কৃষিকাজে বিজ্ঞান
সূচনা: মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো কৃষিক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের ছোঁয়া লেগেছে। মানুষ বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে প্রকৃতির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। চাষাবাদ, ফসল উৎপাদন, ফসল সংরক্ষণ ও সরবরাহসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। বিজ্ঞানের এমন চরম উৎকর্ষের ফলে কৃষিকাজে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
সনাতন পদ্ধতিতে কৃষিকাজ: আদিম সমাজ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত কৃষির চাহিদা টিকে রয়েছে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। তখন বেঁচে থাকার জন্য মানুষ কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করেছে। শুরুতে তারা গোরু, মহিষ, ঘোড়া, লাঙল ইত্যাদির মাধ্যমে জমি চাষ করত। বিজ্ঞান সনাতন এসব পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে।
কৃষিকাজে বিজ্ঞানের উদ্ভাবন: উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে কৃষিতে আধুনিকতার সূচনা ঘটে। তখন থেকে কৃষকরা লাঙল-জোয়াল, গোরু-মহিষের পরিবর্তে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দিয়ে কৃষিকাজ আরম্ভ করে। সেচ ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক বৃষ্টিনির্ভরতার বিপরীতে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দেওয়া ও কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর যন্ত্রের মাধ্যমে এ কাজ সম্পন্ন হতে থাকে। উন্নত বীজ উৎপাদন ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এর মান নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞানেরই সাফল্য। এছাড়া বিভিন্ন রাসায়নিক সার আবিষ্কারের ফলে ফসলের ক্ষতিসাধন রোধ বিজ্ঞানের কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে।
কৃষিকাজে বিজ্ঞানের প্রভাব: বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ফলে কৃষিক্ষেত্রে এ বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কৃষিকাজ সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় শ্রমশক্তি যেমন কম লাগছে তেমনি সময় অপচয় রোধ হয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে শীতপ্রধান দেশে তাপ নিয়ন্ত্রণ করে শাক-সবজি ও ফলমূল ঘরেই উৎপাদন করা যাচ্ছে। মরুভূমির দেশে বালি সরিয়ে সেখানে মাটি ফেলে সেচের মাধ্যমে ফসল চাষ করা হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে জমির উর্বরতা কম থাকা সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ফলে অনেক বেশি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
আধুনিক যন্ত্রপাতি: কৃষিতে বিজ্ঞানের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির আবিষ্কার মানুষের সময় ও শ্রম বাঁচিয়েছে বহুগুণে। সহজতর হয়েছে কৃষিব্যবস্থা। কৃষিকাজে বিজ্ঞান যেসব যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: শস্য ছেদনকারী যন্ত্র- মোয়ার, ফসল কাটার যন্ত্র-রূপার, ফসল বাঁধার যন্ত্র- বাইন্ডার, মাড়াইয়ের যন্ত্র- প্রেশিং মেশিন, সার বিস্তারণ যন্ত্র- ম্যানিউর স্প্রেডার, চাষাবাদ করার যন্ত্র- ট্রাক্টরসহ আরও অসংখ্য যন্ত্রপাতি। আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার কম্পিউটারের ব্যবহারও কৃষিকাজে শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষিকাজে বিজ্ঞান: বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এখানকার জমির উর্বরাশক্তি অন্য দেশের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। কিন্তু সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহারের অভাবে এদেশের কৃষিকাজে এখনো তেমন পরিবর্তন সাধিত হয়নি। অনুর্বর জমি হওয়া সত্ত্বেও উন্নত দেশসমূহ যেখানে বিজ্ঞানের কল্যাণে অনেক বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারছে, সেখানে আমাদের দেশের কৃষকরা এখনো লাঙল-জোয়াল আর গোরু-মহিষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। বাংলাদেশে শতকরা ৮০ ভাগ কৃষক এখনো সচেতনতা, শিক্ষা ও মূলধনের অভাবে প্রচুর শ্রম দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফসল পাচ্ছে না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ না করাই এর অন্যতম কারণ।
কৃষিকাজে বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা: কৃষিকাজে বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে বাংলাদেশে কৃষিকাজে বিজ্ঞানের ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এদেশের আবাদি জমির তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। বর্ধিত জনসংখ্যার আবাসনের চাহিদা মেটাতে সেই কৃষিজমিতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন বাড়িঘর। অভাব দেখা দিচ্ছে খাদ্যশস্যের। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। তাই বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষিকাজে উন্নতি সাধন করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।
কৃষিকাজে বিজ্ঞানের ক্ষতিকর দিক: কৃষিব্যবস্থায় বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে উন্নতি যেমন হয়েছে, তেমনি কিছু খারাপ প্রভাবও লক্ষ করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, বৃষ্টির পানির সাথে মিশে পুকুরের মাছ চাষে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। সার ও কীটনাশকের রাসায়নিক পদার্থ বাতাসের সাথে মিশে বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। তাই বিজ্ঞানের সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিকাজে উন্নতির প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
উপসংহার: বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের খাদ্যের চাহিদা পূরণ হয় কৃষিক্ষেত্র থেকে। এজন্য এ ক্ষেত্রকে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। নতুন নতুন উদ্ভাবনকে কৃষিকাজে ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সাথে কৃষিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা গেলে উন্নত দেশের মতো এদেশের কৃষিব্যবস্থা থেকে সর্বোচ্চ সফলতা পাওয়া সম্ভব হবে। তাই কৃষিকাজে বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ অত্যাবশ্যকীয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!