৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালির জাতীয় জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। এ দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। ইতিহাসখ্যাত ৭ মার্চের ভাষণ। ২ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা বাংলায় পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অসহযোগ চলছিল। তৎকালীন পাকিস্তানি জনগণই শুধু নয়, বহির্বিশ্বের অনেকে এক অনন্য উদ্দীপনা নিয়ে তাকিয়ে ছিল, বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে কী বলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য এ ছিল অন্তিম মুহূর্ত। অন্যদিকে স্বাধীনতার চেতনায় প্রদীপ্ত বাঙালি জাতির জন্য এ ভাষণ ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করে জাতীয় মুক্তি বা কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে চূড়ান্ত সংগ্রামের সূচনা।
ভাষণের বিষয়বস্তুঃ ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানের উত্তাল জনসমুদ্রে সভামঞ্চে 'রাজনীতির কবি' (নিউজউইক ম্যাগাজিনের ভাষায়, 'পোয়েট অব পলিটিকস') বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এলেন। বর্ণবৈষম্যবাদবিরোধী, আমেরিকার কালো মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা, বিশ্বনন্দিত মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো তাঁর জনগণকে একটি স্বপ্নের কথা বলতে নয়, নির্দেশের অপেক্ষারত উত্তাল বাঙালি জনসমুদ্রকে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানাতে। মাত্র ১৮ মিনিটের এক ভাষণ। বঙ্গবন্ধু তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ তেজস্বী ভাষণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনীতি ও বাঙালিদের বঞ্চনার ইতিহাসের ব্যাখ্যা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঙালিদের দ্বন্দ্বের স্বরূপ উপস্থাপন, অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি বিশ্লেষণ ও বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা, শাস্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানে তাঁর সর্বাত্মক চেষ্টা, সারা বাংলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ, প্রতিরোধসংগ্রাম শেষাবধি মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত, শত্রুর মোকাবিলায় গেরিলাযুদ্ধের কৌশল অবলম্বন, যেকোনো উসকানির মুখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার পরামর্শদান ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরার পর ঘোষণা করেন: ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ। .............এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।'
ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্যঃ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল একজন দক্ষ কৌশলীর সুনিপুণ বক্তব্য। বিশেষত ভাষণের শেষ পর্যায়ে তিনি “স্বাধীনতার' কথা এমনভাবে উচ্চারণ করেন, যাতে ঘোষণার কিছু বাকিও থাকল না, আবার তাঁর বিরুদ্ধে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার অভিযোগ উত্থাপন করাও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর জন্য সম্ভব ছিল না। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতারই ঘোষণা। তবে সরাসরি তা ঘোষণা না করে তিনি কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাঁর অবস্থান ছিল: মেজরিটি বা সংখ্যাগরিষ্ঠ (বাঙালি) মাইনরিটি বা সংখ্যালঘিষ্ঠ (পশ্চিম পাকিস্তানি) থেকে বিচ্ছিন্ন হবে কেন? বরং মাইনরিটিই "সিসিড' বা বিচ্ছিন্ন হোক। বাস্তবে ২৫ মার্চ ১৯৭১ এমনটিই ঘটে। ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুর এ কৌশল বা অবস্থান বাংলাদেশ সংগ্রামের পক্ষে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে একটি। সম্প্রতি ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জ্যাকব এফ ফিল্ড উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস: দ্য স্পিচেস দ্যাট ইনস্পয়ার্ড হিস্টরি (লন্ডন, ২০১৩) শিরোনামে মানবজাতির ইতিহাসের ২৫০০ বছরের ৪১ জন জাতীয় বীরের ভাষণ নিয়ে একটি বই সংকলন করেছেন। তাতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ভাষণকে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ১৮৬৩ সালের বিখ্যাত গেটিসবার্গ বক্তৃতার সঙ্গে তুলনা করা যায় । লিংকনের সে ভাষণও ছিল সংক্ষিপ্ত। মাত্র তিন মিনিটের। প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও উভয়ই ইতিহাসের মূল্যবান দলিল । লিংকনের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো গণতন্ত্র সম্বন্ধে তাঁর বিখ্যাত উক্তি, 'দিস গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল অ্যান্ড ফর দ্য পিপল উইল নেভার পেরিশ ফ্রম দ্য আর্থ।' বঙ্গবন্ধু বললেন, 'সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।' বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের অন্যান্য শ্রেষ্ঠ ভাষণ থেকে উজ্জ্বল ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এ ভাষণ নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে রাতারাতি সশস্ত্র করে তোলে। একটি ভাষণকে অবলম্বন করে স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ বাঙালি জীবন উৎসর্গ ও কয়েক লাখ মা-বোন সম্ভ্রম বিসর্জন দেন। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালে এ ভাষণ রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করে। বলা যায়, এই একটি ভাষণ একটি জাতিরাষ্ট্র, বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে, যা বিশ্বে নজিরবিহীন। জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেসকো এ ভাষণকে ৩০ অক্টোবর ২০১৭ বিশ্ব-ঐতিহ্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে 'দ্য ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার'-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে।
Related Question
View All"পরিবেশ দূষণ ও এর প্রতিকার"
বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে পরিবেশ দূষণ একটি ব্যাপক আলোচিত ঘটনা যা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। গত কয়েক দশক ধরে প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা মানব জাতিকে সতর্ক ও সচেতন হতে নির্দেশ দিয়ে আসছেন। পরিবেশ দূষণ মানব সমাজে নিদারুন সংকটের সৃষ্টি করেছে এবং মানব জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই পরিবেশ দূষণের ফলে শুধু মানব গোষ্ঠীই নয়, বরং সমস্থ জীবকূলের অস্তিত্ব এই পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। দূষণ পরিবেশের প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর স্বকীয়তা নষ্ট করে দেয়। পরিবেশে বিভিন্ন উপাদানে ক্ষতিকারক বস্তুর অনুপ্রবেশ ঘটে। বিশিষ্ট বস্তুবিজ্ঞানী ওডামের মতে, “বায়ু, পানি, মাটি” ইত্যাদি ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের যে পরিবর্তন মানব সভ্যতাকে অথবা কোন প্রজাতির জীবনকে সাংস্কৃতিক বা প্রাকৃতিক সম্পর্কে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে বা করতে পারে, তাকেই দূষণ বলে। পরিবেশ দূষণের প্রকারভেদগুলো হলোঃ পানি দূষণ, মাটি দূষণ, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ ।
পানি দূষণমুক্ত রাখতে করণীয়:
১. পানিতে আবর্জনা, সার বা বিষাক্ত দ্রব্য না ফেলা।
২. উপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা।
৩. ভূগর্ভস্থ পানির পরিমিত ব্যবহার।
৪. জমিতে সার বা কীটনাশক ব্যবহারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
বায়ু দূষণমুক্ত রাখতে করণীয়:
১. ধুমপানের ধোঁয়া, যানবাহন ও কলকারখানার ধোঁয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
২. ওজোন স্তরে ছিদ্র হয়ে যে সমস্যার সম্ভাবনা রয়েছে তা প্রতিরোধ করা।
৩. গ্রীণ হাউজ গ্যাসের কারণে উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ করা।
৪. আবর্জনাকে ধরণ অনুযায়ী পৃথক করে জমা ও অপসারণ করা। ৫. জনগণকে বৃক্ষ রোপনে উৎসাহী করা।
শব্দ দূষণ রোধে করণীয় :
১. উচ্চস্বরে কথা/চিৎকার করা যাবে না।
২. জোরে গান বাজানো যাবে না।
৩. হাইড্রোলিক হর্ণ/ বোমাবাজি/ বিকট আওয়াজে স্লোগান ইত্যাদি করা
মাটি দূষণ মুক্ত রাখতে করণীয়:
১. প্লাস্টিকের ব্যাগ, পলিথিন পরিহার করতে হবে।
২. বৃক্ষরোপন, পাহাড় ও উচ্চভূমি রক্ষা করতে হবে।
৩. কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৪. ইটের বিকল্পে ব্লক ইট ব্যবহার।
৫. পরিকল্পিত শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
কারাগারের রোজনামচা
কারাগারের রোজনামচা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রচিত একটি গ্রন্থ সংকলন। গ্রন্থটির নামকরণ করেন বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুর ৯৮ তম জন্ম বার্ষিকীতে ২০১৭ সালে গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেবার পর বাঙালি জাতির মহানায়ক গ্রেফতার হন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কারান্তরীণ থাকেন। সেই সময়ে কারাগারে প্রতিদিন তিনি ডায়েরী লেখা শুরু করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঘটনাবহুল জেল- জীবনচিত্র এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবন, জেল-যন্ত্রণা, কয়েদীদের অজানা কথা, অপরাধীদের কথা, কেন তারা এই অপরাধ জগতে পা দিয়েছিলো সেসব বিষয় যেমন সন্নিবেশিত হয়েছে; ঠিক তেমনি তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের দুঃখ-দুর্দশা, গণমাধ্যমের অবস্থা, শাসক গোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন, ৬ দফার আবেগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাস ঘাতকতা, প্রকৃতি প্রেম, পিতৃ-মাতৃ ভক্তি, কারাগারে পাগলদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সংবেদনশীলতার সাথে তুলে ধরেছেন।
Rice is our main food. There is plenty of rice produced in our country. We all should work hard to reduce poverty. Excessive crop production is not possible without hard work. At present, we grow advanced varities of rice.
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!