প্রকৃত আরোহ তিন প্রকার-
১. বৈজ্ঞানিক আরোহ
২. অবৈজ্ঞানিক আরোহ
৩. সাদৃশ্যমূলক অনুমান
বৈজ্ঞানিক আরোহের সিদ্ধান্ত সব সময় নিশ্চিত হয়, এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। যেহেতু বৈজ্ঞানিক আরোহের সিদ্ধান্ত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে, প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে গৃহীত হয়, তাই সেটা সব সময় নিশ্চিত হয়, কখনো সম্ভাব্য হয় না। যেমন: 'সব মানুষ হয় মরণশীল' এ বাক্যটি বৈজ্ঞানিক আরোহের একটি সর্ব সত্য দৃষ্টান্ত।
উদ্দীপকে লোকটির বেঁচে থাকার বিষয়টি দুই বন্ধুর নিশ্চিত হওয়ার ঘটনা বৈজ্ঞানিক আরোহ নির্দেশ করে। নিচে বৈজ্ঞানিক আরোহ ব্যাখ্যা করা হলো-
বৈজ্ঞানিক আরোহের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে যুক্তিবিদ কার্ডেথ রিড (Carveth Read) বলেন, 'আরোেহ অনুমানের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিশেষ দৃষ্টান্তের অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতার নীতি কার্যকারণ নিয়মের উপর নির্ভর করে একটি সাধারণ সংশ্লেষক বাক্য স্থাপন করার মানসিক প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক আরোহ বলে।' কাজেই কার্ভেথ রিডের বর্ণনা এবং বৈজ্ঞানিক আরোহের স্বরূপ অনুসারে আমরা বলতে পারি, প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা নীতি ও কার্যকারণ নীতির উপর নির্ভর করে কয়েকটি বিশিষ্ট দৃষ্টান্ত পর্যবেক্ষণের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটি সার্বিক সংশ্লেষক বাক্য স্থাপন করার যে পদ্ধতি, তাকেই বৈজ্ঞানিক আরোহ বলে। যেমন: আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় রহিম, করিম, যদু, মধু ইত্যাদি কয়েকটি বিশিষ্ট মানুষের মৃত্যু দেখে এবং মানুষের সাথে মরণশীলতার কার্যকারণ সম্পর্কে আবিষ্কার করে। উপরন্তু যে অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে, অনুরূপ অবস্থা অন্যান্য মানুষের ক্ষেত্রে উপস্থিত হলে তাদেরও মৃত্যু হবে। প্রকৃতির এই একানুরূপতায় বিশ্বাস 'রেখে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, 'সব মানুষ হয় মরণশীল', তবে তাকে বৈজ্ঞানিক আরোহ বলে গণ্য করা হবে। উল্লেখ্য, এরূপ বৈজ্ঞানিক আরোহের অনুমানগত রূপ হবে:
করিম হয় মরণশীল;
জসিম হয় মরণশীল;
জয় হয় মরণশীল;
∴ সব মানুষ হয় মরণশীল।
উল্লেখিত যুক্তিবাক্যটিতে কিছু মানুষের মৃত্যু পর্যবেক্ষণ করে অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে একটি সার্বিক সংশ্লেষক বাক্য স্থাপন করা হয়েছে। এই স্বতঃসিদ্ধ যুক্তিবাক্যটি সব স্বীকার করতে বাধ্য। বৈজ্ঞানিক আরোহের উক্ত ধারণাটি স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলে সর্বজনস্বীকৃত।
সুতরাং উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, উদ্দীপকে লোকটির বেঁচে থাকা সম্পর্কে যেহেতু দুই বন্ধু নিশ্চত সিদ্ধান্ত স্থাপন করে সেহেতু তা বৈজ্ঞানিক আরোহ।
আলোচ্য উদ্দীপকে প্রতীক ও পরেশের বক্তব্য সাদৃশ্যমূলক অনুমানের উপর ভিত্তি করে লোকটিকে চেয়ারম্যানের ছোট ভাই বলে ধারণা করেছে। নিচে সাদৃশ্যমূলক অনুমান বিশ্লেষণ করা হলো-
দুটি বস্তুর মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে সাদৃশ্য লক্ষ করে যদি অনুমান করা হয় যে, তাদের একটি বিশেষ গুণের অধিকারী বলে অপরটিও ঐ গুণের অধিকারী হবে, তাহলে যে অনুমান করা হয় তার নাম সাদৃশ্যানুমান (Analogy) | উদাহরণস্বরূপ: মানুষ ও গাছপালার মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে মিল আছে। অর্থাৎ উভয়ই মাটি, পানি, খাদ্য ছাড়া বাঁচতে পারে না, উভয়ই বংশ বৃদ্ধি করে।
মানুষ স্বভাবতই মরণশীল;
সুতরাং গাছপালাও মরণশীল।
সাদৃশ্যমূলক অনুমান দুই প্রকার-
১. সাধু সাদৃশ্যানুমান,
২. অসাধু সাদৃশ্যানুমান
যে সাদৃশ্যানুমানে কয়েকটি গুরুত্বহীন ও অনাবশ্যক বিষয়ে সাদৃশ্য দেখিয়ে সিদ্ধান্ত অনুমান করা হয়, তাকে অসাধু সাদৃশ্যানুমান বলে। অসাধু সাদৃশ্যানুমানে সাদৃশ্যের বিষয়গুলো নিতান্তই অবান্তর এবং অপ্রাসঙ্গিক। কাজেই সাদৃশ্যের বিষয়গুলোর সাথে অনুমিত বিষয়ের কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক থাকে না। এরূপ অনুমানে সাদৃশ্যের তুলনায় বৈসাদৃশ্য ও অজ্ঞাত বিষয়ের সংখ্যা বেশি থাকে। কাজেই এর সিদ্ধান্তের পক্ষে সত্য হওয়ার বদলে মিথ্যার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেমন- কামাল ও জামাল দুই বন্ধু। তাদের মধ্যে গায়ের বর্ণ, উচ্চতা, দেহের গঠন, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি বিষয়ে সাদৃশ্য আছে।
কামাল বুদ্ধিমান
অতএব জামালও বুদ্ধিমান।
এ যুক্তিটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাদৃশ্য দেখিয়ে সিদ্ধান্ত টানা হয়েছে। বাস্তবে গায়ের রং, উচ্চতা ইত্যাদির সাথে বুদ্ধির অস্তিত্বের কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক নেই। কাজেই যুক্তিটি একটি অসাধু সাদৃশ্যানুমান।
সুতরাং উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রতীক ও পরেশের বক্তব্য সাদৃশ্যমূলক অনুমানের উপর ভিত্তি করে বলা হলেও তা হলো অসাধু সাদৃশ্যমূলক অনুমান।
Related Question
View Allদুটি বস্তুর মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে সাদৃশ্য লক্ষ করে যদি অনুমান করা হয়, তাদের একটি বিশেষ গুণের অধিকারী বলে অপরটিও ওই গুণের অধিকারী হবে, তাহলে যে অনুমান করা হয় তার নাম সাদৃশ্যানুমান।
প্রকৃত আরোহে আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্তের মাঝে এমন কিছু ফাঁক বা ব্যবধান থাকে, যা অন্ধের মতো ঝুঁকি নিয়ে অতিক্রম করাই হলো প্রকৃত আরোহের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রকৃত আরোহে এরূপ ব্যবধানে অতিক্রমের প্রক্রিয়াকেই আরোহাত্মক লম্ফ বলে। উদাহরণস্বরূপ, রহিম, করিম, যদু, মধু, জন, ডন প্রমুখ মানুষের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এক বিরাট ব্যবধান অতিক্রম করে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের সব মানুষের মরণশীলতা সম্পর্কে যে সার্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, তা আরোহমূলক লম্ফের উপর নির্ভর করেই সম্ভব হয়।
উদ্দীপকে স্বাগত আরোহ যুক্তিবিদ্যা বইয়ে যে আরোহ সম্পর্কে জেনেছে, তা হচ্ছে বৈজ্ঞানিক আরোহ। কারণ আরোহের যত প্রকারভেদ রয়েছে, তাদের মধ্যে একমাত্র বৈজ্ঞানিক আরোহে আরোহের সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রয়েছে। তাই একে প্রকৃত আরোহ বলা হয়ে থাকে। বৈজ্ঞানিক আরোহের বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে-
◇পরীক্ষণাত্মক পদ্ধতি;
◇ আরোহমূলক লম্ফ;
◇সার্বিক সংশ্লেষক যুক্তিবাক্য;
◇বাস্তবভিত্তিক অভিজ্ঞতা;
◇প্রকৃতি নিয়মানুবর্তিতা নীতি ও কার্যকারণ সম্পর্ক;
◇ আকারগত ও বস্তুগত সত্যতা; ◇ সর্বদা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত;
◇ বিশেষ বিশেষ ঘটনা পর্যবেক্ষণ।
এসব বৈশিষ্ট্য থেকে বলা যায়, এখানে একটি আরোহের যতগুলো বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে প্রকৃত আরোহ বলা যায়, তার সব বৈশিষ্ট্যই বৈজ্ঞানিক আরোহের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। এমনকি একমাত্র সঠিকভাবে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত কেবল বৈজ্ঞানিক আরোহই দিতে পারে। তাই এটি একটি প্রকৃত আরোহ।
উদ্দীপকে স্বাগতের বন্ধু যে জ্যামিতিক চিত্র দেখেছে, তা আরোহ যুক্তিবিদ্যার যুক্তিসাম্যমূলক আরোহের বিষয়বস্তু। কারণ একমাত্র যুক্তিসাম্যমূলক আরোহে জ্যামিতিক চিত্র ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই একে জ্যামিতিক আরোহ বলেও আখ্যায়িত করা হয়।
এ প্রকার অনুমানে একটি মাত্র দৃষ্টান্তের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত টানা হলেও এর সিদ্ধান্ত সচরাচর নিশ্চিত। যে যুক্তি দিয়ে একটি সার্বিক বাক্যের অন্তর্গত কোনো একটি বিশেষ ঘটনাকে প্রমাণ করা যায়, সেই একই যুক্তি দিয়ে তার অন্তর্গত সমশ্রেণিভুক্ত অন্যান্য বিশেষ ঘটনাকে প্রমাণ করা যায়- এই নীতির উপর নির্ভর করে একটি সার্বিক সিদ্ধান্ত স্থাপন করার প্রক্রিয়াকে যুক্তিসাম্যমূলক আরোহ বলে। যুক্তিসাম্যমূলক আরোহ জ্যামিতির ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য। এখানে জ্যামিতির সূত্র ব্যবহার করে যুক্তিসাম্যমূলক আরোহ যুক্তি গঠন করে তা নিচে জ্যামিতিক চিত্রে তুলে ধরা হলো-
কোনো জ্যামিতিক প্রমাণে আমরা প্রথমে কোনো প্রদত্ত চিত্রের বৈশিষ্ট্য বা গুণকে প্রমাণ করি এবং তারপর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, প্রদত্ত চিত্রটিতে প্রমাণিত বৈশিষ্ট্য সেই একই শ্রেণির চিত্রের ক্ষেত্রেও সত্য হবে। যেমন: আমরা জানি, ত্রিভুজের তিনটি কোণের সমষ্টি দুই সমকোণের সমান; অর্থাৎ ১৮০০। এটি একটি জ্যামিতিক সূত্র। ত্রিভুজের তিনটি কোণ ABC নামক ত্রিভুজ অঙ্কন করে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করি, ত্রিভুজের তিনটি কোণ মিলে ১৮০° হয়। অনুরূপ যুক্তি দিয়ে আমরা সার্বিককরণ করে বলতে পারি যে X, Y, Z কিংবা A, B, C। অর্থাৎ সব ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণের সমান।
কার্যকারণ নিয়মের অর্থ হলো, প্রত্যেক কার্য বা ঘটনার একটি কারণ আছে। কোনো ঘটনার আগে যা ঘটে তাকে কারণ বলে। আর সেই ঘটনার পরে যা ঘটে তাকে কার্য বা ফল বলে। কারণ ছাড়া কার্য বা ফল হয় না, বিনাকারণে কোনো ঘটনা ঘটে না, নিছক শূন্য (০) থেকে কোনো কিছুর সৃষ্টি হয় না। শূন্য থেকে শুধু শূন্য পাওয়া যায়। পৃথিবীতে এমন কোনো ঘটনা নেই, যার কোনো কারণ নেই; প্রতিটি ঘটনাই কার্যকারণে আবদ্ধ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!