যুক্তিবিদ যোসেফের মতে, 'অনুমান হলো এমন এক চিন্তা প্রক্রিয়া যা এক বা একাধিক অবধারণ নিয়ে শুরু হয়ে অন্য একটি অবধারণে পরিণতি লাভ করে এবং যার সত্যতা পূর্ববর্তী অবধারণের মধ্যে নিহিত থাকে।'
অনুমানের প্রকৃতিগত দুটি বৈশিষ্ট্য হলো- ১. অনুমান সর্বদা এক বা একাধিক প্রদত্ত বাক্য বা আশ্রয়বাক্যের ওপর নির্ভরশীল। কেননা অনুমান যখন ভাষায় প্রকাশিত হয় তখন তা হয় 'যুক্তি' এবং যুক্তি আবার এক বা একাধিক জানা যুক্তিবাক্যের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়। এগুলোকে কোনো যুক্তির 'প্রদত্ত বাক্য' বা 'আশ্রয়বাক্য' বলে। ২. অনুমান সর্বদা সিদ্ধান্ত হিসেবে নতুন একটি যুক্তিবাক্য স্থাপন করে। বস্তুত অনুমানের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত টানা হলেই শুধু আশ্রয়বাক্যে নিহিত নতুন বাক্যটি আত্মপ্রকাশ করে, যা সিদ্ধান্ত হিসেবে যুক্তিবাক্যটিকে নতুনত্ব প্রদান করে।
উদ্দীপকে অনুসারে 'অনুমান পদ্ধতি' হচ্ছে যুক্তিবিদ্যার সবচেযে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অনুমান দু'ধরনের। যথা- অবরোহ ও আরোহ। অবরোহ অনুমান আবার দু'ধরনের। যথা- মাধ্যম ও অমাধ্যম। লক্ষণীয় যে, মাধ্যম অনুমান সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত না হলেও অমাধ্যম অনুমান সম্পর্কে যুক্তিবিদেরা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। এক্ষেত্রে জে. এস. মিল, বেইন প্রমুখ যুক্তিবিদ মনে করেন যে, অমাধ্যম অনুমানকে 'অনুমান' বলা উচিত নয়। কারণ অনুমানের একটি অনিবার্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কোনো নতুন তথ্যে উপনীত হওয়া। কিন্তু মিল মনে করেন যে, অমাধ্যম অনুমানের সিদ্ধান্তটি কোনো নতুন তথ্য তো নয়ই, বরং বলা যায় আশ্রয়বাক্যে উল্লিখিত তথ্যের পুনরাবৃত্তি মাত্র। তাই অমাধ্যম অনুমান সম্পর্কে তার মন্তব্য হলো, "এরূপ সকল ক্ষেত্রে যথার্থই কোনো অনুমান নেই, আশ্রয়বাক্যে যা বর্ণিত হয়েছে শুধু সেটুকু ছাড়া সিদ্ধান্তে নতুন কোনো তথ্য থাকে না। তাছাড়া যুক্তিবিদ বেইন মনে করেন, 'অমাধ্যম অনুমানের আশ্রয়বাক্যকে আসলে ভিন্ন ভাষায় সিদ্ধান্তে তুলে ধরা হয়, সিদ্ধান্তে কোনো নতুন তথ্য পরিবেশ করা হয় না।' যেমন, "সব মানুষ হয় প্রাণী”-এ আশ্রয়বাক্য থেকে অমাধ্যম অনুমান হিসেবে আমরা যে সিদ্ধান্ত পাই তাহলো- "কিছু প্রাণী হয় মানুষ"। আর এ দৃষ্টিকোণ থেকে অমাধ্যম অনুমান সম্পর্কে বেইন বলেন, "এখানে একই তথ্য এক ধরনের স্তরবিন্যাস থেকে ভিন্ন শব্দবিন্যাসে স্থানান্তর ঘটে মাত্র। সুতরাং মিল ও বেইন অনন্তর বা অমাধ্যম অনুমানকে যথার্থ অনুমান বলে স্বীকার করেন না।
উদ্দীপকে অধ্যাপক ফুয়াদ যুক্তিবিদ্যার ক্লাসে জানালেন, 'অনুমান পদ্ধতি' হচ্ছে যুক্তিবিদ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অনুমান প্রধানত দুটি রূপের হয়। যথা- অবরোহ ও আরোহ। অবরোহ অনুমান আবার দুভাগে বিভক্ত। যেমন- অমাধ্যম অনুমান ও মাধ্যম অনুমান। যে অবরোহ অনুমানে একটি মাত্র আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি সরাসরি অনুমিত হয় তাকে 'অমাধ্যম অনুমান' বলে। অর্থাৎ এ ধরনের অনুমান পদ্ধতিতে দ্বিতীয় কোনো আশ্রয়বাক্যকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয় না বলেই এর নাম হয়েছে অমাধ্যম অনুমান। একই কারণে এ পদ্ধতিকে 'অনন্তর অনুমান' বা 'প্রত্যক্ষ অনুমান' বলেও অভিহিত করা হয়।
দৃষ্টান্তস্বরূপ:
সব মানুষ হয় প্রাণী।- আশ্রয়বাক্য
... কিছু প্রাণী হয় মানুষ। - সিদ্ধান্ত
অন্যদিকে যে অবরোহ অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি অনুমিত হয় তাকে 'মাধ্যম অনুমান' বা 'সান্তর অনুমান' বলে। অর্থাৎ এ ধরনের অনুমান পদ্ধতিতে সরাসরি একটি আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় না; বরং মাধ্যম হিসেবে অন্য কোনো আশ্রয়বাক্যের উপর নির্ভর করতে হয় বলে এর নাম হয়েছে 'মাধ্যম অনুমান'। আবার একই কারণে এ পদ্ধতিকে 'সান্তর অনুমান' বা 'পরোক্ষ অনুমান; বলে অভিহিত করা হয়।
দৃষ্টান্তস্বরূপ :
সব প্রাণী হয় মরণশীল - আশ্রয়বাক্য।
সব মানুষ হয় প্রাণী – আশ্রয়বাক্য।
.. সব মানুষ হয় মরণশীল- সিদ্ধান্ত।
এছাড়া অমাধ্যম অনুমানের আশ্রয়বাক্যে যে তথ্যটি সুপ্ত অবস্থায় থাকে সেটি সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত হয়। এক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞানের ব্যাপ্তি খুব একটা প্রসারিত হতে পারে না। পক্ষান্তরে, মাধ্যম অনুমান আমাদের জ্ঞানের পরিধিকে অধিক পরিমাণে সম্প্রসারণ ঘটায়। কেননা মাধ্যম অনুমানের আশ্রয়বাক্যগুলো এমনভাবে গৃহীত হয় যে, তা নতুন এক তথ্য হিসেবে সিদ্ধান্ত নিঃসৃত করে।
Related Question
View Allঅমাধ্যম অনুমান হলো যে অবরোহ অনুমানে একটিমাত্র আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি সরাসরি অনুমিত হয় বা নিঃসৃত হয়।
মাধ্যম অনুমান হলো পরোক্ষ অনুমান। যে অবরোহ অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি নিঃসৃত হয় বা অনুমিত হয় তাকে 'মাধ্যম অনুমান' বলে। মাধ্যম অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থাকা বাধ্যতামূলক। কারণ মাধ্যম অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, একটি আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না। যেমন-
A – সকল মানুষ হয় মরণশীল।
A – রহিম হয় একজন মানুষ।
A - রহিম হয় মরণশীল।
উদ্দীপকে মিজান সাহেবের বক্তব্য আরোহ অনুমানমূলক। আরোহ অনুমান অনুযায়ী অনুমান প্রক্রিয়ায় কয়েকটি বিশেষ দৃষ্টান্তের ওপর নির্ভর করে একটি সার্বিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। যেমন-
মতিন হয় দানশীল ব্যক্তি এবং ধনী।
মজিদ হয় দানশীল ব্যক্তি এবং ধনী।
মাখন হয় দানশীল ব্যক্তি এবং ধনী।
সকল ধনী ব্যক্তি দানশীল।
মিজান সাহেব বাস্তবে কিছু মানুষকে দেখেছে যে তারা ধনী এবং দানশীল। সুতরাং তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে সকল ধনী ব্যক্তি হয় দানশীল। এখানে সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্যগুলোর চেয়ে বেশি ব্যাপক হয়েছে। আরোহ অনুমানে সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্য থেকে কিছু লোক এর দানশীল ও ধনীর দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করা যথেষ্ট নয়। এ কারণে আরোহ অনুমান এর সিদ্ধান্ত সব সময় সম্ভাব্য হয়।
সুতরাং উদ্দীপকে মিজান সাহেবের বক্তব্যটি একটি আরোহ অনুমান। যার সিদ্ধান্ত সবসময় সম্ভাব্য হয়। কারণ আরোহ অনুমানে সিদ্ধান্ত আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত বা অনুমিত হয় না, সিদ্ধান্তে আশ্রয়বাক্য থেকে নতুন তথ্য প্রকাশ করে।
উদ্দীপকে যে যুক্তিটি দেওয়া আছে তা হলো-
সকল জ্ঞানী হয় ধনী।
সকল কবি হয় ধনী।
সকল কবি হয় জ্ঞানী।
এই যুক্তিটি একটি অবরোহমূলক যুক্তি। এই দৃষ্টান্তে আশ্রয়বাক্য রয়েছে দুটি। আর আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়েছে। তাই এটি অবরোহ অনুমান। যে অনুমানে এক বা একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে সিদ্ধান্ত অনুমিত হয় তাকে 'অবরোহ অনুমান' বলে। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্যের চেয়ে কম ব্যাপক বা সমান ব্যাপক হতে হবে। উপরোক্ত অনুমানে সমান ব্যাপক সিদ্ধান্ত হয়েছে। উদ্দীপকের উক্ত যুক্তিটি বৈধ। কারণ আশ্রয়বাক্য হতে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়েছে। তবে যুক্তির আশ্রয় বাক্যগুলোর সত্যতা থেকে সিদ্ধান্তের সত্যতা যদি যাচাই করতে যাই তবে তা মিথ্যা। কারণ 'সকল জ্ঞানী হয় ধনী' আশ্রয়বাক্যটি বস্তুগত মিথ্যা এবং 'সকল কবি হয় ধনী' আশ্রয়বাক্যটি বস্তুগতভাবে মিথ্যা। সকল জ্ঞানী ধনী • নাও হতে পারে, আবার, সকল কবি ধনী নয়। তাই উভয় আশ্রয়বাক্য বস্তুগতভাবে মিথ্যা। সুতরাং সিদ্ধান্তে তথ্য 'সকল কবি হয় জ্ঞানী' বস্তুগতভাবে মিথ্যা। আশ্রয়বাক্য বস্তুগত মিথ্যা হলে সিদ্ধান্ত বস্তুগতভাবে মিথ্যা।
উদ্দীপকের যুক্তিটির আশ্রয়বাক্য, সিদ্ধান্ত বস্তুগতভাবে সত্য মিথ্যার উপর যুক্তির বৈধতা-অবৈধতা নির্ভর করে না। তাই এখানে আশ্রয় বাক্য ও সিদ্ধান্ত বস্তুগতভাবে মিথ্যা হলেও যুক্তিটি বৈধ। কারণ আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হলে যুক্তিটি বৈধ হয়। আর উক্ত যুক্তির আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়েছে। সুতরাং, যুক্তিটি বৈধ।
যে অবরোহ অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত নিঃসৃত হয় সেটিই হলো 'মাধ্যম অনুমান'।
যে অনুমান প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তটি এক বা একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় এবং যার সিদ্ধান্তটি কখনোই আশ্রয়বাক্যের চেয়ে ব্যাপক হতে পারে না, তবে অনেক ক্ষেত্রে আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্ত সমব্যাপক হয় সেটিই হলো 'অবরোহ অনুমান'। যেমন-
সকল মানুষ হয় মরণশীল।
রহিম হয় একজন মানুষ।
রহিম হয় মরণশীল।
উপরের দৃষ্টান্তে সিদ্ধান্তটি দুটি আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়েছে এবং সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্যের চেয়ে কম ব্যাপক।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!