বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী লেখিকা ও মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত। নারীদের কুসংস্কারমুক্ত ও শিক্ষিত করতে এবং সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
১৮৯৭ সালে ১৬ বছর বয়সে উর্দুভাষী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বিপত্নীক সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তিনি রোকেয়া খাতুন এর সাথে স্বামীর নাম সাখাওয়াত হোসেন যোগ করেন এবং আর. এস হোসেন নামে লিখতেন।
তিনি মুসলিম নারী মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন তাই তাকে 'মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত' বলা হয়।
১৯০২ সালে তাঁর প্রথম গল্প 'পিপাসা' প্রকাশিত হয় 'নবপ্রভা' পত্রিকায়।
তার নামানুসারে 'রোকেয়া হল' নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হল আছে।
৩ মে, ১৯০৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯১০ সালে কলকাতায় গমন করেন এবং নারী মুক্তির লক্ষ্যে তিনি ১৬ মার্চ, ১৯১১ সালে 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' ও ১৯১৬ সালে 'আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম' (মুসলিম মহিলা সমিতি) প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি ৯ ডিসেম্বর, ১৯৩২ সালে মারা যান।
বেগম রোকেয়ার উপন্যাস দুটি 'পদ্মরাগ' (১৯২৪), 'Sultana's Dream'- এটি ইংরেজিতে লেখা।
সুলতানার স্বপ্নঃ
বাংলা সাহিত্যে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচিত 'সুলতানার স্বপ্ন' গ্রন্থটি ইংরেজি 'Sultana's Dream' শিরোনামে রচিত। এখানে মূল চরিত্র Sultana একজন অবরুদ্ধা নারী। গৃহের চতুষ্কোণ হচ্ছে তার বিচরণ ও কর্মক্ষেত্র, বাইরের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার অধিকার তার ছিল না। তিনি স্বপ্ন দেখেন, তিনি তার বোন সারার মতো অপরিচিতা এক নারীর সাথে অন্তঃপুর ত্যাগ করে উন্মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে ফুল-বাগান দেখতে বের হয়েছেন যাকে স্বপ্নরাজ্য 'Lady Land' বলা হয়েছে। এ গ্রয়ে রোকেয়া একটি নারীবাদী স্বপ্নরাজ্য বা ইউটোপিয়ার বর্তনা দিয়েছেন। এ কল্পরাজ্যে সমাজের সকল কর্মকাণ্ডে নারীর হবেন প্রধান চালিকাশক্তি আর পুরুষরা হবেন গৃহবনী এখানে থাকবে না কোন অপরাধ, প্রচলিত থাকার 'ভালোবাসা ও সত্যের' ধর্ম।
উত্তরঃ
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষত বাঙালি মুসলিম সমাজে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীশিক্ষার প্রসারে এক অবিস্মরণীয় নাম। তার বিখ্যাত হওয়ার প্রধান কারণসমূহ নিম্নরূপ:
নারীশিক্ষার প্রসার: তিনি মুসলিম মেয়েদের জন্য প্রথম বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে এবং ১৯১১ সালে কলকাতায় 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' প্রতিষ্ঠা তার দূরদর্শী চিন্তাভাবনার ফসল ছিল।
সাহসী সাহিত্যকর্ম: তার লেখনীর মাধ্যমে তিনি সমাজের গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অবরোধপ্রথা এবং নারীর প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। 'সুলতানার স্বপ্ন', 'অবরোধবাসিনী', 'মতিচূর' ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম, যা নারীর মুক্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো সওয়াল করে।
সমাজ সংস্কার: তিনি কেবল লেখনীতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং বাস্তবেও নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান এবং সমাজে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য কাজ করেছেন। তিনি 'আঞ্জুমান-এ-খাওয়াতিন-এ-ইসলাম' (মুসলিম মহিলা সমিতি) নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
তার অসামান্য অবদান বাঙালি নারী সমাজে নবজাগরণ এনেছিল এবং আধুনিক নারী আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যার জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০-৯ ডিসেম্বর ১৯৩২) হলেন একজন বাঙালি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং প্রথম বাঙালি নারীবাদী লেখিকা। রোকেয়া মাত্র ৫/৬ জন ছাত্রী নিয়ে ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল" নামে মেয়েদের একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তী পর্যায়ে হাই স্কুলে পরিণত হয়। ১৯১৬ সালে তিনি মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। মতিচূর (১৯০৪) প্রবন্ধগ্রন্থে রোকেয়া নারী-পুরুষের সমকক্ষতার যুক্তি দিয়ে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় আহ্বান জানিয়েছেন এবং শিক্ষার অভাবকে নারীপশ্চাৎপদতার কারণ বলেছেন। তিনি বলেছেন “ সংসার জীবন দুই চাকার বিশিষ্ট গাড়ির মতো, যার একটি হলো স্বামী অন্যটি স্ত্রী একটি চাকা নষ্ট হলে গাড়ি চলতে পারে না" তার সুলতানার স্বপ্ন (১৯০৫) নারীবাদী ইউরোপিয়ান সাহিত্যের ক্লাসিক নিদর্শন বলে বিবেচিত।