আল-হাকিম দারুল হিকমা প্রতিষ্ঠা করেন।
শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবদানের জন্য আল মুইজকে পাশ্চাত্যের মামুন বলা হয়।
মূলত আল-মুইজের সময়কাল ছিল মিসরে ফাতেমি শাসনকালের স্বর্ণযুগ। আল-মুইজ মিসরে ফাতেমি শাসন সুদৃঢ় করে রাজ্যের প্রভূত উন্নতি সাধনে মনোনিবেশ করেন এবং সমৃদ্ধিশালী একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি উদার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য সৈয়দ আমীর আলী তাকে পাশ্চাত্যের মামুন বলে অভিহিত করেছেন।
উদ্দীপকে উল্লিখিত বিষয়টি আমার পাঠ্যবইয়ের ফাতেমি বংশের উত্থানের সাথে মিল পাওয়া যায়।
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা) ও হযরত ফাতেমা (রা)-এর বংশধরগণ ইসলামের ইতিহাসে ফাতেমি নামে পরিচিত। এরা ছিল ইসমাঈলীয় শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পরবর্তীতে ইসমাঈলীয় মতবাদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে থাকে। নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে পারস্যবাসী আব্দুল্লাহ বিন-মায়মুন পারস্যের আওয়াজ ও সিরিয়ার সালমিয়াতে প্রচারকার্যের কেন্দ্র স্থাপন করে আব্বাসি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে দাঈ প্রেরণ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে ইসমাঈলীয় মতবাদ ইয়েমেন, ইয়ামামা, বাহরাইন, সিন্ধু, মিসর ও উত্তর আফ্রিকায় বিস্তার লাভ করে।
উদ্দীপকের ফাতেমীয় বংশ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। যে বংশ মহানবি (স)-এর কন্যার নাম ভাঙিয়ে উত্তর আফ্রিকায় বিস্তার লাভ করে এবং একটি নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। ৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে আব্দুল্লাহর মৃত্যু হলে তার শিষ্য আবু আব্দুল্লাহ আল-হুসাইন ইসামাঈলীয় প্রচারকার্যের দায়িত্ব নেন। ৯০১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উত্তর আফ্রিকায় গমন করে নিজেকে ইমাম মাহদীর অগ্রদূত বলে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে কাতামা গোত্রের সহায়তায় ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে আগলাবি শাসক জিয়াদতুল্লাহকে পরাজিত করে সাইদ বিন হুসাইনকে ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদী উপাধি দিয়ে খলিফা ঘোষণা করেন। এভাবে ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদী আগলাবি বংশের ধ্বংসস্তূপের ওপর আব্বাসি খিলাফতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে একটি খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। উত্তর আফ্রিকা ও মিসরে প্রতিষ্ঠিত এ বংশটিই ফাতেমি বংশ হিসেবে পরিচিত।
সুতরাং দেখা যায়, উদ্দীপকের বংশটির উত্থানের মধ্যে ফাতেমি বংশের উত্থানের মিল পরিলক্ষিত হয়।
উত্তর আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠিত ফাতেমি রাজবংশ সংস্কৃতির সকল অজানে অভূতপূর্ব উন্নয়ন তথা অবদান রেখে গেছেন।
ফাতেমি খিলাফত সংস্কৃতির চর্চা হিসেবে যেসব উন্নতি সাধন করেন তা তৎকালীন বিশ্বে বিরল ছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় তারা ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেছিল। দারুল হিকমা, আল-আহজার মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় তার উত্তম উদাহরণ। চিকিৎসাবিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান চর্চায়ও তারা প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। এছাড়াও অসংখ্য সৌধ, প্রাসাদ, মসজিদ, মিনার এবং চারু ও কারুশিল্পে তাদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল।
উদ্দীপকে হযরত মুহাম্মদ (স)-এর কন্যার নামে প্রতিষ্ঠিত ফাতেমি বংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই বংশের বিভিন্ন অবদানের মধ্যে সাংস্কৃতিক অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম নিদর্শন মনে করা হতো আল-আজহার মসজিদকে। পরবর্তীতে এ মসজিদটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী আল-আহজার বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। যেখানে বিশ্বের স্বনামধন্য শিক্ষক ও ছাত্ররা পড়াশোনা ও গবেষণা করত।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দার-আল-হিকমা বা বিজ্ঞানের ভবন নির্মাণ ফাতেমীয় শাসকদের অন্যান্য দৃষ্টান্ত। এখানে পাঠাগার ও গ্রন্থাগার সংযুক্ত, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ এবং নতুন গ্রন্থ প্রণয়নের অসামান্য অবদানের জন্য দারুল হিকমা প্রাচ্যে মামুনের বায়তুল হিকমার মতো প্রসিদ্ধি লাভ করে। শিক্ষার উন্নয়নের জন্য ফাতেমীয়রা বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রেও তারা ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন। ৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম থেকে মিসরে আগত চিকিৎসক মুহাম্মদ আল-তামিমী এ সময়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে মুসা বিন আল-সাজ্জান এবং তার তদীয় পুত্র ইসহাক ও ইসমাঈলও বিশেষ অবদান রাখেন। সে সময়ে নির্মিত আল-আকসার, আল-সালেহ এবং ইবনে রাজ্জাকের মসজিদগুলোও অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ছিল।
উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ফাতেমীয় বংশের শাসকরা অসামান্য অবদান রেখে গেছেন যা তৎকালীন বিশ্বে বিরল ছিল।
Related Question
View Allজওহর ছিলেন ফাতেমি খলিফা আল-মুইজের সেনাপতি এবং আল কাহিরা (কায়রো) নগরীর গোড়াপত্তনকারী।
ফাতেমি খলিফা আল-মুইজের শাসনামলে মিসরে প্রতিষ্ঠিত রাজধানী 'আল-কাহিরা' নামে পরিচিত।
আল-কাহিরা অর্থ 'বিজয়ী শহর'। চতুর্থ ফাতেমি খলিফা আল-মুইজের সেনাপতি জওহর ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মিসর জয় করেন এবং খলিফার নির্দেশে কায়রোকে রাজধানীর উপযোগী করে নির্মাণ করেন। সরকারিভাবে কায়রোর নামকরণ করা হয় 'আল-কাহিরা' বা বিজয়ী শহর। ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে 'আল-কাহিরা' বা কায়রো রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।
উদ্দীপকে বর্ণিত মুর্তজার ক্ষমতা গ্রহণের সাথে ফাতেমি খলিফা আল-হাকিমের ক্ষমতায় আরোহণের সাদৃশ্য রয়েছে।
ফাতেমি খলিফা আল-আজিজের মৃত্যুর পর পুত্র আল-হাকিম মাত্র ১১ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ (৯৯৬ খ্রি.) করেন। তিনি নাবালক হওয়ায় পিতার আমলের প্রাদেশিক শাসনকর্তা বারজোয়ান তার প্রতিনিধি হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। কিন্তু বারজোয়ান ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে আল-হাকিম গুপ্তচরের সাহায্যে তাকে হত্যা করে নিজে সকল ক্ষমতা গ্রহণ করেন। একই পরিস্থিতি উদ্দীপকে বর্ণিত মুর্তজার ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়।
পিতার মৃত্যুর পর মুর্তজা গৃহশিক্ষক আসিফের তত্ত্বাবধানে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু আসিফ লোভী ও ক্ষমতালিঙ্গু হয়ে উঠলে মুর্তজা তাকে গুপ্তচরের সহায়তায় হত্যা করে নিজে ক্ষমতা দখল করেন। খলিফা আল-হাকিমও তত্ত্বাবধায়ক বারজোয়ানের অতিরিক্ত লোভ এবং অপতৎপরতাকে বরদাশত করেননি। বারজোয়ান সেনাধ্যক্ষ ইবনে আমরকে পরাজিত ও হত্যা করে নিজেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করলে আল-হাকিম তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। গুপ্তঘাতক নিযুক্ত করে তিনি তাকে হত্যা করেন এবং নিজে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। সুতরাং উদ্দীপকের মুর্তজা এবং খলিফা আল-হাকিমের ক্ষমতা দখলের ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা।
উদ্দীপকের মুর্তজার মতোই খলিফা আল-হাকিমও রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে উদ্ভট, বিচিত্র ও খামখেয়ালিপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ইতিহাসে এমন অনেক শাসক রয়েছেন, যারা রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে কোনো যুক্তির বাধ-বিচার করেননি। নিজেদের ভালো লাগা এবং খামখেয়ালিপনায় তারা রাজ্য শাসন করেছেন। এমনই দুজন শাসক উদ্দীপকের মুর্তজা এবং ফাতেমি খলিফা আল-হাকিম।
আল-হাকিম জটিল চরিত্রের অধিকারী এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক অভিযোগ করেন। তিনি জিম্মিদের প্রতি কঠোর নীতি অবলম্বন করেন এবং বহু খ্যাতনামা লোককে হত্যা করেন। তিনি খ্রিষ্টানদের গির্জা ধ্বংস করে তাদেরকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার নির্দেশ দেন। ১০০১ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আদেশ জারি করেন যে, দিনে কোনো কাজকর্ম করা যাবে না; দোকান বন্ধ থাকবে এবং মানুষ আরাম করবে। অন্যদিকে রাতে অফিস-আদালতের কাজকর্ম চলবে এবং বেচাকেনা অব্যাহত থাকবে। তিনি একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। রাত্রিবেলা ঘুরে ঘুরে প্রজাদের সুখ-দুঃখ অবলোকন করতেন। তিনি প্রায়ই মুকাত্তাম (কায়রোর নিকটে) পাহাড়ের ওপর একটি নির্জন গৃহে যেতেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি অনবদ্য অবদান রাখেন। তিনি আব্বাসীয়দের অনুকরণে বায়তুল হিকমার আদলে মিসরে দারুল হিকমা নামক বিজ্ঞানাগার নির্মাণ করেন (১০০৫ খ্রি.)। উদ্দীপকের মুর্তজাও এ ধরনের উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য শাসন করেছেন। তিনিও আল-হাকিমের মতো রাতে ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক কাজ-কর্ম করার এবং দিনে বিশ্রাম নেওয়ার নির্দেশ জারি করেন। তিনি নির্জনতা পছন্দ করতেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগী ছিলেন।
উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, মূর্তজার মতোই খলিফা আল-হাকিম উদ্ভট ও বিচিত্র সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য শাসন করেছেন।
ফাতেমি খলিফা আল-হাকিম ১০০৫ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোতে একটি বিখ্যাত বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করেন। এটি দারুল হিকমা নামে পরিচিত। বাগদাদের বায়তুল হিকমার অনুকরণে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মিশরের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলী-ইবন-ইউসুফ এ জ্ঞানগৃহ নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এখানে শিয়া ধর্ম বিষয়ে আলোচনা ও গবেষণা হতো। এখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বহু অমূল্য গ্রন্থরাজি সংগৃহীত ছিল। দেশ-বিদেশের বহু প্রখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি এখানে হাজির হতেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্রখ্যাত দার্শনিক ও পদার্থবিজ্ঞানী ইবনে হায়সাম।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!