সাংস্কৃতিক জীবনে মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব
বাঙালি জীবনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা বৈপ্লবিক যুগান্তরের সম্ভাবনায় তাৎপর্যবহ ও সুদূরপ্রসারী। ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসন-বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনের অনিঃশেষ চেতনা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের মতো শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের গণজাগরণ ও বৈপ্লবিক চেতনার স্পর্শে এক অপরিমেয় সম্ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে আমাদের সাহিত্যলোক ৷ সেই উজ্জীবনী শক্তি একাত্তরের রক্তস্নাত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে বর্তমান সময়েও বহমান। সংগত কারণেই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমাদের জীবনে ও সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। স্মৃতি ও বিস্মৃতির দোলাচলে বাঙালি জাতিসত্তা যেরূপ বিভ্রান্তি ও সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, জাতীয় জীবনের এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের সেই রেনেসাঁসীয় গতি ও শক্তির পুনঃপর্যবেক্ষণ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কেবল বর্তমান প্রজন্মের জন্যেই নয়, বিভ্রান্তিপ্রবণ সমাজমানসের জন্যও এই পর্যবেক্ষণের উপযোগিতা কম নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনে অপরিমেয় ত্যাগ, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও সাফল্যের সূর্যোদয়ে গৌরবময়। ইতিহাসের যে গতিশীল ও দ্বন্দ্বময় ধারা পলাশীর বিপর্যয় (১৭৫৭), সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭), কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিভেদের রাজনীতি, পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৪৭-এর অসংগত রাজনৈতিক মীমাংসা, ভাষা- আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান প্রভৃতি ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জীবনে সেই ঐতিহাসিক নিয়মেই চরম পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সামূহিক অস্তিত্বের প্রশ্নে সমগ্র জাতি এক অভিন্ন বিন্দুতে মিলিত হয় এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি তার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে করতলগত করে। সুদীর্ঘকালের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও নিপীড়নের ফলে জাতির সৃষ্টিশীল চেতনায় যে ক্ষোভ, প্রতিবাদ, রক্তক্ষরণ, সংগ্রামশীল জীবনদৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎস্পর্শী কল্পনার জন্ম হয়েছিল, যুদ্ধের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা ও সাফল্যে তার গঠনমূলক রূপান্তরের পথ সুপ্রশস্ত হয়। স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধোত্তরকালে বাংলাদেশের সামগ্রিক জীবনকাঠামোতে গুণগত পরিবর্তন ছিল প্রত্যাশিত, প্রয়োজনীয়; কিন্তু রক্তাক্ত যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের গতি অল্প কিছুকালের মধ্যেই হয়ে পড়ল অবরুদ্ধ, রক্তাক্ত। কেবল পরিমাণগত পার্থক্য ছাড়া পাক আমলের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর কোনো গুণগত পরিবর্তন জাতীয় জীবনে ঘটেনি। স্বাধীনতা-উত্তর কয়েক বছরের মধ্যেই, ১৯৭৫-পরবর্তীকালে, জাতিশোষণ রূপ নিল শ্রেণিশোষণে, পরিবর্তিত কৌশলে সামরিক শাসন নিয়ন্ত্রণ করল রাষ্ট্রযন্ত্র, স্তব্ধ করা হলো সত্যকণ্ঠ। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা জাতির চিন্তা-চেতনায়, মন ও মননে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল নিঃসন্দেহে। বাঙালির প্রত্যাশার দিগন্ত হয়েছিল সুবিস্তৃত। কিন্তু যুদ্ধোত্তর কয়েক বছরের মধ্যেই জাতীয় চৈতন্যে প্রকাশ পেতে থাকল পরাজয়ক্লিষ্টতা। মনে হলো, ‘অতীত যেন বিদ্ররূপ করছে; বর্তমান হয়ে উঠেছে পান্ডুর, নির্ভর-অযোগ্য। জাতিসত্তা পুনরায় নিক্ষিপ্ত হলো অতীত গর্ভে বারুদ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হলো মূল্যবোধের স্তম্ভগুলি; গণতন্ত্র হলো সমরাস্ত্র-শাসিত; জাতিশোষণ রূপান্তরিত হলো শ্রেণিশোষণে; সহস্র কোটিপতির রসদ সরবরাহে আমাদের অস্তিত্বমূল শুকিয়ে গেল। রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হলো ছিন্নমূল সব ভাড়াটে কুশীলব; ছদ্মবেশের আড়ালে দেখা গেল তাদের অতীত কঙ্কাল।' জাতীয় অস্তিত্বের এই বিবর্ণ পটভূমিতে বাংলাদেশের সৃষ্টিশীল জীবনস্পর্শী চেতনালোক হয়েছে ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত। ফলে, স্কুল অর্থে স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশে সাহিত্যে বিভাগোত্তর কাল অপেক্ষা একটি নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে। সে-বিষয়টি হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু গভীরতর অর্থে, চেতনার পরিমাপে মুক্তিযুদ্ধ একটি ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক রূপ ও স্বরূপে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যে অভিব্যক্ত হয়েছে।
Related Question
View All"পরিবেশ দূষণ ও এর প্রতিকার"
বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে পরিবেশ দূষণ একটি ব্যাপক আলোচিত ঘটনা যা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। গত কয়েক দশক ধরে প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা মানব জাতিকে সতর্ক ও সচেতন হতে নির্দেশ দিয়ে আসছেন। পরিবেশ দূষণ মানব সমাজে নিদারুন সংকটের সৃষ্টি করেছে এবং মানব জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই পরিবেশ দূষণের ফলে শুধু মানব গোষ্ঠীই নয়, বরং সমস্থ জীবকূলের অস্তিত্ব এই পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। দূষণ পরিবেশের প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর স্বকীয়তা নষ্ট করে দেয়। পরিবেশে বিভিন্ন উপাদানে ক্ষতিকারক বস্তুর অনুপ্রবেশ ঘটে। বিশিষ্ট বস্তুবিজ্ঞানী ওডামের মতে, “বায়ু, পানি, মাটি” ইত্যাদি ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের যে পরিবর্তন মানব সভ্যতাকে অথবা কোন প্রজাতির জীবনকে সাংস্কৃতিক বা প্রাকৃতিক সম্পর্কে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে বা করতে পারে, তাকেই দূষণ বলে। পরিবেশ দূষণের প্রকারভেদগুলো হলোঃ পানি দূষণ, মাটি দূষণ, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ ।
পানি দূষণমুক্ত রাখতে করণীয়:
১. পানিতে আবর্জনা, সার বা বিষাক্ত দ্রব্য না ফেলা।
২. উপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা।
৩. ভূগর্ভস্থ পানির পরিমিত ব্যবহার।
৪. জমিতে সার বা কীটনাশক ব্যবহারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
বায়ু দূষণমুক্ত রাখতে করণীয়:
১. ধুমপানের ধোঁয়া, যানবাহন ও কলকারখানার ধোঁয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
২. ওজোন স্তরে ছিদ্র হয়ে যে সমস্যার সম্ভাবনা রয়েছে তা প্রতিরোধ করা।
৩. গ্রীণ হাউজ গ্যাসের কারণে উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ করা।
৪. আবর্জনাকে ধরণ অনুযায়ী পৃথক করে জমা ও অপসারণ করা। ৫. জনগণকে বৃক্ষ রোপনে উৎসাহী করা।
শব্দ দূষণ রোধে করণীয় :
১. উচ্চস্বরে কথা/চিৎকার করা যাবে না।
২. জোরে গান বাজানো যাবে না।
৩. হাইড্রোলিক হর্ণ/ বোমাবাজি/ বিকট আওয়াজে স্লোগান ইত্যাদি করা
মাটি দূষণ মুক্ত রাখতে করণীয়:
১. প্লাস্টিকের ব্যাগ, পলিথিন পরিহার করতে হবে।
২. বৃক্ষরোপন, পাহাড় ও উচ্চভূমি রক্ষা করতে হবে।
৩. কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৪. ইটের বিকল্পে ব্লক ইট ব্যবহার।
৫. পরিকল্পিত শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
কারাগারের রোজনামচা
কারাগারের রোজনামচা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রচিত একটি গ্রন্থ সংকলন। গ্রন্থটির নামকরণ করেন বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুর ৯৮ তম জন্ম বার্ষিকীতে ২০১৭ সালে গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেবার পর বাঙালি জাতির মহানায়ক গ্রেফতার হন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কারান্তরীণ থাকেন। সেই সময়ে কারাগারে প্রতিদিন তিনি ডায়েরী লেখা শুরু করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঘটনাবহুল জেল- জীবনচিত্র এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবন, জেল-যন্ত্রণা, কয়েদীদের অজানা কথা, অপরাধীদের কথা, কেন তারা এই অপরাধ জগতে পা দিয়েছিলো সেসব বিষয় যেমন সন্নিবেশিত হয়েছে; ঠিক তেমনি তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের দুঃখ-দুর্দশা, গণমাধ্যমের অবস্থা, শাসক গোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন, ৬ দফার আবেগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাস ঘাতকতা, প্রকৃতি প্রেম, পিতৃ-মাতৃ ভক্তি, কারাগারে পাগলদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সংবেদনশীলতার সাথে তুলে ধরেছেন।
রাতারগুল জলাবন
রাতারগুল জলাবন বা রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট (Ratargul Swamp Forest) বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির জলাবন বা সোয়াম্প ফরেস্ট এবং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, যা সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত। এটি পৃথিবীর মাত্র কয়েকটি জলাবনের মধ্যে অন্যতম একটি। রাতারগুল যা বাংলার অ্যামাজন নামেও পরিচিত চিরসবুজ এই বন গুয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত এবং চেঙ্গির খালের সাথে একে সংযুক্ত করেছে। বর্ষাকালে এই বন ২০ থেকে ৩০ ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। বাকি সারা বছর, পানির উচ্চতা ১০ ফুটের মতো থাকে। বর্ষাকালে এই বনে অথৈ জল থাকে চার মাস। এখানে গাছের ডালে ডালে ঘুরে বেড়ায় নানান বন্য প্রাণী আর পাখি। শীতে জল শুকিয়ে যায় বলে বর্ষা এবং বর্ষা পরবর্তী সময় (জুলাই থেকে অক্টোবর) রাতারগুল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। সিলেট শহর থেকে রাতারগুলের দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার। জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় এ বনের অবস্থান। সিলেট বন বিভাগের উত্তর সিলেট রেঞ্জে-২ এর অধীন প্রায় ৩০ হাজার ৩শ' ২৫ একর জায়গা জুড়ে এ জলাভূমি। এর মধ্যে ৫শ' ৪ একর জায়গার মধ্যে বন, বাকি জায়গা জলাশয় আর সামান্য কিছু উঁচু জায়গা। তবে বর্ষাকালে পুরো এলাকাটিই পানিতে ডুবে থাকে। শীতে প্রায় শুকিয়ে যায় রাতারগুল। তখন বনের ভেতরে খনন করা বড় জলাশয়গুলোতে শুধু পানি থাকে। পুরাতন দুটি বড় জলাশয় ছাড়াও ২০১০-১১ সালে রাতারগুল বনের ভেতরে পাখির আবাসস্থল হিসেবে ৩.৬ বর্গ কিলোমিটারের একটি বড় লেক খনন করা হয়। শীতে এ জলাশয়ে বসে নানান পাখির মিলন মেলা। রাতারগুল একটি প্রাকৃতিক বন। এরপরেও বন বিভাগ হিজল, বরুণ, করচ আর মুতা-সহ কিছু জলবান্ধব জাতের গাছ লাগিয়ে দেয় এ বনে। এছাড়াও রাতারগুলের গাছপালার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ কদম, জালিবেত, অর্জনসহ জল সহিষ্ণু প্রায় ২৫ প্রজাতির গাছপালা। সিলেটের শীতলপাটি তৈরির মূল উপাদান মুতার বড় অংশ এই বন থেকেই আসে। বাংলাদেশ বন বিভাগ ১৯৭৩ সালে এ বনের ৫শ' ৪ একর এলাকাকে বন্যপ্রাণীর জন্য অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!