কিয়াসের বিধানের ওপর আমল করা ওয়াজিব।
ইসলামি শরিয়তের পূর্ণাঙ্গতার জন্য কিয়াসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
মানবজীবন ও সমাজ সতত পরিবর্তনশীল। পরিবর্তন ও বিবর্তনের ধারায় জগতে নতুন নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটে। ফলে নতুন নতুন জিজ্ঞাসা, সমস্যা ও জটিলতার সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য কুরআন ও হাদিসে বিজ্ঞানসম্মত যে পদ্ধতির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাই কিয়াস। এ পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমেই শরিয়ত পরিপূর্ণ হয়। তাই কিয়াসের প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক।
ইমাম সাহেব আফতাবের কিয়াসকে বৈধ নয় বলে মন্তব্য করার কারণ হলো তার কিয়াসের আছল নির্দিষ্ট না হওয়া। কিয়াস সম্পাদনের জন্য ইমামগণ কতগুলো শর্তারোপ করেছেন। এ শর্তগুলো পূরণ না হলে কিয়াস গ্রহণযোগ্য হবে না। এ শর্তগুলোর একটি হলো আছল নির্দিষ্ট না হওয়া। ইমাম সাহেবের বক্তব্যে এ বিষয়টির ইঙ্গিত সুস্পষ্ট।
আছল হলো মূলবিধান। অর্থাৎ যার ওপর ভিত্তি করে কিয়াস করা হবে। এ বিষয়টি কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা জাতির জন্য নির্দিষ্ট হতে পারবে না। যেমন- শরিয়তের কোনো ঘটনা প্রমাণের জন্য ন্যূনতম দুজন পুরুষের সাক্ষ্য প্রয়োজন। কিন্তু একটি বিশেষ 'কারণে রাসুল (স) হযরত খোযায়মা (রা)-এর একক সাক্ষ্যকেই দু'জনের স্থলাভিষিক্ত করে দিয়েছেন। প্রথমত এ বিষয়টির ওপর কিয়াস করা যাবে না। কেননা এটি হযরত খোযায়মা (রা)-এর জন্য নির্দিষ্ট। কিন্তু আফতাবের কিয়াসে এ বিষয়টি লক্ষণীয়। আফতাব মাহতাবের কাছে দু'লক্ষ টাকা আমানত রাখে। নির্দিষ্ট সময়ে আফতাব তা ফেরত চাইলে মাহতাব টাকা রাখার কথা অস্বীকার করে। বিষয়টি ফায়সালার জন্য ইমাম সাহেব আফতাবের কাছে সাক্ষী তলব করেন। তখন আফতাব হযরত খোযায়মা (রা)-এর একক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে একজন সাক্ষী উপস্থাপন করেন। কিন্তু একক সাক্ষ্য শুধু খোযায়মা (রা)-এর জন্য নির্দিষ্ট হওয়ায় এর ওপর কিয়াস করা বৈধ নয়। এ কারণে ইমাম সাহেব আফতাবের কিয়াসকে বৈধ নয় বলে মন্তব্য করেন।
কিয়াস বৈধ হওয়ার জন্য উক্ত কারণ অর্থাৎ আছল নির্দিষ্ট না হওয়াকেই যথেষ্ট বলে আমি মনে করি না।
কিয়াস সম্পাদনের জন্য ইমামগণ কতগুলো শর্তারোপ করেছেন। এ শর্তগুলো পূরণ না হলে কিয়াস গ্রহণযোগ্য হবে না। আছল নির্দিষ্ট না হওয়া এ শর্তগুলোর মধ্যে একটি। এটি ছাড়াও আরও বেশ কিছু শর্ত রয়েছে যা কিয়াসের বৈধতার জন্য আবশ্যক।
কিয়াসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো এর মূল বিধানটি কিয়াসবিরোধী হবে না। কেননা আছল কিয়াসবিরোধী হলে তার ওপর কিয়াস করা যায় না। এছাড়া যে আছলের ওপর কিয়াস করা হবে এবং যে ফরয়াকে কিয়াস করা হবে সে আছল ও ফরয়ার মধ্যে পুরোপুরি মিল থাকতে হবে। আছল ও ফরয়া পুরোপুরি সাদৃশ্যপূর্ণ না হলে কিয়াস বৈধ হবে না। আবার ফরয়ার যদি আলাদা দলিল থাকে তাহলে তার কিয়াস করার প্রয়োজন পড়ে না। তাই যে ফরয়াটির কিয়াস হবে তার জন্য আলাদা কোনো নস বা দলিল থাকতে পারবে না।
কিয়াস সম্পন্ন হওয়ার একটি অনিবার্য শর্ত হলো- যে কারণ ও যুক্তির ভিত্তিতে আছল বা মূলবিধান প্রবর্তিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয় ফরয়ার মধ্যে সে একই কারণ ও যুক্তি বিদ্যমান থাকা। কিয়াসের আর একটি বিশেষ শর্ত হলো আসলের হুকুমটি ফরয়ার ওপর প্রয়োগ করা। এগুলো ছাড়া আরও দুটি শর্ত রয়েছে। যার একটি হলো আসলের হুকুম ফরয়ার ওপর প্রয়োগের পর আছলে হুকুমটি অপরিবর্তিত থাকা। অন্যটি হলো- যে বিষয়টির ওপর কিয়াস করা হবে সেটি কোনো আছলের ফরয়া হতে পারবে না। কিয়াসের এ শর্তগুলো পালন না করলে কিয়াস বৈধ হয় না।
পরিশেষে বলা যায়, ইমাম সাহেব যে কারণটির জন্য আফতাবের কিয়াসকে অবৈধ বলেছেন কিয়াসের বৈধতার জন্য সেটির সাথে সাথে এ শর্তগুলোও পূরণ করা প্রয়োজন।
Related Question
View Allযার উপর কিয়াস করা হয়, তাকে আছল বলে।
কিয়াস ইসলামি শরিয়তের চতুর্থ উৎস হিসেবে কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত বলে এটি ছাড়া ইসলামকে সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা বলা যায় না। কিয়াস ব্যতীত ইসলাম একটি গতিহীন ও সংকীর্ণ জীবনাদর্শে পরিণত হয়। ফলে সব দেশের ও সব কালের দাবি মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিয়াসই ইসলামকে সর্বকালীন ও সর্বজনীন জীবনাদর্শে পরিণত করে। এ কারণেই কিয়াসকে ইসলামি শরিয়তের উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এটি ইসলামকে পূর্ণতা দান করেছে।
১নং প্রেক্ষাপটে রাকিবের পিতার উপদেশে ইসলামের দ্বিতীয় উৎস তথা হাদিসের প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। হাদিস অর্থ কথা বা বাণী। ইসলামি পরিভাষায়, হাদিস বলতে মহানবি (স)-এর বাণী, কর্ম ও মৌন সম্মতিকে বোঝায়। হাদিস হলো শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস। এটি আল-কুরআনের মূলনীতিসমূহের বাস্তবরূপ ও ব্যাখ্যা। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা যে জীবনবিধান ও আদর্শ উপস্থাপন করেছেন সাধারণ মানুষের পক্ষে সব সময় তা বোঝা সম্ভব নয়। সেজন্য এথেকে তাদের উপকৃত হওয়া কষ্টকর। হাদিসে কুরআনের বক্তব্যসমূহকে সর্বসাধারণের উপযোগী করে পরিবেশন করা হয়েছে। হাদিসকে তাই কুরআনের ব্যাখ্যা গ্রন্থও বলা হয়। মূলত কুরআন ও হাদিস দুটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থ হলেও একটি অপরটির পরিপূরক। হাদিস ছাড়া যেমন কুরআন বোঝা সম্ভব নয় তেমনি কুরআন ছাড়াও হাদিসের নিজস্ব কোনো মান নেই।
১নং প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, রাকিব ফজর নামাজের পর দৈনিক অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াত করেন। এ প্রেক্ষিতে তার পিতা বলেন, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের পাশাপাশি এর সম্পূরক শিক্ষা হিসেবে দ্বিতীয় উৎসও রীতিমত অধ্যয়ন করতে হবে। অর্থাৎ তিনি এখানে কুরআনের পাশাপাশি শরিতের দ্বিতীয় উৎস হাদিস অধ্যয়নের কথা বলেছেন। সুতরাং বলা যায়, রাকিবের পিতার উপদেশে হাদিস অধ্যয়নের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
২নং প্রেক্ষাপটে জনাব আবিরের কর্মটি হলো কিয়াস। যা কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য। কিয়াস শব্দের অর্থ পরিমাপ, অনুমান বা তুলনা করা। কিয়াস হলো ইসলামি আইন প্রবর্তনের একটি পদ্ধতি। মানুষের গতিশীল জীবনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটে। এ সমস্যাগুলোর সমাধান সরাসরি কুরআন ও হাদিসে পাওয়া না গেলে সাদৃশ্যপূর্ণ বিধান দ্বারা নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করাই হলো কিয়াস।
২নং প্রেক্ষাপটে জনাব আবির কুরআন-হাদিস গবেষণা করে নিজের চিন্তা বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে আধুনিক যুগের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানকল্পে একটি পাণ্ডুলিপি রচনা করেন। এখানে কিয়াসের কথাই বলা হয়েছে। কিয়াস আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স) এর নির্দেশিত ও নির্বাচিত বিষয়। মুসলিম জাতিকে আল্লাহ তায়ালা فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ অথ ঃ 'অতএব, হে দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন মানুষেরা, তোমরা চিন্তা ও গবেষণা করো' (সুরা আল হাশর: ২)। আবার কিয়াস রাসুল (স) এর পছন্দনীয় পদ্ধতি। হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা) কে ইয়েমেনের বিচারক হিসেবে প্রেরণ করার সময় কীভাবে বিচার ফয়সালা করবে? এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মুয়াজ (রা) কুরআন-হাদিসের পর নিজের ব্যক্তিগত গবেষণার আলোকে বিচার ফয়সালা করার কথা বলেন। তাঁর এ জবাবে রাসুল (স) অত্যন্ত খুশি হন।
পরিশেষে বলা যায় যে, কিয়াসের বিধান কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই আবিরের কাজটি কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য।
সময়কাল এবং ইজমা সংঘটনের প্রকৃতি বিবেচনায় ইজমার স্বতন্ত্র স্তরবিন্যাসই 'মারাতিবুল ইজমা'।
কিয়াস ইসলামি আইনের চতুর্থ উৎস। কুরআন-মাজিদে কিয়াসের স্বীকৃতি রয়েছে। ইসলামি আইনের উৎস হিসেবে কিয়াস কোনো নতুন সংযোজন নয়। রাসুল (স)- এর যুগে কিয়াসের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে। তিনি নিজে কিয়াস করার জন্য সাহাবি (রা)-দের বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর ইন্তেকালের পর সাহাবিগণ কিয়াসের স্বাধীন প্রয়োগের মাধ্যমে একে ইসলামি আইনের চতুর্থ উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
অর্থ: হে চক্ষুষ্মাণগণ, তোমরা শিক্ষাগ্রহণ কর (সুরা আল-হাশর: ২)।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!