গ্রামের হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ছিলেন অঘোর। তার কাছে কোনো রোগী গেলেই তিনি একটুখানি সাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট টপ টপ করে ফেলে পুরিয়া করে দিতেন। তবে ম্যালেরিয়া রোগীরা তার কাছে যেত না। তারা ভিড় জমাত এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপের কাছে। সেবার প্রায় পুরো গ্রাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে তোরাপ ডাক্তার দুহাতে টাকা আয় করেন কিন্তু অঘোর ডাক্তার হয়ে পড়েন কর্মহীন। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন এ্যালোপ্যাথি চর্চা করার। তাই তিনি একটা সিরিঞ্জ আর কিছু কুইনাইন ইঞ্জেকশন কেনার জন্য চুপিচুপি জেলা শহরে গিয়েছিলেন।
Related Question
View Allগ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তার বলতে মূলত সেসব ডাক্তারকে বোঝায় যারা প্রথাগত ডাক্তারি শিক্ষার বাইরে থেকে সাধারণ চিকিৎসা দেন। তারা মূলত গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাসেবার ঘাটতি পূরণের জন্য কাজ করে থাকেন। 'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পে অঘোর ও তোরাপ হচ্ছেন সেই শ্রেণির ব্যক্তি। অঘোর ও তোরাপ ডাক্তারের মতো হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে অনেক সময় মানুষ উপকৃত হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের চিকিৎসায় মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়।
'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পে দুজন চিকিৎসক অঘোর ডাক্তার ও তোরাপ ডাক্তার। অঘোর চর্চা করেন হোমিওপ্যাথ আর তোরাপ চর্চা করেন এ্যালোপ্যাথ। গ্রামের মানুষের সংকটকালে তাদের একমাত্র ভরসা এই দুই ডাক্তার। মূলত গ্রামীণ অঞ্চল শহর থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ার কারণে অনেক কিছুই মানসম্মত হয়ে ওঠে না। বর্তমান সময়েও লক্ষ করা যায় গ্রামে এখনো আধুনিক মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌছেনি। তাই তাদের ভরসা রাখতে হয় হাতুড়ে ডাক্তারের ওপর। এ গল্পের দুজন ডাক্তারের চিকিৎসা পদ্ধতির দিকে তাকালেই গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসা পদ্ধতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হোমিওপ্যাথ অঘোর ডাক্তারের কাছে যেকোনো রোগী এলেই সাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট মিশিয়ে দিয়ে দেয়। সর্বরোগের একই ওষুধ। তোরাপ ডাক্তারও এক সিরিঞ্জ দিয়েই পুরো গ্রামকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তার ইঞ্জেকশনের বর্ণনায় লেখক জানিয়েছেন, ইঞ্জেকশন দিয়ে তিনি দুতিনটে লোককে চিরদিনের জন্য খোঁড়া করে ফেললেন। আর তার ম্যাপাক্রিন বড়ি খেয়ে কয়েকজন তো চিরকালের জন্য কালা হয়ে গেল। তবু মানুষ তার কাছেই যায়। কারণ গ্রামীণ প্রত্যন্ত এলাকায় অন্য কোনো উপায় থাকে না মানুষের কাছে।
তাই বলা যায়, গ্রামীণ অঞ্চলে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে গ্রামের মানুষদের অদক্ষ হাতুড়ে ডাক্তার ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না। তবে অঘোর ডাক্তার ও তোরাপ ডাক্তারের মতো হাতুড়ে ডাক্তাররা কিছু ক্ষেত্রে মানুষের জন্য সহায়ক হলেও তাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত না হওয়ার কারণে অনেক মানুষের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়। যার মূল্য কোনোভাবেই শোধ করা যায় না।
'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পটিতে দেখা যায়, কৃষিপ্রধান এই দেশে বর্ষা ও শীত হচ্ছে কাজের মৌসুম। এ সময়ে অসুস্থ হয়ে শুয়ে থাকার সময় মানুষের নেই। কিন্তু তারপরেই শরৎকালে একটু অবসরে থাকে মানুষ। ওই সময়ের জন্যই যেন ওত পেতে বসে থাকে ম্যালেরিয়া জ্বর। আশ্বিন মাসের দিকে ম্যালেরিয়ার প্রকোপে মানুষ ঘরে ঘরে ছেঁড়া কাঁথা, ন্যাকড়া, ত্যানা গায়ে চাপিয়ে কোঁকাত। আর সে কী কাঁপুনি! সে সময়ে ম্যালেরিয়ার মতো বাঘা জ্বর আর কিছু ছিল না। বাঘ যেমন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের টুটি কামড়ে ধরে, ঠিক তেমনই ম্যালেরিয়া জ্বর এসে গ্রামের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। হঠাৎ করেই অনেক বেশি ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রভাব হতো বলে এই জ্বরকে বাঘের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পে দেখা যায়, শরৎকালে যখন বেশ ঝরঝরে আবহাওয়া, আকাশ ভর্তি রোদ, একটু একটু ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করে ঠিক তখনই হুড়মুড়িয়ে চলে আসে ম্যালেরিয়া জ্বর। জ্বরের প্রভাবে গ্রামের প্রায় অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আর তাদের চিকিৎসার জন্য একমাত্র ভরসা ছিলেন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপ।
লেখকের গ্রামে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে যে দুজন ডাক্তার ছিলেন তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন তোরাপ ডাক্তার। তিনি এ্যালোপ্যাথ চর্চা করেন। গ্রামের দুই হাতুড়ে ডাক্তার তোরাপ ও অঘোরের মধ্যে প্রতিযোগিতায় সব সময় তোরাপ ডাক্তারই এগিয়ে থাকেন। কারণ গ্রামে প্রধানত প্রার্দুভাব ঘটে ম্যালেরিয়া জ্বরের। ম্যালেরিয়ার মতো বাঘা জ্বর অঘোর ডাক্তারের হোমিওপ্যাথ চিকিৎসায় সারানো সম্ভব নয়। তাই একমাত্র ভরসা তোরাপ ডাক্তার। সেবার শরৎকালে গ্রামের প্রায় অর্ধেক লোক ম্যালেরিয়া জ্বরে পড়লে ব্যস্ততা বাড়ে তোরাপ ডাক্তারের। তোরাপ ডাক্তার হলুদ রঙের বড় বড় বিকট দাঁত বের করে, একটি বড় সিরিঞ্জ নিয়ে রোগীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরতেন। তার সঙ্গে থাকত দুই প্যাকেট ভর্তি ম্যাপাক্রিন বড়ি। রোগী যেখানেই থাকুক না কেন, গলায় স্টেথোটি ঝুলিয়ে ইনজেকশনের বাক্সটি হাতে নিয়ে তোরাপ ডাক্তার হাজির হয়ে যেতেন। রোগীর কাছে গিয়েই তিনি তার গোদা গোদা এ্যাকাব্যাকা আঙুল দিয়ে রোগীর কজি চেপে ধরে কিছুক্ষণ নাড়ি পরীক্ষা করতেন। তারপর ইনজেকশন দিয়ে ম্যালেরিয়ার ভূত ছাড়াতে চাইতেন। ডাক্তারি ফি এবং ওষুধের খরচ বাবদ দুই টাকা পকেটে ভরে মহিষের লাঙলের ফলার মতো প্রকাণ্ড সিরিঞ্জ দিয়ে ইঞ্জেকশন করতেন। অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ তোরাপ ডাক্তারের ইঞ্জেকশনে অনেকে চিরদিনের জন্য খোঁড়া হয়ে যায় এবং ম্যাপাক্রিন বড়ি খেয়ে অনেকে চিরদিনের জন্য কালা হয়ে যায়। এই ছিল এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপের ম্যালেরিয়া চিকিৎসা।
তাই বলা যায়, হাতুড়ে ডাক্তার তোরাপের চিকিৎসা ছিল অনুমাননির্ভর। তার চিকিৎসায় অনেকে সেরে উঠলেও অনেকের জন্য তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছিল।
'হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি' গল্পে লেখকের গ্রামে যে দুজন ডাক্তার আছেন তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপ। পেশায় তিনি একজন ডাক্তার হলেও মূলত মৌসুম বুঝে ডাক্তারি করেন। বাকি সময় নিজ হাতে হালচাষ করেন। বর্ষাকাল হচ্ছে চাষবাসের সময় এবং শীতকাল হচ্ছে ফসল কাটার মৌসুম। এ সময় গ্রামের সব মানুষ রোগটোগ শিকেয় তুলে রেখে মাঠে নেমে পড়ত। কারণ এই দুই সময়ে কাজ করতে না পারলে পেটে ভাত জুটবে না। এ সময় রোগী হয়ে শুয়ে থাকার উপায় নেই। কাজেই এ সময়টাতে তোরাপ ডাক্তার ডাক্তারি পেশা শিকেয় তুলে রেখে কৃষিকাজে নেমে পড়তেন। এ সময় তিনি ডাক্তারির ধার ধারতেন না। মূলত কৃষিকাজ করার জন্যই কৃষি মৌসুম বর্ষাকাল ও শীতকালে তোরাপ ডাক্তার ডাক্তারি করতে যান না।
বাংলায় একটা প্রবাদ আছে- "যার কাজ তারই সাজে, অন্য লোকের লাঠি বাজে।" অর্থাৎ যার যেটা কাজ তার সেটাই করা উচিত। না হলে অন্যের কাজ করতে গেলে অহেতুক উপহাসের পাত্র হয়ে দুঃখ ও অপমান বয়ে বেড়াতে হয়। 'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি গল্পে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার অঘোর এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসা করতে গিয়ে দুঃখ ও অপমানকে সঙ্গী করেছেন।
'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পে দেখা যায়, গ্রামের অর্ধেকের বেশি মানুষ ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত। তাদের চিকিৎসা করে দুহাতে মোটা টাকা রোজগার করে নিচ্ছেন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপ। ম্যালেরিয়া জ্বরে হোমিওপ্যাথ কাজ করে না বলে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার অঘোরের কাছে কোনো রোগী যায় না। তোরাপ ডাক্তারের যেখানে আঙুল ফুলে কলাগাছ সেখানে অঘোর ডাক্তারের সংসার চালানো দায় হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অঘোর ডাক্তার সিদ্ধান্ত নেন তিনিও এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসা দেবেন। তাই তিনি চুপি চুপি জেলা শহরে গিয়ে একটা সিরিঞ্জ আর কিছু কুইনাইন ইঞ্জেকশন কিনে আনেন। তোরাপের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি এগিয়ে থাকতে চান। এবার থেকে তিনিও এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসায় ইঞ্জেকশন দেবেন। তার কাছে প্রথম রোগী আসে ইদরিস। সে ইঞ্জেকশনের ভয়ে অঘোর ডাক্তারের হোমিওপ্যাথ চিকিৎসাতেই ভরসা রেখেছে। অদক্ষ ডাক্তার অঘোর কখনো ইঞ্জেকশন করেননি। কিন্তু তিনি হার মানতে নারাজ। তাই তিনি মনের জোরে কাঁপা কাঁপা হাতে ইদ্রিসের কোমরের মাংসে সুচ ঢুকিয়ে দেন। কিন্তু সুচটা ভেঙে যায় আনাড়ি ডাক্তারের অদক্ষতার কারণে। সেই সময়ে একজন বুদ্ধিমান ছেলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আন্দাজ করতে পেরে দাঁত দিয়ে সুচটা বের করে নেয়। লজ্জা, দুঃখ ও অপমানে অঘোর ডাক্তারের দুচোখে অশ্রুর ঢল নামলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারেন।
'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পে ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রাদুর্ভাবের কথা ফুটে উঠেছে। একটা সময় ছিল যখন ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত গ্রামের পর গ্রাম। ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় মূলত শরৎকালে। ম্যালেরিয়া জ্বরের মতো মারাত্মক জ্বর তখন আর কিছু ছিল না। ঘরে ঘরে মানুষ ছেঁড়া কাঁথা, ন্যাকড়া, ত্যানা গায়ে চাপিয়ে কোঁকাত। কাঁপুনি থামানোর জন্য অনেকে গায়ে পাথর পর্যন্ত চাপিয়ে রাখত। যখন ম্যালেরিয়া শুরু হয় তখন মানুষ দমাদম বিছানা ধরতে লাগে। ছেলে-বুড়ো কেউ বাদ যায় না। পুরোনো রোগীদের বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বর বাড়তে থাকে। সঙ্গে বাড়ে পিপাসা। ঘটি ঘটি পানি খেয়ে পিপাসা কমে না। পানি পেটে গিয়ে গরম হয়ে যায়, তারপর গা-টা গুলিয়ে ওঠে। তারপরেই বমি। বমি হয়ে গেলেই আবার পিপাসা। জ্বর কমে আসে আস্তে আস্তে। রাত দশটার দিকে একদম জ্বর চলে গিয়ে গা ঠান্ডা হয়। সব মিলিয়ে ম্যালেরিয়া রোগীর অবস্থা থাকে অত্যন্ত শোচনীয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!