'একুশে ফেব্রুয়ারি: আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি'- বিষয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা লিখুন।

Updated: 1 month ago
উত্তরঃ

'একুশে ফেব্রুয়ারি: আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি'

ভূমিকা:
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে অনন্য, গৌরবোজ্জ্বল ও চেতনাদীপ্ত অধ্যায় হলো একুশে ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষার মর্যাদাকে অক্ষুন্না রাখতে এ দিন বাংলার দুর্জয় সন্তানরা রক্ত দিয়ে রঞ্জিত করেছিল পিচঢালা কালো রাজপথ। এই ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে বিশ্ব দরবারে উচ্চতর মর্যাদা, স্বাধিকার আন্দোলনের নবতর অনুপ্রেরণা ও নিজস্ব জাতিসত্তার এক অনন্য পরিচিতি দান করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের প্রথম সোপান, যা পরবর্তীতে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দেয়। রক্তনদী পেরিয়ে আসা সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সাড়ে সাত দশক পেরিয়ে আজ সময় এসেছে আত্মজিজ্ঞাসার বায়ান্নর একুশের যে চেতনা আমাদের ধমনীতে অনুরণিত হয়েছিল, দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তার কতটুকু আমরা অর্জন করতে পেরেছি? আমাদের প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির সমীকরণ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে? ভাষা আন্দোলনে শহিদদের আত্মত্যাগ স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। তাঁদের আত্মোৎসর্গেই আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে পেয়েছি। আমাদের জাতীয় জীবনে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভাষা শহিদদের উদ্দেশ্যে এ দিনকে স্মরণ করে আমরা তাই গেয়ে উঠি-

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো।

একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি?

একুশে ফেব্রুয়ারির পটভূমি:
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের প্রথম সফল গণঅভ্যুত্থান এবং শাসকচক্রের বিরুদ্ধে প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। মূলত ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে এবং এটি চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। জনসংখ্যার বিবেচনায় বাংলাভাষীরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবুও রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলার দাবি বারবার উপেক্ষিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা দেন: 'Urdu only, and Urdu shall be the state language of Pakistan.' এরপর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময়ও তিনি একমাত্র উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করে। না না ধ্বনিতে সমাবর্তন অনুষ্ঠান প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ এবং শুধু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন সৃষ্টির জন্য তমুদ্দন মজলিসের উদ্যোগে প্রথম রাষ্ট্রভাষা। সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রতিবাদ দিবস এবং ৩১ জানুয়ারি ঢাকার সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল। ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলার অকুতোভয় সংগ্রামী জনগণ ও ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করে। ছাত্রছাত্রীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সম্মুখে গিয়ে পৌঁছায় তখনই ঘাতক পুলিশ নির্বিচারে মিছিলটির ওপর গুলিবর্ষণ করে। সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর, জব্বারসহ আরও অনেক তরুণ-প্রাণ অকালেই ঝরে যায়। পুলিশের বর্বরোচিত নৃশংসতার প্রতিবাদে জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং রাজপথে নেমে আসে। অবস্থা। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে অবশেষে সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

একুশের চেতনায় স্বাধীনতার মূলমন্ত্র:

একুশের ভাষা আন্দোলন দৃশ্যত বাঙালির মাতৃভাষাভিত্তিক একটি সাংস্কৃতিক লড়াই হলেও এর গভীরেই মূলত নিহিত ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অমোঘ মূলমন্ত্র। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক এক অবাস্তব রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এ দেশের মানুষের ওপর যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিক শোষণের জাল বিস্তার করেছিল, বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে তার প্রথম শক্ত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। অকুতোভয় সংগ্রামী বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধিকারের এই স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীতে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণের ধমনিতে ছড়িয়ে পড়ে, যা ছিল শোষকদের বিরুদ্ধে বাঙালির অধিকার আদায়ের ইতিহাসের প্রথম সফল, সুসংগঠিত ও প্রথম বিজয়ী সংগ্রাম। বায়ান্নর এই রক্তঝরা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি প্রথম মেরুদণ্ড সোজা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়ানোর অদম্য রাজনৈতিক সাহস পায়, হাজার বছরের নিজস্ব জাতিসত্তা ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ে পরিচিত হওয়ার বৈপ্লবিক অনুপ্রেরণা লাভ করে এবং যেকোনো ন্যায্য দাবি আদায়ে রাজপথে সোচ্চার হয়ে ওঠার ঐতিহাসিক দীক্ষা নেয়। ভাষা আন্দোলনের এই সফলতার সুদূরপ্রসারী ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এতটাই সুগভীর ছিল যে, এটি বাঙালির অবদমিত জাতীয়তাবাদকে এক নতুন রাজনৈতিক রূপ দান করে; যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে বাঙালি জাতি সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৬২-এর বৈষম্যবিরোধী শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের স্বাধিকারের অমোঘ সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন (যা বাঙালির 'ম্যাগনা কার্টা' হিসেবে খ্যাত), ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এক মহাসমুদ্রের মতো বলিষ্ঠ ও চূড়ান্ত ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল। একুশের রাজপথের সেই রক্তই বাঙালিকে শিখিয়েছিল কীভাবে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম" বজ্রকণ্ঠে রূপ নেয়। তাই নিঃসঙ্কোচে ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলা যায়, বাঙালির রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, ভৌগোলিক মুক্তি ও সার্বভৌমত্বের মূলসূত্রটি বায়ান্নর একুশের ভাষা আন্দোলনের গর্ভেই সুপ্ত ছিল এবং এই রক্তপিচ্ছিল ও চেতনাদীপ্ত পথ ধরেই দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বিশ্বমানচিত্রে আমাদের চিরকাঙ্ক্ষিত লাল-সবুজের স্বাধীন ও সার্বভৌম মানচিত্র লাভ করতে সক্ষম হয়েছি।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ:

১৯৫৩ সাল থেকে এদেশের মানুষ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো এ দিনকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেই থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর বহু দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। আর ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং বিশ্বের ১২৪টি দেশ তা সমর্থন করে। এই ঘোষণার মধ্যদিয়ে ইউনেস্কোর ওই ঘোষণা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল। আজ বাঙালির একুশ যে বিশ্বজনীন দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে- এ গৌরব ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী থেকে শুরু করে প্রত্যেক স্বাধীনতা সংগ্রামী ও প্রগতিপন্থি বাঙালির। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো)-এর সাধারণ পরিষদ তার ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ২৭টি দেশের সমর্থনে সর্বসম্মতভাবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এর পর থেকে প্রতি বছর উক্ত সংস্থার ১৮৮টি সদস্য দেশ এবং সংস্থাটির সদর দপ্তরে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।

জাতীয় জীবনে একুশের চেতনা: আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে, চিন্তনে এবং মননে একুশের অবিনাশী চেতনার এক উজ্জ্বল ও সুগভীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বায়ান্নর এই রক্তঝরা আন্দোলন কেবল রাজপথের লড়াই ছিল না, বরং তা বাঙালি জাতির মন-মানসে এক নতুন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধিকারমুখী নব সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটায়। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির মজবুত ভিত্তি নির্মাণে একুশের প্রভাব অপরিসীম। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে: "একুশে ফেব্রুয়ারি কোনো বিশেষ দিন, ক্ষণ বা তিথি নয়; এটি একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস। এ ইতিহাস অগ্নিগর্ভ। "বাঙালির চিন্তাজগতে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করেই আমাদের পরবর্তী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার আদায়ের সমস্ত আন্দোলন বিকশিত ও বেগবান হয়েছে। একুশের রাজপথের সেই দ্রোহই বাঙালিকে শিখিয়েছিল কীভাবে বুলেটের সামনে বুক পেতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হয়। বাংলা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধমনিতে একুশের এই চেতনা আজ অব্দি নিত্য সক্রিয় ও প্রমান্য। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় কবিতা, কথাসাহিত্য, নাটক ও প্রবন্ধে একুশের বলিষ্ঠ পদচারণা দেখা যায়। তৎকালীন ও সমকালীন কবি-সাহিত্যিকগণ একুশের চেতনাকে উপজীব্য করে রচনা করেছেন অসংখ্য অনন্য কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। উদাহরণস্বরূপ-মুনীর চৌধুরীর ঢাকা জেলে বসে রচিত বিখ্যাত নাটক 'কবর', ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী পটভূমিতে জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস 'আরেক ফালগুন' এবং কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচিত প্রথম তাতক্ষণিক দ্রোহের কবিতা 'কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি' এসব অমর সৃষ্টি একুশের অবদানেই পুষ্ট। এছাড়াও শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও হাসান হাফিজুর রহমানের হাত ধরে বাংলা কবিতায় একুশের চেতনা এক নতুন দিগন্ত লাভ করে।

কেবল উচ্চাঙ্গের সাহিত্যেই নয়, বাঙালির দৈনন্দিন আচার, মানসিকতা ও জাতীয় ঐতিহ্যের সকল ক্ষেত্রেই একুশে ফেব্রুয়ারির এক আলাদা মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৫৩ সালে প্রথম শহীদ দিবস উদযাপন করতে গিয়ে তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীরা যেসব কর্মসূচি পালন করেছিলেন, দীর্ঘ সাত দশক পেরিয়ে আজও আমরা গভীর শ্রদ্ধায় ও পরম আবেগে সেগুলো হুবহু অনুসরণ করছি। শীতের শেষে ফালগুনের ভোরে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নেওয়া, সমবেত কণ্ঠে আবদুল গাফফার চৌধুরীর "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি..." গানটি গাওয়া এবং শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করার মধ্য দিয়ে আমাদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনা প্রতিবছর নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হয়। এছাড়া, বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে আয়োজিত এক মাসব্যাপী 'অমর একুশে বইমেলা' আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বৃহৎ, স্বতঃস্ফূর্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক এবং মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই বইমেলাই মূলত বাঙালির মননশীলতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রধান চালিকাশক্তি।

আমাদের ১৯৫২ সালের এই ভাষা আন্দোলন আজ আর কোনো আঞ্চলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ প্রশংসিত ও সম্মানিত। সারা বিশ্বে এ দিনটি 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে সর্বজনীনভাবে পালিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি বিপন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি বিশেষভাবে সম্মানিত এবং সংরক্ষিত হচ্ছে, যা বাঙালির এই আত্মত্যাগকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য ও সুউচ্চ মর্যাদা দান করেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক বিচারে দেখা যায়, আমাদের জাতীয় জীবনের এক বৃহৎ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ জুড়ে একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে জড়িয়ে রয়েছে। তাইতো নাগরিক কবি শামসুর রাহমান তাঁর 'বর্ণমালা, আমার কবিতায় দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন-

তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে কী থাকে আমার?

উনিশ শো বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুস্পাঞ্জলি

বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।

একুশের প্রেক্ষাপটে আমাদের 'প্রত্যাশা':

স্বাধীনতার সূচনালগ্নে এবং ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা দিনগুলোতে এ দেশের আপামর জনসাধারণের মনে একুশের সুমহান চেতনাকে কেন্দ্র করে কিছু মৌলিক ও সুদূরপ্রসারী প্রত্যাশা দানা বেঁধেছিল। সেগুলোর প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রধানতম প্রত্যাশাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ মানুষের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার নিশ্চিত করা। শুধু সরকারি দাপ্তরিক কাজেই নয়, বরং দেশের উচ্চ আদালত, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, বিজ্ঞানচর্চা, উচ্চশিক্ষা এবং উন্নত গবেষণার প্রধান ও একমাত্র মাধ্যম হবে বাংলা, এটাই ছিল একুশের প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা। বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন: ভাষা শহীদদের পবিত্র রক্তে ভেজা এই স্বাধীন মাটিতে কোনো ধরনের স্বৈরাচার, শোষক বা ঔপনিবেশিক মানসিকতার স্থান হবে না এমনটাই প্রত্যাশা ছিল আপামর জনতার। একটি সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা, মত প্রকাশ ও মৌলিক অধিকার পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে।
  • সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশ ও ভাষাদূষণ রোধ: বাঙালির নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং প্রাণের ভাষার মর্যাদা চিরকাল অক্ষুণ ও অক্ষয় থাকবে- এটি ছিল একুশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা। যেকোনো পরকীয় অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে মুক্ত হয়ে বাংলা ভাষা তার নিজস্ব স্বকীয়তা, ব্যাকরণগত শুদ্ধতা এবং অপরূপ মাধুর্য নিয়ে বিকশিত হবে এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ বজায় থাকবে।
  • প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার অধিকার রক্ষা: বাঙালির নিজের ভাষা আন্দোলনের মূল সুরই ছিল স্বাধিকার এবং অন্যের চাপিয়ে দেওয়া ভাষার বিরুদ্ধে নিজের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। অন্যের ভাষাকে সম্মান জানানোর সেই উদার চেতনা থেকেই প্রত্যাশা ছিল যে, স্বাধীন বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যান্য প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষও যেন কোনো বৈষম্য ছাড়াই তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির মুক্ত চর্চা করতে পারে।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান:

যেখানে আমরা পিছিয়েপ্রাপ্তির খতিয়ান (যেমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, প্রযুক্তিতে বাংলা) কম না হলেও, অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করা যায় যে, দীর্ঘ সময়েও আমাদের অনেক মৌলিক প্রত্যাশা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে:

  • উচ্চশিক্ষা ও বিচার বিভাগে ইংরেজি প্রীতি: স্বাধীনতার এতদিন পরও দেশের উচ্চ আদালত এবং বিজ্ঞান, চিকিৎসা বা প্রকৌশল বিদ্যার মতো উচ্চশিক্ষার স্তরগুলোতে বাংলার ব্যবহার এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। উচ্চ আদালতের অধিকাংশ রায় ও আইনি নথিপত্র এখনো ইংরেজিতে লেখা হয়। তাছাড়া, উচ্চশিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত অনুবাদ গ্রন্থ ও বাংলায় মৌলিক গবেষণার অভাবের কারণে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি মাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
  • ভাষাদূষণ ও বিকৃতি: বর্তমান প্রজন্মের একাংশের মধ্যে বাংলা ও ইংরেজির এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি মিশ্রণ তৈরি করে বিকৃত উচ্চারণে 'বাংলিশ' বলার এক ক্ষতিকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক গণমাধ্যম, এফএম রেডিওর কৃত্রিম উপস্থাপন শৈলী এবং আধুনিক নাটক ও সিনেমায় সুকৌশলে ভাষার যে বিকৃত ও সস্তা উচ্চারণ প্রদর্শন করা হয়, তা একুশের চেতনার চরম পরিপন্থী।
  • মনস্তাত্ত্বিক দৈন্যতা ও হীনম্মন্যতা: আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখনো ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলতে পারাকে আভিজাত্য, আধুনিকতা ও যোগ্যতার প্রতীক মনে করা হয়। এর বিপরীতে নিজের মাতৃভাষার সঠিক ব্যবহারের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অবহেলা ও হীনম্মন্যতা কাজ করে। এই মানসিক দৈন্যতা বা ভাষাগত হীনম্মন্যতা নতুন প্রজন্মকে শিকড়বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে এবং আমাদের একুশের চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
  • ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার সংকট: বাংলাদেশে প্রায় অর্ধশত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বাস করে, যাদের নিজস্ব সমৃদ্ধ ভাষা ও চমৎকার লিপি রয়েছে। কিন্তু সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের অনেক ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। সরকার প্রাথমিক স্তরে কয়েকটি নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিতরণ শুরু করলেও দক্ষ শিক্ষকের তীব্র অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই শিশুরা নিজ মাতৃভাষায় পুরোপুরি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না।

উত্তরণের পথ ও আমাদের করণীয়:

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই ব্যবধান ঘুচিয়ে একুশের চেতনাকে জাতীয় জীবনে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে হলে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

⇒ দেশের উচ্চ আদালতের সমস্ত রায়, আদেশ ও আইনি কার্যক্রম বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলায় দেওয়ার আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো প্রস্তুত করতে হবে। একই সাথে, সরকারি ও বেসরকারি সর্বস্তরের দাপ্তরিক কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে 'বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭'-এর শতভাগ বাস্তবায়ন কঠোরতার সাথে নিশ্চিত করতে হবে।

⇒ বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা ও অর্থনীতির মতো জটিল ও আধুনিক বিষয়গুলো সহজ ও প্রাঞ্জল বাংলায় রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এর জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী 'জাতীয় অনুবাদ সংস্থা' গঠন করতে হবে, যা মানসম্মত উচ্চশিক্ষার পাঠ্যপুস্তক বাংলায় সহজলভ্য করবে।

⇒ বাণিজ্যিক গণমাধ্যম, এফএম রেডিওর কৃত্রিম উপস্থাপন শৈলী, নাটক-সিনেমা এবং বিজ্ঞাপনে বাংলার অপপ্রয়োগ ও 'বাংলিশ'-এর সস্তা বিকৃতি রোধে রাষ্ট্রীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় আইনি নীতিমালা ও সামাজিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।

⇒ 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট'-কে আরও গতিশীল করে এ দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর বিপন্ন ভাষা ও লিপি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতে হবে। উপজাতীয় শিশুদের জন্য নিজস্ব মাতৃভাষার পাঠ্যপুস্তক বিতরণের পাশাপাশি তা শেখানোর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

সর্বোপরি, ভাষাগত হীনম্মন্যতা দূর করে "বাংলা আমার অহংকার"- এই গৌরবময় বোধ শৈশব থেকেই প্রতিটি শিশুর অন্তরে প্রোথিত করতে হবে। পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলামে ভাষা চর্চাকে গুরুত্ব দিতে হবে, যেন নতুন প্রজন্ম অন্য ভাষা শেখার পাশাপাশি নিজের ভাষাকে মননে ও কর্মে সর্বোচ্চ মর্যাদার স্থানে রাখতে পারে।

উপসংহার:
একুশ আমাদের কণ্ঠে ভাষা দিয়েছে, হৃদয়ে দিয়েছে আবেগ, চেতনায় জাগিয়েছে দৃঢ়তা। একুশ আমাদের মুক্তির চেতনায় উদ্দীপ্ত করেছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদরা যে অবদান রেখেছেন, তাকে চিরকাল অম্লান রাখতে হবে। একুশকে কেবল ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের আনুষ্ঠানিকতা বা প্রভাতফেরির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। আমাদের মুক্তি চেতনার উৎস ও বাহক একুশকে তার যথাযথ সম্মান প্রদান করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। যেদিন এ দেশের প্রতিটা স্তরে বাংলা ভাষা তার আপন মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং একটি অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে উঠবে, সেদিনই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ পূর্ণতা পাবে এবং আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ পূর্ণতা পাবে।

21

Related Question

View All
উত্তরঃ

একজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।

একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।

একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।

সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।

একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।

একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।

অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।

সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।

লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।

3.8k
উত্তরঃ

সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।

আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।

সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।

3.2k
উত্তরঃ

আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।

শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।

বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।

আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।

arif
arif
3 years ago
3.7k
উত্তরঃ

আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ

 

বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।

অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র

য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।

শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

2.4k
উত্তরঃ

"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ: 

সাম্যবাদের পতন:

১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।

গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:

সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ: 

অর্থনৈতিক সংকট:

সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।

জাতীয়তাবাদের উত্থান:

অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা:

নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।

সামাজিক পরিবর্তন:

পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

গুরুত্বপূর্ণ দিক: 

  • এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
  • যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল। 

Satt Team 10
Satt Team 10
10 months ago
2.3k
উত্তরঃ

পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে  দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান  বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:

জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-

১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।

২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ  পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:

সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়  একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।

অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন  বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।

অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা  জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে,  ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।

২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে।  [ঊর্মি হোসেন]

Md. Aminul Islam
Md. Aminul Islam
3 years ago
4.5k
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews