উত্তরঃ
পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। ভূ-অভ্যন্তরের এই স্তরবিন্যাস পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যেমন টেকটোনিক প্লেটের সঞ্চালন, আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের কারণ বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্দীপকে পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগের 'খ' ও 'গ' চিহ্নিত স্তর দুটি ভূ-অভ্যন্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্দেশ করে।
উদ্দীপকের চিত্র অনুযায়ী, 'ক' স্তরটি ভূত্বক, 'খ' স্তরটি গুরুমণ্ডল (Mantle) এবং 'গ' স্তরটি কেন্দ্রমণ্ডল (Core) নির্দেশ করে। গুরুমণ্ডল ভূত্বকের নিচে অবস্থিত এবং কেন্দ্রমণ্ডল ভূ-অভ্যন্তরের সর্বাপেক্ষা কেন্দ্রীয় স্তর। এই দুটি স্তর গঠনগত উপাদান, ভৌত অবস্থা, তাপমাত্রা এবং ঘনত্বে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গুরুমণ্ডল ('খ' স্তর) ও কেন্দ্রমণ্ডল ('গ' স্তর)-এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
- অবস্থান ও গভীরতা: গুরুমণ্ডল ভূত্বকের নিচ থেকে প্রায় ২,৯০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ৮৩%। অন্যদিকে, কেন্দ্রমণ্ডল গুরুমণ্ডলের নিচ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত অর্থাৎ ২,৯০০ কিমি থেকে প্রায় ৬,৩৭০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ১৬%।
- উপাদান: গুরুমণ্ডল মূলত সিলিকেট জাতীয় ভারী খনিজ পদার্থ, যেমন লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম (অলিভিন, পাইরক্সিন) দ্বারা গঠিত। এর উপরের অংশকে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার বলা হয়, যা সান্দ্র প্রকৃতির। কেন্দ্রমণ্ডল মূলত লোহা (Fe) ও নিকেল (Ni) দ্বারা গঠিত, তাই একে NiFe স্তরও বলা হয়।
- তাপমাত্রা: গুরুমণ্ডলের তাপমাত্রা ১,০০০°C থেকে ৩,৭০০°C পর্যন্ত হয়ে থাকে। কেন্দ্রমণ্ডলের তাপমাত্রা গুরুমণ্ডলের চেয়ে অনেক বেশি, ৪,৪০০°C থেকে ৬,১০০°C পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
- ঘনত্ব: গুরুমণ্ডলের ঘনত্ব ৩.৩ গ্রাম/ঘন সেমি থেকে ৫.৭ গ্রাম/ঘন সেমি পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়। কেন্দ্রমণ্ডলের ঘনত্ব পৃথিবীর সমস্ত স্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ, ৯.৯ গ্রাম/ঘন সেমি থেকে ১৩.০ গ্রাম/ঘন সেমি পর্যন্ত।
- ভৌত অবস্থা: গুরুমণ্ডল প্রধানত কঠিন তবে এর উপরের অংশ (অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার) আংশিক তরল বা অর্ধ-তরল (প্লাস্টিক) অবস্থায় থাকে। কেন্দ্রমণ্ডল দুটি অংশে বিভক্ত; বাইরের কেন্দ্রমণ্ডল তরল অবস্থায় এবং ভেতরের কেন্দ্রমণ্ডল অত্যধিক চাপের কারণে কঠিন অবস্থায় থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডল উভয়ই পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করে। গুরুমণ্ডলের আংশিক তরল অংশের পরিচলন স্রোত প্লেট টেকটোনিক্সের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, যা পর্বত গঠন, ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির মতো ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী। অন্যদিকে, কেন্দ্রমণ্ডল, বিশেষত তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র উৎপাদনে অপরিহার্য, যা মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। সুতরাং, এই দুটি স্তরের গঠন ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হলেও উভয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ও ভূচৌম্বকীয় প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে।