বিভূতিভূষণের রচনায় পাওয়া যায়— 

i. প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য 

ii. গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় অনাবিল সম্পর্ক 

iii. গার্হস্থ্য জীবনের টানাপোড়েনের চিত্র

 

নিচের কোনটি সঠিক?

Updated: 1 year ago
  • ক
    ii
  • খ
    i ও ii
  • গ
    ii ও iii
  • ঘ
    i, ii ও iii
758
ব্যাখ্যাঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম পথিকৃৎ, যিনি মূলত প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের নিপুণ চিত্রণের জন্য পরিচিত। তাঁর রচনায় প্রকৃতি কেবল একটি পটভূমি নয়, বরং এক জীবন্ত চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
  • i. প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য: বিভূতিভূষণের লেখায় প্রকৃতির অপরূপ ও নির্ভেজাল সৌন্দর্য বারে বারে ফুটে উঠেছে। নিসর্গ, বনভূমি, নদ-নদী, ঋতুচক্র—এসবের বিশদ ও মুগ্ধকর বর্ণনা তাঁর লেখার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি প্রকৃতির সূক্ষ্মতম রূপ ও রহস্যময়তা তুলে ধরেন, যা পাঠকের মনে এক অনাবিল শান্তি এনে দেয়।
  • ii. গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় অনাবিল সম্পর্ক: তাঁর উপন্যাসে গ্রামীণ মানুষের সরল জীবনযাত্রা, তাদের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন ও সংগ্রামের সাথে প্রকৃতির এক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। গ্রামের দরিদ্র মানুষের সাথে প্রকৃতির আত্মিক বন্ধন, প্রকৃতির কোলে তাদের বেড়ে ওঠা এবং প্রকৃতির প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও নির্ভরশীলতা তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। যেমন 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসে অপু-দুর্গার প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবনযাপন এবং 'আরণ্যক'-এ অরণ্যের সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই সম্পর্কটি একদিকে যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি অন্যদিকে অনাবিল ও নিষ্পাপ।
  • iii. গার্হস্থ্য জীবনের টানাপোড়েনের চিত্র: যদিও বিভূতিভূষণের রচনায় গ্রামীণ বা মধ্যবিত্ত পরিবারের গার্হস্থ্য জীবনের টানাপোড়েন, অভাব-অনটন এবং সম্পর্কের জটিলতা কিছুটা উঠে এসেছে (যেমন 'পথের পাঁচালী'-তে অপু ও দুর্গার পরিবারের সংগ্রাম), তবে এটি তাঁর রচনার প্রধান বা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য নয়। তাঁর রচনার মূল উপজীব্য হলো প্রকৃতি এবং মানবজীবনের সাথে প্রকৃতির গভীর সংযোগ, আত্মিক অনুসন্ধান ও আধ্যাত্মিকতা। গার্হস্থ্য জীবনের চিত্রণ প্রায়শই প্রকৃতির বিশালতার প্রেক্ষাপটে বা প্রকৃতির প্রভাবাধীন হয়ে এসেছে, যা প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের অনন্য উপস্থাপনার চেয়ে কম প্রাধান্য পায়।
সুতরাং, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় মূলত প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য এবং গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় অনাবিল সম্পর্কই প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে পাওয়া যায়।
Satt AI
Satt AI
3 months ago

কালবৈশাখীর সময়টা। আমাদের ছেলেবেলার কথা।
বিধু, সিধু, নিধু, তিনু, বাদল এবং আরও অনেকে দুপুরের বিকট গরমের পর নদীর ঘাটে নাইতে গিয়েছি। বেলা বেশি নেই।
বিধু আমাদের দলের মধ্যে বয়সে বড়। সে হঠাৎ কান খাড়া করে বললে - ঐ শোন – আমরা কান খাড়া করে শুনবার চেষ্টা করলাম। কিছু শুনতে বা বুঝতে না পেরে বললাম – কী রে? -
বিধু আমদের কথার উত্তর দিলে না। তখনো কান খাড়া করে রয়েছে।
হঠাৎ আবার সে বলে উঠল – ঐ-ঐ-শোন -
আমরও এবার শুনতে পেয়েছি—দূর পশ্চিম-আকাশে ক্ষীণ গুড়গুড় মেঘের আওয়াজ।
নিধু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললে—ও কিছু না—
বিধু ধমক দিয়ে বলে উঠল—কিছু না মানে? তুই সব বুঝিস কিনা? বৈশাখ মাসে পশ্চিম দিকে ওরকম মেঘ ডাকার মানে তুই কিছু জানিস? ঝড় উঠবে। এখন জলে নামব না। কালবৈশাখী। আমরা সকলে ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি ও কী বলছে। কালবৈশাখীর ঝড় মানেই আম কুড়ানো! বাড়ুয্যেদের
মাঠের বাগানে চাঁপাতলীর আম এ অঞ্চলে বিখ্যাত। মিষ্টি কী! এই সময়ে পাকে। ঝড় উঠলে তার তলায়
ভিড়ও তেমনি। যে আগে গিয়ে পৌঁছতে পারে তারই জয়।
সবাই বললাম— তবে থাক । কিন্তু তখনো রোদ গাছপালার মাথায় দিব্যি রয়েছে। আমাদের অনেকের মনের সন্দেহ তখনো দূর হয়
নি। ঝড়-বৃষ্টির লক্ষণ তো কিছু দেখা যাচ্ছে না; তবে বহু দূরাগত ক্ষীণ মেঘের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে । ওরই ক্ষীণ সূত্র ধরে বোকার মতো চাপাতলীর তলায় যাওয়া কি ঠিক হবে?
বিধু আমাদের সকল সংশয় দূর করে দিলে। যেমন সে চিরকাল আমাদের সকল সংশয় দূর করে এসেছে। সে জানিয়ে দিলে যে, সে নিজে এখুনি চাঁপাতলীর আমতলায় যাচ্ছে, যার ইচ্ছে হবে সে ওর সঙ্গে যেতে পারে । এরপর আর আমাদের সন্দেহ রইল না। আমরা সবাই ওর সঙ্গে চললাম।
অল্পক্ষণ পরেই প্রমাণ হলো, ও আমাদের চেয়ে কত বিজ্ঞ। ভীষণ ঝড় উঠল, কালো মেঘের রাশি উড়ে আসতে লাগল পশ্চিম থেকে । বড় বড় গাছের মাথা ঝড়ের বেগে লুটিয়ে লুটিয়ে পড়তে লাগল, ধুলোতে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল, একটু পরেই ঠান্ডা হাওয়া বইল, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে পড়তে বড় বড় করে ভীষণ বাদলের বর্ষা নামল ।
বড় বড় আমবাগানের তলাগুলি ততক্ষণে ছেলেমেয়েতে পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। আম ঝরছে শিলাবৃষ্টির মতো; প্রত্যেক ছেলের হাতে এক এক বোঝা আম। আমরাও যথেষ্ট আম কুড়ুলাম, আমের ভারে নুয়ে পড়লাম এক একজন। ভিজতে ভিজতে কেউ অন্য তলায় চলে গেল, কেউ বাড়ি চলে গেল আমের বোঝা নামিয়ে রেখে আসতে। আমি আর বাদল সন্ধ্যার অন্ধকারে নদীর ধারের পথ দিয়ে বাড়ি ফিরছি। পথে কেউ কোথাও নেই, ছোট-বড় ডালপালা পড়ে পথ ঢেকে গিয়েছে; পাকা নোনাসুদ্ধ নোনাগাছের ডাল কোথা থেকে উড়ে এসে পড়েছে, কাঁটাওয়ালা সাঁইবাবলার ডালে পথ ভর্তি, কাঁটা ফুটবার ভয়ে আমরা ডিঙিয়ে পথ চলছি আধ-অন্ধকারের মধ্যে।
এমন সময় বাদল কী একটা পায়ে বেধে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। আমায় বললে- দ্যাখ তো রে জিনিসটা কী? আমি হাতে তুলে দেখলাম একটি টিনের বাক্স, চাবি বন্ধ। এ ধরনের টিনের বাক্সকে পাড়াগাঁ অঞ্চলে বলে, ডবল টিনের ক্যাশ বাক্স। টাকাকড়ি রাখে পাড়াগাঁয়ে। এ আমরা জানি । বাদল হঠাৎ বড় উত্তেজিত হয়ে পড়ল। বললে—দেখি জিনিসটা?
দ্যাখ তো, চিনিস?
- চিনি, ডবল টিনের ক্যাশ বাক্স।
টাকাকড়ি থাকে।
- তাও জানি।
এখন কী করবি?
সোনার গহনাও থাকতে পারে। ভারী দেখেছিস কেমন?
– তা তো থাকেই। টাকা গহনা আছেই এতে।
টিনের ক্যাশ বাক্স হাতে আমরা দুজনে সেই অন্ধকারে তেঁতুলতলায় বসে পড়লাম। দুজনে এখন কী করা যায় তাই ঠিক করতে হবে এখানে বসে। আম যে প্রিয় বস্তু, এত কষ্ট করে জল ঝড় অগ্রাহ্য করে যা কুড়িয়ে এনেছি, তাও একপাশে অনাদৃত অবস্থায় পড়েই রইল, থলেতে বা দড়ির বোনা গেঁজেতে।
বাদল বললে—কেউ জানে না যে আমরা পেয়েছি—
– তা তো বটেই। কে জানবে আর।
এখন কী করা যায় বল।
বাক্স তো তালাবন্ধ-
– এখুনি ইট দিয়ে ভাঙি যদি বলিস তো—ওঃ না জানি কত কী আছে রে এর মধ্যে। তুই আর আমি দুজনে নেব, আর কেউ না। খুব সন্দেশ খাব। ঝড়ের ঝাপটা আবার এলো। আমরা তেঁতুলগাছের গুঁড়িটার আড়ালে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। তেঁতুলগাছে ভূত আছে সবাই জানে। কিন্তু ভূতের ভয় আমাদের মন থেকে চলে গিয়েছে। অন্য দিনে আমাদের দুজনের সাধ্য ছিল না এ সময় এ গাছতলায় বসে থাকি।
বাদল বলল—শীতে কেঁপে মরছি। কী করা যাবে বল। বাড়ি কিন্তু নিয়ে যাওয়া হবে না। তাহলে সবাইকে
ভাগ দিতে হবে, সবাই জেনে যাবে। কী করবি?
- আমার মাথায় কিছু আসছে না রে।
— ভাঙি তালা । ইট নিয়ে আসি, তুই থাক এখানে ।
না। তালা ভাঙিসনে। ভাঙলেই তো গেল। অন্যায় কাজ হয় তালা ভাঙলে, ভেবে দ্যাখ। কোনো গরিব লোকের হয়তো। আজ তার কী কষ্ট হচ্ছে, রাতে ঘুম হচ্ছে না। তাকে ফিরিয়ে দেব বাক্সটা ।
বাদল ভেবে বললে—ফেরত দিবি?
- দেব ভাবছি।
- কী করে জানবি কার বাক্স?
চল, সে মতলব বার করতে হবে। অধর্ম করা হবে না।
এক মুহূর্তে দুজনের মনই বদলে গেল। দুজনেই হঠাৎ ধার্মিক হয়ে উঠলাম। বাক্স ফেরত দেয়ার কথা মনে আসতেই আমাদের অদ্ভুত পরিবর্তন হলো। বাক্স নিয়ে জল ঝড়ে ভিজে সন্ধ্যার পর অন্ধকারে বাড়ি চলে এলাম। বাদলদের বাড়ির বিচুলিগাদায় লুকিয়ে রাখা হলো বাক্সটা ।
তারপর আমাদের দলের এক গুপ্ত মিটিং বসল বাদলদের ভাঙা নাটমন্দিরের কোণে। বর্ষার দিন—আকাশ মেঘে মেঘাচ্ছন্ন। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম। সেই কালবৈশাখীর ঝড়-বৃষ্টির পরই বাদলা নেমে গিয়েছে। একটা চাঁপাগাছের ফোটা চাঁপাফুল থেকে বর্ষার হাওয়ার সঙ্গে মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। ব্যাঙ ডাকছে নরহরি বোষ্টমের ডোবায়। আমাদের দলের সর্দার বিধুর নির্দেশমতো এ মিটিং বসেছিল। বাক্স ফেরত দিতেই হবে- এ আমাদের প্রথম ও শেষ প্রস্তাব। মিটিং-এ সে প্রস্তাব পেশ করার আগেই মনে মনে আমরা সবাই সেটি মেনেই নিয়েছিলাম। বিধুকে বলা হলো বাক্স ফেরত দেয়া সম্বন্ধে আমরা সকলেই একমত, অতএব এখন উপায় ঠাওরাতে হবে বাক্সের মালিককে খুঁজে বের করার। কারও মাথায় কিছু আসে না। এ নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা হলো। যে কেউ এসে বলতে পারে বাক্স আমার। কী করে আমরা প্রকৃত মালিককে খুঁজে বার করব? মস্ত বড় কথা। কোনো মীমাংসাই হয় না ।
অবশেষে বিধু ভেবে ভেবে বললে—মতলব বার করিছি। ঘুড়ির মাপে কাগজ কেটে নিয়ে আয় দিকি। বলেছি—বিধুর হুকুম অমান্য করার সাধ্য আমাদের নেই। দু-তিনখানা কাগজ ঐ মাপে কেটে ওর সামনে হাজির করা হলো ।
বিধু বললে—লেখ—বাদল লিখুক। ওর হাতের লেখা ভালো । বাদল বলল—কী লিখব বলো-
লেখ বড় বড় করে। বড় হাতের লেখার মতো। বুঝলি? আমি বলে দিচ্ছি— - বলো-
আমরা একটা বাক্স কুড়িয়ে পেয়েছি। যার বাক্স তিনি রায়বাড়িতে খোঁজ করুন । ইতি - বিধু, সিধু, নিধু, তিনু। আমি আর বাদল আপত্তি করে বললাম-বারে, আমরা কুড়িয়ে পেলাম, আর আমাদের নাম থাকবে না বুঝি?আমাদের ভালো নাম লেখ ।
বিধু বললে—লিখে দাও । ভালোই তো। ভালো নাম সবারই লেখ ।
তিনখানা কাগজ লিখে নদীর ধারের রাস্তায় ভিন্ন ভিন্ন গাছে বেলের আঠা দিয়ে মেরে দেওয়া হলো।
দু-তিন দিন কেটে গেল ।
কেউ এল না ।
তিন দিন পরে একজন কালোমতো রোগা লোক আমাদের চণ্ডীমণ্ডপের সামনে এসে দাঁড়াল। আমি তখন
সেখানে বসে পড়ছি। বললাম—কী চাও?
– বাবু, ইদিরভীষণ কার নাম?
– আমার নাম। কেন? কী চাই?
একটা বাক্স আপনারা কুড়িয়ে পেয়েছেন?
আমার নামের বিকৃত উচ্চারণ করাতে আমি চটে গিয়েছি তখন। বিরক্তিভাবে বললাম—কী রকম বাক্স
- কাঠের বাক্স ।
- না। যাও।
বাবু, কাঠের নয়, টিনের বাক্স।
– কী রঙের টিন?
- কালো ।
- না। যাও—
- বাবু দাঁড়ান, বলছি । মোর ঠিক মনে হচ্ছে না। এই রাঙা মতো—
– না, তুমি যাও ৷
লোকটা অপ্রতিভভাবে চলে গেল। বিধুকে খবরটা দিতে সে বললে-ওর নয় রে । লোভে পড়ে এসেছে। ওর মতো কত লোক আসবে।
আবার তিন-চার দিন কেটে গেল।
বিধুর কাছে একজন লোক এলো তারপরে । তারও বর্ণনা মিলল না; বিধু তাকে বিদায় দিলে পত্রপাঠ। যাবার সময় সে নাকি শাসিয়ে গেল, চৌকিদারকে বলবে, দেখে নেবে আমাদের ইত্যাদি। বিধু তাচ্ছিল্যের সুরে বললে- যাও যাও, যা পার করো গিয়ে। বাক্স আমরা কুড়িয়ে পাইনি। যাও ।
আর কোনো লোক আসে না ।
বর্ষা পড়ে গেল ভীষণ ।
সেবার আমাদের নদীতে এলো ভীষণ বন্যা ।
বড় বড় গাছ ভেসে যেতে দেখা গেল নদীর স্রোতে। দু-একটা গরুও আমরা দেখলাম ভেসে যেতে। অম্বরপুর চরের কাপালিরা নিরাশ্রয় হয়ে গেল। নদীর চরে ওদের ছোট ছোট ঘরবাড়ি সেবারেও দেখে এসেছি—কী চমৎকার পটলের আবাদ, কুমড়োর খেত, লাউ-কুমড়োর মাচা ওদের চরে! দু পয়সা আয়ও পেত তরকারি বেচে। কোথায় রইল তাদের পটল কুমড়োর আবাদ, কোথায় গেল তাদের বাড়িঘর। আমাদের ঘাটের সামনে দিয়ে কত খড়ের চালাঘর ভেসে যেতে দেখলাম। সবাই বলতে লাগল অম্বরপুর চরের কাপালিরা সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছে । একদিন বিকেলে আমাদের চণ্ডীমণ্ডপে একটা লোক এলো। বাবা বসে হাত-বাক্স সামনে নিয়ে জমাজমির হিসেব দেখছেন। গ্রামের ভাদুই কুমোর কুয়ো কাটানোর মজুরি চাইতে এসেছে । আরও দু-একজন প্রজা এসেছে খাজনা পত্তর দিতে। আমরা দু ভাই বাবার কড়া শাসনে বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছি । এমন সময় একটা লোক এসে বললে-দণ্ডবৎ হই, ঠাকুরমশায়।
বাবা বললেন—এসো। কল্যাণ হোক। কোথা থেকে আসা হচ্ছে?
- আজ্ঞে অম্বরপুর থেকে। আমরা কাপালি।
- বোসো। কী মনে করে? তামাক খাও। সাজো।
লোকটা তামাক সেজে খেতে লাগল। সে এসেছে এ গাঁয়ে চাকরির খোঁজে। বন্যায় নিরাশ্রয় হয়ে নির্বিষখোলার গোয়ালাদের চালাঘরে সপরিবারে আশ্রয় নিয়েছে। এই বর্ষায় না আছে কাপড়, না আছে ভাত। দু আড়ি ধান ধার দিয়েছিল গোয়ালারা দয়া করে, সেও এবার ফুরিয়ে এলো । চাকরি না করলে স্ত্রী- পুত্র না খেয়ে মরবে।
বাবা বললেন—আজ এখানে দুটি ডাল-ভাত খেও।
লোকটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে—তা খাব। খাচ্ছিই তো আপনাদের। দুরবস্থা যখন শুরু হয় ঠাকুরমশাই, এই গত জষ্টি মাসে নির্বিষখোলার হাট থেকে পটল বেচে ফিরছি; ছোট মেয়েটার বিয়ে দেব বলে গহনা গড়িয়ে আনছিলাম । প্রায় আড়াই শো টাকার গহনা আর পটল-বেচা নগদ টাকা পঞ্চাশটি – একটা টিনের বাক্সের ভেতর ছিল। সেটা যে হাটের থেকে ফিরবার পথে গরুর গাড়ি থেকে কোথায় পড়ে গেল, তার আর খোঁজই হলো না। সেই হলো শুরু—আর তারপর এলো এই বন্যে-
বাবা বললেন—বল কী? অতগুলো টাকা-গহনা হারালে ?
—অদেষ্ট, একেই বলে বাবু অদেষ্ট। আজ সেগুলো হাতে থাকলে— আমি কান খাড়া করে শুনছিলাম। বলে উঠলাম—কী রঙের বাক্স
সবুজ টিনের।
বাবা আমাদের বাক্সের ব্যাপার কিছুই জানেন না। আমায় ধমক দিলেন—তুমি পড়ো না, তোমার সে খোঁজে কী দরকার? কিন্তু আমি ততক্ষণে বইপত্তর ফেলে উঠে পড়েছি। একেবারে এক ছুটে বিধুর বাড়ি গিয়ে হাজির। বিধু আমার কথা শুনে বললে—দাঁড়া, সিধু আর তিনুকেও নিয়ে আসি। ওরা সাক্ষী থাকবে কি না?
বিধুর খুব বুদ্ধি আমাদের মধ্যে। ও বড় হলে উকিল হবে, সবাই বলত।
আধঘণ্টার মধ্যে আমাদের চণ্ডীমণ্ডপের সামনে বেশ একটি ছোটখাটো ভিড় জমে গেল। বাক্স ফেরত পেয়ে সে লোকটা যেন কেমন হকচকিয়ে গেল। চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। কেবল আমাদের মুখের দিকে চায় আর বলে— ঠাকুরমশাই, আপনারা মানুষ না দেবতা? গরিবের ওপর এত দয়া আপনাদের?
বিধু অত সহজে ভুলবার পাত্র নয়। সে বললে- দেখে নাও মাল সব ঠিক আছে কি না আর এই কাকাবাবুর সামনে আমাদের একটা রসিদ লিখে দাও, বুঝলে? কাকাবাবু আপনি একটু কাগজ দিন না ওকে-লিখতে জান তো?
না, ও উকিলই হবে বটে ! 

আমার বাবা এমন অবাক হয়ে গেলেন ব্যাপার দেখে যে, তাঁর মুখ দিয়ে একটি কথাও বেরুল না ।

Related Question

View All
  • ক
    প্রকৃতি ও রাজনীতি
  • খ
    প্রকৃতি ও মানবজীবন
  • গ
    মানবজীবন ও রাজনীতি
  • ঘ
    প্রকৃতি ও সমাজ বাস্তবতা
742
  • ক
    চাঁদের পাহাড়ে
  • খ
    মিসমিদের কবচ
  • গ
    পথের পাঁচালী
  • ঘ
    স্মৃতির রেখা
864
Updated: 1 year ago
  • ক
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
  • খ
    কাজী নজরুল ইসলাম
  • গ
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  • ঘ
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
1.4k
  • ক
    গল্পগ্রন্থ
  • খ
    উপন্যাস
  • গ
    ভ্রমণ-দিনলিপি
  • ঘ
    কাব্যগ্রন্থ
1.9k
  • ক
    সৈয়দ মুজতবা আলী
  • খ
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
  • গ
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  • ঘ
    বিপ্রদাশ বড়ুয়া
652
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews

Question Analytics

মোট উত্তরদাতা

জন

সঠিক
ভুল
উত্তর নেই