কিয়াস শব্দের অর্থ অনুমান করা।
রুখসাত বলতে কোনো বিষয়ে কথায় বা কাজে মুজতাহিদদের (গবেষক) একটি অংশের একমত হওয়াকে বোঝায়। রুখসাত-এর আভিধানিক অর্থ অবকাশ, ঐচ্ছিক বা হালকা। এটি ইজমার একটি রুকন। এর মাধ্যমে কোনো বিষয়ে মুজতাহিদদের একটি অংশ একমত হন এবং বাকিরা সে বিষয়ে মৌনতা অবলম্বন করেন। এমনকি এ বিষয়ে মতামত প্রকাশের নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত তারা কোনো আপত্তি উত্থাপন করেন না। বরং বিষয়টি জানার পর নেতিবাচক বক্তব্য না দিয়ে চুপ থাকেন। একে মৌনতামূলক ইজমাও বলা হয়।
উদ্দীপকের ইমাম সাহেব শরিয়তের তৃতীয় উৎস ইজমার কথা বোঝাতে চেয়েছেন। নবোদ্ভাবিত ধর্মীয় বা পার্থিব যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য যেকোন সময়ে যোগ্যতাসম্পন্ন মুজতাহিদদের কুরআন-সুন্নাহ সমর্থিত এবং সর্বসম্মত ঐকমত্যের নাম হলো ইজমা। উদ্দীপকের ইমাম সাহেব এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
উদ্দীপকের ইমাম সাহেব সমস্যা সমাধানের জন্য কুরআন ও হাদিসের পরে ইজমার কথা বলেছেন। বস্তুত ইজমা নতুন কোনো মূলনীতি প্রণয়ন করে না। বরং আল্লাহ ও রাসুল (স) যেসব মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন তার আলোকে মুসলিম মুজতাহিদগণ নতুন নতুন সমস্যার সমাধান করে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা কোনো কিছুই বাদ দেয়নি। কিন্তু আমাদের এই সীমিত জ্ঞানের দ্বারা তার নিগূঢ় অর্থ উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। তাই ইজমার উৎপত্তি হয়। ইজমা আধুনিককালের সৃষ্ট কোন বিধান নয় বরং রাসুল (স)-এর যুগ থেকে এর নিদর্শন এসেছে। যেমন- আজানের প্রচলনে উমর (রা)-এর সাথে পরামর্শ, খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের জন্য সালমান ফারসি (রা)-এর সাথে পরামর্শ ইত্যাদি সবই ইজমার অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীতে সাহাবিদের ইজমা তার যথাযথ দাবি ও প্রকৃত রূপ নিয়ে বিমূর্ত হয়ে ওঠে খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে। মহানবি (স)- এর ইন্তেকালের পর অসংখ্য জাতীয় ইস্যুতে মুমিনগণ সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে ইজমার বাস্তব দৃষ্টান্ত পেশ করেন। ইজমার চাক্ষুস উদাহরণ হচ্ছে- হযরত আবু বকর (রা)-এর খলিফা নির্বাচিত হওয়া। বর্তমানে রাসুলুল্লাহ ও সাহাবিদের ইজমার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় বিষয়ে অসংখ্য ইজমা সংঘটিত হয়।
কুরআন ও হাদিসের পরে শরিয়তের যে উৎস রয়েছে তা হলো ইজমা। ইজমার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনস্বীকার্য। ইজমা অর্থ-ঐকমত্য, ঐক্যবদ্ধ হওয়া। ধর্মীয় কোনো বিষয়ে একই যুগের মুজতাহিদদের ঐকমত্যকে ইজমা বলে। ইমাম সাহেবের উক্তিতে এরই ইঙ্গিত বিদ্যমান।
মানব সমাজ পরিবর্তন ও প্রগতিশীল। ইসলামি সমাজও এ ধারার ব্যতিক্রম নয়। মহানবি (স)-এর সময়ে থেকে এবং পরবর্তীতে ইসলাম ও মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রসারের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে মুসলিম সমাজ এমন কতগুলো সমস্যার সম্মুখীন হয়, যার সমাধান কুরআন-হাদিসে স্পষ্টভাবে দেয়া হয়নি। বর্তমান যুগ বিজ্ঞান- প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির নতুন নতুন সময়ে আমাদেরকে নতুন নতুন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারের বিধি-বিধান কুরআনে বিদ্যমান। যদিও আমরা তার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারি না। বস্তুত আল্লাহ কুরআনে কোন কিছুই বাদ রাখেনি। মানব জ্ঞান সসীম হওয়ায় শিক্ষা ও গবেষণায় কুরআন থেকে যাবতীয় সমস্যার সমাধান আহরণ করা সম্ভব হয়নি। এজন্য আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মধ্য থেকে একদল বান্দাদেরকে মধ্যমপন্থি জাতি হিসেবে নির্বাচন করেছেন। যারা তার প্রণীত মূলনীতি গবেষণার মাধ্যমে শরিয়ত নির্দেশিত বিধান প্রণয়ন করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন- 'আর এমনিভাবে আমি তোমাদের করেছি মধ্যমপন্থি জাতি, যেন তোমরা মানুষের ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসুল (স) হবেন তোমাদের ওপর সাক্ষী' (সুরা বাকারা: ১৪৩)। পরিশেষে বলা যায় যে, মুসলিম জীবনদর্শন ও ব্যবস্থাপনায় ইজমার তাৎপর্য অনস্বীকার্য।
Related Question
View All'নিফাক' অর্থ- কপটতা, ভণ্ডামি ইত্যাদি।
'হুরুফে মুকাত্তায়াত' বলতে কুরআনে সংযোজিত বিচ্ছিন্ন বর্ণসমূহকে বোঝায়। কুরআন মাজিদের মোট ২৯টি সুরার শুরুতে হুরুফে মুকাত্তায়াত রয়েছে। প্রত্যেক গ্রন্থেই কিছু গোপন বিষয় থাকে, আর আল- কুরআনের গোপন বিষয় হলো হরফে মুকাত্তায়াত। তাফসিরকারগণের মতে যেসব বর্ণের প্রকৃত অর্থ ও যথার্থ মর্ম আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অবহিত নয় তাকেই 'হুরুফে মুকাত্তায়াত' বলে। যেমন- এর অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অবগত নয়।
মিথ্যাচার করা মুনাফিকের স্বভাব। মুনাফিক বলতে তাদেরকে বোঝায়, যারা মৌখিকভাবে ইমানের ঘোষণা দেয়, নামাজ, রোজাও পালন করে, কিন্তু অন্তরে কুফরি পোষণ করে। এদের মুখের ভাষা এক রকম কিন্তু অন্তর অন্যরকম। উদ্দীপকের দৃশ্যপট-১ এ দেখা যায় রাইয়্যান এ স্বভাবের অধিকারী।
উদ্দীপকের রাইয়্যান মিথ্যাচারের মাধ্যমে মুনাফিকি করে। সুরা আল বাকারায় দ্বিতীয় রুকুতে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের করুণ পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন। মুনাফিকরা ইমান আনার কথা বলে আল্লাহ ও মুমিনদের ঠকাতে চায়। কিন্তু তাদের এ কাজের কারণে নিজেরাই ঠকে। তাদের এরূপ কাজের কারণে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রকৃতপক্ষেই মুনাফিকদের অন্তরে থাকে নিফাক, কুফর, শিরকের ব্যাধি। তাদের এসব স্বভাবের কারণে পাপপ্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। তারা পৃথিবীতে অসম্মান ও অবিশ্বাসের পাত্রে পরিণত হয়। তাছাড়া পরকালীন জীবনেও তাদের কল্পনাতীত শাস্তি পেতে হবে। হাদিসেও নবি (স) মুনাফিকদের শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া মুনাফিকদের তিনটি গুণের মধ্যে মিথ্যাচার একটি। মিথ্যাচারকে মহানবি (স) সব পাপের মূল হিসেবে অবহিত করেছেন।
ওপরের আলোচনার আলোকে বলতে পারি, রাইয়্যান মিথ্যাচার করার মাধ্যমে মুনাফিকির স্বভাব পোষণ করছে। যার জন্য পরকালে তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে।
উম্মাহর ঐকমত্যের জন্য বর্তমানে ইজমার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ইজমা হচ্ছে সমকালীন বিজ্ঞ আলেমদের কোনো বিষয়ের ওপর ঐকমত্য। ধর্মীয় বা পার্থিব যেকোনো বিষয়ের বিধান উদ্ভাবন, প্রবর্তন বা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেকোনো যুগের মুসলিম মুজতাহিদ আলেমদের ঐকমত্যের মাধ্যমেই ইজমা হয়ে থাকে।
উদ্দীপকের দৃশ্যপট-২ এ রফিক ইসলামিক স্টাডিজ নিয়ে অধ্যয়ন করার কারণে ইজমার ব্যাপারে জানতে পারে। সে মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যের জন্য উদগ্রীব। বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন বৈপরীত্য মাসয়ালার সুন্দর সমাধানে ইজমার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইসলামি আইনের উৎসসমূহের মধ্যে কুরআন ও হাদিসের পরেই এর অবস্থান হওয়াতে এর দ্বারা শরিয়তের বিভিন্ন মাসয়ালা প্রণয়নে এর প্রয়োজন পড়ে। কুরআন ও হাদিসে যে পরিমাণ সমস্যার সমাধান পেশ করা হয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেকগুণ বেশি বিষয়ে কোনো সমাধান দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান প্রবর্তন করতে ইজমার বিকল্প নেই। নবোদ্ভাবিত সব সমস্যার সমাধানে ইজমা অনিবার্য। তাছাড়া মহানবি (স) বলেছেন- 'আমার উম্মত বিভ্রান্তির ওপর এক হবে না।' রাসুল (স) এর এ বাণীর মধ্যেই ইজমার গুরুত্ব বিদ্যমান। কেননা রাসুল (স) নিজেই ইজমার প্রতি ইঙ্গিত করে আলেমদের ঐকমত্যে পৌঁছানোর উপদেশ দিয়েছেন।
ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি, বর্তমান বিশ্বে নতুন নতুন যেসব ধর্মীয় বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে তা ইজমার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
রুখসাত অর্থ অবকাশ, ঐচ্ছিক বা হালকা।
যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই ইজমা করতে পারবে। ইজমা সম্পাদনে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের 'আহলুল ইজমা' বলা হয়। রাসুল (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবিরা ছিলেন ইজমার আহল। কেননা রাসুলের পর তারাই ছিলেন ইসলামি শরিয়ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ, রাসুল (স)-এর পছন্দনীয় এবং সমাজে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। সাহাবিদের যুগের পরে অভিজ্ঞ আলিমগণ ইজমা প্রদান করতে পারবেন। এভাবে শরিয়ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য মানুষ, যারা ইজমা প্রদান করলে তা শরিয়তের বিধানে পরিণত হবে সে ধরনের ব্যক্তি বা মানুষদের আহলুল ইজমা বা ইজমার আহল বলা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!