উত্তরঃ
উদ্দীপকের মতলব মিয়া এবং 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদ আত্মপরিচয়দানে ও আত্মপ্রকাশে অনেকটাই অভিন্ন। উভয় চরিত্রই নিজেদের অপ্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে গ্রামীণ সমাজের সরলতা ও ধর্মবিশ্বাসের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়।
উদ্দীপকের মতলব মিয়া একজন অচেনা দরবেশ হিসেবে গ্রামে আগমন করে। সে নিজেকে পীর হিসেবে পরিচয় দিয়ে অলৌকিক কর্মকাণ্ডের গল্প বলে গ্রামবাসীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তার আত্মপ্রকাশের মূলে রয়েছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ, যা কাটিয়ে ওঠার জন্য সে ধর্মীয় মোড়কে নিজেকে উপস্থাপন করে। তার উদ্দেশ্য হলো গ্রামের মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে সমাজে একটি অবস্থান তৈরি করা।
'লালসালু' উপন্যাসের মজিদও অনুরূপভাবে এক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মহব্বতনগর গ্রামে আসে। সে নিজেকে একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে জাহির করে। গ্রামে একটি বানোয়াট মাজার প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজেকে সেই মাজারের খাদেম ও পীর হিসেবে প্রচার করে। মজিদের আত্মপ্রকাশের মূল উদ্দেশ্য ছিল অন্নসংস্থান ও সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ। পরবর্তীতে সে এই ধর্মীয় ভণ্ডামিকে নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
উভয় চরিত্রের আত্মপরিচয়দানে ও আত্মপ্রকাশে যে সকল অভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়, তা নিম্নরূপ:
- উভয়েই অজ্ঞাত স্থান থেকে আগমনকারী অপরিচিত ব্যক্তি।
- উভয়েই নিজেদের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব (পীর/দরবেশ) হিসেবে উপস্থাপন করে।
- উভয়েই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য গ্রামীণ মানুষের ধর্মীয় আবেগ ও সরলতাকে পুঁজি করে।
- উভয়েই অলৌকিকত্ব বা ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে নিজেদের জাহির করে।
- উভয়ের উদ্দেশ্যই সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি সম্মানজনক বা ক্ষমতাশালী অবস্থান তৈরি করা।
- উভয়েই মানুষের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারকে নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
তবে, মজিদের ভণ্ডামি ও আত্মপ্রতিষ্ঠার কৌশল মতলব মিয়ার চেয়ে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী ও সুসংগঠিত। মজিদ কেবল অলৌকিক গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং একটি মিথ্যা মাজার প্রতিষ্ঠা করে এবং তা কেন্দ্র করে একটি ধর্মীয় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। পক্ষান্তরে, মতলব মিয়ার আত্মপ্রকাশের প্রাথমিক পর্যায় উদ্দীপকে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে সে কেবল নিজেকে পীর হিসেবে পরিচয় দিয়ে অলৌকিক কর্মকাণ্ডের গল্প বলা শুরু করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, মতলব মিয়া ও মজিদ উভয়ই সমাজের ধর্মীয় কুসংস্কার ও সরলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে নির্মাণ করে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। কৌশলগত গভীরতায় পার্থক্য থাকলেও, তাদের আত্মপ্রকাশের উদ্দেশ্য এবং মূল পদ্ধতি অভিন্ন।