আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীতে পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের আগমন ঘটে।
বাঙালিসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর (নূনিয়া, মাহাতো, মুন্ডা, রবিদাস ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) সাথে মেলামেশার ফলে সাঁওতালদের পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যে তেমন কোনো ভিন্নতা দেখা যায় না। সাঁওতাল পুরুষরা ধুতি, লুঙ্গি ও গামছা পরিধান করেন। বর্তমানে অনেকেই, বিশেষত শিক্ষিত সাঁওতাল ছেলেরা প্যান্ট-শার্ট পরেন। অতীতে এ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা 'ফতা' নামক দু'খণ্ড মোটা কাপড় পরিধান করতেন। এর একটি খণ্ড নিম্নাঙ্গে এবং অপরটি ঊর্ধ্বাঙ্গে ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে দু'একজন বয়স্ক নারী ছাড়া এ পোশাক ব্যবহার করতে তেমন একটা দেখা যায় না। বরং বাঙালি সমাজের সংস্পর্শে এসে সাঁওতাল নারীরা এখন সালোয়ার, কামিজ ও শাড়িই বেশি পরিধান করেন।
উদ্দীপক দ্বারা কোচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কোচ বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসবাসরত উপজাতির অন্যতম। এরা 'রাজবংশী' নামেও পরিচিত। কোচ ভাষা তিবেতো- বর্মন ভাষা পরিবারের বোড়ো শাখার অন্তর্ভুক্ত এবং এর মধ্যে অসমীয়া, বাংলা, গারো প্রভৃতি ভাষার অনেক শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এ ভাষার কোনো লিখিত বর্ণমালা নেই। ফলে বিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোচরা বাংলা ভাষা ব্যবহার করেন। কেবল বয়স্ক কোচরা নিজেদের মধ্যে কথোপকথনের সময় 'কোচ ভাষা' ব্যবহার করেন। কোচরা সনাতন হিন্দু ধর্মের পূজার পাশাপাশি তাদের আদি ধর্মের কিছু কিছু দেব-দেবীর পূজাও উদযাপন করেন। যেমন- মনসা দেবীকে পারিবারিক দেবীরূপে মানার সাথে সাথে কোচরা সাপের ভয়ে এ দেবীর পূজা করেন। আবার পরিবারের কেউ যদি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, তাহলে তারা রোগীর আরোগ্য কামনায় গৃহপ্রাঙ্গণে 'পিশাচ পূজা'র আয়োজন করেন। এছাড়া অনাবৃষ্টিকালে বৃষ্টি কামনায় কোচরা 'লঙ্কাচারিয়া পূজা করেন।
উদ্দীপকের অপু তার অধ্যাপক বাবার কাছ থেকে জানতে পারে যে, বাংলাদেশে বসবাসরত একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। ফলে তাদের শিশুরা বাংলা ভাষাতেই লেখাপড়া করে। এছাড়াও তাদের ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম হলো- 'মনসা পূজা', 'পিশাচ পূজা', 'লঙ্কাচারিয়া পূজা' ইত্যাদি। অপু তার বাবার কাছ থেকে যে বিষয়গুলো জানতে পেরেছে, তা পূর্বে বর্ণিত কোচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগত ও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, উদ্দীপক দ্বারা কোচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
উদ্দীপক দ্বারা কোচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ নৃগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামো একইসাথে ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। বাংলাদেশে বসবাসকারী কোচ সমাজ মোট সাতটি দলে বিভক্ত। দলগুলো হচ্ছে- ওয়ানাং, হরিগাইয়া, সাতপাড়ি, দশগাইয়া, চাপ্পা, তিনথেকিয়া ও শংকর। দলগুলোকে কোচরা 'ভাগ' নামে অভিহিত করে। এ দল বা ভাগের প্রতিটিরই একাধিক গোেত্র রয়েছে। গোত্রগুলোকে কোচরা 'নিকিনি' নামে আখ্যায়িত করে। এসব গোত্র বা নিকিনি'র মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- কামা, রান্জ, পিড়া, মাজি, হানসুর, দাহেং, রাংসা, কাশ্যপ, দাম্বুক ইত্যাদি। কোচদের পরিবার একইসাথে মাতৃসূত্রীয় ও পিতৃতান্ত্রিক। এর মানে হচ্ছে, পরিবারের সন্তান-সন্ততিরা মায়ের পদবি গ্রহণ করে এবং সে অনুযায়ী পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু পরিবারে পিতাই প্রধান ব্যক্তি এবং সব সিদ্ধান্ত তিনিই গ্রহণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর পুত্র সন্তান সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে এবং এক্ষেত্রে তারা হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুসরণ করে। কন্যা সন্তানরা পিতার সম্পত্তির কোনো ভাগ না পেলেও বিবাহের পর স্বামীর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং তার সম্পত্তির একটি অংশ লাভ করে।
কোচদের মধ্যে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে 'সামাজিক পরিষদ' নামক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিয়ে তারা তা মীমাংসা করে নেয়। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে বলা হয় 'গাঁওবুড়া'। বিচার-সালিশ কাজে গাঁওবুড়াকে সাহায্য করার জন্য সমাজের প্রবীণ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি উপদেষ্টা মণ্ডলিও থাকে। সামাজিক পরিষদের সিদ্ধান্তই কোচ সমাজের কাছে চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়। এ নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাধারণত একক বিবাহরীতির প্রচলন থাকলেও সন্তান লাভের আশায় অনেকে একাধিক বিবাহ করেন। কোচ সমাজে বিধবা বিবাহের ব্যাপকতা না থাকলেও অল্পবয়সী বিধবারা পুনর্বিবাহ করতে পারে এবং এক্ষেত্রে সামাজিক স্বীকৃতি বিদ্যমান। এ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে একাত্মবোধ অত্যন্ত গভীর, যে জন্য কোচ সমাজে কোনো অনাথ কিংবা এতিম ছেলেমেয়ে নেই। কারণ কোনো শিশু এতিম বা অনাথ হলে তাকে লালন-পালন করার দায়িত্ব গোত্রের যে কোনো পরিবারের এবং এক্ষেত্রে তারা স্বত:স্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, গোত্রপ্রীতি ও নারী- পুরুষকে সমভাবে মূল্যায়ন করার মধ্য দিয়ে কোচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা একটি অনন্য সাধারণ সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলেছেন।
Related Question
View All১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক সমাজবিজ্ঞান চর্চার সূত্রপাত হয়।
চল্লিশের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী লেখক রাধাকমল মুখার্জি, ডি এন মজুমদার, নির্মল কুমার বসু ও বিনয় কুমার সরকার বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সে সময় কয়েকজন মার্কসবাদী বাঙালি সমাজবিজ্ঞানীর লেখা পাওয়া যায়। এসব সমাজচিন্তাবিদগণ বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক অনেক আলোচনা সমালোচনা করেন এবং সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেন। যার ফলে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান চর্চার পটভূমি নির্মিত হয়।
উদ্দীপকের বর্ণনা অনুসারে 'ক' দ্বারা সমাজবিজ্ঞান বিষয়কে নির্দেশ করা হচ্ছে।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক সমাজবিজ্ঞান চর্চার সূত্রপাত হয়। ১৯৪৮ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ দখলকারী ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি অর্জনের আগে চল্লিশের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী লেখক রাধাকমল মুখার্জি, ডিএন মজুমদার, নির্মল কুমার বসু ও বিনয় কুমার সরকার বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সে সময় কয়েকজন মার্ক্সবাদী বাঙালি সমাজবিজ্ঞানীদের লেখা পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- এমএন রায়, মোজাফফর আহমদ, সুশোভন সরকার, গোপাল হালদার ও বিনয় ঘোষ। এসব সমাজচিন্তাবিদ বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক অনেক আলোচনা সমালোচনা করেছেন এবং সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেছেন। এসব সমাজচিন্তাবিদদের মাধ্যমে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান চর্চার পটভূমি নির্মিত হয়েছে।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, সমাজবিজ্ঞান বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা করে। এ বর্ণনার আলোকে বলা যায়, এখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে।
সাধারণ অর্থে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলতে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে বোঝায়। নৃবিজ্ঞানী ই. বি. টেইলর সাধারণ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র গোষ্ঠীকেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে জেরি ও জেরির ভাষায়, 'ক্ষুদ্র গোষ্ঠী হলো মানুষের এমন এক গোষ্ঠী যারা স্বতন্ত্র ইতিহাসের সম্মিলিত অনুভূতি থেকে উৎসারিত একটি পরিচয় বহন করে'। প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরই নিজস্ব সংস্কৃতি, প্রথা, আদর্শ, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য থাকে। নৃবিজ্ঞানী ন্যারোল-এর মতে, অংশীদারিত্বমূলক সামাজিক মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক বিভাজন সম্পর্কে দলীয় সচেতনতা হলো ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর সদস্যদের মূল উপাদান। অন্যদিকে, নৃবিজ্ঞানী কোহেন ও ইয়ামস ক্ষুদ্র সম্প্রদায় তথা উপজাতি বলতে এমন এক জনগোষ্ঠীকে বুঝিয়েছেন, যারা তাদের জীবিকার জন্য খাদ্যসংগ্রহ, উদ্যান, কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। আবার উইলিয়াম পি. স্কট-এর মতে, যে গোষ্ঠীর সাধারণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে এবং যারা নিজস্ব পরিচিতিসহ বৃহৎ কোনো সমাজের উপগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করে তারাই হলো ক্ষুদ্র গোষ্ঠী। এসব সংজ্ঞার আলোকে বলা যায়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নিজস্ব সংস্কৃতির অধিকারী, তারা আধুনিক পেশাসহ এক ধরনের নির্দিষ্ট জীবিকা পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং তারা বাস করে একটি নির্দিষ্ট এলাকায়। সর্বোপরি তাদের জীবন একই ধরনের সামাজিক আচার-আচরণ, প্রথা, বিশ্বাস, বিচারব্যবস্থা, অনুসরণীয় রীতিনীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়।
ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামো বলতে বোঝায়, যে ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গ্রামে ক্ষমতার বিকাশ ও প্রয়োগ ঘটে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বলেন, “শ্রেণিসমূহের অবস্থান ও পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকার প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ সমাজে সামাজিক শক্তিসমূহ যে কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়, তাকে গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামো বলা যেতে পারে।” উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভূমি মালিক ও বর্গা চাষিদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে উভয় শ্রেণিই গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোর অংশ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!