উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমি বংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদী।
আল-মুইজকে তার কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য ফাতেমি বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক বলা হয়।
ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদী ফাতেমি বংশের প্রথম হলেও যুক্তিসংগতভাবে আল-মুইজ ছিলেন এ বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। মুইজ মিসর জয় করেন এবং উত্তর আফ্রিকায় শাসন কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। জ্ঞান-গরিমা, দৃঢ়তা, উদারতা, দূরদর্শিতা, নির্ভীকতা প্রভৃতি গুণে আল-মুইজ ছিলেন ফাতেমি বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ খলিফা। তার রাজত্বকালে ফাতেমি সাম্রাজ্য চরম বিস্তৃতি লাভ করে এবং গৌরবের চরম শিখরে আরোহণ করে। তাই আল-মুইজকে ফাতেমি বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক বলা হয়।
শাহিদের বক্তব্যে মিসরে ফাতেমিদের পতনের পেছনে পরবর্তী শাসকদের অযোগ্যতার দিকটিই ফুটে উঠেছে।
ফাতেমি খলিফা আল-হাকিম ছিলেন চরম খেয়ালি ও নির্জনতা বিলাসী। পরবর্তীতে আল-হাকিমের চেয়েও বেশি খেয়ালি, বেশি বিলাসী এবং অতিরিক্ত দুর্বল শাসকগণ মিসরে ফাতেমি খিলাফতে অধিষ্ঠিত হন। আল-জহির, আল মুস্তানসির, আল মুসতালী, আল আমির, আল-হাফিজ, আল-জাফির, আল-ফইজ ও সবার শেষে আল-আজীদ ফাতেমি সিংহাসনে আরোহণ করেন। তারা নামেমাত্র শাসক ছিলেন। দেশের প্রকৃত শাসনক্ষমতা মন্ত্রীদের ওপর ন্যস্ত ছিল।
ফাতেমি বংশের পরবর্তী খলিফাগণ ছিলেন ব্যক্তিত্বহীন, অদক্ষ ও অযোগ্য। বদর আল-জামালী এবং আল-আফজাল ছাড়া অধিকাংশ মন্ত্রী ছিলেন কুচক্রী, স্বার্থপর ও ষড়যন্ত্রকারী। তারা খলিফাদের নামে ভয়ানক দুঃশাসন চালিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেয় আর খলিফাগণ জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকেন। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন অঞ্চল ফাতেমিদের হাতছাড়া হতে থাকে। তাদের কর্তৃত্ব কেবল আফ্রিকা ও মিসরে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। এ অঞ্চলেও তুর্কি, বার্বার ও নিগ্রোদের দ্বন্দ্ব খিলাফতে ভয়ানক অরাজকতা তৈরি করে। কিন্তু অযোগ্য শাসকগণ তা বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। এভাবে শেষ পর্যায়ের ফাতেমি শাসকদের অযোগ্যতার কারণেই তাদের পতন ঘটে। সুতরাং, শাহিদের মতটি সঠিক।
আল-হাকিম ফাতেমি বংশের একজন অদ্ভুত শাসক- আমরের এ বক্তব্যের সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত।
আল-হাকিম সম্বন্দ্বে মানসিক ভারসাম্যহীনতার অভিযোগ রয়েছে। তিনি অনেক খ্যাতনামা লোককে হত্যা করেন। মিসরে খ্রিষ্টানদের গির্জাসমূহ ধ্বংস করে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আদেশ দেন অথবা বড় ক্রুশচিহ্ন ধারণ করে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে বাঁচার সুযোগ দেন। ইহুদিদের ক্ষেত্রেও তিনি কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। আবার রাষ্ট্রীয় শীর্ষপদে খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের নিয়োগ দেন। ১০০১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আদেশ জারি করেন, দিনে কোনো কাজ করা হবে না, দোকানপাট বন্ধ থাকবে এবং মানুষ আরাম করবে। রাতে সব কাজ-কর্ম করতে হবে এবং বেচাকেনা চলবে। তিনি একটি নতুন ধর্মমত প্রবর্তন করেন, যার অনুসারীদের বলা হতো দুজ বা দুজি। অনুসারীগণ তাকে মনে করত অবতার।
এ সকল পরস্পরবিরোধী এবং অযৌক্তিক শাসনরীতির জন্য আল-হাকিম সম্পর্কে আমরের বক্তব্য সঠিক বলে প্রমাণিত।
Related Question
View Allজওহর ছিলেন ফাতেমি খলিফা আল-মুইজের সেনাপতি এবং আল কাহিরা (কায়রো) নগরীর গোড়াপত্তনকারী।
ফাতেমি খলিফা আল-মুইজের শাসনামলে মিসরে প্রতিষ্ঠিত রাজধানী 'আল-কাহিরা' নামে পরিচিত।
আল-কাহিরা অর্থ 'বিজয়ী শহর'। চতুর্থ ফাতেমি খলিফা আল-মুইজের সেনাপতি জওহর ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মিসর জয় করেন এবং খলিফার নির্দেশে কায়রোকে রাজধানীর উপযোগী করে নির্মাণ করেন। সরকারিভাবে কায়রোর নামকরণ করা হয় 'আল-কাহিরা' বা বিজয়ী শহর। ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে 'আল-কাহিরা' বা কায়রো রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।
উদ্দীপকে বর্ণিত মুর্তজার ক্ষমতা গ্রহণের সাথে ফাতেমি খলিফা আল-হাকিমের ক্ষমতায় আরোহণের সাদৃশ্য রয়েছে।
ফাতেমি খলিফা আল-আজিজের মৃত্যুর পর পুত্র আল-হাকিম মাত্র ১১ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ (৯৯৬ খ্রি.) করেন। তিনি নাবালক হওয়ায় পিতার আমলের প্রাদেশিক শাসনকর্তা বারজোয়ান তার প্রতিনিধি হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। কিন্তু বারজোয়ান ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে আল-হাকিম গুপ্তচরের সাহায্যে তাকে হত্যা করে নিজে সকল ক্ষমতা গ্রহণ করেন। একই পরিস্থিতি উদ্দীপকে বর্ণিত মুর্তজার ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়।
পিতার মৃত্যুর পর মুর্তজা গৃহশিক্ষক আসিফের তত্ত্বাবধানে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু আসিফ লোভী ও ক্ষমতালিঙ্গু হয়ে উঠলে মুর্তজা তাকে গুপ্তচরের সহায়তায় হত্যা করে নিজে ক্ষমতা দখল করেন। খলিফা আল-হাকিমও তত্ত্বাবধায়ক বারজোয়ানের অতিরিক্ত লোভ এবং অপতৎপরতাকে বরদাশত করেননি। বারজোয়ান সেনাধ্যক্ষ ইবনে আমরকে পরাজিত ও হত্যা করে নিজেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করলে আল-হাকিম তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। গুপ্তঘাতক নিযুক্ত করে তিনি তাকে হত্যা করেন এবং নিজে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। সুতরাং উদ্দীপকের মুর্তজা এবং খলিফা আল-হাকিমের ক্ষমতা দখলের ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা।
উদ্দীপকের মুর্তজার মতোই খলিফা আল-হাকিমও রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে উদ্ভট, বিচিত্র ও খামখেয়ালিপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ইতিহাসে এমন অনেক শাসক রয়েছেন, যারা রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে কোনো যুক্তির বাধ-বিচার করেননি। নিজেদের ভালো লাগা এবং খামখেয়ালিপনায় তারা রাজ্য শাসন করেছেন। এমনই দুজন শাসক উদ্দীপকের মুর্তজা এবং ফাতেমি খলিফা আল-হাকিম।
আল-হাকিম জটিল চরিত্রের অধিকারী এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক অভিযোগ করেন। তিনি জিম্মিদের প্রতি কঠোর নীতি অবলম্বন করেন এবং বহু খ্যাতনামা লোককে হত্যা করেন। তিনি খ্রিষ্টানদের গির্জা ধ্বংস করে তাদেরকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার নির্দেশ দেন। ১০০১ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আদেশ জারি করেন যে, দিনে কোনো কাজকর্ম করা যাবে না; দোকান বন্ধ থাকবে এবং মানুষ আরাম করবে। অন্যদিকে রাতে অফিস-আদালতের কাজকর্ম চলবে এবং বেচাকেনা অব্যাহত থাকবে। তিনি একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। রাত্রিবেলা ঘুরে ঘুরে প্রজাদের সুখ-দুঃখ অবলোকন করতেন। তিনি প্রায়ই মুকাত্তাম (কায়রোর নিকটে) পাহাড়ের ওপর একটি নির্জন গৃহে যেতেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি অনবদ্য অবদান রাখেন। তিনি আব্বাসীয়দের অনুকরণে বায়তুল হিকমার আদলে মিসরে দারুল হিকমা নামক বিজ্ঞানাগার নির্মাণ করেন (১০০৫ খ্রি.)। উদ্দীপকের মুর্তজাও এ ধরনের উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য শাসন করেছেন। তিনিও আল-হাকিমের মতো রাতে ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক কাজ-কর্ম করার এবং দিনে বিশ্রাম নেওয়ার নির্দেশ জারি করেন। তিনি নির্জনতা পছন্দ করতেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগী ছিলেন।
উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, মূর্তজার মতোই খলিফা আল-হাকিম উদ্ভট ও বিচিত্র সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য শাসন করেছেন।
ফাতেমি খলিফা আল-হাকিম ১০০৫ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোতে একটি বিখ্যাত বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করেন। এটি দারুল হিকমা নামে পরিচিত। বাগদাদের বায়তুল হিকমার অনুকরণে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মিশরের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলী-ইবন-ইউসুফ এ জ্ঞানগৃহ নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এখানে শিয়া ধর্ম বিষয়ে আলোচনা ও গবেষণা হতো। এখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বহু অমূল্য গ্রন্থরাজি সংগৃহীত ছিল। দেশ-বিদেশের বহু প্রখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি এখানে হাজির হতেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্রখ্যাত দার্শনিক ও পদার্থবিজ্ঞানী ইবনে হায়সাম।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!