কোনো জ্ঞাত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো অজানা বিষয় সম্বন্ধে জ্ঞান লাভের মানসিক প্রক্রিয়াকে 'অনুমান' বলে।
অনুমান এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া যাকে যৌক্তিক বিচারাধীনে আনয়নের জন্য ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ভাষায় প্রকাশিত একটি অনুমান বা যুক্তি কয়েকটি যুক্তিবাক্য দ্বারা গঠিত হয়। অনুমানের এ প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করলে আমরা এর মধ্যে তিনটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পাই; যথা- এক বা একাধিক প্রদত্তবাক্য বা আশ্রয়বাক্য একটি নতুন বাক্য সিদ্ধান্ত ও তাদের মধ্যে অনিবার্য সম্পর্ক।
অবরোহ ও আরোহ অনুমান হলো অনুমানের মৌলিক দিক। এ দুটি অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই অবরোহ যুক্তিবিদ্যা ও আরোহ যুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠিত। সার্বিক যুক্তিবাক্য থেকে বিশেষ যুক্তিবাক্যে আসার প্রক্রিয়াকে অবরোহ অনুমান বলে। অন্যদিকে বিশেষ যুক্তিবাক্য থেকে সার্বিক যুক্তিবাক্যে আসার প্রক্রিয়াকে 'আরোহ অনুমান' বলে।
অবরোহ অনুমানে সিদ্ধান্ত কোনো সময়ই আশ্রয়বাক্য থেকে বেশি ব্যাপক হয় না, কিন্তু আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্ত সর্বদা আশ্রয়বাক্য থেকে ব্যাপক হয়। অবরোহ অনুমান হয় বৈধ, না হয় অবৈধ। কিন্তু আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্ত হয় সম্ভাব্য। অবরোহ অনুমানে যুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তির বৈধতার প্রসঙ্গ বিবেচনা করা হয়, কিন্তু আরোহ অনুমানের ক্ষেত্রে আশ্রয়বাক্যে বস্তুগত সত্যতা বিচার বিবেচনা করা হয়। অবরোহ অনুমানের গতি নিম্নমুখী, অন্যদিকে আরোহ অনুমানের গতি ঊর্ধ্বমুখী। অবরোহ অনুমানে ব্যবহৃত যুক্তিগুলো সত্যি বলে ধরে নেওয়া হয়। অন্যদিকে আরোহ অনুমানে ব্যবহৃত যুক্তিগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত হয়।
অবরোহ অনুমানের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আশ্রয়বাক্য এক বা একাধিক হতে পারে, কিন্তু আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্ত কেবলই হয় দুই বা ততোধিক আশ্রয়বাক্যের ভিত্তিতে।
অনুমানকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- অবরোহ ও আরোহ অনুমান। যে অনুমানে সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্য থেকে কোনোক্রমেই বেশি ব্যাপক হতে পারে না তাকে অবরোহ অনুমান বলে। অবরোহ অনুমানে আমরা অধিকতর ব্যাপক ধারণা থেকে কম ধারণা বা বিশেষ ধারণার দিকে অগ্রসর হই। অর্থাৎ অনুমানের গতি এখানে নিম্নমুখী। যেমন-
সব ফুল হয় সুন্দর।
সব জবা হয় ফুল।
সব জবা হয় সুন্দর।
এছাড়াও অবরোহ অনুমানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
১. অমাধ্যম অনুমান: যে অবরোহ অনুমানে একটি মাত্র আশ্রয়বাক্য থেকে সরাসরি সিদ্ধান্তটি অনুমিত হয় তাকে 'অমাধ্যম অনুমান' বলে।
২. মাধ্যম অনুমান: যে অবরোহ অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি অনুমিত হয় তাকে 'মাধ্যম অনুমান' বলে।
অন্যদিকে যে অনুমানে সিদ্ধান্তটি সবসময়ই আশ্রয়বাক্যগুলো থেকে বেশি ব্যাপক তাকে আরোহ অনুমান বলে। আরও অনুমানে আমরা বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা বস্তুর ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি সার্বিক বাক্যকে সিদ্ধান্ত রূপে অনুমান করি। সুতরাং সিদ্ধান্তটি সবসময় আশ্রয়বাক্য থেকে বেশি ব্যাপক। অনুমানের গতি এখানে ঊর্ধ্বমুখী। যেমন-
কামাল হয় মরণশীল।
শ্যামল হয় মরণশীল।
সুমনা হয় মরণশীল।
সকল মানুষ হয় মরণশীল।
আবার আরোহ অনুমানকেও' দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ১. প্রকৃত আরোহ ও ২. অপ্রকৃত আরোহ।
Related Question
View Allঅমাধ্যম অনুমান হলো যে অবরোহ অনুমানে একটিমাত্র আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি সরাসরি অনুমিত হয় বা নিঃসৃত হয়।
মাধ্যম অনুমান হলো পরোক্ষ অনুমান। যে অবরোহ অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি নিঃসৃত হয় বা অনুমিত হয় তাকে 'মাধ্যম অনুমান' বলে। মাধ্যম অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থাকা বাধ্যতামূলক। কারণ মাধ্যম অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, একটি আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না। যেমন-
A – সকল মানুষ হয় মরণশীল।
A – রহিম হয় একজন মানুষ।
A - রহিম হয় মরণশীল।
উদ্দীপকে মিজান সাহেবের বক্তব্য আরোহ অনুমানমূলক। আরোহ অনুমান অনুযায়ী অনুমান প্রক্রিয়ায় কয়েকটি বিশেষ দৃষ্টান্তের ওপর নির্ভর করে একটি সার্বিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। যেমন-
মতিন হয় দানশীল ব্যক্তি এবং ধনী।
মজিদ হয় দানশীল ব্যক্তি এবং ধনী।
মাখন হয় দানশীল ব্যক্তি এবং ধনী।
সকল ধনী ব্যক্তি দানশীল।
মিজান সাহেব বাস্তবে কিছু মানুষকে দেখেছে যে তারা ধনী এবং দানশীল। সুতরাং তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে সকল ধনী ব্যক্তি হয় দানশীল। এখানে সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্যগুলোর চেয়ে বেশি ব্যাপক হয়েছে। আরোহ অনুমানে সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্য থেকে কিছু লোক এর দানশীল ও ধনীর দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করা যথেষ্ট নয়। এ কারণে আরোহ অনুমান এর সিদ্ধান্ত সব সময় সম্ভাব্য হয়।
সুতরাং উদ্দীপকে মিজান সাহেবের বক্তব্যটি একটি আরোহ অনুমান। যার সিদ্ধান্ত সবসময় সম্ভাব্য হয়। কারণ আরোহ অনুমানে সিদ্ধান্ত আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত বা অনুমিত হয় না, সিদ্ধান্তে আশ্রয়বাক্য থেকে নতুন তথ্য প্রকাশ করে।
উদ্দীপকে যে যুক্তিটি দেওয়া আছে তা হলো-
সকল জ্ঞানী হয় ধনী।
সকল কবি হয় ধনী।
সকল কবি হয় জ্ঞানী।
এই যুক্তিটি একটি অবরোহমূলক যুক্তি। এই দৃষ্টান্তে আশ্রয়বাক্য রয়েছে দুটি। আর আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়েছে। তাই এটি অবরোহ অনুমান। যে অনুমানে এক বা একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে সিদ্ধান্ত অনুমিত হয় তাকে 'অবরোহ অনুমান' বলে। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্যের চেয়ে কম ব্যাপক বা সমান ব্যাপক হতে হবে। উপরোক্ত অনুমানে সমান ব্যাপক সিদ্ধান্ত হয়েছে। উদ্দীপকের উক্ত যুক্তিটি বৈধ। কারণ আশ্রয়বাক্য হতে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়েছে। তবে যুক্তির আশ্রয় বাক্যগুলোর সত্যতা থেকে সিদ্ধান্তের সত্যতা যদি যাচাই করতে যাই তবে তা মিথ্যা। কারণ 'সকল জ্ঞানী হয় ধনী' আশ্রয়বাক্যটি বস্তুগত মিথ্যা এবং 'সকল কবি হয় ধনী' আশ্রয়বাক্যটি বস্তুগতভাবে মিথ্যা। সকল জ্ঞানী ধনী • নাও হতে পারে, আবার, সকল কবি ধনী নয়। তাই উভয় আশ্রয়বাক্য বস্তুগতভাবে মিথ্যা। সুতরাং সিদ্ধান্তে তথ্য 'সকল কবি হয় জ্ঞানী' বস্তুগতভাবে মিথ্যা। আশ্রয়বাক্য বস্তুগত মিথ্যা হলে সিদ্ধান্ত বস্তুগতভাবে মিথ্যা।
উদ্দীপকের যুক্তিটির আশ্রয়বাক্য, সিদ্ধান্ত বস্তুগতভাবে সত্য মিথ্যার উপর যুক্তির বৈধতা-অবৈধতা নির্ভর করে না। তাই এখানে আশ্রয় বাক্য ও সিদ্ধান্ত বস্তুগতভাবে মিথ্যা হলেও যুক্তিটি বৈধ। কারণ আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হলে যুক্তিটি বৈধ হয়। আর উক্ত যুক্তির আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়েছে। সুতরাং, যুক্তিটি বৈধ।
যে অবরোহ অনুমানে একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্ত নিঃসৃত হয় সেটিই হলো 'মাধ্যম অনুমান'।
যে অনুমান প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তটি এক বা একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় এবং যার সিদ্ধান্তটি কখনোই আশ্রয়বাক্যের চেয়ে ব্যাপক হতে পারে না, তবে অনেক ক্ষেত্রে আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্ত সমব্যাপক হয় সেটিই হলো 'অবরোহ অনুমান'। যেমন-
সকল মানুষ হয় মরণশীল।
রহিম হয় একজন মানুষ।
রহিম হয় মরণশীল।
উপরের দৃষ্টান্তে সিদ্ধান্তটি দুটি আশ্রয়বাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়েছে এবং সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্যের চেয়ে কম ব্যাপক।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!