মহানবি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর পুত্রের মৃত্যুদিনে সূর্যগ্রহণ দেখা যায়।
বহুদিন পর দাই-মা হালিমাকে দেখে রাসুল (স.) আকুল হয়ে উঠেছিলেন। শৈশবে মুহাম্মদ (স.)-কে নিজ সন্তানের ন্যায় স্নেহ দিয়েছিলেন দাই-মা হালিমা। সেই আদর-স্নেহের কথা ভোলেননি তিনি। আর তাই কোমল মনের অধিকারী মুহাম্মদ (স.) বহুদিন পর দাই-মাকে দেখে 'মা আমার, মা আমার' বলে আকুল হয়ে উঠেছিলেন।
যেসব মহাপুরুষের আবির্ভাবে পৃথিবী ধন্য হয়েছে মানুষের জীবনে যাঁরা এনেছেন সৌষ্ঠব, ফুটিয়েছেন লাবণ্য, মরুভাস্কর হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (স.) তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।
হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবন আলোচনা করতে গিয়ে সকলের আগে আমাদের চোখে পড়ে তাঁর ঐতিহাসিকতা। হজরতের জীবনের প্রত্যেকটি ঘটনা, প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি বিবরণ যেভাবে রক্ষা করা হয়েছে, সত্যের কষ্টিপাথরে ঘষে যেভাবে যাচাই করা হয়েছে, পৃথিবীর কোনো মহাপুরুষের বেলায় তা করা হয়নি।
আরবের লোকের স্মৃতিশক্তি ছিল সত্যি অসাধারণ। বিরাট বিরাট কাব্যগ্রন্থ সহজেই তারা মুখস্থ করে ফেলত। আরবি সাহিত্যের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায়, মুখস্থ না করে কোনো কিছু লিখে রাখা আরবিরা লজ্জার কথা বলে মনে করত। সাহাবিরা এবং অন্য হাদিসজ্ঞরা অনেকেই হাজার হাজার হাদিস মুখস্থ করে রাখতেন।
হজরত মোস্তফা (স.) মানবতার গৌরব। আল্লাহর নবি হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষই মনে করতেন এবং সেভাবেই তিনি জীবনযাপন করেছেন। ৬৩ বছরের ক্ষুদ্র পরিসর জীবনে হজরতকে কত পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হয়েছে, দেখলে অবাক হতে হয়। যিনি ছিলেন এতিম, তিনি হয়েছিলেন সারা আরবভূমির অবিসংবাদিত নেতা। হজরত যখন মদিনার অধিনায়ক, তখন তাঁর ঘরের আসবাব ছিল একখানা খেজুর পাতার বিছানা আর একটি পানির সুরাহি। অনেক দিন তাঁকে অনাহারে থাকতে হত এবং অনেক সময় উনুনে জ্বলত না আগুন।
হজরতের চরিত্রে সংমিশ্রণ হয়েছিল কোমল আর কঠোরের। বিশ্বাসে যিনি ছিলেন অজেয়, অকুতোভয়, সত্যে ও সংগ্রামে যিনি বজ্রের মতো কঠোর, পর্বতের মতো অটল, তাঁকেই আবার দেখতে পাই- কুসুমের চেয়েও কোমল। বন্ধু-বান্ধবের জন্য তাঁর প্রীতির অন্ত নেই মুখ তাঁর সব সময় হাসিহাসি, ছেলেপিলের সঙ্গে মেশেন তিনি একেবারে শিশুর মন নিয়ে পথে দেখা হলে বালক-বন্ধুকে তার বুলবুলির খবর জিজ্ঞেস -করতে তাঁর ভুল হয় না। বন্ধুবিয়োগে চক্ষু তাঁর অশ্রুসিক্ত হয়। বহু দিন পর দাই-মা হালিমাকে দেখে 'মা আমার, মা আমার' বলে তিনি আকুল হয়ে ওঠেন। মক্কাবিজয়ের পর সাফা পর্বতের পাদদেশে বসে হযরত বক্তৃতা করছিলেন। একজন লোক তাঁর সামনে এসে ভয়ে কাঁপতে লাগল। হজরত অভয় দিয়ে বললেন: "ভয় করছ কেন? আমি রাজা নই, কারও মুনিবও নই এমন মায়ের সন্তান আমি, শুষ্ক খাদ্যই যাঁর আহার্য।”
হজরত জীবনে কাউকে কড়া কথা বলেননি কাউকে অভিসম্পাত দেননি। আনাস নামক এক ভৃত্য দশ বছর হজরতের চাকরি করার পর বলেছেন এই সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে হজরতের মুখে তিনি কড়া কথা শোনেননি কখনো। মক্কায় বা তায়েফে অত্যাচারে জর্জরিত হয়েও হজরতের মুখে অভিসম্পাতের বাণী উচ্চারিত হয়নি। বরং তিনি বলেছেন, "এদের জ্ঞান দাও প্রভু এদের ক্ষমা করো।" জগতে সাম্যের প্রতিষ্ঠা মোস্তফা চরিত্রের অন্যতম বিশেষত্ব। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ও দাস-ব্যবসায়ের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে মানবাত্মা যখন গুমরে মরছিল, রাসুলুল্লাহ্ (স.) তখন প্রচার করেন সাম্যের বাণী।
সমগ্র জীবন দিয়ে তিনি সাম্যের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। চরম দুরবস্থার হাত থেকে দাসদের পরিত্রাণের জন্যও তিনি কাজ করেছেন। মানুষকে সালাতে আহ্বান করার জন্যে মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেছেন হাবশি গোলাম হজরত বেলালকে।
নারীর অবস্থার পরিবর্তন এনেছেন হজরত। নারীর মর্যাদা ছিল তাঁর শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। তাঁর কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)-কে কেন্দ্র করে সে যুগে গড়ে উঠেছে নারীত্বের আদর্শ। হজরত ঘোষণা করেছেন: “বেহেশত মায়ের পায়ের নিচে।”
কুসংস্কারকে হজরত কোনো দিনই প্রশ্রয় দেননি। একবার হজরতের পুত্রের মৃত্যুদিনে সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। লোকে বলাবলি করতে থাকে বুঝি হজরতের বিপদে প্রকৃতি শোকাবেশ পরিধান করেছে। তখনি সভা ডেকে হজরত এই বাস্তবতাবিরোধী কথার প্রতিবাদ করলেন; বললেন, “আল্লাহ্র বহু নিদর্শনের মধ্যে দুটি চন্দ্র ও সূর্য। কারুর জন্ম বা মৃত্যুতে চন্দ্র সূর্যে গ্রহণ লাগতে পারে না।”
হজরত জ্ঞানের ওপর জোর দিয়েছেন সব সময়। জ্ঞান যেন হারানো উটের মতো তাকে তিনি খুঁজে বের করতে বলেছেন যেখান থেকেই হোক। আরও বলেছেন তিনি: “জ্ঞানসাধকের দোয়াতের কালি শহিদের লহুর চাইতেও পবিত্র।”
এভাবে জ্ঞানের আলোয় মানুষের হৃদয় উজ্জ্বল করার প্রেরণা দিয়ে গেছেন তিনি।
জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব বোঝাতেই হজরত মুহাম্মদ (স.) জ্ঞানসাধকের কলমের কালিকে শহিদের রক্তের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন।
হজরত মুহাম্মদ (স.) সবসময়ই যা সত্য, যা যুক্তিগ্রাহ্যতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। জ্ঞানচর্চা ব্যতীত মানুষের মন সত্য ও যুক্তির আলোয় আলোকিত হতে পারে না। এ কারণেই হজরত মুহাম্মদ (স.) জ্ঞানচর্চার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। জ্ঞানসাধকের কলমের কালিকে শহিদের রক্তের চেয়েও পবিত্র ঘোষণা করে তিনি মানুষকে জ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করেছেন।
উদ্দীপক ও আলোচ্য প্রবন্ধে মহানবি (স.)-এর সারল্যের পরিচয় ফুটে উঠেছে।
মহানবি হজরত মুহাম্মদ (স.) ছিলেন আল্লাহর নবি। তা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষ হিসেবেই ভাবতেন এবং সেভাবেই জীবনযাপন করতেন। তাঁর জীবন ছিল সহজসরল ও অনাড়ম্বর। মানুষকে তিনি অতি সহজে আপন করে নিতেন।
উদ্দীপকে মহানবি (স.)-এর চরিত্রের একটি বিশেষ গুণের কথা বলা হয়েছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেও তাঁর মাঝে কোনো ধরনের অহংকার ছিল না। সাধারণের মাঝে অবলীলায় মিশে যেতেন তিনি। সবার প্রতি ছিল মাধুর্যপূর্ণ আচরণ। শিশুদেরকেও খুব ভালোবাসতেন তিনি। 'মরু-ভাস্কর' রচনায় মহানবি (স.)-এর সহজসরল ও নিরহংকার মনোবৃত্তির যে পরিচয় মেলে, তা উদ্দীপকেও লক্ষণীয়।
'মরু-ভাস্কর' রচনায় হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর নানাবিধ গুণের সমাবেশ ঘটলেও উদ্দীপকে তা ঘটেনি।
লেখক হবীবুল্লাহ্ বাহার 'মরু-ভাস্কর' প্রবন্ধে মহানবি (স.)-এর জীবন ও আদর্শের নানাদিক তুলে ধরেছেন। মহানবি (স.)-এর চরিত্রে ক্ষমাশীলতা, দয়া, মানবপ্রেম, ধৈর্যশীলতাসহ সব ধরনের মানবীয় গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। সর্বগুণে গুণান্বিত হয়েও তিনি ছিলেন সহজসরল, নিরহংকার।
উদ্দীপকে মহানবি (স.)-এর সারল্যের পরিচয় ফুটে উঠেছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে তিনি স্বীকৃত। অথচ আজীবন তিনি ছিলেন সহজসরল, মানবপ্রেমী। সবার প্রতি তাঁর আচরণ ছিল মধুময়। মহানবি (স.)-এর বিশেষ এ গুণটি ছাড়াও 'মরু-ভাস্কর' রচনায় আরও নানা গুণের কথা বলা হয়েছে।
হজরত মুহাম্মদ (স.) সেই মহাপুরুষদের একজন, যিনি ছিলেন সব প্রকারের মানবীয় গুণের আধার। মানবপ্রেমে তিনি অতুলনীয়, জীবপ্রেমেও তিনি মহীয়ান। মানুষের প্রতি ভালোবাসায় তিনি ছিলেন কুসুমের মতো কোমল। আবার সত্য প্রকাশে ছিলেন বজ্রের মতো কঠোর। নিষ্কলুষ চারিত্রিক গুণাবলি ও মানবপ্রেমের কারণেই তিনি সর্বকালের সকল মানুষের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। মহানবি (স.)-এর গুণাবলি সম্পর্কে এমন বিস্তৃত ধারণা পাওয়া যায় 'মরু-ভাস্কর' রচনায়। অন্যদিকে উদ্দীপকের সংক্ষিপ্ত পরিসরে কেবল তাঁর সহজসরল মানসিকতার পরিচয় মেলে। উদ্দীপকে তাই মহানবি (স.)-এর গুণাবলির আংশিক প্রতিফলন ঘটেছে। অর্থাৎ প্রশ্নোক্ত বক্তব্যটি যৌক্তিক।
আলোচ্য উক্তিটিতে হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর ক্ষমাশীলতার দিকটি ফুটে উঠেছে।
মহানবি হজরত মুহাম্মদ (স.) শত্রুর প্রতি ক্ষমাশীলতার মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। মক্কায় ইসলাম প্রচারের সময় তিনি নির্মমভাবে অত্যাচারিত হয়েছিলেন। তাই বলে শত্রুদের তিনি অভিশাপ দেননি। তার পরিবর্তে অত্যাচারীদের বোধোদয়ের জন্য তিনি প্রার্থনা করেছিলেন। এমনই ছিল হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর ক্ষমাশীল মানসিকতা, যা প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে প্রকাশিত হয়েছে।