(ক) সৌরজগৎ (Solar System) : সূর্য ও এর গ্রহ ও উপগ্রহ, ধূমকেতু, উল্কা, গ্রহাণু, গ্যাস, ধূলিকণা ইত্যাদি নিয়ে সৌরজগৎ গঠিত। সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্র। সূর্যকে কেন্দ্র করে এর আটটি গ্রহ ঘুরছে। এই আটটি গ্রহ হলো বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন। সকল গ্রহই সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার (elliptical) পথে ঘুরছে। কিছু গ্রহের রয়েছে উপগ্রহ। এগুলো গ্রহকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। বুধ ও শুক্রের কোনো উপগ্রহ নেই ।
চিত্র :১১.২
পৃথিবীর রয়েছে একটি, মঙ্গল ও নেপচুনের প্রত্যেকের দুটি, ইউরেনাসের পাঁচটি, শনির দশটি এবং বৃহস্পতির রয়েছে ১২টি উপগ্রহ। এসব উপগ্রহকে গ্রহের চাঁদ বলা হয়। সৌরজগতে একমাত্র সূর্যেরই আলো আছে, অন্য কোনোটির নেই। সূর্যের আলো পড়ে সৌরজগতের গ্রহ ও উপগ্রহ আলোকিত হয়। এছাড়া সৌরজগতে রয়েছে অনিয়মিত আকারের হাজার হাজার বস্তু। এরা হলো উল্কা, ধূমকেতু, গ্রহাণু, গ্যাস, ধূলিকণা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কঠিন বস্তু ইত্যাদি।
(i) সূর্য (The Sun) :
সূর্য গ্যাসীয় পদার্থ দ্বারা তৈরি একটি অতিমাত্রায় গরম ও উজ্জ্বল বস্তু। এটি সৌরজগতের পীতবর্ণ সম্পন্ন নক্ষত্র এবং পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্র। তাই একে অন্য নক্ষত্রের তুলনায় বেশি উজ্জ্বল দেখায় । পৃথিবী থেকে সূর্য আট আলোক মিনিট দূরে। সূর্য হতে পৃথিবীতে আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। এর পৃষ্ঠ তাপমাত্রা 6000 K । এর ভর 1.99 × 10-30 kg । গড় ব্যাসার্ধ 6.95 x 108m। সূর্য পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে 1.496 x 1011 m দূরত্বে অবস্থিত। এর ঘনত্ব 1410 kgm-3 যা পানির তুলনায় প্রায় 1.4 গুণ। সূর্য তার নিজ অক্ষের উপর 25 দিনে একবার ঘুরে আসে। সূর্যের পৃষ্ঠে তার আকর্ষণের জন্য ত্বরণের মান 275 ms-2 হিসাব করা হয়েছে। এটি রেডিও বা বেতার অঞ্চলে তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ নিঃসরণ করে।
(ii) গ্রহ ( The Planets) :
আমরা জানি যে সকল নিরেট খ-গোলীয় বস্তু সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তন করে তাদেরকে গ্রহ বলা হয়। গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার পথে ভ্রমণ করে। তাদের নিজস্ব কোনো আলো নেই । কিছু গ্রহকে কেন্দ্র করে আবর্তনশীল উপগ্রহ আছে। পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ হচ্ছে চন্দ্র। এটি পৃথিবীকে কেন্দ্ৰ করে ঘুরে। বুধ ও শুক্র গ্রহের কোনো উপগ্রহ নেই। মঙ্গল এবং নেপচুন গ্রহের দুটি করে উপগ্রহ আছে। শনি গ্রহের দশটি এবং বৃহস্পতি গ্রহের বারোটি উপগ্রহ আছে। উপগ্রহগুলোকে গ্রহের চন্দ্র বলা হয়।
(iii) গ্রহাণুপুঞ্জ (Asteroids) :
মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথের মাঝ দিয়ে অতিক্ষুদ্র গ্রহের মতো কিছু বস্তু সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে; তাদের বলা হয় গ্রহাণু। গ্রহাণু আবিষ্কারের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় 2000 গ্রহাণুপুঞ্জ আবিষ্কৃত হয়েছে। এদের সর্ববৃহৎটির নাম সেরেস। এর ব্যাসার্ধ 350 km এবং সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় 4.6 বছর। ক্ষুদ্রতমটির ব্যাসার্ধ 50m
চিত্র : ১১.৩
(iv) ধূমকেতু (Comet) :
পানি, এমোনিয়া ও মিথেন গ্যাস কোনো নিরেট ক্ষুদ্র শিলাখণ্ডের উপর জমে তৈরি হয় ধূমকেতু। এর একটি মাথা ও লেজ আছে বলে মনে হয়। সূর্যকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরার সময় এর সামনের দিকের পানি বাষ্পে পরিণত হয় এবং বিকিরণ চাপে এর সামনের দিকে স্ফীত (একটি মাথা) ও পিছনের দিকে সরু লেজের মতো হয়ে যায়। দেখতে অনেকটা ঝাড়ুর মতো দেখায়। এদের মধ্যে হেলির ধূমকেতু বিখ্যাত । এটা ৭৬ বছর পরপর একবার দেখা যায়। ধূমকেতুর মাথাটা শিলার মতো ভারী বস্তু এবং পুচ্ছ বা লেজের দিকটি হালকা পদার্থ যেমন ধূলিকণা ও গ্যাস দিয়ে তৈরি।
(v) উল্কা ( Meteors) :
অনেক সময় আকাশে ছোট আগুনের গোলা ছুটে যেতে দেখা যায়। মনে হয় যেন একটি তারা একস্থান থেকে ছুটে অন্যস্থানে যাচ্ছে। এরা আসলে নক্ষত্র বা তারা নয়। এদের বলা হয় উল্কা। অতিক্ষুদ্র গ্রহগত শিলা খণ্ড যখন পৃথিবীর কাছাকাছি এসে গেলে পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের প্রভাবে প্রবল বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে বায়ুর সাথে ঘর্ষণের ফলে উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠে এবং পৃথিবী পৃষ্ঠের পতনের পূর্বেই নিভে যায়। এদের উল্কা বলে।
চিত্র :১১.৪
(খ) নক্ষত্রসমূহ (Stars) :
যেসব খ- পদার্থ সূর্যের ন্যায় নিজস্ব আলো আছে এবং তা আলো দেয় তাদের বলা হয় নক্ষত্র। পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্র হলো সূর্য। সৌরজগতের বাইরে অনেক দূরে দূরে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র রয়েছে। এদেরকে ক্ষুদ্র ও মিটমিট করে জ্বলতে দেখা যায় এর কারণ এরা পৃথিবীর অনেক অনেক দূরে। সূর্যের পর নিকটতম নক্ষত্র হলো আলফা সেন্টুরি । পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব চার আলোক বর্ষ।
চিত্র :১১.৫
(গ) গ্যালাক্সি (Galaxies) :
অনেকগুলো নক্ষত্রের সমাবেশকে বলা হয় গ্যালাক্সি। আমরা যে গ্যালাক্সিতে বা ছায়াপথে বাস করি তার নাম আকাশ গঙ্গা (Milky way)। সূর্য ও খালি চোখে দৃশ্যমান সকল নক্ষত্র এই আকাশ গঙ্গা বা ছায়াপথে রয়েছে। এ ছায়াপথে প্রায় 10 সংখ্যক নক্ষত্র রয়েছে। এই ছায়াপথ ছাড়াও মহাবিশ্বে রয়েছে লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সি। এদের খালি চোখে দেখা যায় না। এসব গ্যালাক্সির আকার ও আয়তন বিভিন্ন। কোনোটা উপবৃত্তাকার, কোনোটা সৰ্পিল । সবচেয়ে উজ্জ্বল কিছু কিছু গ্যালাক্সি উপবৃত্তাকার। অ্যানড্রোমেড়া একটি গ্যালাক্সি যাকে খালি চোখে দেখা যায় না। আমাদের গ্যালাক্সি (ছায়াপথ) থেকে এর দূরত্ব 2 x 10° আলোকবর্ষ। সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়েও অনেক গ্যালাক্সি দৃষ্টিগোচর হয় না।
গ্যালাক্সি প্রধানত দু প্রকার ।
(ক) স্বাভাবিক গ্যালাক্সি (খ) রেডিও গ্যালাক্সি
(ক) স্বাভাবিক গ্যালাক্সি (Normal Galaxies) :
আমরা জানি যে, গ্যালাক্সি হলো মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান। আমাদের ছায়াপথ ছাড়াও মহাবিশ্বে লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সি রয়েছে। এদের বলা হয় স্বাভাবিক গ্যালাক্সি। স্বাভাবিক গ্যালাক্সি তিন প্রকার হয় -
(i) উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি
(ii) সর্পিল বা পেঁচানো গ্যালাক্সি
(iii) বিষম গ্যালাক্সি। -
(i) উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি : যে সব গ্যালাক্সি দেখতে উপবৃত্তাকার চাকতির মতো তাদের বলা হয় উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি। এগুলো সাধারণত লোহিত দানব ও শ্বেত বামন নক্ষত্র নিয়ে গঠিত। গ্যালাক্সির শতকরা ১৮ ভাগ উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি।
(ii) সর্পিল বা পেঁচানো গ্যালাক্সি : অধিকাংশ স্বাভাবিক গ্যালাক্সি (প্রায় ৮০%) হলো পেঁচানো গ্যালাক্সি। আমাদের ছায়াপথ (Milky way) ও অ্যানড্রোমেডা এই ধরনের গ্যালাক্সি ।
(iii) বিষম গ্যালাক্সি : এ ধরনের গ্যালাক্সির কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই। কনিষ্ঠ স্বাভাবিক গ্যালাক্সি হলো বিষম গ্যালাক্সি। এরা মধ্যবয়সী। স্বাভাবিক গ্যালাক্সি শতকরা ২ ভাগ বিষম গ্যালাক্সি।
চিত্র :১১.৬
(খ) রেডিও গ্যালাক্সি ( Radio galaxies) :
যেসব গ্যালাক্সি রেডিও কম্পাঙ্কের তাড়িত চৌম্বক বিকিরণ নিঃসরণ করে তাদের রেডিও গ্যালাক্সি বলে। রেডিও গ্যালাক্সিকে দু ভাগে ভাগ করা যায়।
(i) সাধারণ রেডিও গ্যালাক্সি
(ii) কোয়াসার।
(i) সাধারণ রেডিও গ্যালাক্সি যে স্বাভাবিক আলোকীয় গ্যালাক্সির দুই পাশে দুটি প্রবল রেডিও উৎস রয়েছে, এদের সাধারণ রেডিও গ্যালাক্সি বলে। এটা দেখতে অনেকটা কোনো ব্যক্তির মুখমণ্ডলের দুই পাশে দুটি কানের মতো। রেডিও ক্ষমতা উৎপাদের (output) পাল্লা হলো 1030 থেকে 1038 ওয়াট।
(ii) কোয়াসার (Quasar) : কোয়াসার হলো আধা নাক্ষত্রিক (Quasi-stellar) রেডিও উৎস। এদের গঠন নক্ষত্রের ন্যায় এবং এরা ক্ষমতাশালী বেতার তরঙ্গ নিঃসরণ করে। এদের রেডিও উৎপাদ 1037 থেকে 1038 ওয়াট পাল্লার মধ্যে। কোয়াসার হলো দূরবর্তী জ্ঞাত বস্তু । এরা পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। এরা যেন মহাবিশ্বের সীমানায় রয়েছে। এরা পৃথিবী থেকে 0.9C বেগে সরে যাচ্ছে। এদের আকার খুব ছোট। এরা অতি ঘন গ্যালাক্সি গঠন করে। এদের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি এবং এদের মহাকর্ষ বলও অনেক বেশি। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০টি কোয়াসার শনাক্ত করা গেছে।
মহাবিশ্বের ঘটনা
মহাবিশ্বে ঘটছে নানান ঘটনা। নক্ষত্রের হাইড্রোজেনের পরিমাণ কমে তৈরি হচ্ছে সুপারনোভা এবং তার বিস্ফোরণ ঘটে তৈরি হচ্ছে পালসার। বিভিন্ন নক্ষত্রে ঘটছে নানান রকম নিউক্লিয় প্রতিক্রিয়া। ঘটছে নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যুর মতো ঘটনা, তৈরি হচ্ছে কৃষ্ণ গহ্বর।
এছাড়া সৌরজগতে ঘটছে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ, উল্কাপাত ইত্যাদি। আমরা এখানে সূর্যের শক্তির উৎস, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, পালসার সৃষ্টি ইত্যাদি ঘটনা নিয়ে আলোচনা করব।
সূর্যের শক্তির উৎস :
এটা দেখা গেছে যে, সূর্য প্রতি সেকেন্ডে 4 x 1026 জুল শক্তি বিকিরণ করে। সূর্য এই বিপুল পরিমাণ শক্তি কোথা থেকে পায়? এই শক্তি সূর্য পায় নিউক্লিয়ার ফিউশান বিক্রিয়া থেকে। সূর্যের ভিতর অতি উচ্চ তাপমাত্রার কারণে চারটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস ফিউশানিত হয়ে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি করে। এই যে বিক্রিয়া যাতে হালকা নিউক্লিয়াস একত্রিত হয়ে ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করে তাকে বলা হয় ফিউশন। ফিউশন বিক্রিয়াকে নিম্নোক্তভাবে দেখানো যায় :
শক্তি
আইনস্টাইনের ভরশক্তি সমীকরণ E = mc2 মোতাবেক এই শক্তির উদ্ভব হয়। এভাবে E হচ্ছে নির্গত শক্তি, হচ্ছে ভরের হ্রাস এবং c হচ্ছে আলোর বেগ ।
এটা জানা গেছে যে, প্রতিটি ফিউশন বিক্রিয়ায় বিন্দু পরিমাণ ভর হারিয়ে যায়। অর্থাৎ যেসব হালকা নিউক্লিয়াস একত্রিত হয়ে যে ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করে তার ভর, হালকা নিউক্লিয়াসগুলোর ভরের যোগফলের চেয়ে কম। সুতরাং একত্রিত হওয়ার ফলে কিছু পরিমাণ ভর হারিয়ে যায়। এই হারানো ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এটা দেখানো যায় চারটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস একত্রিত হয়ে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরির জন্য প্রচুর শক্তি নির্গত হয়। সূর্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, সূর্য আরও কোটি কোটি বছর আমাদের আলো ও তাপ দেবে।
সৌর ঔজ্জ্বল্য :
সূর্য থেকে প্রতি সেকেন্ডে চতুর্দিকে নির্গত শক্তির পরিমাণকে সৌর ঔজ্জ্বল্য বলে। একে Ls দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
Ls = 4πR2 × S... (11.1)
এখানে, S = সৌর ধ্রুবক যার মান 1.38 x 103; R = সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথের ব্যাসার্ধ যার মান
1 AU = 1.496 x 1011m |
নিজে কর : সৌর ধ্রুবক 1.38 x 10"; সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথে ব্যাসার্ধ IAU হলে সৌর ঔজ্জ্বল্য নির্ণয় কর।