছে। নারীর প্রতি বিশেষ একধরনের স্থান থাকতো শরতের গল্প - উপন্যাসে, তার সমসাময়িক অন্যদের মতো নারীকে তিনি শুধু অবলা বলেই রেখে দেননি, তাদের মুখে বুলি ফুটিয়েছেন, কিছুটা হলেও তাকে দাঁড় করিয়েছেন সমাজের স্রোতের বিরুদ্ধে। রবি ঠাকুরের হৈমন্তী যখন স্বামী সংসার আর যৌতুকের পরাকাষ্ঠার বলি হয়, শরতের বিলাসী তখনো লড়ে যাচ্ছে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু জয়ে।

 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬ - ১৯৩৮); The New Nations

তার চরিত্রগুলোর অনেকেই আত্মজৈবনিক। বলা যায়, তার জীবনদর্শন ও বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়েছে তাদের মধ্য দিয়ে। তার চরিত্রগুলোর কেউ কারো চেয়ে কম নয়। সবাই নিজস্ব আবেদনে ভাস্বর। কোন পরিস্থিতিতে কোন চরিত্র ঠিক কীরকম আচরণ করবে, তা যেন পাঠকের কাছে একধরনের চমক। এই ‘চরিত্রহীন’ - এর সতীশের কথাই ধরা যাক না, মাতাল এবং খামখেয়ালী সতীশকে কোনো পাঠক কি একটু সময়ের জন্যও ভালো না বেসে পেরেছেন? কারণ সে সবসময় একটা সমান্তরাল চরিত্রে অবতীর্ণ হয়ে গিয়েছে উপন্যাস জুড়ে, সাবিত্রীর প্রতি তার প্রেম সতীশের জন্য আপনাকে কখনোই কোনো ভালো না লাগা আনতে দেবে না। আর কিরণময়ী? রহস্যময়ী সেই সিঁড়ির কাছটাতে সতীশ ও উপেনের প্রথম দেখা মুখ, সময়ের প্রবাহমানতায় যার প্রতি প্রচন্ড রাগ হবে! কিন্তু তারপরও তাকে কাছে টানতেই হয়। কি এক অদ্ভুত আকর্ষণী শক্তি এদের যে কখনো কোনো নেতিবাচক চরিত্রকেও ঠিক দূরে ঠেলে দেয়া যায় না। এদের জন্যও একটা মায়া কাজ করতে থাকে। সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে পরিবর্তনের জোয়ার বয়েছে শরত - রচনায়।

‘দেবদাস’ উপন্যাসে দেবদাস কিংবা পার্বতী, চন্দ্রমুখী কিংবা চুনিলাল। ভুল এরা করেই গিয়েছে কাহিনীর বিভিন্ন অংশে, তারপরেও সেসব ভুলকে একটা মায়ার দৃষ্টি থেকে দেখবার জায়গা করে দিয়েছেন শরৎচন্দ্র। একে অপরকে এতো ভালোবাসবার পরও দেবদাস - পার্বতী নিজেদের সাথে এমন কেন করে? ঠিক এই প্রশ্নের জবাবে লেখক দিয়েছেন আত্মসম্মানের ব্যাখ্যা। কখনো কখনো ব্যক্তিপ্রেমের চাইতেও আত্মসম্মান কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এবং তখন প্রেমও এই সীমানা অতিক্রম করতে পারে না। এদের প্রেমটাও ঠিক তেমনই। পড়তে পড়তে খারাপ লাগে, তারপর আবার মনে হয়, “নাহ ঠিকই আছে!”। এভাবে চরিত্র আর কাহিনীর মধ্য দিয়ে চলতে চলতে কোনো এক পথের মোড়ে এসে লেখক যেন একটা দ্বিধা সৃষ্টি করে দেন পাঠকমনে। এর ব্যাখ্যা চেয়ে বসেন হঠাৎ করেই। পাঠক যখন নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চায়, “এ ভালো ও মন্দ” - এমন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে চায়, ঠিক তখনই পাশার দান উল্টে দেবার মতো করে লেখক সিদ্ধান্ত দেন। ভালো বা মন্দের সীমানা ছাড়িয়ে চরিত্রগুলো তখন হয়ে ওঠে সময় ও স্থানের মুখাপেক্ষী, তারা পরিচালিত হতে থাকে আপেক্ষিকতার মধ্য দিয়ে। পাঠকেরা একটু আগে নেয়া সিদ্ধান্ত দোলাচলে ভোগে। চরিত্রগুলোর আবেদন ক্রমশ বাড়তে থাকে। এভাবেই বোধ হয় কাহিনীকে ধরে রাখেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

শরৎচন্দ্রের জন্ম হয় ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই সেপ্টেম্বর (বাংলা ১২৮৩ সালের ৩১শে ভাদ্র) হুগলি জেলায় দেবানন্দপুর গ্রামে। গ্রামটি ইস্টার্ন রেলওয়ের ব্যান্ডেল রেলস্টেশন থেকে দু’মাইল উত্তর - পশ্চিমে অবস্থিত। তার পিতার নাম মতিলাল চট্টোপাধ্যায় এবং মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। তার ভাইবোনেরা হলেন অনিলা দেবী, প্রভাসচন্দ্র, প্রকাশচন্দ্র, সুশীলা দেবী। বোনের নামে ‘অনিলা দেবী’ ছদ্মনামেও তিনি লিখেছেন।

 

শরৎচন্দ্রের পিতা প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কিছুদিন এফ.এ. পড়েছিলেন। অস্থিরচিত্ত ও অনেকটা ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষ হওয়ায় অল্প কিছুদিন চাকরি করা ছাড়া আর তেমন কিছু করা হয়ে ওঠেনি। তিনি গল্প - উপন্যাসও লিখতেন; যদিও চিত্তচাঞ্চল্যের কারণে কোনো লেখা সম্পূর্ণ করতেন না। আর্থিক অসচ্ছলতা জন্য তিনি প্রায় সময়ই পরিবার নিয়ে ভাগলপুরে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। তাই শরৎচন্দ্রের ছেলেবেলার অনেকগুলো বছর কেটেছিল ভাগলপুরে, মাতুলালয়ে।

ছোটবেলায় শরৎচন্দ্রকে ভর্তি করানো হয় প্যারী পন্ডিতের পাঠশালায়। ছাত্র হিসেবে মেধাবী হলেও, স্বভাবে ছিলেন প্রচুর দুরন্ত। তার দৌরাত্ম্যে সবাই অতিষ্ঠ হয়ে পড়তো। পিতামহী ছিলেন তাকে নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলতেন, “ন্যাড়া একটু দুরন্ত আছে বটে, কিন্তু বড় হলেই ঠান্ডা হয়ে যাবে”

দু - তিন বছর এখানে পড়ার পর এলাকায় একটি সিদ্ধেশ্বর ভট্টাচার্যের বাংলা স্কুল স্থাপিত হলে, তাকে এতে ভর্তি করানো হয়। এখানেও বছর তিনেক পড়াশোনা করেন তিনি।

১৮৯২ সালে ১৬ বছর বয়সে তার জীবনে সাহিত্যচর্চার শুরু হয়। প্রথমেই গল্প রচনা করেন। ‘কাশীনাথ’, ‘ব্রহ্মদৈত্য’, ‘কাকবাসা’ এগুলো তার প্রথমদিকের রচনা। ১৮৯৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

এই সাহিত্যিকের বাল্যকালের স্মৃতিতে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় ছিলো ‘ভাগলপুর সাহিত্য সভা’। ১৮৯৪ সালেই এর স্থাপনা হয়।

এ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর ‘বাল্য স্মৃতি’ প্রবন্ধে তিনি বলেন,

আমি ছিলাম সভাপতি, কিন্তু আমাদের সাহিত্য সভায় গুরুগিরি করিবার অবসর কিংবা প্রয়োজন আমার কোনোকালেই ঘটে নাই। সপ্তাহে একদিন করিয়া সভা বসিত এবং অভিভাবক গুরুজনদের চোখ এড়াইয়া কোনো একটি নির্জন মাঠেই বসিত। জানা আবশ্যক যে, সে - সময়ে সে - দেশে সাহিত্যচর্চা একটি গুরুতর অপরাধের মধ্যেই গণ্য হইত।

১৮৯৫ সালে তার মায়ের মৃত্যু হয় এবং অর্থাভাবের দরুন কলেজ ত্যাগ করতে হয়। তারপর ১৯০০ সালে বিহারের গোড্ডায় রাজ বনালী এস্টেটে একটি চাকরি পান। কিন্তু পিতার অনেক বৈশিষ্ট্য তার মধ্যেও ছিল। সে চাকরি তিনি ছেড়ে দেন এবং এরপর কিছুদিন সাঁওতাল পরগণায় সেটেলমেন্টে কাজে যোগ দেন। ১৯০৩ সালে তার পিতাও ইহলোক ত্যাগ করেন এবং তিনি তখন হাইকোর্টে অনুবাদকের কাজ নেন। সে বছরই ‘মন্দির’ নামে তার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। গল্পটি মামা সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে কুন্তলীন প্রতিযোগিতায় পাঠানো হয়েছিলো। তার প্রথম মুদ্রিত রচনাটি তার নিজের নামেই প্রকাশ পায়নি, ভাগ্যের অদ্ভুত চক্র! সেবার দেড়শ গল্পের মধ্যে ‘মন্দির’ শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হয়েছিলো ‘বসুমতি’ পত্রিকার সম্পাদক জলধর সেন দ্বারা।

শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস ‘শ্রীকান্ত’ এর নামচরিত্রটি অনেকাংশে তার নিজের উপর ভিত্তি করেই সৃষ্টি। শ্রীকান্তের মতোই তিনিও বার্মা তথা বর্তমান মায়ানমারে ভাগ্যান্বেষণে যাত্রা করেন ১৯০৩ সালেই। রেঙ্গুনে থাকা অবস্থাতেই তিনি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী শান্তিদেবী ও এক বছর বয়সী পুত্রসন্তানের প্লেগে মৃত্যু হয়। এরপর মোক্ষদা দেবীর পিতার বিশেষ অনুরোধে শরৎচন্দ্র তাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর মোক্ষদার নাম পাল্টে তিনি রেখেছিলেন হিরন্ময়ী।

 

শরৎচন্দ্র হাওড়া কংগ্রেসে সভাপতি ছিলেন, কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাকে সবসময়ই সশস্ত্র বিপ্লবীদের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। তিনি ১৯২২ সালে তাই একবার কংগ্রেস ত্যাগ করতে চান, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাকে বাধা দেন। তিনি সশস্ত্র সংগ্রামীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগও রাখতেন। বিপ্লবী বিপিন গাঙ্গুলী তার মামা ছিলেন। তার ভালো সম্পর্ক ছিল বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সর্বাধিনায়ক হেমযন্দ্র ঘোষ, কাকোরী ষড়যন্ত্র মামলার আসামী বিপ্লবী শ্চীন স্যান্যাল, বারীন ঘোষ, উপেন বন্দোপাধ্যায়, অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে। শরৎচন্দ্র বিপ্লবীদের নিজের রিভলবার, বন্দুকের গুলি দিয়ে এবং আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন। মাস্টারদা সূর্য সেনকেও তিনি আন্দোলনের কাজের জন্য অর্থ দিয়েছিলেন।

আত্মপ্রচারবিমুখ ছিলেন এই লেখক। পরিচিতদের মধ্যে নিজস্ব বৃত্তে স্বচ্ছন্দ থাকতেন, ছিলেন হাস্যরসে ভরপুর এবং প্রচণ্ড পারিবারিক। বেশভূষার ক্ষেত্রে শৌখিনতা ছিল। দক্ষ সাঁতারু হবার পাশাপাশি শিকারেও পারদর্শী ছিলেন, কিন্তু পরে শিকার করা ছেড়ে দেন। হয়তো একটা সময় জীবপ্রেম এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে তার মধ্যে, তখন আর শিকারী পরিচয় তার কাছে বোঝার মতো ঠেকতো। এরপর অনেক বছর তিনি সি.এস.পি.সি.এ. অর্থাৎ কলকাতা পশুক্লেশ নিবারণী সমিতির হাওড়া শাখার চেয়ারম্যান ছিলেন। ‘মহেশ’ গল্পে তার জীবপ্রেমের প্রকাশ ঘটেছে।

১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডি.লিট উপাধি লাভ করেন। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পেয়েছিলেন জগত্তারিণী পদক। লেখক পরিচয় তার জীবনে প্রবল ভূমিকা নিয়েছে, কিন্তু গায়ক, বাদক, চিকিৎসক ও চিত্রশিল্পী হিসেবেও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।

জীবনের শেষ ক’টি বছর অসুস্থতার দরুন অনেক ভুগেছেন তিনি। যকৃতে ক্যান্সার হয়েছিলো, যা পরে পাকস্থলীও আক্রান্ত করে। কলকাতার একটি ইউরোপিয়ান নার্সিং হোমে তার পেটে অপারেশন করা হয়েছিলো। কিন্তু অপারেশনের চারদিন পর, ১৯৩০ সালের ১৬ই জানুয়ারি মৃত্যু হয় তার।

 

শরৎচন্দ্র সৃষ্ট রাজলক্ষ্মী - শ্রীকান্ত - ইন্দ্রলাল, রমা - রমেশ, সব্যসাচী, বড়দিদি, সতীশ - সাবিত্রী, বিলাসী সহ আরো বহু অমর চরিত্র বাংলা সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধতর। তার শক্তিশালী লেখনী ও সমাজকদে ভিন্নভাবে দেখবার চোখ সাহিত্যজগতে যুক্ত করেছে বহু কালজয়ী রচনা, যার আবেদন পাঠকসমাজে বছরের পর তাকে জীবিত রাখবে একজন অপরাজেয় কথাশিল্পীর পরিচয়ে।

সুত্রঃ রোর বাংলা

বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর উপন্যাসে মানুষের অন্তরে তার ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস-সংস্কারের সাথে প্রণয়াকাঙ্ক্ষার যে নিরন্তর দ্বন্দ্ব-সংঘাত, গার্হস্থ্য ও সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি অসাধারণভাবে শিল্প কুশলতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে। বাঙালি সমাজে নারীর বঞ্চনা, নারীর দুঃখ তাঁর উপন্যাসের অন্যতম দিক।

  • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৬ সালে (৩১ ভাদ্র, ১২৮৩ বঙ্গাব্দ) হুগলীর দেবানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
  • তিনি মাতৃবিয়োগের (১৮৯৫) কারণে চরম অর্থকষ্টে নিপতিত হন এবং ১৯০৩ সালে ভাগ্যান্বেষণে রেঙ্গুন (বার্মা) গমন করেন।
  • তিনি মাঝে মাঝে অনিলা দেবী, অপরাজিতা দেবী, শ্রী চট্টোপাধ্যায়, অনুরূপা দেবী, পরশুরাম (এটি রাজশেখর বসুরও ছদ্মনাম), শ্রীকান্ত শর্মা ও সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছদ্মনামে লিখতেন।
  • তিনি ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক এবং ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট ডিগ্রী লাভ করেন।
  • তাঁর রচিত উপন্যাসে প্লটের তুলনায় চরিত্রের প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায়। তিনি সমাজে প্রচলিত বর্ণ-বিভাজনকে তাঁর লেখায় প্রশ্রয় দেননি।
  • তিনি ১৬ জানুয়ারি, ১৯৩৮ সালে (২ মাঘ, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) পাক নার্সিংহোমে মৃত্যুবরণ করেন।

শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত গল্পের নাম 'মন্দির': গল্পটি প্রথমে তাঁর মামা ও বাল্যবন্ধু সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে 'বসুমতি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটি ১৯০৩ সালে কুন্তলীন পুরস্কার পায়। চরিত্র: অমরনাথ, অপর্ণা, শক্তিনাথ।

শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলো:

'বড়দিদি' (১৯০৭): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এটি সরলা দেবী সম্পাদিত 'ভারতী' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ পায়। প্রথমে এটির নাম ছিল 'শিশু'। মাধবীর নাম 'বড়দিদি'। চরিত্র: মাধবী, সুরেন্দ্রনাথ, ব্রজরাজ, প্রমীলা।

'বিরাজ বৌ' (১৯১৪): উপন্যাসটি 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। সুন্দরী বিরাজ বৌয়ের নানাবিধ সমস্যা উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। চরিত্র: বিরাজ, নীলাম্বর, পীতাম্বর।

'পরিণীতা' (১৯১৪): বিংশ শতাব্দীর প্রথম সময়ের ভারতের কলকাতার পটভূমিতে উপন্যাসটি রচিত। চরিত্র: ললিতা, গুরুচরণ, আন্নাকালী, চারু, শেখর রায়, মনোরমা, গিরীন।

'পল্লীসমাজ' (১৯১৬): উপন্যাসটি ১৯১৫ সালে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯১৬ সালে ১৯টি পরিচ্ছেদে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকার মালিক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। 'কুঁয়াপুর' নামক গ্রামকে কেন্দ্র করেন বাংলার সামন্ততান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থা, পল্লিজীবনের নীচতা ও ক্ষুদ্র রাজনীতির পটভূমিকায় এক আদর্শবাদী যুবক-যুবতীর সম্পর্ক ও বিশেষ করে তাদের অভিশপ্ত প্রেমকাহিনি এই উপন্যাসের মূল বিষয়। রমা ও রমেশের প্রেমের মাঝে এতো তিক্ততা ছিলো যে, রমা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে রমেশকে জেলে পাঠাতেও দ্বিধা করেনি। এ উপন্যাসের নাট্যরূপ 'রমা' (১৯২৮)। চরিত্র: রমা, রমেশ, বেণীমাধব, বিশ্বেশ্বরী।

'নিষ্কৃতি' (১৯১৭): এ উপন্যাসের প্রথমাংশ 'ঘরভাঙা' নামে 'যমুনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ভবানীপুরের চাটুয্যেদের একান্নবর্তী পরিবার এবং সেই পরিবারের সম্পর্কের জটিলতা এ উপন্যাসের মূল বিষয়। চরিত্র: গিরিশ, হরিশ, সিদ্ধেশ্বরী, শৈলজা, রমেশ, নয়নতারা। ১৯৪৪ সালে Deliverance নামে দিলীপকুমার রায়ের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এটি গল্প আকারে রচিত হলেও পরবর্তীতে শরৎচন্দ্র পরিবর্ধিত করে উপন্যাস আকারে প্রকাশ করেন।

'শ্রীকান্ত' (১ম খণ্ড- ১৯১৭, ২য় খণ্ড- ১৯১৮, ৩য় খণ্ড-১৯২৭, ৪র্থ খণ্ড- ১৯৩৩): এটি তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস। এ উপন্যাসে শরৎচন্দ্র 'শ্রীকান্ত শর্মা' ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। চরিত্র: রাজলক্ষ্মী, ইন্দ্রনাথ, শ্রীকান্ত, অভয়া। ইন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কিশোর চরিত্র।

'দেবদাস (১৯১৭): দেবদাস, পার্বতী, চন্দ্রমুখী অন্যতম চরিত্র।

'চরিত্রহীন' (১৯১৭): এটি প্রথমে ধারাবাহিকভাবে 'যমুনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রথা বহির্ভূত প্রেম ও নারী-পুরুষের সমাজ অননুমোদিত সম্পর্ক এ উপন্যাসের মূল বিষয়। চরিত্র: সতীশ, সাবিত্রী, দিবাকর, কিরণময়ী, সরোজিনী।

'দত্তা' (১৯১৮): উপন্যাসটি ১৩২৪-১৩২৫ বঙ্গাদে 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। চরিত্র: নরেন, বিজয়া, রাসবিহারী, বনমালী। এ উপন্যাসের নাট্যরূপ 'বিজয়া' (১৯৩৪)

'গৃহদাহ' (১৯২০): এতে ত্রিভুজ প্রেমের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। চরিত্র: সুরেশ, অচলা, মহিম।

'বামুনের মেয়ে' (১৯২০): এ উপন্যাসে তৎকালীন সমাজের জাতিভেদ, কুসংস্কার ও আর্থিক বৈষম্যের বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে। চরিত্র: রাসমণি, গোলোক চাটুয্য, জ্ঞানদা।

'দেনা-পাওনা' (১৯২৩): এ উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র: জীবানন্দ, ষোড়শী। উপন্যাসটি 'ষোড়শী' নামে নাট্যায়িত হয়

'পথের দাবী' (১৯২৬): এটি রাজনৈতিক উপন্যাস জ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। চরিত্র: সব্যসাচী।

'বিপ্রদাস' (১৯৩৫): এটি শরৎচন্দ্রের জীবিতাবস্থায় প্রকশি সর্বশেষ গ্রন্থ। উপন্যাসটি 'বিচিত্রা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় চরিত্র: বিপ্রদাস, দ্বিজদাস, বন্দনা।

'শেষ প্রশ্ন' (১৯৩১): এটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিতর্কপ্রধান ও সমস্যামূলক উপন্যাস। উল্লেখযোগ্য চরিত্র শিবনাথ-মনোরমা, অজিত-কমল, নীলিমা-আশুবাবু।

'শেষের পরিচয়' (১৯৩৯): এটি তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস এটি শরৎচন্দ্র লেখা শেষ করে যেতে পারেননি। বাকী অংশ রাধারানী দেবী কর্তৃক রচিত। উপন্যাসটি 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

'পণ্ডিত মশাই' (১৯১৪), 'বৈকুণ্ঠের উইল' (১৯১৬) 'অরক্ষণীয়া' (১৯১৬), 'চন্দ্রনাথ' (১৯১৬), 'নববিধান (১৯২৪)।

শরৎচন্দ্রের প্রবন্ধগুলো:

'নারীর মূল্য' (১৯২৩): এটি নারীর সামাজিক অধিকার ও সমাজে নারীর স্থান সম্পর্কিত প্রবন্ধ। এটি তিনি 'অনিলা দেবী' ছদ্মনামে রচনা করেন, যা 'যমুনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অনিলা দেবী শরৎচন্দ্রের বড় বোনের নাম।

'তরুণের বিদ্রোহ' (১৯২৯): এ প্রবন্ধটি ১৯২৯ সালের ৩০ মার্চ রংপুর বঙ্গীয় যুব সম্মিলনীর অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ। এ গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে 'সত্য ও মিথ্যা' নামে আরো একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

'স্বদেশ ও সাহিত্য' (১৯৩২)।

শরৎচন্দ্রের উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পগুলো:

'কাশীনাথ' (১৯১৭): সতের বছর বয়সে তিনি সর্বপ্রথম পাঠশালার সহপাঠী কাশীনাথের নামে গল্পটি লিখেন।

'বিলাসী': সাধু রীতিতে রচিত ন্যাড়া নামের এক যুবকের জবানিতে বিবৃত এ গল্পের কাহিনিতে শরৎচন্দ্রের প্রথম জীবনের ছায়াপাত ঘটেছে। গল্পটিতে বর্ণিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী দুই মানব-মানবীর চরিত্রের অসাধারণ প্রেমের মহিমা, যা ছাপিয়ে উঠেছে জাতিগত বিভেদের সংকীর্ণ সীমা। চরিত্র: বিলাসী, মৃত্যুঞ্জয়, খুড়া, ন্যাড়া।

'মন্দির', 'মহেশ' (চরিত্র: গফুর, আমিনা), 'মামলার ফল', 'সতী', 'অনুরাধা', 'পরেশ', 'অভাগীর স্বর্গ', 'অতিথির স্মৃতি' (দেওঘরের স্মৃতি) ইত্যাদি।

দেনা-পাওনা (ছোটগল্প)রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেনা-পাওনা (উপন্যাস)শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শরৎচন্দ্রের উল্লেখযোগ্য বড় গল্পগুলো:

'বিন্দুর ছেলে ও অন্যান্য গল্প' (১৯১৪): এটি বিন্দুর ছেলে, রামের সুমতি ও পথনির্দেশ গল্পের সংকলন। এ গল্পগুলি ' যমুনা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

'মেজদিদি' (১৯১৫): এটি মেজদিদি, দর্পচূর্ণ ও আঁধারে আলো গল্পের সংকলন। এ তিনটি গল্পই চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। 'মেজদিদি'র চরিত্র: হেমাঙ্গিনী, কেষ্ট, কাদম্বিনী।

'ছবি' (১৯২০): এটি ছবি, বিলাসী ও মামলার ফল গল্পের সংকলন।

শরৎচন্দ্রের নাটকগুলো:

'ষোড়শী' (১৯২৮), 'রমা' (১৯২৮), 'বিজয়া' (১৯৩৪)।

Related Question

View All
  • শ্রীকান্ত

  • দেবদাস

  • গৃহদাহ

  • পল্লীসমাজ

75
  • তাঁর রচনায় তৎসম শব্দের ব্যবহার নগণ্য
  • 'শ্রীকান্ত' তাঁর আত্মজীবনী
  • বর্ণ-বিভাজন তিনি মোটেই মান্য করেননি
  • তাঁর উপন্যাসে প্লটের তুলনায় চরিত্রের প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায়
129
  • 'দেবদাস' উপন্যাসের পার্বতী
  • 'পল্লীসমাজ' উপন্যাসের রমা
  • 'গৃহদাহ' উপন্যাসের অচলা
  • 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের রাজলক্ষ্মী
55
  • ১৮৬৩
  • ১৯১৩
  • ১৮৭৬
  • ১৮৮০
533
Updated: 5 months ago
  • গোরা (নাট্যগ্রন্থ)
  • বিদ্রোহী (কাব্যগ্রন্থ)
  • পথের দাবী (উপন্যাস)
  • একাত্তরের দিনগুলি (উপন্যাস)
357
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews

Question Analytics

মোট উত্তরদাতা

জন

সঠিক
ভুল
উত্তর নেই