উত্তরঃ
'একুশে ফেব্রুয়ারি: আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি'
ভূমিকা:
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে অনন্য, গৌরবোজ্জ্বল ও চেতনাদীপ্ত অধ্যায় হলো একুশে ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষার মর্যাদাকে অক্ষুন্না রাখতে এ দিন বাংলার দুর্জয় সন্তানরা রক্ত দিয়ে রঞ্জিত করেছিল পিচঢালা কালো রাজপথ। এই ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে বিশ্ব দরবারে উচ্চতর মর্যাদা, স্বাধিকার আন্দোলনের নবতর অনুপ্রেরণা ও নিজস্ব জাতিসত্তার এক অনন্য পরিচিতি দান করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের প্রথম সোপান, যা পরবর্তীতে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দেয়। রক্তনদী পেরিয়ে আসা সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সাড়ে সাত দশক পেরিয়ে আজ সময় এসেছে আত্মজিজ্ঞাসার বায়ান্নর একুশের যে চেতনা আমাদের ধমনীতে অনুরণিত হয়েছিল, দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তার কতটুকু আমরা অর্জন করতে পেরেছি? আমাদের প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির সমীকরণ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে? ভাষা আন্দোলনে শহিদদের আত্মত্যাগ স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। তাঁদের আত্মোৎসর্গেই আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে পেয়েছি। আমাদের জাতীয় জীবনে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভাষা শহিদদের উদ্দেশ্যে এ দিনকে স্মরণ করে আমরা তাই গেয়ে উঠি-
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো।
একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?
একুশে ফেব্রুয়ারির পটভূমি:
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের প্রথম সফল গণঅভ্যুত্থান এবং শাসকচক্রের বিরুদ্ধে প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। মূলত ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে এবং এটি চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। জনসংখ্যার বিবেচনায় বাংলাভাষীরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবুও রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলার দাবি বারবার উপেক্ষিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা দেন: 'Urdu only, and Urdu shall be the state language of Pakistan.' এরপর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময়ও তিনি একমাত্র উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করে। না না ধ্বনিতে সমাবর্তন অনুষ্ঠান প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ এবং শুধু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন সৃষ্টির জন্য তমুদ্দন মজলিসের উদ্যোগে প্রথম রাষ্ট্রভাষা। সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রতিবাদ দিবস এবং ৩১ জানুয়ারি ঢাকার সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল। ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলার অকুতোভয় সংগ্রামী জনগণ ও ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করে। ছাত্রছাত্রীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সম্মুখে গিয়ে পৌঁছায় তখনই ঘাতক পুলিশ নির্বিচারে মিছিলটির ওপর গুলিবর্ষণ করে। সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর, জব্বারসহ আরও অনেক তরুণ-প্রাণ অকালেই ঝরে যায়। পুলিশের বর্বরোচিত নৃশংসতার প্রতিবাদে জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং রাজপথে নেমে আসে। অবস্থা। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে অবশেষে সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
একুশের চেতনায় স্বাধীনতার মূলমন্ত্র:
একুশের ভাষা আন্দোলন দৃশ্যত বাঙালির মাতৃভাষাভিত্তিক একটি সাংস্কৃতিক লড়াই হলেও এর গভীরেই মূলত নিহিত ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অমোঘ মূলমন্ত্র। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক এক অবাস্তব রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এ দেশের মানুষের ওপর যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিক শোষণের জাল বিস্তার করেছিল, বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে তার প্রথম শক্ত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। অকুতোভয় সংগ্রামী বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধিকারের এই স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীতে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণের ধমনিতে ছড়িয়ে পড়ে, যা ছিল শোষকদের বিরুদ্ধে বাঙালির অধিকার আদায়ের ইতিহাসের প্রথম সফল, সুসংগঠিত ও প্রথম বিজয়ী সংগ্রাম। বায়ান্নর এই রক্তঝরা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি প্রথম মেরুদণ্ড সোজা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়ানোর অদম্য রাজনৈতিক সাহস পায়, হাজার বছরের নিজস্ব জাতিসত্তা ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ে পরিচিত হওয়ার বৈপ্লবিক অনুপ্রেরণা লাভ করে এবং যেকোনো ন্যায্য দাবি আদায়ে রাজপথে সোচ্চার হয়ে ওঠার ঐতিহাসিক দীক্ষা নেয়। ভাষা আন্দোলনের এই সফলতার সুদূরপ্রসারী ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এতটাই সুগভীর ছিল যে, এটি বাঙালির অবদমিত জাতীয়তাবাদকে এক নতুন রাজনৈতিক রূপ দান করে; যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে বাঙালি জাতি সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৬২-এর বৈষম্যবিরোধী শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের স্বাধিকারের অমোঘ সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন (যা বাঙালির 'ম্যাগনা কার্টা' হিসেবে খ্যাত), ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এক মহাসমুদ্রের মতো বলিষ্ঠ ও চূড়ান্ত ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল। একুশের রাজপথের সেই রক্তই বাঙালিকে শিখিয়েছিল কীভাবে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম" বজ্রকণ্ঠে রূপ নেয়। তাই নিঃসঙ্কোচে ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলা যায়, বাঙালির রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, ভৌগোলিক মুক্তি ও সার্বভৌমত্বের মূলসূত্রটি বায়ান্নর একুশের ভাষা আন্দোলনের গর্ভেই সুপ্ত ছিল এবং এই রক্তপিচ্ছিল ও চেতনাদীপ্ত পথ ধরেই দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বিশ্বমানচিত্রে আমাদের চিরকাঙ্ক্ষিত লাল-সবুজের স্বাধীন ও সার্বভৌম মানচিত্র লাভ করতে সক্ষম হয়েছি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ:
১৯৫৩ সাল থেকে এদেশের মানুষ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো এ দিনকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেই থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর বহু দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। আর ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং বিশ্বের ১২৪টি দেশ তা সমর্থন করে। এই ঘোষণার মধ্যদিয়ে ইউনেস্কোর ওই ঘোষণা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল। আজ বাঙালির একুশ যে বিশ্বজনীন দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে- এ গৌরব ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী থেকে শুরু করে প্রত্যেক স্বাধীনতা সংগ্রামী ও প্রগতিপন্থি বাঙালির। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো)-এর সাধারণ পরিষদ তার ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ২৭টি দেশের সমর্থনে সর্বসম্মতভাবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এর পর থেকে প্রতি বছর উক্ত সংস্থার ১৮৮টি সদস্য দেশ এবং সংস্থাটির সদর দপ্তরে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।
জাতীয় জীবনে একুশের চেতনা: আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে, চিন্তনে এবং মননে একুশের অবিনাশী চেতনার এক উজ্জ্বল ও সুগভীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বায়ান্নর এই রক্তঝরা আন্দোলন কেবল রাজপথের লড়াই ছিল না, বরং তা বাঙালি জাতির মন-মানসে এক নতুন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধিকারমুখী নব সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটায়। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির মজবুত ভিত্তি নির্মাণে একুশের প্রভাব অপরিসীম। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে: "একুশে ফেব্রুয়ারি কোনো বিশেষ দিন, ক্ষণ বা তিথি নয়; এটি একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস। এ ইতিহাস অগ্নিগর্ভ। "বাঙালির চিন্তাজগতে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করেই আমাদের পরবর্তী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার আদায়ের সমস্ত আন্দোলন বিকশিত ও বেগবান হয়েছে। একুশের রাজপথের সেই দ্রোহই বাঙালিকে শিখিয়েছিল কীভাবে বুলেটের সামনে বুক পেতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হয়। বাংলা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধমনিতে একুশের এই চেতনা আজ অব্দি নিত্য সক্রিয় ও প্রমান্য। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় কবিতা, কথাসাহিত্য, নাটক ও প্রবন্ধে একুশের বলিষ্ঠ পদচারণা দেখা যায়। তৎকালীন ও সমকালীন কবি-সাহিত্যিকগণ একুশের চেতনাকে উপজীব্য করে রচনা করেছেন অসংখ্য অনন্য কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। উদাহরণস্বরূপ-মুনীর চৌধুরীর ঢাকা জেলে বসে রচিত বিখ্যাত নাটক 'কবর', ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী পটভূমিতে জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস 'আরেক ফালগুন' এবং কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচিত প্রথম তাতক্ষণিক দ্রোহের কবিতা 'কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি' এসব অমর সৃষ্টি একুশের অবদানেই পুষ্ট। এছাড়াও শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও হাসান হাফিজুর রহমানের হাত ধরে বাংলা কবিতায় একুশের চেতনা এক নতুন দিগন্ত লাভ করে।
কেবল উচ্চাঙ্গের সাহিত্যেই নয়, বাঙালির দৈনন্দিন আচার, মানসিকতা ও জাতীয় ঐতিহ্যের সকল ক্ষেত্রেই একুশে ফেব্রুয়ারির এক আলাদা মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৫৩ সালে প্রথম শহীদ দিবস উদযাপন করতে গিয়ে তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীরা যেসব কর্মসূচি পালন করেছিলেন, দীর্ঘ সাত দশক পেরিয়ে আজও আমরা গভীর শ্রদ্ধায় ও পরম আবেগে সেগুলো হুবহু অনুসরণ করছি। শীতের শেষে ফালগুনের ভোরে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নেওয়া, সমবেত কণ্ঠে আবদুল গাফফার চৌধুরীর "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি..." গানটি গাওয়া এবং শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করার মধ্য দিয়ে আমাদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনা প্রতিবছর নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হয়। এছাড়া, বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে আয়োজিত এক মাসব্যাপী 'অমর একুশে বইমেলা' আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বৃহৎ, স্বতঃস্ফূর্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক এবং মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই বইমেলাই মূলত বাঙালির মননশীলতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রধান চালিকাশক্তি।
আমাদের ১৯৫২ সালের এই ভাষা আন্দোলন আজ আর কোনো আঞ্চলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ প্রশংসিত ও সম্মানিত। সারা বিশ্বে এ দিনটি 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে সর্বজনীনভাবে পালিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি বিপন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি বিশেষভাবে সম্মানিত এবং সংরক্ষিত হচ্ছে, যা বাঙালির এই আত্মত্যাগকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য ও সুউচ্চ মর্যাদা দান করেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক বিচারে দেখা যায়, আমাদের জাতীয় জীবনের এক বৃহৎ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ জুড়ে একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে জড়িয়ে রয়েছে। তাইতো নাগরিক কবি শামসুর রাহমান তাঁর 'বর্ণমালা, আমার কবিতায় দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন-
তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে কী থাকে আমার?
উনিশ শো বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুস্পাঞ্জলি
বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।
একুশের প্রেক্ষাপটে আমাদের 'প্রত্যাশা':
স্বাধীনতার সূচনালগ্নে এবং ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা দিনগুলোতে এ দেশের আপামর জনসাধারণের মনে একুশের সুমহান চেতনাকে কেন্দ্র করে কিছু মৌলিক ও সুদূরপ্রসারী প্রত্যাশা দানা বেঁধেছিল। সেগুলোর প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রধানতম প্রত্যাশাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ মানুষের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার নিশ্চিত করা। শুধু সরকারি দাপ্তরিক কাজেই নয়, বরং দেশের উচ্চ আদালত, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, বিজ্ঞানচর্চা, উচ্চশিক্ষা এবং উন্নত গবেষণার প্রধান ও একমাত্র মাধ্যম হবে বাংলা, এটাই ছিল একুশের প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা। বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন: ভাষা শহীদদের পবিত্র রক্তে ভেজা এই স্বাধীন মাটিতে কোনো ধরনের স্বৈরাচার, শোষক বা ঔপনিবেশিক মানসিকতার স্থান হবে না এমনটাই প্রত্যাশা ছিল আপামর জনতার। একটি সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা, মত প্রকাশ ও মৌলিক অধিকার পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে।
- সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশ ও ভাষাদূষণ রোধ: বাঙালির নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং প্রাণের ভাষার মর্যাদা চিরকাল অক্ষুণ ও অক্ষয় থাকবে- এটি ছিল একুশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা। যেকোনো পরকীয় অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে মুক্ত হয়ে বাংলা ভাষা তার নিজস্ব স্বকীয়তা, ব্যাকরণগত শুদ্ধতা এবং অপরূপ মাধুর্য নিয়ে বিকশিত হবে এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ বজায় থাকবে।
- প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার অধিকার রক্ষা: বাঙালির নিজের ভাষা আন্দোলনের মূল সুরই ছিল স্বাধিকার এবং অন্যের চাপিয়ে দেওয়া ভাষার বিরুদ্ধে নিজের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। অন্যের ভাষাকে সম্মান জানানোর সেই উদার চেতনা থেকেই প্রত্যাশা ছিল যে, স্বাধীন বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যান্য প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষও যেন কোনো বৈষম্য ছাড়াই তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির মুক্ত চর্চা করতে পারে।
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান:
যেখানে আমরা পিছিয়েপ্রাপ্তির খতিয়ান (যেমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, প্রযুক্তিতে বাংলা) কম না হলেও, অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করা যায় যে, দীর্ঘ সময়েও আমাদের অনেক মৌলিক প্রত্যাশা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে:
- উচ্চশিক্ষা ও বিচার বিভাগে ইংরেজি প্রীতি: স্বাধীনতার এতদিন পরও দেশের উচ্চ আদালত এবং বিজ্ঞান, চিকিৎসা বা প্রকৌশল বিদ্যার মতো উচ্চশিক্ষার স্তরগুলোতে বাংলার ব্যবহার এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। উচ্চ আদালতের অধিকাংশ রায় ও আইনি নথিপত্র এখনো ইংরেজিতে লেখা হয়। তাছাড়া, উচ্চশিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত অনুবাদ গ্রন্থ ও বাংলায় মৌলিক গবেষণার অভাবের কারণে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি মাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
- ভাষাদূষণ ও বিকৃতি: বর্তমান প্রজন্মের একাংশের মধ্যে বাংলা ও ইংরেজির এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি মিশ্রণ তৈরি করে বিকৃত উচ্চারণে 'বাংলিশ' বলার এক ক্ষতিকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক গণমাধ্যম, এফএম রেডিওর কৃত্রিম উপস্থাপন শৈলী এবং আধুনিক নাটক ও সিনেমায় সুকৌশলে ভাষার যে বিকৃত ও সস্তা উচ্চারণ প্রদর্শন করা হয়, তা একুশের চেতনার চরম পরিপন্থী।
- মনস্তাত্ত্বিক দৈন্যতা ও হীনম্মন্যতা: আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখনো ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলতে পারাকে আভিজাত্য, আধুনিকতা ও যোগ্যতার প্রতীক মনে করা হয়। এর বিপরীতে নিজের মাতৃভাষার সঠিক ব্যবহারের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অবহেলা ও হীনম্মন্যতা কাজ করে। এই মানসিক দৈন্যতা বা ভাষাগত হীনম্মন্যতা নতুন প্রজন্মকে শিকড়বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে এবং আমাদের একুশের চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
- ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার সংকট: বাংলাদেশে প্রায় অর্ধশত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বাস করে, যাদের নিজস্ব সমৃদ্ধ ভাষা ও চমৎকার লিপি রয়েছে। কিন্তু সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের অনেক ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। সরকার প্রাথমিক স্তরে কয়েকটি নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিতরণ শুরু করলেও দক্ষ শিক্ষকের তীব্র অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই শিশুরা নিজ মাতৃভাষায় পুরোপুরি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না।
উত্তরণের পথ ও আমাদের করণীয়:
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই ব্যবধান ঘুচিয়ে একুশের চেতনাকে জাতীয় জীবনে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে হলে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
⇒ দেশের উচ্চ আদালতের সমস্ত রায়, আদেশ ও আইনি কার্যক্রম বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলায় দেওয়ার আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো প্রস্তুত করতে হবে। একই সাথে, সরকারি ও বেসরকারি সর্বস্তরের দাপ্তরিক কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে 'বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭'-এর শতভাগ বাস্তবায়ন কঠোরতার সাথে নিশ্চিত করতে হবে।
⇒ বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা ও অর্থনীতির মতো জটিল ও আধুনিক বিষয়গুলো সহজ ও প্রাঞ্জল বাংলায় রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এর জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী 'জাতীয় অনুবাদ সংস্থা' গঠন করতে হবে, যা মানসম্মত উচ্চশিক্ষার পাঠ্যপুস্তক বাংলায় সহজলভ্য করবে।
⇒ বাণিজ্যিক গণমাধ্যম, এফএম রেডিওর কৃত্রিম উপস্থাপন শৈলী, নাটক-সিনেমা এবং বিজ্ঞাপনে বাংলার অপপ্রয়োগ ও 'বাংলিশ'-এর সস্তা বিকৃতি রোধে রাষ্ট্রীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় আইনি নীতিমালা ও সামাজিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
⇒ 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট'-কে আরও গতিশীল করে এ দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর বিপন্ন ভাষা ও লিপি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতে হবে। উপজাতীয় শিশুদের জন্য নিজস্ব মাতৃভাষার পাঠ্যপুস্তক বিতরণের পাশাপাশি তা শেখানোর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সর্বোপরি, ভাষাগত হীনম্মন্যতা দূর করে "বাংলা আমার অহংকার"- এই গৌরবময় বোধ শৈশব থেকেই প্রতিটি শিশুর অন্তরে প্রোথিত করতে হবে। পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলামে ভাষা চর্চাকে গুরুত্ব দিতে হবে, যেন নতুন প্রজন্ম অন্য ভাষা শেখার পাশাপাশি নিজের ভাষাকে মননে ও কর্মে সর্বোচ্চ মর্যাদার স্থানে রাখতে পারে।
উপসংহার:
একুশ আমাদের কণ্ঠে ভাষা দিয়েছে, হৃদয়ে দিয়েছে আবেগ, চেতনায় জাগিয়েছে দৃঢ়তা। একুশ আমাদের মুক্তির চেতনায় উদ্দীপ্ত করেছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদরা যে অবদান রেখেছেন, তাকে চিরকাল অম্লান রাখতে হবে। একুশকে কেবল ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের আনুষ্ঠানিকতা বা প্রভাতফেরির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। আমাদের মুক্তি চেতনার উৎস ও বাহক একুশকে তার যথাযথ সম্মান প্রদান করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। যেদিন এ দেশের প্রতিটা স্তরে বাংলা ভাষা তার আপন মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং একটি অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে উঠবে, সেদিনই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ পূর্ণতা পাবে এবং আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ পূর্ণতা পাবে।